Home স্বাস্থ্য কথা সব কিছুই খাবার নয় -উম্মে নাজিয়া

সব কিছুই খাবার নয় -উম্মে নাজিয়া

দোকানে গেলেই জিভে পানি এসে যায়। তারপরে থাকে ছোটখাটো উপহার। চিপস কিনলে খেলনা, স্টিকার ফ্রি ইত্যাদি। বন্ধুরা টিফিন হলেই দলবেঁধে খায় চিপস, ড্রিংকস, বিস্কুট, আইসক্রিম, বার্গার, পিজা, নাচৌ, ড্রিপ ফ্রাই, আচার, সমুচা, সিঙ্গারা, পিঠা, ফুচকা, হালিম ইত্যাদি রকমারি মুখরোচক খাবার। এগুলো খেতে কার না ভালো লাগে। খেতে কত সুস্বাদু। রেস্টুরেন্টের আশপাশ দিয়ে গেলে সুগন্ধে চারদিক মৌ মৌ করে, তারপর কেউ যদি বলে এগুলো খেতে নেই তাহলে তুমিই বল তা কি মেনে নেয়া যায়? ছোট বন্ধুরা! তোমরা অনেক ছোট, অনেক জিনিসই বুঝতে পার না। তাহলে বলিÑ বাজারে খোলা তেলে যেসব খাবার ভাজা হয়, সেই তেলের ব্যাপারে, তুমি কি জান ঐ তেলের বয়স তোমার চেয়ে বেশি? হাসছ? মোটেও হাসির বিষয় নয়, তেল বার বার গরম করতে থাকলে তরল তাপমাত্রা গ্রহণের হার ধীরে ধীরে কমতে থাকে, ফলে একই তেলে বার বার জিনিস ভাজতে থাকলে তেল বিষাক্ত হয়ে যায় এবং মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে পড়ে। বাজারে খাবারের ব্যবসায়ীরা তেল কখনও ফেলে দেয় না। একই তেলের মধ্যে নতুন করে তেল গুলে এবং ভাজতে থাকে। তাই পুরনো তেলে ভাজা খাবার খেয়ে প্রায়ই শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ে, সেই সঙ্গে পেটের সমস্যা তো রয়েছে। এতো গেল তেলের কথা! খাবারের উপাদান তো কথাই নেই! নিম্নমানের আটা, পচা ডিম, মরা মুরগি, কম দামের বাটার, কৃত্রিম চিনি বা আসল চিনি নয় রাসায়নিক দ্রব্য (মরবিটল, স্যাকারিন, সোডিয়াম থাই স্মেমেট) দিয়ে বানানো হয়েছে। পড়তে খুব কঠিন মনে হচ্ছে, শুধু জেনে রাখ মুখস্থ করতে হবে না। এগুলো বেশি খেলে কিডনি দুর্বল হয়ে যায়। খাদ্যদ্রব্যে যেমন- কেকে যে ক্রিম দেয়া হয়, অধিকাংশই খুব বিষাক্ত। সয়াবিন তেল, গুড়ো দুধ, ডিম আর চিনি দিয়ে এই ক্রিম তৈরি করে থাকে। পুরনো গুঁড়ো দুধ অনেক পুরনো হয়ে গেছে মানুষের খাবার উপযোগী নয়, সেই দুধ নিম্নমানের তেল দিয়ে ক্রিম কনডেন্সড মিল্ক তৈরি করা হয়, অথচ এগুলো দিয়ে আমরা কত সেমাই, চা-কফি বানিয়ে খাই। যে তেলের কথা এতক্ষণ বলছি, সেই তেলও অনেক খারাপ, ভালো মানের তেলের দাম অনেক বেশি। বেশি দামের তেল কিনে তারা ব্যবসা করে না, কম দামি তেল কিনে বেশি লাভ করে।
দোকানিরা যে মসলা ব্যবহার করে থাকেন তা বেশির ভাগ সময়ে ২/৩ দিনের পুরনো এবং নষ্ট, সেই বাসি পচা মসলা দিয়েই রান্না করা হয়। হালিম এবং সমুচাতে মুরগির নাড়িভুঁড়ি ছোট ছোট টুকরা করে কিছু মাংসের সঙ্গে মিশিয়ে দেয় যা অত্যন্ত ক্ষতিকর।
অনেক সময় এই সব খাবার একদিনে বিক্রি শেষ হয় না, দোকানিরা সেই খাবার পরদিন আবারও গরম করে বিক্রি করে। রাস্তার পাশের এই সকল খোলা খাবারে গাড়ির ধোঁয়া, আবর্জনা, ধুলাবালি পড়ে ধুলাবালিতে বিভিন্ন রোগের জীবাণুসহ ক্ষতিকর বস্তু যোগ হয়। এই সকল বিষাক্ত খাবার সকল বয়সের মানুষের জন্যই ক্ষতিকর, শিশুদের ক্ষতি সবচেয়ে বেশি। কারণ ছোটরা বড়দের তুলনায় বেশি কোমল তাই ক্ষতি বেশি হয়ে থাকে।
বাজারে গুড়ের তৈরি যে সকল খাবার পাওয়া যায় সেগুলোও অনেক বিষাক্ত। বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত রঙ এবং ফিটকিরি পচা আটা দিয়ে এই সকল গুড় তৈরি করা হয়।
ছোট মনিরা! তোমাদের প্রিয় চিপস, ড্রিঙ্কস সেগুলোও অনেক ক্ষতিকর। চিপসে রয়েছে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত মনো সোডিয়াম গ্লুটামেট টেস্টিং সল্ট এবং অন্যান্য ক্ষতিকর দ্রব্য।

এবার বলি কোমল পানীয়র কথা
মজাদার পেপসি, ৭-আপ, কোকাকোলা, মিরিন্ডাতে অনেক ধরনের রাসায়নিক দ্রব্য মেশানো হয়, যেমন দ্রবণীয় কার্বন ডাই অক্সাইড, অতিরিক্ত চিনি, কৃত্রিম চিনি, কীটনাশক এবং আরো অনেক দ্রব্য অনেক দিন থাকলে যাতে কোনো শেওলা না জমে সে জন্য কীটনাশক দেয়া হয়। শীতে যাতে জমে না যায় সে জন্য ইথিলিন গ্লাইকল নামক রাসায়নিক দ্রব্য যোগ করা হয়। ইথিলিন গ্লাইকল দিয়ে মরা মানুষ সংরক্ষণ করে রাখা হয়। কী ভাবছ। এবার তো এসব খাওয়া ছেড়ে দিতেই হবে? মিরিন্ডা, ফানটাতে আরো আছে কৃত্রিম রঙ, টাইগার, স্পিড ইত্যাদিতে রয়েছে অ্যালকোহল, এসব কিন্তু আমি বানিয়ে বলছি না। ঐবধষঃযু ফৎরহশং, ঋবন. ২৫, ২০১৪ সংখ্যায় যা লেখা আছে জানলে তোমাদের চোখ কপালে উঠবে।

কোকে রয়েছে ক্যাফেইন, চিনি এবং অ্যাসপারটামি (অংঢ়ধৎঃধসব)। এই অ্যাসপারটামি ক্যাফেইন খাওয়ার কারণে অনেক রোগ হয়ে থাকে, হয়ত সরাসরি নয় কিন্তু অনেক রোগের কারণ। ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস, ক্যাফেইনে আসক্তি, অতিরিক্ত মোটা হয়ে যাওয়া ইত্যাদি।
যারা দিনে ১-২টি ক্যান অথবা ৫০০সষ চিনিযুক্ত পানীয় পান করে তারা টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়। গবফরপধষ হবংি ঞড়ফধু তথ্য মতে প্রতি বছর পৃথিবীতে এক লাখ চুরাশি হাজার লোক বিভিন্নভাবে অসুস্থ হয়ে মারা যায় এইসব চিনিযুক্ত পানীয় পান করার ফলে। ব্রিটিশ ফার্মামিস্ট নিরাজ নায়েক বলেছেন, একসঙ্গে ৩৩০ সষ কোক খেলে ১ ঘণ্টার মধ্যে এটি হতে পারে। অনেক সময় বমি হতে পারে। কোলাতে ফসফরিক এসিড থাকার ফলে মিষ্টির স্বাদটা এত বুঝা যায় না। মাত্র ২০ মিনিটে রক্তের চিনির মাত্রা বেড়ে যায় যা ইনসলিনের ভারসাম্য ঠিক রাখতে পারে না, তখন শরীর রক্তের অতিরিক্ত চিনি চর্বি হিসেবে জমা করতে থাকে। ৪০ মিনিটের মধ্যে শরীরে রক্তের প্রেসার বেড়ে যায়, যাকে আমরা বলি হাই ব্লাডপ্রেসার। এ ছাড়াও এটি আমাদের ব্রেনের ওপর প্রভাব ফেলে। তোমরা হয়ত শুনে থাকবে অনেক মানুষ বিভিন্ন ধরনের মারাত্মক ক্ষতিকর বস্তু খেয়ে নেশা করে থাকে যাকে বলে মাতাল। নেশা করলে তার কোনো স্বাভাবিক জ্ঞান থাকে না, সে যেকোনো খারাপ কাজ করতে পারে। ধীরে ধীরে সে মৃত্যুর দিকে চলে যায়। ইসলাম ধর্মসহ পৃথিবীর প্রায় সকল ধর্মগ্রন্থে নেশা করাকে তীব্রভাবে নিষেধ করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন কোক খেলে মানুষের মধ্যে ঐ ধরনের আকর্ষণ তৈরি হয়ে থাকে।
এছাড়া সফট ড্রিঙ্কস শিশুদের কিডনির সমস্যা এবং শ্বাসকষ্ট তৈরি করে। আজকাল অনেক শিশু শ্বাসকষ্টে ভুগে থাকে। এর জন্য কত কষ্ট, নেবুলাইজার দিয়ে ঔষধ নেয়া, অক্সিজেন দিতে হয়।
হজমের মাত্রা কমিয়ে দেয়
কোক খেতে খুব সুস্বাদু, এতে কোনো সন্দেহ নেই কিন্তু তুমি কি জান কোক তোমার চর্বি হজম করার জন্য যে সমস্ত এনজাইম দরকার সেই এনজাইমকে নষ্ট করে দেয়। কখনও কোনো ডাক্তার কাউকে বলেন না, আপনি পরিশ্রমের পর অথবা বাচ্চারা খেলাধুলার পর এক বোতল পেপসি অথবা কোক খাবেনÑ বল, বলে কখনো?
মেদ এবং ডায়াবেটিস
আগেই বলেছি যারা অনেক বেশি যে কোন সফট ড্রিঙ্কস খায় তারা বেশ মোটা হয় এবং ভবিষ্যতে তাদের ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেড়ে যায়। ওজন বেশি হলে হার্ট, ফুসফুস এবং কিডনি অসুস্থ হতে পারে। অতিরিক্ত ওজন শরীরে ক্যান্সার কোষগুলোর বৃদ্ধি হতে সাহায্য করে।
দাঁতের এবং হাড়ের ক্ষয়
কোক এবং পেপসির চঐ মাত্রা কম, ৩.২ যা বেশি টকজাতীয়, এই কম মাত্রার কারণে হাড় ক্ষয় হয় এবং দাঁতের চক চকে ভাব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।
গঘঞ পত্রিকাতে ঐড়হধৎ যিরষব সধহ, ংধঃ ওঝ অযঁ ২০১৫ তে লিখেছেন:
প্রায় এক মগ কোলাতে ১০ চা-চামচ চিনি দেয়া হয়। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা (ডঐঙ) বলেছে, দিনে কখনো ৬ চা-চামচের বেশি চিনি খাওয়া একদম ঠিক নয়। হার্ভার্ড পাবলিক স্কুলের গবেষণা থেকে জানা যায়। কতই না কষ্ট, কী দরকার এগুলো খাওয়া। এবার একটা ভালো কথা বলি, সবচেয়ে ভালো জুস হলো লেবুর রসে চিনির শরবত। এছাড়াও যে কোন ফলের জুস আম্মু তৈরি করে দিতে পারেন। সেটা যে কোনো ফল হোক না কেন। যেমন- কাঁচা আম, পাকা আম, পেঁপে, আনারস, বাতাবি লেবু, কমলা, পেয়ারা, কামরাঙ্গা, পাকা তেঁতুল, টমেটো, গাজরের জুস, বাঁধাকপি, লেটুসের জুস আরো কত কী! লেখাটি পড়ে লুকিয়ে রেখো না, পাছে আবার আম্মু পেপসি, কোলা খাওয়া বন্ধ করে দেন। আম্মুকে অবশ্যই লেখাটি পড়তে বলবেÑ যাতে উনি তোমাকে ঘরের তৈরি খাবার খেতে দেন আর বিশ্বস্ত না হলে কোনো বাইরের খাবার যেন না খাওয়ান। ব্যস্ততার কারণে অনেকেই এখন কষ্ট করে ঘরে খাবার তৈরি করতে চান না, টাকা দিয়ে বাইরে থেকে সহজ এবং আরামদায়ক মনে করেন। কিন্তু সাবধান বাইরের প্রায় সকল খাবারেই কিছু না কিছু ক্ষতিকর জিনিস অবশ্যই মেশানো আছে। সেটি বিদেশী হলেও, তবে আমাদের দেশে তৈরি অধিকাংশ খাবারেই এর পরিমাণ খুবই বেশি।
সবচেয়ে ভালো নিজের বাড়িতে তৈরি করা খাবার তবে উপকরণ অর্থাৎ যেসব জিনিস দিয়ে খাবার তৈরি হবে, অবশ্যই যাচাই করে কিনতে হবে। গ্রামের হাটবাজারে এখনও অনেক ভালো জিনিস পাওয়া যায় যা শহরে অনেকাংশেই পাওয়া সম্ভব নয়। ছোট বন্ধুরা! তোমরা বাইরের খাবারকে এবার না বলবে তো?

SHARE

Leave a Reply