Home গল্প ভোজন বিড়ম্বনা -নুরুল হুদা

ভোজন বিড়ম্বনা -নুরুল হুদা

শফিক সাহেবের একমাত্র সন্তান আদিল। তাকে নিয়ে মা-বাবার স্বপ্নের অন্ত নেই। শিশুকাল থেকেই যেন ছেলেটি পরোপকারী হয় সে দিকেই নজর বাবা-মায়ের। আদিল ছাত্র হিসেবে খুব ভালো। সমাপনী পরীক্ষায় জিপিএ ফাইভ পেয়েছে সে। শফিক সাহেব তাকে ভর্তি করিয়ে দেন নোয়াখালী জেলা স্কুলে। অল্প দিনেই আদিল তার প্রখর মেধাশক্তি ও উত্তম চরিত্র দ্বারা সবার মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। বন্ধুদের মধ্যে নাদিমের সাথে বেশ সখ্য গড়ে ওঠে তার। কারণ নাদিম এবং আদিল একই মহল্লায় বাস করে। নাদিম ধনী পরিবারের সন্তান। পাড়ায় তাদের ব্যাপক নাম ডাক। দুই বন্ধু এক সাথে রোজ স্কুলে যায়। তারা যে পথে স্কুলে যায় সে পথে নতুন একটা বস্তি গড়ে ওঠে। গত কিছু দিন ধরে মেঘনা নদীর প্রচণ্ড ভাঙনে গৃহহীন মানুষগুলো মাথা গোঁজার তাগিদে শহরের এই প্রশস্ত রাস্তার পাশে তাঁবু টানায়। আজ স্কুলে যাওয়ার সময় তাদের দৃষ্টি পড়ে এই তাঁবুগুলোর প্রতি। আদিল তাঁবুর মানুষগুলো সম্পর্কে জানতে চায়। নাদিম বিরক্তির স্বরে বলে, এদের সম্পর্কে কী জানবে। এরাতো বস্তির লোক। আদিল বললো, এদের দেখে মনে হচ্ছে খুবই অসহায় লোক এরা। নাদিম বললো আরে ধ্যাৎ! চল, স্কুলের সময় চলে যাচ্ছে। নাদিমের পীড়াপীড়িতে আদিল স্কুলের দিকে পা বাড়ায়। কিন্তু আজ আদিলের পাঠে মনোযোগ নেই। গণিতের টিচার শরীফ স্যার বুঝতে পারলেন যে আদিল আজ আনমনা হয়ে আছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, মন খারাপ কেন আদিল? আদিল আমতা আমতা করে বলল, না স্যার। ও দিকে নাদিম ব্যস্ত তার বার্থডে পার্টির দাওয়াত নিয়ে। আজ সন্ধ্যায় তার বারোতম বার্থডে পার্টি। আদিলকে আগেই দাওয়াত করেছিল। আদিল নাদিমের প্রতি খুবই বিরক্ত। ছুটির পর দু’জনেই বাড়ির পথে পা বাড়াল। তাঁবুগুলোর কাছে আসতেই আদিল বললো, চল এবার মানুষগুলোর একটু খোঁজ নিই। নাদিম বললো, তুমি তো জান আজ আমার বার্থডে পার্টি। তুমি খোঁজ নাও আমি বরং চলি। নাদিমের কারণে এখনো জানা হলো না এই মানুষদের সম্পর্কে। আদিল সিদ্ধান্ত নিলো আজ নাদিমের পার্টিতে সে যাবে না। প্রতি দিনের মতো আদিল খাওয়া-দাওয়া সেরে শোয়ার ঘরে গেল। কিন্তু কিছুতেই এই মানুষগুলোর কথা মন থেকে সরাতে পারছে না। এদিকে বিশাল কেক কেটে নাদিম তার জন্মদিনের উৎসব শুরু করলো। বন্ধুরা সবাই এলো। সবার একই প্রশ্ন, নাদিম তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড আদিল এলো না কেন? নাদিম বললো দেখলে না, আজ ক্লাসে তার মন খারাপ ছিল। সেই জন্যই হয়তো আসেনি আর কি। তার কথা বাদ দাও। তোমরা সবাই এসেছ না। তার জন্য কি আমার পার্টি বসে আছে। নাদিমের বাবা তার বন্ধুদের জন্য, অভিজাত এক ভোজের আয়োজন করলো। কোর্মা, পোলাও থেকে শুরু করে কোনটাই বাদ যায়নি খাবারের মেনু থেকে। সবাই মিলে ভোজ উৎসবে মেতে উঠলো। বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে নাদিম অতিরিক্ত খেয়ে ফেললো, অতি ভোজনের কারণে নাদিমের ভীষণ পেটের পীড়া শুরু হলো। অবস্থা এতোই জটিল হলো যে, নাদিম পরদিন স্কুলে যেতে পারলো না। আদিল আজ নাদিমের জন্য অপেক্ষা না করে টিফিন বক্স ব্যাগে রেখে স্কুলের পথে রওয়ানা দিল। পথিমধ্যে একটি কচিকণ্ঠের কান্নার আওয়াজ শুনতে পেল। এগিয়ে গিয়ে দেখলো একটি ছেলে পেট চেপে ধরে কান্না করছে। আদিল জানতে চাইলো তার কী হয়েছে। ছেলেটির বাবা বললো, বাবু আমরা ধরিয়া ভাঙ্গার মানুষ। গত সপ্তাহে মেঘনা নদীর প্রচণ্ড ভাঙনে আমাদের বসতভিটা সহায় সম্পত্তি বিলীন হয়ে গেছে। এর নাম আদনান। আদনান তোমাদের মতো একজন ছাত্র। আজ কয়দিন অনাহারে অর্ধাহারে থাকার কারণে ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। এ অবস্থা দেখে আদিলের চোখে পানি চলে এলো। আদিল তড়িঘড়ি করে তার টিফিন বক্স থেকে সব কয়টি রুটি ও ডিম বের করে আদনানকে খেতে দিল। আদনান তা খেয়ে স্বস্তি পেল এবং আদিলের দিকে তাকিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো। আদিলও খুশি মনে স্কুলের দিকে দ্রুত পা বাড়াল। স্কুলে গিয়ে দেখলো নাদিম এখনো আসেনি। আদিলের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে গেল। কারণ নাদিম তো কখনো স্কুলে অনুপস্থিত থাকে না। সে স্থির করলো ছুটির পর নাদিমের বাড়িতে যাবে। নাদিমের বাসার কলিংবেল টিপতেই তার ছোট ভাই নাফিস দরজা খুলে দিল। আদিলকে দেখে নাদিম অভিমান করে বললো এখন এসেছ, কালকে এলে না কেন? আদিল বললো আগে বলো আজ স্কুলে গেলে না কেন? নাদিম বললো আসলে বন্ধু গতকাল পার্টিতে একটু বেশি খেয়ে ফেললাম। তাই পেটে প্রচণ্ড ব্যথা আরম্ভ হলো। আদিল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, এবার তাহলে শোন, কালকে যে তাঁবুর মানুষদের খোঁজ নিতে সময় দাওনি, আজ তাদের খোঁজ নিতে গিয়ে দেখলাম আদনান নামের একটা ছেলে ক্ষুধার যন্ত্রণায় পেট চেপে ধরে কান্না করছে। আর তুমি বেশি খাওয়ার কারণে কষ্ট পাচ্ছ। তুমি যদি তাদের খোঁজ নিতে এবং অতিরিক্ত না খেয়ে তাদেরকে খেতে দিতে তাহলে সেও কষ্ট পেতো না। আর তুমিও কষ্ট পেতে না। আদিলের কথা শুনে নাদিমের অন্তর নাড়া দিলো। নাদিম বললো তুমি ঠিকই বলেছ। এদিকে আদিলের পথ চেয়ে আছে তার মা। স্কুল থেকে ফিরতে দেরি হাওয়ায় তার মা চিন্তিত। ইতোমধ্যে আদিল বাড়িতে ঢুকতেই তার মুখের দিকে তাকিয়ে মা বললেন, কী আদিল আজ তোমার মুখ শুকনো কেন? টিফিন করোনি? আসতে দেরি হলো কেন? আদিল সব ঘটনা খুলে বললো। ছেলের এ উদার মানবিকতা দেখে মায়ের চোখ বেয়ে আনন্দ অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। আদিলের বাবা শফিক সাহেবকে ছেলের এই উদারতার কথা জানালে তার বাবা আনন্দচিত্তে আদিলের জন্য হাত তুলে আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন।

SHARE

Leave a Reply