Home ফিচার গ্রাম-বাঙলার ঐতিহ্যবাহী নকশি কাঁথা -আবদুল হাই ইদ্রিছী

গ্রাম-বাঙলার ঐতিহ্যবাহী নকশি কাঁথা -আবদুল হাই ইদ্রিছী

নকশি কাঁথা আমাদের দেশীয় ঐতিহ্য, আমাদের গৌরব। এদেশের কারুশিল্পীদের নিপুণ হাতের অনবদ্য সৃষ্টি। সেই আদিকাল থেকে আজ অবধি নকশি কাঁথার কদর একটুও কমেনি। বরং সময়ের বিবর্তনে নকশি কাঁথার চাহিদা আরও বেড়েছে। যুক্ত হয়েছে আধুনিক ফ্যাশনেবল সব ডিজাইন আর নতুন নতুন নকশা। বর্তমানে ঘরের বিছানাতে ফ্যাশনেবল সৌন্দর্য আনতে নকশি কাঁথার জুড়ি মেলা ভার। বন্ধুরা, আজ তোমাদের জানাবো আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের হস্তশিল্পের অন্যতম গৌরব নকশি কাঁথা নিয়ে।

প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিল্পকলা নকশি কাঁথা
কাঁথার সঙ্গে আমরা সবাই কম-বেশি পরিচিত। এদেশে এমন কোনো পরিবার খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে কাঁথার ব্যবহার নেই। পল্লীশিল্পের কথা ভাবতেই প্রথমে মনে পড়ে নকশি কাঁথার কথা। যুগ যুগ ধরে বাংলার গ্রামের নিভৃতে তৈরি হচ্ছে এই কাঁথা। বাংলাদেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিল্পকলার মধ্যে নকশি কাঁথার স্থান রয়েছে অনেক উঁচুতে।
সংস্কৃত শব্দ ‘কন্থা’ ও প্রাকৃত শব্দ ‘কথ্থা’ থেকে ‘কাঁথা’ শব্দের উৎপত্তি বলে ধারণা করা হয়। কাঁথা শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘জীর্ণ বস্ত্রে প্রস্তুত শোয়ার সময়ে গায়ে দেয়ার মোটা শীতবস্ত্র বিশেষ’। বাংলাদেশের অঞ্চলভেদে কাঁথাকে খাতা, খেতা বা কেথা, কেতা নামে অভিহিত হয়। রংপুর অঞ্চলে কাঁথাকে ‘দাগলা’, ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুর অঞ্চলে ‘গুদুরি’ বলা হয়। সূচিকর্মে অলঙ্কৃত কাঁথাকে বলা হয় নকশি কাঁথা। অনেক জায়গায় নকশি কাঁথাকে সাজের কাঁথা বা নকশি খেতাও বলা হয়ে থাকে।
সুনিপুণ হাতে সুচ আর সুতোয় গ্রাম বাংলার বধূ-কন্যাদের মনের মাধুরী মেশানো রঙ দিয়ে নান্দনিক রূপ-রস ও বর্ণ-বৈচিত্র্যে ভরা যে কাঁথা তাই নকশি কাঁথা। নকশি কাঁথায় আমরা প্রতিনিয়ত খুঁজে পাই আমাদের শিল্প, সংস্কৃতি, সমাজ-সভ্যতা, প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, গৌরবগাঁথা ও সুপ্রাচীন ঐতিহ্য। এটি মূলত গ্রামীণ মহিলাদের শিল্পকর্ম হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। নকশি কাঁথা শিল্পের সাথে আমাদের আর্থ-সামাজিক কর্মকান্ডও জড়িয়ে আছে।

শিল্প-সাহিত্যে নকশি কাঁথা
নকশি কাঁথা নিয়ে লেখা হয়েছে কাব্য, গাঁথা ও রচনা। পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের অনবদ্য কাব্যগ্রন্থ ‘নকশি কাঁথার মাঠ’ এরই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি লিখেছেন-
“কেহ কেহ নাকি গভীর রাত্রে দেখেছে মাঠের পরে
মহা-শূন্যেতে উড়াইছে কেবা নকশি কাঁথাটি ধরে
হাতে তার সেই বাঁশের বাঁশিটি বাজায় করুণ সুরে
তারি ঢেউ লাগি এ-গাঁও ও-গাঁও গহন ব্যথায় ঝুরে।
সেই হতে গাঁর নামটি হয়েছে নকশি-কাঁথার মাঠ
ছেলে বুড়ো গাঁর সকলেই জানে ইহার করুণ পাঠ।’’

যেভাবে তৈরি হয় নকশি কাঁথা
এদেশের গ্রামের বধূ ও কন্যারা এক সময় শুধুমাত্র পরিবারের প্রয়োজনে নকশি কাঁথা তৈরি করতেন। আর এরই মাঝ দিয়ে ঐতিহ্যেরও প্রকাশ পেত। সাধারণত বর্ষাকালে গ্রামের মহিলাদের সংসারের কাজকর্ম কম থাকায় এ সময়টাতে তারা কাঁথা তৈরি করতো। বলতে গেলে গ্রামীণ জীবনে এ ধারা আজও অব্যাহত আছে। আমাদের দেশের প্রায় সর্বত্রই নকশি কাঁথা তৈরি হতো। নকশি কাঁথার মূল উপাদান হলো পুরাতন কাপড় ও রঙবেরঙের সুতা। পুরনো কাপড় কয়েক ভাঁজ করে চার ধার সেলাই করে আটকানো হয়। বয়নশিল্প ও সেলাইয়ের সমান দূরত্ব আনার জন্য প্রথমে বড় বড় ফোঁড় দিয়ে টাক দিয়ে নেয়া হয়। তারপর সেলাই করা হয়। পুরনো শাড়ির পাড় থেকে নেয়া রঙিন সুতা অথবা রঙিন ফেটি সুতা দিয়ে কাঁথার মোটিফের কাজ করা হয়ে থাকে।
প্রথমে কেন্দ্রীয় মোটিফের কাজ হয়, তারপর চারকোনায় সমধরনের নকশা বা মোটিফ সেলাই করে অলঙ্করণ করা হয়। এরপর খালি অংশগুলো ছোট ছোট নকশা বা জ্যামিতিক মোটিফ দিয়ে ভরাট করা হয়। সবশেষে বাকি থাকা জমিনের অংশ সাদা সুতা দিয়ে সেলাই করা হয়। সাধারণত এই রীতিতেই কাঁথা তৈরি করা হয়ে থাকে। তবে অঞ্চলভেদে রীতিতেও ভিন্নতা দেখা যায়।
নকশি কাঁথায় থাকে নানান ফোঁড়। যেমন- কাইত্যা ফোঁড়, এক ফুঁইড়া, লিক ফোঁড়, ক্রসস্টিচ, তারা ফোঁড়, কাটা ফোঁড়, বরকা ফোঁড, তেসরি ফোঁড়, বাঁশপাতা ফোঁড়, বৈকা, বোতাম ঘর, হেরিং বোন, চেইন, কাঁথা ফোঁড়, রান ফোঁড়, ডবল রান, তেরছা ফোঁড়, বখেরা ফোঁড়, গাঁট ফোঁড়, তোলা ফোঁড়, কর্ষিদা ফোঁড় ইত্যাদি।

নকশি কাঁথার আলপনা
বাংলাদেশের প্রত্যেক অঞ্চলের নকশি কাঁথায় রয়েছে ফুল, ফল, লতাপাতা, বৃক্ষ ও জ্যামিতিক নকশার সমাহার। বেশির ভাগ কাঁথায় একটি মূল নকশা থাকে এবং এটাকে ঘিরে বাকি নকশাগুলো কখনো চারকোনায়, কখনো আটভাগে, বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে থাকে। মূল মোটিফকে উজ্জ্বল করার জন্যই এমনটা করা হয়। বাংলাদেশের নকশি কাঁথায় যেসব মোটিফ দেখা যায় সেগুলো হলো-পদ্ম, অষ্টদল, শতদল পদ্ম, সহস্রদল পদ্ম, চক্র, চরকা, স্বস্তিকা, জীবনবৃক্ষ, কলকা, ঢেউ, পাহাড়, মাছ, নৌকা, পায়ের ছাপ, কৃষি যন্ত্রপাতি, হাতপাখা, পশুপাখি, ময়ূর, প্রসাধনী দ্রব্য, রান্নাঘরের জিনিসপত্র, পালকি, ঘোড়াসওয়ার, মসজিদ, মিনার, গম্বুজ, চাঁদ, তারা, জ্যামিতিক নকশা, লতাপাতা, ফুল, কলকা, আম, খেজুর গাছ, পাখি, পাল্কি, লাঙল, নৌকা, হাতি, ফুল, লতাপাতা, ঘোড়া, চাঁদ-তারা, রাজ-রাজার জীবনকাহিনী, কল্পনার পরী, যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং একই সাথে গ্রামীণ জীবনের অনেক কিছুর আলপনা ইত্যাদি। এ যেন শিল্পীর কাছে অতি পরিচিত পরিবেশ ও প্রকৃতির নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ।

নকশি কাঁথার মান ও বৈশিষ্ট্য
ফোঁড়ের ক্ষেত্রে যেমন রয়েছে বিভিন্নতা, তেমনি অঞ্চলভেদে কাঁথার মানও হয় আলাদা। যেমন- চাঁপাইনবাবগঞ্জের নকশি কাঁথার ফোঁড়, কাঁথার পাড় ও নকশার গুণগত মান বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে ভিন্ন। এ এলাকার পাঁচ রকমের কাঁথা বেশ নামকরাÑলহরী কাঁথা, সুজনী কাঁথা, লীক কাঁথা, কার্পেট কাঁথা ও ছোপটানা কাঁথা।
প্রতিটি অঞ্চলের নকশি কাঁথার রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। কাঁথায় ব্যবহৃত ফোঁড়, সেলাইয়ের কৌশল ও নকশার ব্যবহারই বলে দেয় কাঁথাটি কোন অঞ্চলের বা কী মানসিকতা থেকে এই কাঁথা তৈরি করা হয়েছে। ফলে আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য নিরূপণে কাঁথা প্রত্যক্ষভাবেই সাহায্য করে। যেমনÑ রাজশাহী, বগুড়া ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের নকশি কাঁথা আকারে বড় ও পুরু, সেলাই তেমন সূক্ষ্ম নয় এবং জ্যামিতিক নকশা ও ফুল, লতাপাতার নকশার ব্যবহার বেশি। অন্যদিকে যশোর, ফরিদপুর ও খুলনা অঞ্চলের কাঁথা আকারে তেমন বড় নয়, পাতলা, সেলাই সূক্ষ্ম এবং মানুষ ও পশুপাখির মোটিফ বেশি ব্যবহার করা হয়।

নকশি কাঁথার নাম ও ব্যবহার
এবার জেনে নিই কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী নকশি কাঁথার নাম ও তার ব্যবহার-
লেপকাঁথা: এই কাঁথা শীতকালে লেপের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়। এটি অন্যান্য কাঁথার তুলনায় পুরু ও ভারী।
সুজনী কাঁথা: বিছানার চাদর হিসেবে এ কাঁথা ব্যবহার করা হয়। নওগাঁ, কুষ্টিয়া ও যশোর এলাকায় এই কাঁথাকে পাড়নী কাঁথা বা নাছনী কাঁথা বলে। অতিথি এলে বসার জন্য এই কাঁথা বিছিয়ে দেয়া হয়।
আরশীলতা: এটি আয়না ও চিরুনি জড়িয়ে রাখার জন্য ব্যবহৃত হয়।
দস্তরখান: অতিথিকে খাবার সময় বাসনের নিচে পেতে দেয়া হয়।
বর্তন ঢাকনা: অনুষ্ঠানে অভ্যাগতদের খাবার দেয়ার সময় বাসনের আচ্ছাদন বা ঢাকনা হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
নকশি থলে: বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে পান-সুপারি বহনের জন্য ব্যবহার করা হয়।
আসন কাঁথা: হিন্দুদের পূজা-অর্চনা বা বিয়ের অনুষ্ঠানে বর-কনেকে বসতে দেয়া হয় আসন হিসেবে।
চাদর কাঁথা : শীতকালে গায়ের চাদর হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
গিলাফ : আল-কুরআন ও অন্যান্য ধর্মীয় কিতাবের খোল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
রুমাল কাঁথা: এটি রুমাল হিসেবেই ব্যবহার করা হয়।
গাঁটরি বা বোঁচকা কাঁথা: কাপড় চোপড় বেঁধে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়।

নকশি কাঁথার সেকাল-একাল
আবহমানকাল ধরে এ দেশের মানুষ নকশি কাঁথা ব্যবহার করে আসছে। শহরে কিংবা গ্রামে সর্বত্র আজও কাঁথার যথেষ্ট কদর রয়েছে। তবে আগেকার দিনে প্রতিটি পরিবারে নকশি কাঁথার ব্যবহার ছিল ব্যাপক ও বহুবিধ। ব্যবহার অনুযায়ী এগুলোর নামেও ছিল ভিন্নতা। যেমন, শীতের জন্য লেপকাঁথা, বালিশে ব্যবহারের জন্য বয়তন, নামাজের জন্য জায়নামাজ কাঁথা, বসার জন্য আসন কাঁথা এবং খাবারের জন্য দস্তরখানসহ কাঁথার ব্যবহার অনুযায়ী আরো অনেক নাম ছিল। মেয়েদের বিয়েতে এবং আত্মীয়-স্বজনকে কাঁথা উপহার হিসেবে দেয়ারও রেওয়াজ ছিল। স্নেহময়ী মা তার সন্তানের জন্য, প্রেমময়ী স্ত্রী তার স্বামীর জন্য এবং নানি-দাদি, খালা-ফুফুরা পৃথিবীতে নতুন অতিথির আগমনকে সামনে রেখেও কাঁথা তৈরি করতেন। এ প্রচলন আজও একেবারে ফুরিয়ে যায়নি। সেকালের নকশি কাঁথা আজো আছে এবং তৈরিও হচ্ছে। তবে বিবর্তনের ধারায় সময় ও চাহিদার প্রেক্ষিতে আমাদের ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পকর্মেও লেগেছে পরিবর্তনের হাওয়া। নকশি কাঁথার চাহিদা এবং ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এসেছে ব্যাপকতা ও নতুনত্ব। দেশের সীমা পেরিয়ে নকশি কাঁথা আজ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সমাদৃত হচ্ছে। সৌখিন পণ্য হিসেবে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে তৈরি হচ্ছে নকশি কাঁথা। পুরাতন কাপড় ও সুতোর পরিবর্তে ব্যবহার হচ্ছে নতুন মার্কিন, লাল শালু কিংবা কালো কাপড় এবং বিদেশি সিল্কি পেটি সুতো।
এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প যেন আরও বিকশিত হতে পারে সেই দিকে দৃষ্টি রাখা উচিত। হ

SHARE

Leave a Reply