Home বিশেষ রচনা ছড়া কবিতায় একুশ -সাকী মাহবুব

ছড়া কবিতায় একুশ -সাকী মাহবুব

সভ্যতা ও সংস্কৃতির যাত্রা কখনোই সরল রৈখিক নয়। অর্জন-বিয়োজন-সংযোজন এসবের মধ্য দিয়ে সংস্কৃতি অগ্রসর হয়। তবে আমাদের সংস্কৃতির অগ্রযাত্রায় রয়েছে অসংখ্য উজ্জ্বল বাঁক চিহ্ন। একুশে ফেব্রুয়ারি তেমনি একটি উজ্জ্বল বাঁক চিহ্নের সূচক। ভাষার জন্য অকাতরে জীবন দেয়ার ইতিহাস। মাতৃভাষার জন্য রক্ত দেয়ার ইতিহাস পৃথিবীতে ছিলো না।  তবে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে এক মর্মান্তিক ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের মাটিতে একুশের এ ত্যাগ আমাদের এক বিরাট জাতীয় সম্পদ। এবং এক সুমহৎ ঐতিহ্য ন্যায়ের জন্য সত্যের জন্য প্রাণ দেয়ার ঐতিহ্য। যার তুলনা নেই, সুতরাং একুশ এদেশের ছড়া কবিতা রচনায় ও চর্চায় নতুন এক চিন্তা-চেতনার জন্ম দেবে এটাই স্বাভাবিক। বাংলাসাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় আমাদের জীবনের নানা অধ্যায়, ঘটনা-দুর্ঘটনা এ সাহিত্যকে প্রভাবিত করেছে। আমাদের জাতির শ্রেষ্ঠ যে কয়েকটি ঘটনা আছে এর মধ্যে একুশ অন্যতম। তাই একুশ আমাদের জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে মিশে আছে একাকার হয়ে। একুশ আমাদের জীবনযাত্রাকে নানাভাবে নানা আঙ্গিকে উদ্বেলিত করেছে। একুশের ছোঁয়ায় আমাদের সাহিত্যাঙ্গনও কানায় কানায় ভরপুর। বাংলাসাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে একুশের ছোঁয়া লাগেনি। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ছড়া, সঙ্গীত, নাটকসহ সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় এ চেতনাকে তুলে ধরেছেন আমাদের কবি-সাহিত্যিকগণ। আলোচ্য নিবন্ধে ছড়া কবিতায় একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাব নিয়ে আলোচনা করার প্রয়াস পাবো ইনশাআল্লাহ।
কবিতার এক আলোকিত মুখ আবুল হোসেন তার ছড়ায় লেখেন-
এই একুশে খুলে নিলো
মায়ের হাতের বালা
বোনের হাতের মেহেদিটা
ধরায় বুকে জ্বালা।
এই একুশে ভাঙলো মোদের
অনেক রকম ভুল
এই একুশে ফুটলো শেষে
স্বাধীনতার ফুল।
বাংলাসাহিত্যের  স্বনামখ্যাত কবি  আল মাহমুদ একুশ নিয়ে ছড়া লিখেছেন এভাবে-
ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ
দুপুর বেলার অক্ত
বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায়
বরকতেরই রক্ত।
বিশিষ্ট ছড়াকার সাজজাদ হোসাইন খানের কবিতায় একুশ এসেছে এভাবে-
মানুষের ভাষা হাঁটে শব্দে
এককের ঘর ছেড়ে অব্দে
আকাশের মুখ সেতো মৌন
চন্দ্র ও সূর্য, সেও নয় গৌণ।
ছড়াকার আমিরুল ইসলাম লিখেছেন-
কৃষ্ণচূড়ার ডালে ডালে
রক্তরাঙা ফুল
একুশ তুমি কাটিয়ে দ্বিধা
ভাঙাও মনের ভুল।
কবি আহমদ আখতার লিখেছেন এভাবে
একুশ হল ফেব্রুয়ারির
একটি রাঙা দিন,
হিসেব খাতায় জমে থাকা
রক্তভেজা ঋণ।
খালেক বিন জয়েন উদদীনের ছড়ায় একুশের প্রতিফলন দেখতে পাই এমনিভাবে-
একুশ এলে গাছে গাছে শিমুল ফোটে
একুশ এলে শিরায় শিরায় রক্ত ছোটে।
একুশ এলে মায়ের ভাষায় মিছিল ডাকি
একুশ এলে বর্ণমালার ছবি আঁকি।
ফারুক নওয়াজের অনুভূতিটা এমন –
ফেব্রুয়ারির একুশ মানে রক্তে রাঙা ভুঁই,
বোনের খোঁপায় গুঁজে দেওয়া ব্যথার সাদা জুঁই।
ব্যথার সাদা জুঁই চামেলি, ব্যথার আকাশ নীল,
ফেব্রুয়ারির একুশ মানে করুণ গাঁথার মিল।
করুণ গাঁথার মিল নয়রে একুশ মানে হাসি,
একুশ মানে মাতৃভাষা তোমায় ভালোবাসি।”
প্রখ্যাত কবি মোশাররফ হোসেন খানের উচ্চারণ এরকম-
একুশ যখন আসে
রক্ত বৃষ্টি ঝরে তখন
সবুজ দূর্বা ঘাসে।
একুশ যখন আসে
একটি চোখে শোকের নদী
অন্য চোখটি হাসে।
একুশ যখন আসে
ভাই হারানো কষ্টগুলো
পদ্মের মত ভাসে।
একুশ যখন আসে
নতুন সুরুজ মিষ্টি হেসে
দাঁড়ায় মায়ের পাশে।
একুশ এলে পরে-
থোকা থোকা হাসনাহেনা
ঝরঝরিয়ে ঝরে ॥
মশউদ-উশ শহীদের ভাষায়-
একুশ এলেই মনে পড়ে
আমার কিছু গান ছিলো,
একুশ এলেই মনে পড়ে
আমার ঘরে ধান ছিলো,
একুশ এলেই মনে পড়ে
আমার জমি হাল ছিলো,
একুশ এলেই মনে পড়ে
আমার নায়ে পাল ছিলো।
সুকুমার বড়–য়া কয়েকটি লাইন তুলে ধরছি-
একুশ যখন ডাকে
কেউ কি ঘরে থাকে
ঘর ছেড়ে সব চলার পথে
দৃপ্ত চরণ রাখে।
বিমল গুহর-কবিতায় একুশ এসেছে এভাবে-
ছোট্ট মুমু প্রশ্ন করে
একুশ মানে কী!
ধারা পাতের পৃষ্ঠা খুলে
তখন বলেছি-
একুশ হলো তিন ও সাতের
নামতা মনে রাখা
একুশ মানে লাল তুলিতে
ভোরের সূর্য আঁকা।
সুজন বড়ুয়ার ছড়ায় একুশের দোলা লক্ষ করা যায়-
ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ-একটি দিন,
ঝকঝকে আর টকটকে লাল অমলিন,
বর্ণমালার স্বর্ণসাজ,
আগুন মাখা কারুকাজ
বাংলা ভাষার কপাল জুড়ে টিপ রঙিন
ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ একটি দিন।
তপন বাগচীর ছড়ার একুশের তীব্রতা লক্ষ্য করা যায়। যেমন-
একুশ আমার স্বাধীনতা, শোকের সাগর নয়
একুশ আমার জয়ের সাহস আসল পরিচয়।
একুশ আমার উদ্দীপনা ঐক্য গড়ার শক্তি
একুশ মানে মায়ের প্রতি বাঙালিদের ভক্তি।
আলোচনার প্রান্তসীমায় এসে বলে যাই যে, বাংলাসাহিত্যের কবিতার শাখাটি একুশের চেতনায় সমৃদ্ধ। অসংখ্য নবীন-প্রবীণ কবি, সাহিত্যিক, ছড়াকার ক্রমাগত লিখে যাচ্ছেন একুশে ফেব্রুয়ারির গৌরবগাথা নিয়ে। যার ফলে বাংলাদেশের ছড়া কবিতায় সৃষ্টি হয়েছে একুশের চেতনার নতুন স্রোতধারা, গড়ে উঠেছে একুশের নতুন অধ্যায়। বস্তুত একুশ আমাদের সৃষ্টির পুষ্প বাগানকে সুগন্ধে সৌন্দর্যে সুশোভিত করেছে।
এনে দিয়েছে চেতনা ও গৌরব। অনাগতকাল এ ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাসাহিত্য আরো সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে। এ কথা দৃঢ়ভাবেই বলা যায়। হ

SHARE

Leave a Reply