Home সায়েন্স ফিকশন মিশন টু আয়রনম্যান -মহিউদ্দিন আকবর

মিশন টু আয়রনম্যান -মহিউদ্দিন আকবর

(দ্বিতীয় পর্ব)

মামার ঘোর কাটতে না কাটতেই চকচকে লোহার বারটি ধীরে ধীরে তার উজ্জ্বলতা হারাতে শুরু করলো। দেখতে দেখতে এক পর্যায়ে লোহার বারটি সামান্য উজ্জ্বলতা হারিয়ে স্থির হয়ে গেল। এখন সেটিকে সাধারণ একটি নতুন লোহার বার বলেই মনে হচ্ছে।
মামা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ঝিম ধরে থেকে হঠাৎ চিল্লিয়ে উঠলেন- ইউরেকা! ইউরেকা!! আসলেই এটা লোহার টুকরো। তবে ভিন গ্রহের এতে কোনো সন্দেহ নেই।
এরপর সাদিতের নাক ধরে আলতো করে টেনে টেনে বললেন- হ্যাঁরে, এযে খুবই রহস্যজনক ব্যাপার। তুই স্বপ্ন দেখছিলি বটে! কিন্তু সেই স্বপ্নের ঘোরে তোর সাথে সত্যি সত্যি কোনো ভিনগ্রহের লোকের সাক্ষাৎ ঘটে গেছে বলতে হবে। না হলে এই লোহার বারইবা আসবে কোত্থেকে আর তুই লোহার গুণাগুণ সম্পর্কেইবা এতো কথা জানলি কেমন করে।
এবার সাদিত বেশ উৎসাহ নিয়ে বলে- ঠিক আছে মামা, আমি না হয় ভিনগ্রহের লোকের দেখা পেলাম, কিন্তু আমি যে তোমাকেও সেখানে দেখতে পেলাম। মানে আমার স্বপ্নটা তো ছিলো এমন যে, আমি তোমার সাথে একটা খনি অভিযানে বেরিয়েছি। অথচ তুমি দিব্যি সালাতুল ফজর শেষে বসে বসে কুরআনের তাফসির পড়ছিলে।
– আরে পন্ডিত, আমিওতো মনে মনে সে কথাটাই ভাবছি। জানি না বাপু এসবের রহস্যটা কোথায়। তবে তোর এই লোহার বারটাকে তো আর অস্বীকার করতে পারি না। তাছাড়া…
– তাছাড়া আর কী! তুমি তো লোহা সম্পর্কে আল কুরআনে মহান রাব্বুল আলামিনের বাণী সবই পড়েছো। আবার দুনিয়ার যত বড় বড় বিজ্ঞানীর জ্ঞানগর্ভ মতামতও পড়েছো। ওদিকে রোবোম্যানদের আলাপ সালাপে যা বুঝলাম, তারা এই লোহা নিয়ে বেশ উচ্চতর গবেষণা শুরু করেছেন। না হলে সোনা, রূপা, হীরা, জহরত রেখে সামান্য লোহা নিয়ে কেন মাতামাতি!
– আরে বোকার হদ্দ লোহা সম্পর্কে তুই তো এখনো কিছুই জানিস না। আসলে রাব্বুল আলামিন লোহার মাঝে এতো গুণাগুণ রেখেছেন যে, পৃথিবী আজ যতদূর এগিয়েছে বা উন্নতি করেছে এর পেছনে লোহার অবদান বিশাল। তুই আসলে জানিস না যে, নানা ধরনের গবেষণার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন মৌলিক পদার্থের গঠনপ্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে পেরেছেন, তার মাঝে লোহা এক অসাধারণ পদার্থ। লোহার অণুর গঠন সম্পর্কে প্রফেসর আর্মস্ট্রংক বলেছেন, লোহার একটি অণু তৈরি করতে যে পরিমাণ শক্তি প্রয়োজন তা এতই বেশি যে সমগ্র সৌরজগতের শক্তিও এর জন্য পর্যাপ্ত নয়।
– মানে! লোহা কী এতো শক্তিশালী পদার্থ?
– আহা! না শুনতেই মন্তব্য শুরু করলি। আগে তো মন লাগিয়ে শোন।
– আচ্ছা তুমি বলে যাও।
– বিজ্ঞানীরা বলছেন, লোহার একটি অণু তৈরি করতে সৌরজগতের মোট শক্তির চার শ’ গুণ শক্তি প্রয়োজন। মনে করে দেখ তোকে একবার বলেছিলাম কিনা- সূর্যের উপস্থিত তাপমাত্রা হলো ৬,০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা প্রায় ১১,০০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট। আর অভ্যন্তরীণ কোর ২ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৩.৫০ কোটি ডিগ্রি ফারেনহাইট। তাই লৌহ তৈরি হতে সূর্যের চেয়েও বড় বড় নক্ষত্রের প্রয়োজন, যেখানে তাপমাত্রা কয়েক বিলিয়ন মানে অন্তত ৩০০ কোটি ডিগ্রি হতে হবে। কোনো নক্ষত্রে লোহার পরিমাণ নির্দিষ্ট সীমা ছাড়িয়ে গেলে সে আর ওই পরিমাণ শক্তি ও উত্তাপ ধারে রাখতে পারে না। ফলে তা বিস্ফোরিত হয়ে যায়, বিজ্ঞানীরা এই বিস্ফোরণকে বলেন, নোভা বা সুপার নোভা। এই বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে লোহা বহনকারী উল্কাগুলো মহাবিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায়।
– হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়েছে মামা। তুমি আরও বলেছিলে, সেগুলো প্রচন্ড গতিতে মহাশূন্যে ঘুরতে থাকে এবং এক পর্যায়ে পদার্থগুলো মাধ্যাকর্ষণজনিত বল দ্বারা বিভিন্ন গ্রহ, উপগ্রহ, উল্কা, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এন্ড্রোমিডা, ব্ল্যাক হোল পেরিয়ে পৃথিবীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পৃথিবীর বুকে নেমে আসে। এতে প্রমাণ হয় লোহা উৎপন্ন করার মত যোগ্যতা সৌরজগতের নেই।
– ওরে আমার ট্যালেন্ট ভাগনে রে! তোর দেখছি সবই মনে আছে। জানিস, আধুনিক বিজ্ঞানীরাও এ কথা স্বীকার করে নিয়েছেন যে, লোহা একটি অতি জাগতিক বস্তু, যা পৃথিবীতে এসেছে অন্য কোনো গ্রহ থেকে। লোহা কেবলমাত্র সূর্যের চেয়ে বড় কোন নক্ষত্রেই তৈরি হতে পারে যেখানে তাপমাত্রা কোটি ডিগ্রির কাছাকাছি। এ রকম কোন গলিত নক্ষত্রের বিস্ফোরণের মাধ্যমেই লোহার উৎপত্তি সম্ভব।
– আমাদের বিজ্ঞানের স্যার এজন্যই একদিন বেশ জোর দিয়ে বলেছিলেন, লোহা পৃথিবীতে সৃষ্ট কোন পদার্থ নয়, এটি এসেছে পৃথিবীর বাইরে থেকে।
– এবার তুই-ই ভেবে দেখ, তা হলে লোহার উৎপত্তি কোথায় এবং কিভাবে তা পৃথিবীতে এলো?
– আচ্ছা মামা! তুমি তো অনেক তাফসির পড়েছো। এ ব্যাপারে তোমার কি ধারণা বলো না।
– বলছিরে, বলছি। খুব মনোযোগ দিয়ে শোন। দীর্ঘ গবেষণার পর আজও কিন্তু বিজ্ঞান লোহার সৃষ্টি রহস্য নিয়ে কোনো সমাধান দিতে পারেনি। অথচ পবিত্র আল কুরআন সূরা আল-হাদিদের মাঝে পরোক্ষভাবে এই রহস্য জট খুলে দিয়েছে। আর তা করেছে সেই ১৪০০ বছর আগে। যখন মানুষ এসবের কিছুই জানতো না।
আসল কথা হলো, তুইও যদি বুঝেশুনে আল কুরআনের তাফসির পড়িস তাহলে দেখতে পাবি, মহান আল্লাহ তা’য়ালা লোহার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি আল কুরআনে লোহা নিয়ে একটি আলাদা সূরাই নাযিল করেছেন। পবিত্র কুরআনের ৫৭নং সূরা আল হাদিদের ২৫নং আয়াতে দু’টি গাণিতিক কোডের দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে- ‘আল্লাহ লোহা পাঠিয়েছেন যার মধ্যে রয়েছে প্রচন্ড শক্তি এবং রয়েছে মানুষের জন্য বহুবিধ কল্যাণ’।
– এই আয়াতটি একটু বুঝিয়ে বলো না মামা।
– বুঝতে চাইলে ব্যাপারটা খুবই সোজা। বোঝার সুবিধার্থে আয়াতটিকে যদি তিনটি অংশে ভাগ করি তাহলে দেখবি বুঝতে আরও সহজ হবে। এই যেমন, প্রথম অংশ হলো- ‘আল্লাহ লোহা পাঠিয়েছেন’। দ্বিতীয় অংশ হলো- ‘যার মধ্যে রয়েছে প্রচন্ড শক্তি’। তৃতীয় অংশ হলো- ‘এবং রয়েছে মানুষের জন্য বহুবিধ কল্যাণ’।
– আরে! তাই তো!! বেশতো সহজ সহজ মনে হচ্ছে।
– আরও একটু সহজ করে দিচ্ছি। তোর জন্য ভাগ ভাগ করে ব্যাখ্যা করে দিচ্ছি-
১. ‘আল্লাহ লোহা পাঠিয়েছেন’। এই অংশটিতে আরবি ‘আনযালা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে যার অর্থ প্রেরণ করা বা আকাশ থেকে অবতীর্ণ করা। বিশেষত আসমান থেকে বা পৃথিবীর বাইরে থেকে প্রেরণ করা অর্থে আরবি আনযালা শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এখানে স্পষ্ট যে, লোহা পৃথিবীতে সৃষ্টি হয়নি, পৃথিবীর বাইরে থেকে বা আসমান থেকে এসেছে।
২. ‘যার মধ্যে রয়েছে প্রচন্ড শক্তি’। এই অংশটিতে স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে, লোহার অভ্যন্তরে বিপুল শক্তি ভান্ডার রয়েছে এবং এর গঠনপ্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় অলৌকিক বা আসমানি শক্তি আছে। আর আসমানি শক্তি জিনিসটা যে কী তা নিশ্চয় বুঝতে পারছিস?
– বুঝবো না মানে, আসমানি শক্তি মানে হলো সরাসরি আল্লাহর কুদরতি শক্তি। তাই না মামা?
– একশতভাগ ঠিক বলেছিস। এবার শোন আয়াতের তিন নম্বর বিষয়টি-
৩. ‘এবং রয়েছে মানুষের জন্য বহুবিধ কল্যাণ’। এই অংশটিতে আল্লাহ তা’য়ালা জানিয়েছেন, লোহা মানবজাতির জন্য খুবই উপকারী একটি ধাতু, যা মানুষের অনেক রকমের কল্যাণ সাধন করতে পারে।
– আরে মামা দারুণ ব্যাপার তো। মহান মহামহিম তো খুব সুন্দর করে লোহার কথা বুঝিয়ে বলেছেন।
– হ্যাঁ, তিনি তো আল কুরআনেই বলেছেন যে, কুরআনকে তিনি সহজ ভাষায় নাজিল করেছেন। এবার তোকে আরেকটু রহস্যের মাঝে নিয়ে যাই। তোর স্বপ্নে দেখা রোবোম্যান হয় তো এ কথাও জেনে গেছে যে, লোহার ব্যাপারে আল্লাহ যা বলেছেন তাতে আরবি প্রত্যেকটি শব্দের সংখ্যাবিষয়ক মূল্য আছে। অন্যভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, আরবির প্রত্যেকটি বাক্য একেকটি সংখ্যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যাকে ‘আবজাদ বা হিসাব আল-জুমাল’ বলা হয়ে থাকে। মুসলিমগণ যাঁরা এ বাস্তব-সংখ্যা ব্যবহার করে থাকেন তার মধ্যে ‘ইলম-আল-জাফর’ অন্যতম। সূরা হাদিদে লোহার কথা বলতে গিয়ে মহান রাব্বানা সেই সংখ্যাতত্ত্ব বা কোড ব্যবহার করেছেন। আর তাকে গবেষণা করেই বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন যে, পৃথিবীর একদম মধ্যবর্তী স্থানটি অর্থাৎ পৃথিবীর কেন্দ্র লোহার তৈরি। কুরআনে মোট ১১৪টি সূরার মধ্যে আল হাদিদের অবস্থান ৫৭ নম্বর। অর্থাৎ লোহা সম্পর্কিত এই সূরাটির অবস্থান আল কুরআনের ঠিক মধ্যখানে। যা পৃথিবীর মধ্যখানে অবস্থিত লোহার অবস্থানের সাথে মিলে যায়।
– আসলে কি জানো মামা? আমার মনে হয়, আল কুরআন আকারে ইঙ্গিতে অনেক বড় ব্যাপারকেও খুব ছোট কথায় বা অল্প কথায় প্রকাশ করেছে।
– হ্যাঁরে সাদিত তুই ঠিকই বলেছিস। হিকমতময় কুরআনের চমক এখানেই শেষ নয়, চল দেখি আরও গভীরে যাওয়া যাক। এবার তোকে লোহার জটিল রাসায়নিক গঠন ও লোহার পরমাণুর মধ্যে অবস্থিত মৌলিক কণিকার সংখ্যার বিষয়ে কিছু জানাবো। কুরআনই সর্বপ্রথম পরোক্ষভাবে গাণিতিক নিয়মে লোহার পারমাণবিক সংখ্যা, প্রোটন সংখ্যা, ইলেকট্রন সংখ্যা, নিউট্রন ও ভর সংখ্যা সম্পর্কে তথ্যপ্রদান করেছে।
– আরে এসব তুমি বলছো কী?
– আগে শুনেই দেখ্না। কথার মাঝে ফোড়ন কাটিস না তো।
– ঠিক আছে। এই চুপ করলাম।
– তুই তো জানিস, আসলে লোহার অ্যাটমিক নম্বার বা পারমাণবিক সংখ্যা হলো ২৬। ‘হাদিদ’ শব্দটির সংখ্যাগত মানও ২৬ (হা=৮, দাল=৪, ইয়া=১০, দাল=৪)। আমরা বিসমিল্লাহকে আয়াত ধরলে যে আয়াতে ‘লোহাকে পাঠানো হয়েছে’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে তার অবস্থান দাঁড়ায় ২৬। তার মানে কি হলোরে পন্ডিত! বুঝতে পারছিস কিছু?
– ওমা! এই তুমি আমাকে চুপটি করে শুনতে বললে, আবার তুমিই তা ভঙ্গ করছো! আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করলে তো আমার আর চুপ করে থাকা হয় না।
– ও স্যরি! ঠিক আছে শুনে যা। সকালে যখন কুরআনের তাফসির পড়ছিলাম তখন সূরা হাদিদের লোহা পাঠানোর ইতিবৃত্ত জেনে রসায়ন বিজ্ঞানের একটা সূত্রের কথা মনে হয়েছে। সূত্রটি হলো- কোন মৌলের পারমাণবিক সংখ্যা সমান সমান ওই পরমাণুর প্রোটন ও ইলেকট্রন সংখ্যা। সে হিসেবে পারমাণবিক সংখ্যা ২৬ হওয়ায় লোহা পরমাণুর অভ্যন্তরে ২৬টি প্রোটন ও ২৬টি ইলেকট্রন আছে। অপর দিকে লোহা পরমাণুর নিউক্লিয়াসে অবস্থিত নিউট্রন সংখ্যা ৩০।
– বুঝেছি মামা। এই সূত্রমতে সূরা হাদিদের আয়াত সংখ্যাও নিশ্চয়ই ৩০টি হবে।
– আরে হবে বলছিস কিরে, আসলেই সূরা হাদিদের আয়াত সংখ্যা ৩০টি, যা একটি লোহার পরমাণুর নিউট্রন সংখ্যা নির্দেশ করে। বাদ যায়নি ভরসংখ্যাও।
– সেটা আবার কিগো মামা?
– হা হা। সেটাই তো বলছি। তোর স্বপ্নে দেখা রোবোম্যানরা এতসব জানে কিনা কে জানে। তবে ওরা যে লোহা সৃষ্টি আর লোহার গুণাগুণ সম্বন্ধে খুব জানে তা তোর স্বপ্নের বিবরণী শুনে বুঝেছি।
– তবে মামা, লোহা আসমান থেকে দুনিয়াতে এলেও এখন যে কেবলমাত্র দুনিয়াই একমাত্র লোহার খনিতে পূর্ণ তা কিন্তু ওরা ভালো করেই জানে।
– তা অবশ্য ঠিক। আচ্ছা, বাদদে ওসব কথা। এবার কুরআনের দেয়া তথ্য থেকে লোহার ভরসংখ্যা জেনে নে। রসায়ন বিজ্ঞানের থিওরি অনুসারে কোনো মৌলের ভরসংখ্যা বের করার সূত্রটি হলো- ভরসংখ্যা= প্রোটন সংখ্যা+নিউট্রন সংখ্যা। আগেই জেনেছি, লোহার প্রোটন সংখ্যা ২৬ ও নিউট্রন সংখ্যা ৩০। অতএব লোহার ভরসংখ্যা হয়, ২৬+৩০=৫৬। আধুনিক রসায়ন বিজ্ঞানও বলছে লোহার ভরসংখ্যা ৫৫.৮৫ বা ৫৬। তাহলে বুঝতেই পারছিস, আল কুরআন কতো আধুনিক আর লেটেস্ট তথ্যের ভান্ডার।
তুই শুনলে আরও অবাক হবিরে পন্ডিত! ১৮০৩ সালে জন ডাল্টন নামে এক বিজ্ঞানী পরমাণুবাদ প্রচার করেন। তিনি গবেষণা করে বের করেন পরমাণুই হচ্ছে পদার্থের সবচেয়ে ক্ষুুদ্র অংশ। কিন্তু এই পরমাণুর মাঝেও যে আরো ক্ষুদ্র কণিকা আছে তা কিন্তু তিনি জানতে পারেননি। অনেক পরে মানে প্রায় ১০০ বছর পর মানুষ সেটা জানতে পারে। এই মহাসূক্ষ্ম কণিকাগুলোর নাম হলো- ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন ইত্যাদি। ১৮৯৭ সালে জে জে থমসন লোহা নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করে বের করেন ইলেকট্রন। আর ১৯১৯ সালে আর্নেস্ট রাদারফোর্ড আবিষ্কার করেন প্রোটন। তারও ১৩ বছর পর ১৯৩২ সালে জেমস চ্যাডউইক নিউট্রন আবিষ্কার করেন।
– অথচ আল কুরআনে অনেক বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও তথ্য পরোক্ষভাবে গাণিতিক নিয়মে হাজার বছর আগে আল্লাহ তা’য়ালা বলে দিয়েছেন।
– তুই ঠিকই বলেছিস ওরে পন্ডিত। তাই আমার কথার মাঝে কথা বলার জন্য কানমলা দিলাম না।
– আরে মামা! যদি কিছু কিছু বুঝতেই না পারতাম, তাই না হলে কি আর তোমার মত পচা বিজ্ঞানীর ভাগনে হতে পারি?
– কী! আমি পচা বিজ্ঞানী?
– ও থুক্কু, আমার মামা কেন পচা বিজ্ঞানী হবেন! তিনি হলেন সেরা বিগ+জ্ঞানী। মানে অনেক বড় বিজ্ঞানী।
– থাক, আমাকে আর পাম মারতে হবে না। তারচেয়ে বরং মন লাগিয়ে শোনেন জনাব ভাগিনা বাহাদুর।
– জি, আপনি বলে যান মহামান্য মামুজান। আপনার ভাগিনার কান খোলাই আছে।
– বেশ। তাহলে শোন। মহান আল্লাহ তা’য়ালা মানবজাতিকে লোহার উৎস, অণুর জটিল গঠন প্রক্রিয়া, তার অভ্যন্তরের অতিসূক্ষ্ম কণিকা, অভ্যন্তরীণ বিপুল শক্তি ভান্ডার ও উপকারিতা সম্পর্কে জানিয়ে দিয়েছেন। পশ্চিমা বিজ্ঞানীরা লাগাতার গবেষণার মাধ্যমে দেড় হাজার বছর পরে এসে সে সব তথ্য আবিষ্কার করছে।
– তাহলে বোঝা যাচ্ছে, যারা কুরআনকে না বুঝে একটা সাধারণ ধর্মগ্রন্থ বলে মানে করেছে তারা তো হাবাগোবার চেয়েও অধম। মানে আমার চেয়েও গাধা গবেট আর কি!
– থাক থাক আর নিজের বুদ্ধির ঢোল পিটাতে হবে না। এবার ভাবনা-চিন্তা করে নিশ্চয় ওসব পন্ডিতরা একথা স্বীকার করতে বাধ্য হবেন যে, কুরআনে বর্ণিত তত্ত্ব ও তথ্যগুলোর সঙ্গে আজকের আধুনিক বিজ্ঞানের মূলত কোনো দ্বন্দ্ব বা বিরোধ নেই। আর থাকবেই বা কেন? অধিকাংশ ক্ষেত্রে কুরআনের দেয়া সূত্রই তো বিজ্ঞান প্রমাণ বা আবিষ্কার করছে মাত্র। আর দুনিয়াতে তো এই ধারাই অব্যাহত থাকবে। কেননা, কুরআনের ধারা ভিন্ন হলেও উৎসমূল এক এবং অভিন্ন।…
মামার কথা শেষ হয় না। অমনি হঠাৎ মৃদু ভূমিকম্পের মত তাদের কক্ষটা একটু দুলে ওঠে। সাদিত প্রায় চিৎকার করে বলে- মামা, ভূমিকম্প হচ্ছে মনে হয়।
মামাও একটু আতঙ্কিত হয়ে একবার বাইরের দিকে-একবার ঘরের ভেতরে নজর ফেলে বললেন, সর্বনাশ! কী হচ্ছে ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। সাদিত তুই তাড়াতাড়ি টেবিলের নিচে লুকিয়ে পড়। আমি দুই দেয়ালের কোণায় আশ্রয় নিচ্ছি।… কথাটা বলেই মামা দুই দেয়ালের কোণায় সিটিয়ে দাঁড়িয়ে যান। ওদিকে সাদিতও অনেকটা বেঁটে ইঁদুরের মত সুড়–ৎ করে টেবিলের তলায় ঢুকে পড়ে।
অমনি খুব কাছে থেকে গমগমে রোবোটিক কণ্ঠে কেউ বলে ওঠে- দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, সঠিক জ্ঞান না থাকার কারণে জ্ঞানপাপীরা কুরআনের এই হিকমাতকে অস্বীকার করতে সর্বদাই সচেষ্ট ছিল, আছে এবং সম্ভবত কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে। তোমাদের দেশেও তাদের অনুসারী অবিশ্বাসীরা বিজ্ঞানমনস্ক ও মুক্তচিন্তার নামে কুরআনকে অস্বীকার করছে, যা প্রকৃতপক্ষে সত্য, ন্যায়, সুন্দর ও কল্যাণময় মহাবিজ্ঞানময় আল কুরআনকে উপেক্ষারই শামিল। অথচ তাদের জন্য মহাগ্রন্থ আল কুরআনে বলা হয়েছে- ‘দৌড়ে এসো ছুটে এসো তীব্র গতিতে সেই পথে, যে পথে রয়েছে তোমার প্রভুর মাগফিরাত, যে পথ গিয়ে মিশেছে আকাশ ও জমিনের মত বিস্তৃৃত জান্নাতে। যা তৈরি করা হয়েছে কেবলমাত্র আল্লাহকে ভয়কারী বান্দাদের জন্য।’
এরপর এক মিনিট থমথমে নীরব। তখনও মৃদু মৃদু দুলছে পুরো কক্ষটা। তারপর হঠাৎ করেই মনে হলো সাদিত এবং ওর মামাকেসহ পুরো কক্ষটা ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে!
মামা প্রায় চিৎকার করে বললেন- আরে এসব কী হচ্ছে। আরে সাদিত তুই ঠিক আছিস তো?
আবারও সেই রোবোটিক গমগমে আওয়াজ- ডোন্ট ওরি হে তরুণ বিজ্ঞানী। ভয় পাবার কিছু নেই। আমরা আপনাদের মামা-ভাগনেকে সাদরে বরণ করে আমাদের গ্রহে নিয়ে চলেছি। ঘরের বাইরে নজর ফেলে দেখুন পৃথিবী নামক কোনো কিছুই আর আপাতত আপনাদের নজরে আসবে না। কারণ আপনারা এখন পৃথিবী থেকে নিরানব্বই হাজার কিলোমিটার উচ্চতায় নভোম-লের একটি কক্ষপথে রয়েছেন…হা হা হা হা…।
মামা এবার কক্ষের কোণ থেকে সমান্য সরে এসে টেবিলের সামনে এসে বললেন, হ্যাঁরে সাদিত টেবিলের তলা থেকে উঠে আয়। আসলেই আমরা একটা ঘোরের মাঝে পড়ে গেছি। তুই সকালে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছিলি, এবার আমি জেগে জেগে দিবা স্বপ্নই দেখতে শুরু করেছি।
মামা কথা কটি বলে সারতে দেরি, অমনি চোখের পলকেই পুরো কক্ষটি ধীরগতিতে ঘুরতে শুরু করলো। সাথে সাথে রোবোটিক কণ্ঠে আওয়াজ হলো- স্যার আপনারা টেবিলটা শক্তহাতে আঁকড়ে থাকুন। আমরা আমাদের শত্রুপক্ষের নজরদারিতে পড়ে গেছি।
মামা এবার সাহস সঞ্চয় করে ধমকে উঠলেন- মানে?
– মানে খুবই করুণ স্যার।
– আহা সে করুণটাই তো জানতে চাচ্ছি।
– ওরা, মানে আমাদের শত্রুরা জেনে গেছে যে, আমরা পৃথিবী থেকে দুজন সম্ভাবনাময় তরুণ বিজ্ঞানীকে নিয়ে আমাদের রয়াল স্টেটে রওনা দিয়েছি। তাই ওরা আমাদের সেকেন্ড স্পেসের পেছনে লেগেছে।
– সেকেন্ড স্পেস মানে?
– মানে আমাদের ফার্স্ট স্পেস তো চলে গেছে ত্রিশ হাজার আয়রন-বার নিয়ে। আমরা যাচ্ছি সেকেন্ড স্পেসে।
– আরে ধুত্তুরি! আমরা তো আমাদের বাড়ির কক্ষেই আছি।
– তাতে আর সন্দেহ কি? আমরা তো আপনাদের পুরো কক্ষটাকেই আমাদের স্পেসের মাঝে তুলে এনেছি।
– ঠিক বুঝলাম না।
– বুঝবেন স্যার, বুঝবেন। এখন সাবধানে থাকুন। আমরা নিরাপদে শত্রুদের বেষ্টনী পেরিয়ে যেতে পারলেই হয়। তবে আপনাদের কোনো ভয় নেই। আমরা শত্রুদের কাছে হেরে গেলেও ওরা আপনাদের কিছু বলবে না। কেবলমাত্র হাত বদল হবেন আর কি! কারণ ওরা আমাদের থেকে আপনাদের ছিনিয়ে নিয়ে সেই একই কাজে সাহায্য নেবে- যা আমরা করতে চাই। এটা স্রেফ আমাদের উন্নয়নের প্রতিযোগিতা আর কি!!
মামা এবার আর ধৈর্য রাখতে পারেন না। অনেকটা অসহিষ্ণুভাবে বললেন- এতোসব হেঁয়ালি রেখে সোজা কথাটা বলো। আর সাহস থাকলে আমাদের সামনে এসে দাঁড়াও।
– সাহস তো অবশ্যই আছে স্যার। কিন্তু আপনাদের সামনে প্রকাশ্যে না দাঁড়ানোর জন্য আমাদের ওপর কড়া নির্দেশ আছে।
– আমাদের মানে! তোমরা কত জন?
– আপানকে বিনয়ের সাথে জানাতে হচ্ছে যে, আমাদের ছয়জনের স্কোয়াড আপনাদের নিয়ে যাবার দায়িত্বে আছি স্যার।
– বুঝলাম, তোমাদের নির্দেশ দিয়েছে কে?
– স্যার, সে আর বলবেন না। তিনি আমাদের কমান্ডার-ইন-চিফ। আর তাকে নির্দেশ দিয়েছেন স্বয়ং আমাদের মহা বাদশাহ।
এবার মামা আর না হেসে পারলেন না। কিছুক্ষণ হো হো করে হেসে হাসির গমক থামিয়ে বললেন- আমাদের দুনিয়ায় আছেন রাজা-মহারাজা, কিন্তু মহা বাদশাহ বলে তো কোনো পদ বা পদবির কথা শুনিনি।
– শুনবেন কেমন করে স্যার! আপনারা হলেন সৃষ্টির সেরা জীব। আল কুরআনে বলা হয়েছে আশরাফুল মাখলুকাত।
– বেশ তা না হয় বুঝলাম। তো তোমরা আমাদের চেয়ে নিচু জাতের হয়ে আমাদের যে হাইজ্যাক করে নিয়ে যাচ্ছো! এটা কি বেয়াদবি হয়ে গেলো না?
– তা আমরা জানি না স্যার। আমরা হুকুম তামিল করছি। আপনার প্রশ্নের জবাব আমাদের কমান্ডার-ইন-চিফ দিতে পারবেন। আর তিনিও যদি না পারেন তো স্বয়ং মহা বাদশাহই দিতে পারবেন।
– এবার সত্যি করে বলো তো, তোমাদের আসল পরিচয় কী?
– সে আমাদের আগের রোবোম্যানদের কাছে তো জেনেছেন।
– জেনেছেন মানে?
– স্যরি স্যার, আপনার ভাগনে জেনেছেন। তাকে জিজ্ঞেস করুন।
এতোক্ষণ মামার সাথে অদৃশ্য রোবোম্যানের বাদানুবাদ শুনে যাচ্ছিল সাদিত। ও এবার মুখ খুললো। বেশ ঝাঁঝালো স্বরে বললো- আরে ধুত্তিরিকি। কিসব বাজে প্যাঁচাল! মামা বললেন, আমি দেখছিলাম স্বপ্ন। আর এখন দেখছি বাস্তব। কেমন সব গোলমেলে ব্যাপার। এর মধ্যে আবার তোমাদের পরিচয় জানলাম কখন?
সাদিতের কথায় অদৃশ্য রোবোম্যান একটু বিব্রত হয়ে তোতলাতে তোতলাতে বললো- ইয়েস স্যার, আ-আ-আপনি আ-আ-মাদের জাতির পরিচয় জেনেছেন। আপনি তো আমাদের সিনিয়র অফিসারদের নিজের চোখে দেখেছেন।
– নাহ্। মোটেও না। স্বপ্নে দেখা আর বাস্তবে দেখা কি এক হলো?
– আপনার মামার কাছে যেটা স্বপ্ন বলে মনে হয়েছে আসলে সেটা বাস্তবই ছিলো। আসলে আপনারা যাদের এলিয়ন ফেলিয়ন বলে রহস্যের ঘোরের মাঝে থাকেন, আমরা কিন্তু তারাই। তবে আমাদের পরিচয় আল কুরআনেও দেয়া আছে। তা আপনারা অনেকে জানেন আবার অনেকে জানেন না। আবার জানলেও অনেকে মানেন আবার অনেকে মানেন না। আমি সে বিতর্ক করবো না আপনার সাথে। আগে তো চলুন আমাদের সাম্রাজ্যে। দেখবেন আপনাদের দুনিয়া থেকে সেখানে কত পরিপাটি পরিবেশ।
– সেটা কোথায়?
– আমরা ঠিক হিসাব রাখি না। তবে আমাদের মহা বাদশাহ তার হিসাব রাখেন।
– এটা কেমন বেকুবের কথা! আরে আমাদের দেশের সীমানা আর অন্য দেশ থেকে আমাদের রাষ্ট্রপতি যা জানেন আমরাও তাই জানি। এখানে তো কোনো কারচুপি নেই হে।
– তা ঠিক। আমাদেরও কারচুপি নেই।
– মানে?
– মানে খুব সোজা স্যার। আপনাদের রাষ্ট্র একটা নির্দিষ্ট ভূমি সীমানায় আবদ্ধ। কিন্তু আমাদের রাজ্যের সীমানা কখনও ছোট হয়ে যায় আবার কখনও বেড়ে বিরাট হয়ে যায়। প্রতিনিয়তই এমনটি হচ্ছে। তাছাড়া মহাজাগতিক কক্ষপথে কখন যে আমাদের রাজ্যকে নিয়ে আমাদের মহা বাদশাহ লুকিয়ে রাখেন- তা খুঁজে শত্রুরা হয়রান পেরেশান হয়ে যায়।
– আশ্চর্য!
– শুধু আশ্চর্য হচ্ছেন স্যার! শত্রুরা আমাদের লুকানো রাজ্য খুঁজে পেলেই তা দখলের জন্য উঠে পড়ে লেগে যায়। তখনই ঘটে আরেক ঘটনা….
অদৃশ্য রোবোম্যানের কথা ফুরোয় না। অমনি বেশ কর্কশ কণ্ঠে আরেকটা অদৃশ্য রোবোম্যান বেশ খানিকটা ধমকের সাথে বলে ওঠে- আহ্। জনাব মাশরাদ! এবার তো থামুন। ওনাদের সাথে অনেক কথা হয়েছে। এতো কথা বলার পারমিশন কি আমাদের আছে?
– ও স্যরি স্যার! আসলে মানুষদের সাথে কথা বলতে আমার বেশ ভালোই লাগছিলো। তাছাড়া ওনারা হলেন গুণী মানুষ রীতিমত বিজ্ঞানী।
– তা বটে! তবে আমাদের তো নিজেদের জবাবদিহিতার কথাও ভাবতে হবে- না কি?
– ইয়েস স্যার।
– তাছাড়া ওনাদের বুঝের সুবিধার জন্য এই যে আমরা ওনাদের নিজস্ব ভাষাকে আমাদের জন্য ব্যবহার করছি, তাও ঠিক নয়।
– ইজো, গাওদে রাফাকান। মানাজিনা রাফতানে বাতারা। নাখতে নাখতে রারালিক।
– ইজোনেতো, মাক্বানাকি মাজাবানাকি রিকতসান নাফলে।
– আজাসি মারছি মারছি তোয়ারে ফান।
– ইজোতেনো, মারছি নাফানে ফান।
এরপর, পুরো কক্ষটা একেবারে নীরব হয়ে গেলো। এক মিনিট, দুই মিনিট…. পাঁচ মিনিট…দশ মিনিট। আহ্- অসহ্য নীরবতা। এভাবে আর নীরব থাকা যাচ্ছে না। লম্বা একটা দম নিয়ে মামা হাঁক ছাড়লেন- এই রোবোম্যানরা! তোমাদের কী হলো? একেবারে যে নীরব হয়ে গেলে?
মামার কথা শেষ হতে তার কোনো প্রতি-উত্তর হলো না। ধীরে ধীরে পুরো কক্ষ একটা রহস্যময় মিষ্টি মিউজিকে প্লাবিত হয়ে গেলো। আর তাতেই কেমন যেন ঘুম ঘুম ভাব এসে আচ্ছন্ন করে ফেললো মামা-ভাগনে দু’জনকেই।    (চলবে)

SHARE

Leave a Reply