Home সম্পূর্ণ কিশোর উপন্যাস আল কেমিস্ট -মূল : পাউলো কোয়েলহো অনুবাদ : আসিফ...

আল কেমিস্ট -মূল : পাউলো কোয়েলহো অনুবাদ : আসিফ হাসান

তৃতীয় খন্ড

পথ চলতে চলতে অনেক সময় তাদের কাছে মুখ-ঢাকা লোকজন আসে। তারা বেদুইন। তারা কাফেলা-রুটের খোঁজখবর রাখে। তারা চোর, বর্বর গোত্র সম্পর্কে তথ্য দেয়। তারা আসে নীরবে, বিদায় নেয়ও একইভাবে। কালো কাপড়ে মোড়া থাকে তারা, দেখা যায় কেবল তাদের চোখ দুটি।
এক রাতে তারা খবর পেল, গোত্রীয় যুদ্ধ নাকি শুরু হয়ে গেছে। ছেলেটা বাতাসে ভয়ের গন্ধ পেল, যদিও কেউই তাকে কিছুই বলেনি। আবারো সে কথাহীন ভাষা বুঝতে পারল। একেই বলে ‘সার্বজনীন ভাষা।’
ইংরেজ ভদ্রলোকটি বিপদ সম্পর্কে জানতে চাইলেন।
‘একবার আপনি মরুভূমিতে ঢুকলে, আর ফিরে যাওয়ার রাস্তা নেই,’ উটচালক বলল।
‘আর যেহেতু ফিরে যেতে পারছেন না, তা-ই চিন্তা একটাই। সেটা হলো এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে ভালো রাস্তাটা বের করা। বাকিটা আল্লাহর ওপর। বিপদ-আপদ সবই তার হেফাজতে।’
আর সে রহস্যময় সেই শব্দটি বলে কথা শেষ করল : ‘মাকতুব।’
কাফেলাটি এখন আরো তাড়াতাড়ি চলতে লাগল। দিনগুলো সবসময়ই নীরব ছিল, এখন রাতগুলোও নীরব হয়ে গেল। আগে রাতে আগুন জ্বালিয়ে তারা কথাবার্তা বলতো। এখন আগুন জ্বালানো নিষেধ। কাফেলার উপস্থিতি অন্য কেউ টের পাক, তারা চায় না। কাফেলার সর্দার প্রতিটি গ্রুপে সশস্ত্র প্রহরী মোতায়েন করেছেন।

ইংরেজ লোকটির কাছে অদ্ভুত সব বই রয়েছে। পারদ, লবণ, ড্রাগন, রাজা-বাদশাহদের নিয়ে বই। বালকটি এগুলোর মাথা-মুণ্ডু কিছুই বোঝে না। তবে সব বইতেই একটা আইডিয়া ঘুরেফিরে এসেছে : সবকিছুই মাত্র একটা জিনিসেরই প্রকাশ। তবে একটা বইয়ের কথা সে জেনেছে, সেটা পান্নার গায়ে আল কেমিস্টের লেখা কয়েকটা লাইন।

কাফেলা রাত-দিন চলছিল। মুখ-বাঁধা বেদুইনরা এখন আগের চেয়ে ঘনঘন এসে নানা তথ্য দিচ্ছিল। কাফেলা চাইছিল, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মরূদ্যানে পৌঁছাতে।
প্রাণীগুলোর দম শেষ হয়ে আসছিল। লোকজন কথা বলা আরো কমিয়ে দিয়েছে। তবে সেই উটচালকটির মধ্যে কিন্তু ভয়-ডর বলে কিছু দেখা গেল না।
‘আমি জীবিত,’ সে বলল বালকটিকে, এক রাতে তারা যখন খেজুর চিব্বাছিল। ওই রাতে আগুন ছিল না, চাঁদও ওঠেনি।
‘আমি যখন খাই, তখন কেবল খাবার নিয়েই ভাবি। আমি যখন পথ চলি, তখন চলা নিয়েই কেবল ভাবি। যখন লড়াই করি, তখন ভাবনাতে থাকে কেবল আমি তো যেকোনো দিনই মরতে পারি।’
‘যেহেতু আমি অতীত বা ভবিষ্যতে বাঁচতে পারি না, আমি কেবল বর্তমান নিয়েই ভাবি। তুমি যদি বর্তমানের দিকে মনোযোগ দাও, তবে তুমি সুখী মানুষ হতে পারবে। তুমি যদি মরুভূমিতে জীবন দেখ, দেখবে আকাশে আছে তারা, আর এক গোত্র আরেক গোত্রের সাথে যুদ্ধ করছে, কারণ তারা মানবজাতিরই অংশ। জীবন তোমার জন্য হয়ে যাবে একটা আনন্দের জায়গা, মহা উৎসব। কারণ তুমি তখন বর্তমান মুহূর্তেই বাস করছ।’
দুই রাত পর সূর্য ওঠার অনেক আগে তারা প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ছেলেটা দেখল, অন্য দিনের চেয়ে পূর্ব দিগন্তটা কেমন যেন নিচু।
‘ওটা তো মরূদ্যান,’ উটচালক বলল।
‘তাহলে কালই আমরা সেখানে গেলাম না কেন?’ ছেলেটা জানতে  চাইল।
‘কারণ আমাদেরকে বিশ্রাম নিতে হয়েছিল।’

যা দেখল, তা বিশ্বাস করতে পারছিল না ছেলেটা : মরূদ্যান। একবার ভূগোলের বইতে ছবি দেখেছিল সে- মরূদ্যান হলো কয়েকটা খেজুর গাছে ঘেরা একটা কূপ। কিন্তু তার সামনে যে মরূদ্যানটা আছে, সেটা স্পেনের অনেক শহরের চেয়েও বড়। এখানে আছে তিন শ’ কূপ, পঞ্চাশ হাজার খেজুর গাছ, পুরো এলাকাজুড়ে অগণিত তাঁবু।
‘মনে হচ্ছে আলিফ লায়লা ওয়া লায়লা (হাজার রাত্রি এবং এক রাত্রি, আরব্য উপন্যাস), ইংরেজ ভদ্রলোক বললেন। তিনি তখন আল কেমিস্টের সাথে সাক্ষাতের জন্য পাগলপারা হয়ে উঠেছেন।
তাদের ঘিরে থাকা শিশুরা পশু আর লোকজনকে দেখছিল উৎসুক্য দৃষ্টিতে। লোকজন জানতে চাইছিল যুদ্ধ সম্পর্কে। আর নারীরা প্রতিযোগিতা করছিল কাপড় আর মূল্যবান রতœপাথরের। মরুভূমির নীরবতা এখানে সুদূরের স্বপ্ন; মুসাফিররা বিরামহীনভাবে কথা বলছিল, হাসছিল, চিৎকার করছিল। মনে হচ্ছিল তারা আধ্যাত্মিক জগৎ থেকে আত্মপ্রকাশ করে আবার মর্ত্যরে পৃথিবীতে নেমে এসেছে।
তারা স্বস্তি পাচ্ছিল, আনন্দিত ছিল।
উটচালক ছেলেটাকে বলল, মরূদ্যানকে কেন সবসময় নিরপেক্ষ এলাকা বিবেচনা করা হয়। কারণ এখানে নারী আর শিশুরা বাস করে। মরুভূমির সবখানে আছে মরূদ্যান। গোত্রগুলো যুদ্ধ করে মরুভূমিতে, তারা মরূদ্যানকে বিশ্রামের স্থান হিসেবে ব্যবহার করে।
অনেক কষ্ট করে কাফেলার সর্দার তাদের সবাইকে একত্রিত করে এখানে অবস্থানের নিয়ম-কানুন বলে দিলেন। গোত্রীয় যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদেরকে এখানেই থাকতে হবে। আর তারা যেহেতু মুসাফির, তা-ই তাদেরকে এখানে যারা বাস করে তাদের সাথে মিলেমিশেই থাকতে হবে। এটাই কানুন। তারা অবশ্য সেরা আতিথেয়তা পাবে। তারপর তিনি তার প্রহরীসহ সবাইকে তাদের অস্ত্র জমা দিতে বললেন। ‘এই হলো যুদ্ধের আইন,’ কাফেলা সর্দার বললেন। ‘মরূদ্যান কখনো সেনাবাহিনী বা সৈন্যদের আশ্রয়কেন্দ্র হতে পারে না।’
পরে ইংরেজ ভদ্রলোককে নিয়ে ছেলেটা বের হলো মরূদ্যানে আল কেমিস্টকে খুঁজতে। হয়তো তিনি এখানে কোনো তাঁবুতে বাস করেন। কিন্তু খুঁজতে গিয়ে তাদের মনে হলো, মরূদ্যানটি তারা আগে যতটুকু ভেবেছিল, তার চেয়েও বড়।
‘কাউকে কি জিজ্ঞাসা করব?’ ছেলেটি জানতে চাইল।
ইংরেজ ভদ্রলোক চাইছিলেন না, তার এই সফরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অন্য কেউ জানুক। কিন্তু জিজ্ঞাসা না করে উপায়ও ছিল না। তবে যেহেতু ছেলেটা তার চেয়ে ভালো আরবি জানে, তা-ই তিনি ছেলেটাকেই বললেন জিজ্ঞাসা করতে। তারা কূপ থেকে মশকে পানি ভরতে আসা এক নারীকে জিজ্ঞাসা করল।
কিন্তু নারীটি বলল, আল কেমিস্ট নামে কেউ আছে বলে তার জানা নেই। সে দ্রুত চলে গেল। তবে যাওয়ার আগে ওই নারী বলে গেল, তারা যেন কালো কাপড় পরা কোনো নারীকে কিছু জিজ্ঞাসা না করে, কারণ তারা বিবাহিতা। ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা উচিত।
এরপর আরো কয়েক নারী এলো পানি নিতে। কিন্তু তাদের সবার পরনে ছিল কালো পোশাক। তা-ই ছেলেটি কাউকেই জিজ্ঞাসা করল না। তারপর দেখা গেল এক লোককে। ছেলেটি এবার তাকে একটু ভিন্নভাবে জিজ্ঞাসা করল : ‘আপনি এমন কাউকে কি জানেন যিনি রোগ সারাতে পারেন?’
‘আল্লাহই সব রোগ সারায়,’ লোকটির সোজাসাপ্টা জবাব।
তারপর আরেকজন এলো। তাকেও একই প্রশ্ন করা হলো। বালকটি তাকে এও বলল, তার ইংরেজ বন্ধু অনেক পথ পাড়ি দিয়ে এখানে এসেছেন আল কেমিস্টের সাথে সাক্ষাৎ করতে।
তখন আরব লোকটি বললেন, এমন লোক থেকে থাকলেও তার দেখা পাওয়া খুবই কঠিন। তবে তোমরা অপেক্ষা করো। কাফেলা চলে যাক। তারপর খোঁজ করো। ইংরেজ ভদ্রলোক খুশি হলেন। সে ঠিক পথেই চলেছে।
সবশেষে এক তরুণী এলো সেখানে। তার পোশাক কালো ছিল না। তার কাঁধে ছিল একটা সুরাহি। হিজাব পরা, তবে মুখ খোলা। ছেলেটা তার কাছে গেল আল কেমিস্ট সম্পর্কে জানতে।
ইংরেজ ভদ্রলোক তাড়া দিলেন ছেলেটিকে, তাকে জিজ্ঞেস করো।
ছেলেটা তখন এগিয়ে গিয়ে তার নাম জানতে চাইল।
‘ফাতিমা,’ মেয়েটা জবাব দিল।
‘আমাদের নবীর মেয়ের নামও এটা,’ ফাতিমা বলল। ‘আমাদের সেনাবাহিনী পৃথিবীর সব জায়গায় এই নাম নিয়ে গেছে,’ মেয়েটা গর্বের সাথে বলল।
ইংরেজ ভদ্রলোক আবার তাগাদা দিলেন লোকজনের রোগ সারায় এমন কারো কথা সে জানে কিনা জানতে।
‘ওই লোকটি পৃথিবীর সব রহস্য জানেন,’ মেয়েটা বলল। ‘তিনি মরুভূমিতে জিনদের সাথে কথা বলেন।’
তারপর মেয়েটা দক্ষিণের দিক দেখালো। সেখানেই তিনি থাকেন। তারপর সোরাহি ভরে চলে গেল।
ইংরেজ ভদ্রলোকটিও হাওয়া হয়ে গেলেন, আল কেমিস্টকে খুঁজতে। ছেলেটা কিন্তু বসে রইল কূপের কাছেই।
পরদিন আবার সে গেল কূপের কাছে। সে আশ্চর্য হলো সেখানে ইংরেজ ভদ্রলোককে দেখে।
‘আমি তার জন্য সারাটা বিকেল আর সন্ধ্যা অপেক্ষায় থেকেছি,’ ইংরেজ ভদ্রলোক বললেন। ‘তিনি এলেন প্রথম প্রহরের পর। তিনি আমার কাছে জানতে চাইলেন, আমি লোহাকে সোনা বানাতে পারি কি না।
আমি বললাম, আমি তো সে জন্যই এখানে এসেছি।’ তিনি আমাকে বললেন, ‘তোমার উচিত লেগে থাকা, চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।’
ছেলেটা কিছু বলল না। ইংরেজ ভদ্রলোক চলে গেলেন। তখনই সেখানে ফাতিমা এলো, সোরাহি নিয়ে পানি ভরতে।
‘আমি তোমাকে একটা কথা বলতে এসেছি,’ ছেলেটা বলল। ‘আমি তোমাকে আমার স্ত্রী করতে চাই। ’
মেয়েটা সোরাহি ফেলে দিল, পানি গড়িয়ে পড়ল।
‘আমি এখানে অপেক্ষা করছি। আমি পিরামিডের কাছে গুপ্তধন খুঁজতে মরুভূমি পাড়ি দিয়েছি। আমার কাছে যুদ্ধটা মনে হয়েছিল একটা অভিশাপ। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এটা একটা আশীর্বাদ। এই যুদ্ধই আমাকে তোমার কাছে এনে দিয়েছে।’
‘যুদ্ধ একদিন শেষ হবে,’ মেয়েটা বলল।
ছেলেটা চারপাশের খেজুর গাছগুলোর দিকে তাকাল। তার রাখাল আমলের কথা মনে হলো। আবারো সে রাখাল হতে পারে।
‘গোত্রের লোকজন সবসময় গুপ্তধনের খোঁজ করে,’ মেয়েটা বলল। মনে হলো সে বুঝতে পেরেছে ছেলেটা কী চিন্তা করছে। ‘আর মরুভূমির নারীরা তাদের গোত্রের পুরুষদের জন্য গর্বিত।’
ফাতিমা তার সোরাহি ভরে চলে গেল।
(চলবে)

SHARE

Leave a Reply