Home ফিচার বাংলাদেশের বেতশিল্প -আবদাল মাহবুব কোরেশী

বাংলাদেশের বেতশিল্প -আবদাল মাহবুব কোরেশী

বাংলাদেশের বনজসম্পদের মধ্যে উল্লেখ করার মতো যে সম্পদ দৃশ্যমান তার মধ্যে অন্যতম হলো বেতসম্পদ। অবহেলিত এ সম্পদ মানুষের জীবিকা নির্বাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বেত দিয়ে তৈরি করা নান্দনিক জিনিসপত্র ড্রয়িংরুম বা শোয়ার ঘরের সৌন্দর্য বিকাশের এক অন্যতম উপাদান। নানা কারুকাজমন্ডিত এসব বেতের আসবাবপত্র ও নকশাকরা ফার্নিচার সত্যিই আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। রুচিশীল মানুষের জন্য এটি এক অমূল্য সম্পদ। দেশ-বিদেশের অভিজাত পরিবারে বেতের তৈরি বিভিন্ন শিল্প আজও তার সৌন্দর্য বিকাশের অপরিহার্যতা সগৌরবে জানান দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অতীব দুঃখজনক ব্যাপার যে, বিশ্বজোড়া খ্যাতিসম্পন্ন ঐতিহ্যবাহী বেত শিল্পের আজ বড় দুর্দিন যাচ্ছে। যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এখনো এটি একটি বৃহৎ শিল্প হিসেবে গড়ে উঠতে পারেনি। অথচ এ শিল্পকে সঠিকভাবে তত্ত্বাবধান করলে একদিকে যেমন দরিদ্র মানুষের একটি আয়-রোজগারের পথ বের হতো ঠিক তেমনি দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামো বিনির্মাণ করতে বেত একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতো। শুধু অবহেলা আর অদূরদর্শিতার কারণে একটি সম্ভাবনাময় শিল্প আজ মৃতপ্রায় হয়ে কোনোভাবে বেঁচে আছে। বেতের সম্ভাবনাময় এ দিকটা লক্ষ রেখে আমরা যদি বেত শিল্পকে সামনে নিয়ে আসতে পারি, তবে বেত আমাদের শুধু বৈদেশিক মুদ্রাই দেবে না, দেশের একটা উল্লেখযোগ্য বেকার অংশকে আয়ের রাস্তা দেখিয়ে দেবে সন্দেহ নেই। আর এটা সরকারের আন্তরিকতা ছাড়া মোটেও সম্ভবপর নয়।

বেত কী
বেত একপ্রকার সপুষ্পক উদ্ভিদ। বেতগাছের বৈজ্ঞানিক নাম Calamus tenuis,, যা Arecaceae পরিবারভুক্ত। বেত একজাতীয় লতাবিশিষ্ট বা সোজা বেয়ে ওঠা পাম। বিশ্বে ১৩টি গণের প্রায় ৬০০ প্রজাতির বেত রয়েছে। বাংলাদেশে আছে বেতের মাত্র ২টি গণ, MY, Calamusএবং Daemonorops। শেষোক্ত গণের আছে একটি প্রজাতি D. jenkinsianus  (গোলাব বেত বা গোল্লা বেত)। Calamusগণের ১০ প্রজাতির মধ্যে আছে: C. erectus  (কদম বেত), C. flagellum, C. floribundus, C. guruba  (জালি বেত), C. gracilis, C. latifolius (কোরাক বেত), C. longisetus (উদম বেত),C. tenuis (সাঁচি বেত), C. viminalis var. fasciculatus (বড় বেত), C. quinquenervius|। সর্বমোট ১১ প্রজাতির মধ্যে C. flagellum, C. floribundus, C. gracilis, C. quinquenveriusএখন আর সহজলভ্য নয়। এগুলো খুব কমে গেছে কিংবা তাদের উৎপাদন একেবারেই সীমিত হয়ে পড়েছে।
বেতের আবাসস্থল ও বর্ণনা
এশিয়ার গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলের অধিকাংশ বনেই সাধারণত বেতের উৎপাদন ভালো হয়। এটি বাংলাদেশ, ভুটান, কম্বোডিয়া, লাওস, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ভারত, জাভা ও সুমাত্রা অঞ্চলের উদ্ভিদ বললেও অত্যুক্তি হবে না। তা ছাড়া বেত ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলের ভেজা ও জংলা নিচুভূমিতে প্রচুর জন্মে। মালয়েশীয় ভাষায় বেতের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপগোত্রের নাম রতন (rattan) এবং বাংলাদেশেও অনেক এলাকায় তা রতন নামেই পরিচিত। আমাদের দেশে বেত সাধারণত চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পার্বত্য-চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাহাড় ও নিচু এলাকায় বেত প্রচুর পরিমাণে জন্মে। বেতগাছ সাধারণত চিকন, লম্বা, কাঁটাযুক্ত ও খুবই শক্ত হয়। অঙ্গজ ও বীজ উভয় পদ্ধতির মাধ্যমে বেতের বংশবিস্তার বা চাষ করা যেতে পারে। অঙ্গজ চাষে ঊর্ধ্বধাবক ব্যবহৃত হয়। বীজ চাষে বীজতলায় চারা প্রস্তুত করে পরে অন্যত্র রোপণ করা হয়। বীজের শাঁস ফেলে দিয়ে বীজতলার বীজ বপন করলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই চারা গজায়। এসব চারা ০.৭৫-১ মিটার উঁচু হলে স্থানান্তর করতে হয়। ২-৩ বছরে বেত বড় ঝাড় হয়ে ওঠে, ৭-৮ বছরে তা কাটা যায়। বেত চাষে বেশি যতœ লাগে না তবে চারা লাগানোর কিছুদিন পর প্রয়োজনবোধে সেচ ও সামান্য সার দেয়া যেতে পারে। বেতগাছ জঙ্গলাকীর্ণ কাঁটাঝোপ আকারে হয়। আমাদের দেশে সাধারণত ভাটি অঞ্চল ও পাহাড়ি এলাকায় বেতগাছ বেশি দেখা যায়। তাছাড়া গ্রামের রাস্তার পাশে, বসতবাড়ির পেছনে, পতিত জমিতে এবং বনে আর্দ্র জায়গায় বেতগাছ বেশি দেখা যায়। বনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ছাড়াও হাওরের কিনারে অনেকটা স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে বেতগাছ জন্মে। বেতগাছ সাধারণত বাঁশ ঝাড়ের মতো ঝাড় বেঁধে ওঠে। একটি চারা থেকে কিছুদিনের মধ্যেই বেত ঘন হয়ে ঝাড়েও পরিণত হয় এবং অতি অল্পসময়ে বেতগাছ তার পূর্ণতা লাভ করে। চিরসবুজ এই গাছটি পূর্ণবয়স্ক অবস্থায় ৪৫ থেকে ৫৫ ফুট এবং কখনো কখনো তার চেয়েও বেশি লম্বা হয়ে থাকে। এক সময় গ্রামবাংলার প্রতিটি ঘরের চারপাশে বেত গাছ লাগানো প্রায় অপরিহার্য ছিল তৎসময়ে বিষাক্ত কাঁটাযুক্ত এসব বেতগাছ বাড়ির সীমানা প্রাচীর হিসেবে বিবেচনায় আনা হতো। চোর ডাকাত ও শত্রুর অতর্কিত আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য বসত ভিটার চারদিকে বড় বড় গর্ত করে পানি জমা করে রাখা হতো। আর গর্তের চারদিকে কাঁটাযুক্ত এসব বেতগাছ রোপণ করে দেয়া হতো। ফলে চোর, ডাকাত, শত্রু ও বিভিন্ন হিংস্র পশুর আক্রমণ থেকে অনেকটা রক্ষা পাওয়া যেত।

বেতের প্রকারভেদ ও ব্যবহার
আমাদের দেশে বিভিন্ন প্রজাতির বেতগাছ দেখতে পাওয়া যায়। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-যায়াতবেত, কেরাকবেত, সাঁচি বেত, পাটিবেত, জালিবেত, গল্লাবেত ইত্যাদি। কাঁটাযুক্ত বেত গাছকে যায়াতবেত বলা হয়। যায়াত বেত গৃহনির্মাণ সামগ্রী তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়। এখন যায়াত বেত তেমন একটা পাওয়া যায় না। শীতলপাটি, যা পৃথিবী জুড়ে একনামে খ্যাত। এটা তৈরি করতে পাটিবেত ব্যবহার করা হয়। পাটি বেত সাধারণত পানিসংলগ্ন একটু রসালো স্থানে হয়। এ জাতীয় বেত অনেকটা পুকুরের পাড়ে, খালের পাড়ে বা নদীর কিনারায় রোপণ করা হয়। পাটি বেতের শিকড় মাটির গভীরে থাকে বলে পুকুরের পাড় বা নদী ভাঙন রোধ করে থাকে। গোল্লা বেত সাধারণত পাহাড়ি এলাকায় জন্মে। গোল্লা বেত দিয়ে বেতের আসবাবপত্র তৈরি করা হয়। এক সময় পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দুষ্কৃতকারীদের শায়েস্তা করার জন্য এ জাতীয় বেত ব্যবহার করত। এ বেত পাহাড়ি এলাকায় আবার অনেকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষাবাদ করত। সুতরাং বলা যায় যে, বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের কুটির শিল্পের যে সুনাম তার বেশির ভাগ জোগান হয় এসব বেত থেকে। ভিন্ন ভিন্ন কাজে ভিন্ন ধরনের বেত ব্যবহার করা হয়। বেতশিল্পে সাধারণত জালি ও গোল্লা বেতের প্রয়োজন বেশি পড়ে। এসব বেত প্রধানত বুনন ও বাঁধানোর কাজে ব্যবহৃত হয়। নকশার ধরন বুঝে সরু ও মোটা বেতের বিভিন্ন ধরনের অংশ তুলে নিতে হয়। জালি বেত দিয়ে চেয়ার, টেবিল, দোলনা, বাস্কেট, মহিলাদের ব্যাগ ও বিভিন্ন ধরনের ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী তৈরি হয়। গোল্লা বেত ব্যবহার হয় নিত্য ব্যবহার্য আসবাবপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী তৈরির কাঠামোতে। কাজের প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে গোল্লা বেতকে লম্বালম্বিভাবে কয়েক টুকরায় বা বিভিন্ন ভাবে কেটে বিভিন্ন জিনিস তৈরিতে লাগানো হয়। সারা বিশ্বে, বিশেষত এশিয়া ও ইউরোপে বেতের তৈরি সামগ্রীর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশ বেতের তৈরি বিভিন্ন ধরনের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সামগ্রী রাশিয়া, জার্মানি, সিঙ্গাপুর এবং মধ্যপ্রাচ্যে রফতানি করে থাকে। জার্মানি, কানাডা, জাপান ও অন্যান্য দেশে অনুষ্ঠিত বেশ কতগুলো আন্তর্জাতিক কারুশিল্প মেলায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ বেতশিল্পে বিশেষ সুনাম অর্জন করেছে। ১৯৯৯-২০০০ সালে বাংলাদেশ বেত ও বাঁশজাত পণ্য রফতানি করে ২৫ কোটি ৮৬ লক্ষ টাকা অর্জন করেছে।

বেতের সেকাল ও একাল
কাঠ ও বাঁশের পরই বেত বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বনজসম্পদ। তবে এর উৎপাদন ক্রমাগত কমে আসছে। ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বেত রফতানি হয়েছে। কিন্তু এখন সে অবস্থা আর নেই। বাংলাদেশ ১৯৮৫-৮৬ সালে ৩৯,৩৮,০০০ ফুট এবং ১৯৯৩-৯৪ সালে ২৯,৩৮,০০০ ফুট বেত উৎপাদন করেছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেতের চাষ হলেও এক সময় সিলেটের ঘাসিটুলা এলাকায় বেত চাষের আলাদা এক অভয়ারণ্য ছিলো, সেখানে ব্যাপক বেত চাষ করা হতো। এলাকার ছেলেমেয়েরা বেত বুননের কাজের দক্ষশিল্পী ও জাত কারিগর ছিলো। প্রতিটি ঘরে ছিলো বেতের তৈরি নকশা করা আসবাবপত্র। কার চেয়ে কে সুন্দর নকশা করা জিনিস তৈরি করবে এ নিয়ে ছিলো ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিরাট প্রতিযোগিতা। শুধু তাই নয়, অভিভাবকদের মাঝেও ছিলো একটি চাপা উত্তেজনা ও অজানা শঙ্কা। এ শঙ্কা নিয়ে এলাকায় কত যে গল্প প্রচলিত আছে প্রবীণ বেতশিল্পীদের কাছে যা শুনলে সত্যিই রোমাঞ্চিত হতে হয়। তাদের কাছ থেকে শুনা এরকম এক গল্প হচ্ছেÑ ঘাসিটুলার মেয়েদের অন্য কোন এলাকায় বিয়ে দেয়া হতো না। আবার ছেলেদের জন্যও অন্য এলাকার কোন মেয়ে বিয়ে করে আনা হতো না। কারণ ছিলো সহজ,
এখানকার বেতশিল্পীদের মনে একটা সংশয় বা শঙ্কা কাজ করত। মেয়েকে বাইরের এলাকায় বিয়ে দিলে, সে যদি স্বামীর বাড়ির এলাকার লোকজনকে বেতের শৈল্পিক কাজ শিখিয়ে দেয়। আবার ছেলের জন্য অন্য এলাকার মেয়ে বিয়ে করিয়ে আনা হলে, যদি ওই মেয়েটি তার বাবার বাড়ির এলাকার লোকজনকে বেতের কাজ শিখিয়ে দেয়! তা হলে তো সিলেটের একমাত্র বেতশিল্পের এলাকা ঘাসিটুলার কদর আর থাকবে না। গল্পটা আজো আছে। কিন্তু গল্পের নিয়মটি আজ আর নেই। নেই ঘাসিটুলা মানুষের সেই অহংকার আর অজানা শঙ্কা। ঘাসিটুলার বেতশিল্পের সেই খ্যাতি আজ বিলীন। কালের বিবর্তনে হারিয়েছে বেতশিল্পের সেই সোনালি সকাল। কিন্তু হাল ছাড়েননি এখনো কেউ কেউ। প্রাচীন এই শিল্পকে এখন বাঁচিয়ে রাখতে লড়াই করছেন হাতেগোনা কিছু বেতশিল্পী, নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন দিনের পর দিন।
১৯৬০ সালে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা (বিসিক) প্রতিষ্ঠা হলেও বেতশিল্প যতখানি সম্ভাবনাময় ছিল তার তুলনায় সম্প্রসারিত হয়নি। তবে সম্প্রতি বিসিক উন্নত জাতের বেত (রতন) বীজ আমদানি করে চাষ শুরু করেছে। সিলেট বন বিভাগ সিলেটের খাদিমনগরে ১৩৫ একর, হবিগঞ্জে কালেঙ্গা বিটে ৩০ একর, রশিদপুর বিটে ৩০ একর, কালাছড়া বিটে ৩০ একর এবং লাউয়াছড়া বিটে ৩০ একর জায়গায় বেতের চাষ করেছে। কয়েক লাখ টাকা ব্যয়ে আদমপুর বন বিটে ১০০ একর জায়গায় বেত বাগান করা হয়েছে। সিলেট বিভাগের প্রায় এক হাজার পরিবারের ২ হাজার ২শ কারিগর বেত শিল্পের সঙ্গে জড়িত।

বেতের তৈরি বিভিন্ন প্রকার শিল্প
শুকনো বেত দিয়ে বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরি করা হয়। এসব হস্তশিল্প তৈরির কাজে নিয়োজিত গ্রামের মহিলা ও পুরুষ নানা রঙবেরঙের চৌকস দ্রব্য তৈরি করে দেশে বিদেশে রফতানি করে। বেত দিয়ে তৈরি করা হস্তশিল্পের মধ্যে চেয়ার, টেবিল, মোড়া, ডালা, কুলা, চাঙ্গাড়ি, ঢুষি, হাতপাখা, চালোন, টোকা, গোলা, ডোল, ডুলা, আউড়ি, চাঁচ, ধামা, পাতি, বই রাখার তাক, জোতা রাখার সেলফ, সোফা, দোলনা, খাট, ঝুড়ি, টেবিল ল্যাম্প, ল্যাম্পশেড বেতের চেইন ইত্যাদি। এটি গৃহনির্মাণ কাজেও ব্যবহার করা হয়, বিশেষ করে রেস্তোরাঁ, ঘর বা অফিসের শৌখিন পার্টিশন হিসেবে এর ব্যাপক ব্যবহার হয়ে থাকে। এছাড়া লম্বা বেত ফালা করে নানা কিছু বাঁধার কাজেও ব্যবহার করা হয়। কৃষকের মাটি কাটার ওড়া, বিশেষ কাজে ব্যবহারের জন্য ঝাঁকা বা ধামা বা টুকরি তৈরি, নারীদের তৈরি শীতলপাটি, নামাজের পাটি, ভাত খাওয়ার পাটি, হাতপাখা, হাতের লাঠি তৈরি ইত্যাদি কাজে বেত ব্যবহার হয়ে থাকে। আর শহরের অভিজাত শ্রেণির জন্য চেয়ার, সোফা, দোলনা, ফুলদানি তৈরিসহ নানা কাজে বেতের অনেক কদর। বেত একটি মূল্যবান, টেকসই এবং স্মার্ট শ্রেণির দ্রব্য হিসেবে বিবেচিত।

বেতের ফল
বেতগাছ থেকে আমরা শুধু বেতই পাচ্ছি না, বেত আমাদের উপহার দিচ্ছে মজাদার এক ফল, যা এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে সে পরিচিত। যেমন কোন এলাকায় বেতফল, কোথাও বেত্তুন, কোথাও বেথুন, কোথাও বেথুল, কোথাও বেতগুলা, আবার কোথাও বেত্তুইন ইত্যাদি নামে ডাকা হয়। বেতগাছে সাধারণত ফুল আসে অক্টোবর মাসে আর ফল পাকে মার্চ-এপ্রিল মাসে। মজার ব্যাপার হলো বেতে ফুল ধরার আগে বেতগাছ থেকে একধরনের মধুর মিষ্টি ঘ্রাণ ও রস বের হয়ে আসে এবং সে ঘ্রাণ পেয়ে মৌমাছি, পিঁপড়া আর মাছিরা এই রস খেতে বেতগাছে ভিড় জমায়। বেতফল অনেকের কাছে একটি অপ্রচলিত ফল হলেও এলাকার লোকদের কাছে তা খুবই মজাদার ফল। এটি যেমন পুষ্টিকর তেমনি সুস্বাদু এবং ঔষধিগুণে সমৃদ্ধ। মূলত মাটির অবস্থাভেদে এই ফল খুব মিষ্টি হয়। আবার স্থানভেদে একটু টকও হয়। বেত ফল মরিচ দিয়ে চাটনি করে খেতে খুব মজা। এই ফল গোলাকার বা একটু লম্বাটে গোলাকার ছোট ও কষযুক্ত টকমিষ্টি। এর খোসা শক্ত হলেও ভেতরটা নরম। বীজ শক্ত। কাঁচা ফল সবুজ ও পাকলে সবুজাভ ঘিয়ে বা সাদা রঙের হয়। একটি থোকায় প্রায় ২০০টি পর্যন্ত ফল ধরে থাকে।

শেষ কথা
বেতশিল্প বাংলাদেশের অন্যতম একটি ঐতিহ্যময় কুটির শিল্প। যার পরিধি বা পরিচিতি সারা বিশ্বজুড়ে বিদ্যমান। গৃহস্থালিতে বেতের ব্যবহার বহুবিধ। গৃহনির্মাণে যেমন বেতের প্রয়োজন, তেমনি শৌখিন সজ্জাতেও বেতের কদর রয়েছে। অট্টালিকা থেকে ছনের ঘর যার প্রায় প্রতিটি স্থানে কিছু না কিছু বেতের শিল্প থাকবে তা একেবারে হলফ করে বলা যায়। সুতরাং নান্দনিক গৃহসজ্জায় শৌখিন ব্যক্তিদের একটি আলাদা পছন্দ রয়েছে বেতের তৈরি আসবাবপত্রের ওপর। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, একসময় এসব পণ্যের কাঁচামাল বেত দেশেই চাষ হতো। কিন্তু এখন সে অবস্থা আর নেই। এখন এসব কাঁচামালের সিংহভাগই বিদেশ থেকে আনতে হয়। এই পরনির্ভরশীলতার কারণে বেতের সামগ্রীর উৎপাদন ব্যয় যেমন বেড়েছে, তেমনি দাম বেড়ে মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বাজারে এখন অস্তিত্বসঙ্কটে পড়েছে দেশীয় বেতশিল্প। দেশে উৎপাদন কমে যাওয়া ছাড়াও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারা ও কাঁচামাল আমদানিতে মুষ্টিমেয় ব্যবসায়ীর নিয়ন্ত্রণকেই বেতশিল্পের দুর্দিনের কারণ হিসেবে মনে করেন উদ্যোক্তারা। বিভিন্ন যন্ত্রের উদ্ভাবনের ফলে কুটির শিল্পের অনেকগুলো লুপ্ত হয়ে গেলেও বেতের তৈরি আসবাবপত্র তার ইমেজ এখনও ধরে রেখেছে। এখনো দেশের অসংখ্য পরিবার বেতের তৈরি বিভিন্ন জিনিসপত্র ব্যবহার করে থাকেন। সুতরাং এ মৃতপ্রায় শিল্পকে বাঁচাতে হলে সরকারকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। বেত শিল্পীদের শ্রমের মূল্যায়ন করতে হবে। বেতের কাঁচামাল প্রাপ্তি সহজ করে দিতে হবে। মুষ্টিমেয় ব্যবসায়ীর নিয়ন্ত্রণ থেকে বেত শিল্পকে বের করে ঢেলে সাজাতে হবে। এক কথায় বেত শিল্প যাতে তার সোনালি দিন ফিরে পায় তার সব কিছুর জোগান সরকারকেই দিতে হবে।  হ

SHARE

Leave a Reply