Home গল্প তাকবিরের ভাবনা -কামরুল আলম

তাকবিরের ভাবনা -কামরুল আলম

আসিফ মাঝ পুকুর থেকে সাঁতার কাটতে কাটতে পুকুরঘাটের দিকে আসতে লাগলো। কিন্তু এ কী! কেউ যেন তাকে পেছন থেকে টেনে ধরেছে। সে কোনোমতেই সামনে এগোতে পারছে না। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে আসিফ পানির সঙ্গে লড়াই শুরু করলো। শেষ পর্যন্ত ভেঙে গেলো।
‘কী ভাঙলো মামা? আসিফের হাত না পা ভেঙে গেলো?’ মামার গল্প বলায় বাধা দিয়ে জানতে চাইলো তার গল্পের একমাত্র ¯্রােতা তাকবির। পুরো নাম তাকবিরুল ইসলাম। পড়ে ক্লাস টু-তে। স্কুলে লম্বা কোনো ছুটি পেলেই সোজা চলে যাবে নানাবাড়িতে। নানাবাড়িতে গিয়েই খুঁজবে জাফর মামাকে। জাফর মামা তাকবিরের একমাত্র মামা। গল্প বলায় বিশেষ পারদর্শী। পাড়ার ছেলে মেয়েরা তার ঘরে গল্পের আসর জমায়। বিশেষ করে শীতকালে গায়ে চাদর মুড়ি দিয়ে জাফর মামা যখন গল্প বলতে থাকেন পাড়ার ছেলে মেয়েরা তার চারদিক ঘিরে বসে। জাফর মামার মা, মানে তাকবিরের নানী নানা রকম শীতের পিঠা এসময় পরিবেশন করেন বসার ঘরে। কখনো বা গরম গরম ডালের বড়া। নারকেল, গুড় ও চালের গুঁড়া দিয়ে সচরাচর রাস্তার ধারে যে ‘ভাপা’ পিঠা পাওয়া যায় তাকবিরের নানীর বানানো একটি পিঠা প্রায় এরকমই। কিন্তু স্বাদ অন্যরকম। নুনের পিঠাগুলোর স্বাদ তো বর্ণনা করা সম্ভব না। তাকবিরের বাবা আজহার মাহমুদও সে পিঠার বিশেষ ভক্ত। তিনি অবশ্য শ্বশুর বাড়িতে খুব কমই আসেন। তার জন্য পিঠেপুলি প্রায়ই পাঠিয়ে দেয়া হয়। এ কাজটিও করতে হয় তাকবিরের জাফর মামাকে। জাফর মামা সম্পর্কে তাকবিরের বাবার শ্যালক। এই শব্দটি দিয়ে প্রায়ই মামাকে খেপিয়ে তুলে তাকবির। দুষ্টু বুদ্ধি বলতে ওর মাথাতে এই একটাই।
‘মামা, ও মামা, একটা কথা বলবো তুমি রাগ করবে না তো?’
‘না, মামা রাগ করবো কেন? তুমি একটা না, একশটি কিংবা হাজারটি কথা বলবে, আমি রাগ করবো না।’
‘প্রমিজ!’
‘হ্যাঁ প্রমিজ!’ জাফর মামা তাকবিরের হাতে হাত রেখে ওয়াদাবদ্ধ হন। তারপর বলেন, ‘এবার বলো তোমার কথাটা কী?’
‘মামা, তুমি আমার বাবার কী হও?’
‘ওরে দুষ্টুরে, তোর মাথায় এত বুদ্ধি। শোন্ তোর বাবা আমার দোলাভাই। এবার হলো তো।’
‘না হয়নি, আমার বাবা যে তোমার দোলাভাই তা তো ঠিকই আছে। কিন্তু তুমি আমার বাবার কী?’
‘তবে রে…’ বলে জাফর মামা হাত মুষ্টিবদ্ধ করতেই তাকবির ছুটে পালায়। এমনভাবে দৌড়ায় যেন কেউ তাকে ধরতেই পারবে না। জাফর মামাও পেছন পেছন ছুটতে থাকেন। এমন ভাব ধরেন তাকবির যাতে মনে করে তিনি তাকে ধরতে ব্যর্থ হচ্ছেন। এক পর্যায়ে তাকবির তার নানীর কোলে চলে যেতে পারলেই এ খেলাটি শেষ। ‘পারবে না, পারবে না, আমাকে ধরতে পারবে না’ বলে আনন্দে উল্লাস করতে থাকে সে।
জাফর মামা হাসেন। আনন্দে হাসেন। তার ভাগনা বিজয়ী হতে পেরে উল্লাস প্রকাশ করছে এটা দেখেই তিনি আনন্দ পান। তার নিজের জীবনে ওরকম বিজয় আসেনি কোনোদিন। উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে চান্স না পাওয়ায় পারিবারিক সিদ্ধান্ত হয় তিনি বিদেশে চলে যাবেন। বিদেশে চলে যাবেন বললেই তো আর বিদেশে যাওয়া যায় না। তাই ঘরে বেকার বসে থাকা, বিদেশ যাওয়ার অপেক্ষায়।
‘তাকবির, তুমি কি গল্প শুনবে নাকি খেলা করবে?’
‘গল্প শুনবো মামা। বলো না মামা, তারপর কি হলো?’
‘কতটুকু যেন বলেছিলাম?’
‘ওই যে আসিফ সাঁতার কাটছিল, তারপর মাঝপুকুরে আটকে গেল। কী যেন ভেঙে গিয়েছিল?’
‘ও হ্যাঁ, আসিফ যখন সাঁতার কাটছিল তখন তার মনে হলো সে আর সামনের দিকে এগোতে পারছে না। সে পানির মধ্যেই ঘামতে লাগলো। সে চিৎকার দিয়ে মাকে ডাকতে চাইল। কিন্তু মুখ দিয়ে কিছুই উচ্চারণ করতে পারছে না। ঠিক তখনই মায়ের ডাকে ঘুম ভেঙে গেল আসিফের।’ একটা দম নিলেন জাফর মামা।
‘মামা, তার মানে আসিফ ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখছিল?’
‘একদম ঠিক। আসিফের ঘুম ভেঙে গেলে সে কিছুক্ষণ কোনো কিছু বুঝে উঠতে পারছিল না। সময়টা সকাল নাকি সন্ধ্যা বুঝতে না পেরে মায়ের দিকে তাকালো আসিফ। আসিফের মা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, কি রে খোকা, ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখছিলি বুঝি। গোঙানির মতো আওয়াজ শুনে ছুটে এলাম। আসিফ এতক্ষণে টের পেল সে আসলে ঘুমিয়ে ছিল। তখনও তার শরীরে ঘামের চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল। সে অবাক হলো, আর উপলব্ধি করলো চিৎকার করায় তার গলাটা শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে গেছে। তাই মায়ের কাছে পানি চাইল। আসিফের মা ওকে পানি খেতে দিলেন।’ আবার একটু দম নিলেন জাফর মামা।
‘মামা, তোমার গল্পগুলো এত ছোট হয় কেন?’
‘ছোট হবে কেন? আমি তো বড়ো গল্পই বলছি।’
‘মানে এরপর আরো কাহিনী আছে?’
‘থাকবে না কেন? তুই তো এখনও আসিফের পরিচয়ই জানতে পারিসনি।’
‘ও হ্যাঁ। আমি তো খেয়ালই করিনি। আচ্ছা মামা, আসিফ কি আমাদের মতো ছোট কেউ, নাকি তোমাদের মতো বড়ো?’
‘মাঝামাঝি।’
‘মানে?’
‘মানে আসিফ তোদের মতো ছোটও না, আবার আমাদের বয়সেরও না। আসিফ পড়ে ক্লাস এইটে। বয়স ১৩ বছর।’
‘তাহলে তো আসিফ আমার চেয়ে অনেক বড়ো।’
‘হ্যাঁ, তা তো বড়োই।’
‘তারপর কি হলো মামা?’
‘তারপর…? তারপর আসলে তেমন কিছুই হয়নি…।’ জাফর মামা একটু অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলেন। সেই সুযোগে গল্পটার ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছে। তাই তিনি খানিকটা আমতা আমতা করতে লাগলেন।
‘মামা, তুমি এমন করছো কেন? তুমিই তো বললে এটা অনেক বড়ো গল্প।’
‘ও হ্যাঁ, বড়ো গল্পই তো। আসিফের বাবার কথা তো তোমাকে বলাই হয়নি। আসিফের বাবা খুবই ভালো মানুষ।’
জাফর মামার গল্প আর এগুলো না। ঘরে প্রবেশ করলেন তাকবিরের বাবা, মানে জাফর মামার দোলাভাই। তাকবির ও তার মা এক সপ্তাহ যাবৎ এখানে আছে। আজকেই ওদের বাসায় ফিরে যাওয়ার কথা। তাই অফিস থেকে আগেভাগেই বেরিয়ে সোজা শ্বশুর বাড়িতে এসেছেন তিনি।
‘কার বাবা খুবই ভালো মানুষ?’ জানতে চাইলেন তিনি।
‘বাবা, আসিফের বাবা নাকি খুবই ভালো মানুষ। তিনি কি তোমার চেয়েও ভালো?’
‘আসিফের বাবাকে তো আমি চিনি না। তবে তোমার মামা যখন ভালো বলেছে, নিশ্চয়ই ভদ্রলোক ভালোই হবেন। হয়তো আমার চেয়েও ভালো।’
‘না, বাবা, পৃথিবীতে তোমার চেয়ে ভালো আর কেউ হতে পারে না।’
‘এটা তুমি ঠিকই বলেছো তাকবির। পৃথিবীতে সব সন্তানের কাছে তার বাবাই সবচেয়ে ভালো মানুষ। আসিফের কাছে তার বাবা ভালো, তোমার কাছে তোমার বাবা। আর আমার কাছে আমার বাবাও ভালো ছিলেন।’
‘তোমার বাবা, মানে আমার দাদু এখন কোথায় বাবা?’
‘ও, তোমাকে তো বলাই হয়নি, তোমার দাদু এখন আল্লাহর বাড়িতে।’
‘তিনি সেখানে কতদিন থাকবেন, কোনোদিনই তো তাঁকে দেখিনি।’
‘তাকবির, বড়ো হলে তুমি বিস্তারিত জানবে। আসলে তোমার দাদু এখন যেখানে আছেন, সেখান থেকে আর ফিরে আসা যায় না।’
‘এইজন্যই কি সেটাকে না ফেরার দেশ বলে?’
‘না ফেরার দেশ? তুমি এ কথা কোথায় শুনলে?’
‘মামণি বলেছেন। তিনি বলেছেন, দাদু নাকি না ফেরার দেশে চলে গেছেন।’
‘হ্যাঁ, তবে আসল কথাটি কি জানো তাকবির। না ফেরার দেশ নয়, এটা আসলে ফিরে যাওয়ারই দেশ। আমরা বুঝি না বলেই দেশটিকে না ফেরার দেশ বলে থাকি।’
‘আমরা কি সবাই সে দেশে ফিরে যাবো? মানে আমরা কি সেখান থেকেই এসেছি?’
‘একদম ঠিক ধরেছো তুমি। আমরা একসময় ছিলামই না। আল্লাহ রাব্বুল আ’লামিন আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি প্রথমে আমাদের রূহগুলোকে এক জায়গায় রেখে দেন। সেখান থেকে বিভিন্ন সময় আমাদেরকে পৃথিবীতে পাঠান।’
‘রূহ মানে কী বাবা?’
‘রূহ মানে আত্মা। আমাদের যে মন বা হৃদয় আছে, যা দিয়ে আমরা অনুভব করি তা-ই হচ্ছে আত্মা বা রূহ। আমাদের রূহগুলো আমাদের দেহ থেকে যেদিন চলে যাবে সেদিনই আমাদেরকে পৃথিবীতে মৃত ঘোষণা করা হবে। কিন্তু আমরা আসলে মরবো না।’
‘দোলাভাই কী যে আবোলতাবোল বলছেন, মানুষ মরবে না মানে কী? আপনি ছোটদের এসব কী শেখাচ্ছেন?’ হঠাৎ প্রতিবাদ করে বসলো তাকবিরের জাফর মামা।
‘তুমি আমার কথা না বুঝেই রেগে যাচ্ছো। তুমি তো জানো পরকাল বলে কিছু একটা আছে, নাকি?’
‘তা তো জানি, সে তো আমাদের মৃত্যুর পরে।’
‘আমাদের মৃত্যুর পরে মানে আমরা ইহকাল থেকে পরকালে স্থানান্তরিত হবো। এই স্থানান্তরের ঘটনাকেই আমরা মৃত্যু বলে চিহ্নিত করি। পৃথিবীতে আমাদের জীবন শেষ হয়ে যায়, আখেরাতে শুরু হয়।’
তাকবির বাবার কোলঘেঁষে বসেছিল। বড়োদের কথায় ও কিছুটা হতবাক হয়ে যায়। কিন্তু তার মনে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে। হঠাৎ প্রশ্ন করে বসে, ‘বাবা, আল্লাহ কে?’
‘আল্লাহ হলেন আমাদের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রিজিকদাতা সবকিছু। আল্লাহই আমাদের প্রকৃত মালিক। আমরা তাঁর গোলাম।’ কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে ঢোক গিলে বললেন আজহার মাহমুদ।
বাবার মতো ছেলেও আনমনা হয়ে গেল উত্তরটি শুনে। সে ভাবছে মালিক গোলামের ব্যাপারটি নিয়ে। কিছু বুঝতে না পেরে বললো, ‘আমরা আল্লাহর গোলাম মানে কী বাবা?’
‘আল্লাহ আমাদের মালিক বা প্রভু, সে হিসেবে আমরা তাঁর গোলাম। আমরা যদি তাঁর হুকুম মেনে চলি, তাঁর নির্দেশিত পন্থায় সকল কার্যক্রম পরিচালনা করি, তবেই তিনি আমাদেরকে পুরস্কৃত করবেন। অন্যথায় আমাদেরকে শাস্তি পেতে হবে।’
‘আল্লাহ আমাদেরকে পুরস্কৃত করবেন? বাবা, আগে বলোনি কেন? আমি আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার নিতে চাই।’
‘হ্যাঁ, তাকবির, আমরা সবাই চাই আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করতে।’
‘পুরস্কার পেতে হলে কী করতে হয় বাবা?’
‘ওই যে, আল্লাহর কথামতো চলতে হবে। সত্য কথা বলতে হবে, মিথ্যা বলা যাবে না। চুরি করা যাবে না। হালাল খাবার খেতে হবে। নিয়মিত ফরজ নামাজ, রোজা এগুলো আদায় করতে হবে। মানুষকে সৎ কাজের আদেশ দিতে হবে, অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করতে হবে। আল্লাহর বিধান হচ্ছে আল কুরআন, এটা ভালো করে বুঝে বুঝে পড়তে হবে এবং সে অনুযায়ী নিজের জীবন পরিচালনা করতে হবে।’
‘নামাজ পড়লে কি পুরস্কার পাওয়া যায় বাবা?’
‘অবশ্যই পাওয়া যায়। আল্লাহ আমাদেরকে মৃত্যুর পর বসবাসের জন্য দুটি জায়গা নির্ধারণ করে রেখেছেন। এক বেহেশত, দুই জাহান্নাম। বেহেশত হচ্ছে চির শান্তির ঠিকানা, এটা আমাদের জন্য পুরস্কার। আর জাহান্নাম হচ্ছে শাস্তির ঠিকানা। এখানে খুবই কষ্ট ও যন্ত্রণার মধ্যে সবাইকে থাকতে হবে।’
‘বাবা, আমি কষ্ট ও যন্ত্রণার মধ্যে থাকতে পারবো না। আমি বেহেশতে যেতে চাই।’
আল্লাহর কথামতো চললে আমরা ইনশাআল্লাহ বেহেশতে যাবো।’
‘তোমাদের খাবার কিন্তু রেডি, ডাইনিং টেবিলের দিকে এসো।’ অন্দরমহল থেকে ডাক দিলেন তাকবিরের মা। সবাই এগিয়ে গেল ডাইনিং টেবিলের দিকে। হ

SHARE

Leave a Reply