Home সায়েন্স ফিকশন মিশন টু আয়রনম্যান -মহিউদ্দিন আকবর

মিশন টু আয়রনম্যান -মহিউদ্দিন আকবর

এটা কি স্বপ্ন!
কিন্তু আমি তো এখনও স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি সেই আওয়াজ- সেই পবিত্র বাণী।
তাহলে? এটা কেমন এক রহস্যময় ব্যাপার!
ওউফ, মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করছে। কিচ্ছু বুঝে উঠতে পারছি না।
আসলে আমি কি জেগে আছি? নাকি এখনও স্বপ্নের মাঝেই বিভোর আমি?
কিন্তু এই যে এখনও শুনতে পাচ্ছি সেই মহান বাণী…।
না, না। আমি তো আসলেই জেগে আছি। তাহলে? …

আসলে বিজ্ঞানমনস্ক সাদিত সত্যি সত্যি স্বপ্ন দেখেই জেগে উঠেছে।
ওদিকে সাদিতের ছোটমামা আসিফ ততক্ষণে প্রতিদিনকার মতো ফজরের সালাত শেষে অর্থসহ কুরআন তেলাওয়াত করছিলো বেশ উচ্চকণ্ঠে। আর হালকা পাতলা ঘুমের ঘোরে স্বপ্নের জগতে বিচরণ করার কারণে এই তেলাওয়াতই অবচেতন মনে শুনতে পাচ্ছিলো সাদিক। হঠাৎ ঘুম ছুটে যাওয়ায় আসিফের মস্তিষ্কের কোষে কোষে কুরআন তেলাওয়াতের রেশটা বেশ ভালোভাবেই অনুরণিত হচ্ছিলো।
ও বিছানা ছেড়ে প্রায় দৌড়ে বাংলো ঘরে ঢুকে ছোটমামাকে শুধায়- তোমার  তেলাওয়াত হলো মামা?
সাদিতের কথা কানে না তুলে আসিফ নির্দিষ্ট রুকুতে পৌঁছে তেলাওয়াত শেষ করে বলে- হ্যাঁ শেষ তো হলো। কিন্তু বেশি রাত জেগে থাকার ফলটা তো বুঝলি বান্দর! তোর ফজরের সালাত তো কাজা হলো।
আসিফের কথায় সাদিত একটু দমে গিয়ে মিনমিনে গলায় বলে- তুমি সময় মতো ডাকলেই তো এমনটি হতো না।
– তা, ডাকিনি কী বলছিস! যতই ডাকাডাকি করি অমনি এদিক থেকে ওদিক ঘুরে শুয়ে ‘এই তো উঠছি বলেই আবার ঢুব্বুস।’
– মানে?
– মানে আবার কী, ফের ঘুমের দেশে হারিয়ে গেলেন। আর ঘুমের ঘোরে কী সব অগরম বগরম বকতে থাকলেন।
– তাই! আসলে বেশ মজার মজার স্বপ্ন দেখছিলাম কিনা। কিন্তু অবাক কান্ড কি জানো মামা?
– কী আবার অবাক কান্ড?
– স্বপ্নে দেখলাম তোমার সাথে একটা খনিতে অনুসন্ধান অভিযানে গিয়েছি। যখন একটা আবছা অন্ধকার স্থান পেরোতে যাবো অমনি একটা সুরেলা কণ্ঠে শুনতে পেলাম- ‘আমার রাসূলগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ প্রেরণ করেছি এবং তাঁদের সাথে অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও ন্যায়নীতি, যাতে মানুষ ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে। আর আমি নাজিল করেছি লৌহ, যাতে আছে প্রচ- শক্তি এবং মানুষের বহুবিধ উপকার। এটা এজন্য যে, আল্লাহ জেনে  নেবেন কে না দেখে তাঁকে ও তাঁর রাসূলগণকে সাহায্য করে। আল্লাহ শক্তিধর, পরাক্রমশালী’।
যেন কথাগুলো আমাদের উদ্দেশ্য করেই বলা হচ্ছে।
সাদিতের কথায় আসিফ মামা এবার মুচকি হেসে বলে-
আর ও যখন স্বপ্নের ঘোরে ছিলো- তখন পাশের বাংলো ঘরেই সুললিত কণ্ঠে  তেলাওয়াত করছিলো খুদে বিজ্ঞানী বলে খ্যাতিমান তারই ছোটমামা আসিফ। মানে আসিফ খান।
এটা খুবই সত্যিকথা যে ঘোরের মাঝে আমি তোমার তেলাওয়াত শুনছিলাম। কিন্তু সাথে সাথে দেখতে পাচ্ছিলাম, তা কিভাবে অস্বীকার করবো?
– মানে!
– মানে হলো, তোমার পঠিত আয়াতের প্রতিটি শব্দের অর্থ কেউ যেন আমাকে অদৃশ্য থেকে বলে দিচ্ছেন আর আমি ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছি একটা আকরিক ভর্তি খনির মাঝে। সামনে তুমিও হাঁটছো।
– তারপর?
– তারপর আর কী! কিছুক্ষণের মাঝেই একটা ড্রিলার দিয়ে খানিকটা স্থান খনন করে আমরা নেমে গেলাম একটা কুঠরির মতো স্থানে। সেখানে একটা টেবিলে থরে থরে সাজানো রয়েছে লোহার বিভিন্ন আকারের বার। আমি একটু চকচকে দেখে একটা বার হাতে তুলে নিতেই সামনে এসে দাঁড়ালেন একজন অদ্ভুত আকৃতির মানুষ। আমি তাকে গভীর মনোযোগের সাথে পরখ করে বুঝলাম, তিনি মানুষের আকৃতিতে থাকলেও আসলে একটা রোবট! অথচ মানুষের কণ্ঠেই আদেশ করলেন, লোহার বারটা রেখে দাও। এটা তোমাদের অর্জিত কোনো বস্তু নয়। এটা আমরা অনেক কষ্টে সংগ্রহ করেছি। তারপর রিফাইন করে বিভিন্ন আকারের বারে পরিণত করেছি। আজ বেলা এগারোটা ত্রিশ মিনিটে আমরা এগুলোকে স্থানান্তর করে আমাদের গ্রহে নিয়ে যাবো।
তার কথা শুনে আমার খুব হাসি পেলো। আমি মুচকি হেসে বললাম, এখন তো রাত এগারোটা। আর তুমি বলছো আজ বেলা এগারোটা ত্রিশ মিনিটে স্থানান্তর করবে!
রোবোম্যান আমার কথাকে উড়িয়ে দিয়ে বললো, তুমি ঠিক কথা বলছো না। আসলে এখনই রাত এগারোটা। আর মাত্র আধা ঘণ্টা পর আমরা এগুলোকে নিয়ে ছুটবো। ওই তাকিয়ে দেখো, আমাদের সাটেলস্পেস পাইলটরা প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন। তবে মনে রেখো, আমরা যখন ফ্লাইট ছাড়বো তখন আর তোমরা এখান থেকে পালিয়ে যেতে পারবে না।
আমি অবাক হয়ে বললাম, তার মানে?
রোবোম্যান বললো, তোমরা আমাদের টেরিটরিতে প্রবেশ করার সাথে সাথেই তোমাদের আমরা আটকে ফেলেছি। আমরা আগে থেকেই জানি তোমরা খুবই দুঃসাহসী অভিযাত্রী। তাছাড়া তরুণ বিজ্ঞানী হিসেবে তোমার মামার বেশ সুনাম আছে। তাকে আমাদের খুবই প্রয়োজন।
আমি খানিকটা ভয় পেয়ে বললাম, কিন্তু আমাদের দিয়ে তোমরা কী কাজ করাবে। তাছাড়া আমি তো একজন কিশোর মাত্র। পড়ালেখাই শেষ করিনি। তবে বিজ্ঞানের ছাত্র বলে মামার সাথে আমি প্রায়ই বিভিন্ন খনিতে অভিযানে অংশগ্রহণ করি মাত্র।
রোবোম্যান বললো, বেশ বেশ এবার থেমে যাও। আমাদের সময় নষ্ট করো না। এখানে তোমাদের ওপর কোনো অবিচার করা হবে না। সব রকমের নিরাপত্তা, আরাম আয়েশ আর খাবার-দাবার পাবে। আর আমাদের গবেষণায় সাহায্য করবে। আমরা যখন বুঝবো, তোমরা আমাদের মতো মেটালিক হয়ে গেছো এবং আমাদের বিশ্বাসভাজন হয়ে উঠেছো কেবলমাত্র সেদিনই আবার পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারবে।
এবার আমি আরও ভড়কে গিয়ে বললাম, পৃথিবীতে ফিরে যাবো মানে! আমরা তাহলে এখন কোথায়।
রোবোম্যান বললো, যখনই তোমরা খনির আকরিক স্তরে প্রবেশ করেছো অমনি এক অদৃশ্য এলিভেটরের আকর্ষণে পৃথিবী থেকে ত্রিশ লক্ষ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আমাদের রিসোলেটিং প্রভিন্সের ডিজিল্যান্ডের এই সুসজ্জিত ল্যাবে চলে এসেছো।
আমি আকুতির সাথে বললাম, কিন্তু আমার আম্মু-আব্বু তো খুব পেরেশান হবেন। তারা পুলিশে খবর দেবেন। আমাদের না পেয়ে কেঁদে কেঁদে পয়মাল হয়ে যাবেন।
রোবোম্যান মুখে চুক চুক আওয়াজ তুলে বললো, সে ভাবনা তোমার নেই। আমরা অলরেডি তোমার এবং তোমার মামার আদলে এমন দুজন রোবোকিউম্যান তোমাদের পরিবারে পাঠিয়ে দিয়েছি, তাদের দেখে কেউ ধারণাই করতে পারবে না- তারা নকল কেউ।
সাদিতের কথা শুনতে শুনতে মামা ধৈর্যহারা হয়ে বললেন- স্বপ্নের ঘোরে কতো আজগুবি সব দেখেছিস। এবার দয়া করে থেমে যা। ভালো মতো ফ্রেশ হয়ে আয়।
মামার কথায় সাদিত দমে যায় না। ও জোর গলায় বলতে থাকে- আহা! মামা! শোনোই না। আমি তো রোবোম্যানের কথায় প্রায় সম্মোহিত হয়ে পড়েছি। অমনি আরেকজন এসে তাকে ইশারায় বিদায় জানিয়ে বললেন, শোনো হে বালক! তোমার হাতের লোহার বারটি তোমাকেই দিয়ে দেয়া হলো। তবে লোহা সম্পর্কে কিছু তত্ত্ব কথা মনে রেখো। তুমি হয় লোহা সম্পর্কে খুব বেশি জানো না। কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে লোহা বা লোহাজাত দ্রব্যের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। তোমাদের মানব সভ্যতায়ও এর অবদান অপরিসীম। তথ্য-প্রযুক্তির বিস্ফোরণের এই যুগেও এর মৌলটির আবেদন এতটুকু কমেনি। বরং বেড়েছে হাজার গুণ।
সমাজের সর্বত্র দৃশ্যমান লেজার রশ্মির উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ নিয়ে তুমি ভেবেছো কি? যেমন ধরো- এই বস্তুটি কোত্থেকে এলো? কিভাবে আজকের এই অবস্থায় পৌঁছল? আর আমাদের বিজ্ঞানময় মহাগ্রন্থ আল কুরআনে লোহা সম্পর্কে কিছু বলা হয়েছে কিনা? বা বলা হলেও কি বলা হয়েছে? ইত্যাদি। মানব জীবনের অতি পরিচিত এই মৌলটি নিয়ে কুরআন ও বিজ্ঞান কি বলছে সে সম্পর্কে আলোচনা করবো।
তার কথায় আমি অবাক হয়ে বললাম, আপনি আল কুরআনের কথা বলছেন! কিন্তু আপনি তো মানুষ নন।
তিনি মুচকি হেসে বললেন, না আমরা মানুষ নই। তবে কুরআন মেনেই চলি। আমাদের সে আসল পরিচয়টুকু তোমাকে পরে বলবো। তুমি যে কুরআন তেলাওয়াত শুনতে পাচ্ছিলে তা তোমার মামা পাঠ করছিলেন বটে। কিন্তু তার যে তরজমা তুমি শুনতে পাচ্ছিলে তা অদৃশ্য থেকে আমিই বলে যাচ্ছিলাম। যাক সে কথা। এখন লোহার আসল পরিচয়টা তোমার জানা দরকার। লোহা একটি মৌল বা মৌলিক পদার্থ। রাসায়নিক বিজ্ঞানে এর সঙ্কেত এফ-ই। শতাধিক মৌল ও ধাতুর মধ্যে প্রাচুর্যের দিক থেকে প্রকৃতিতে অ্যালুমিনিয়ামের পরই লোহার অবস্থান। তবে তোমাদের পৃথিবীর একদম মধ্যবর্তী স্থানটি অর্থাৎ পৃথিবীর কেন্দ্র লোহার তৈরি। সে হিসেবে পৃথিবীতে লোহার পরিমাণই সবচেয়ে বেশি। যদিও খাঁটি লোহা প্রকৃতিতে বিরল।
আর তোমাদের মাঝে এক শ্রেণির মানুষ মনে করেন লোহার কোনো বিশেষত্ব নেই। এটি অন্যান্য পদার্থের মতো স্বাভাবিকভাবেই পৃথিবীতে সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। সত্যি কথাটা হলো- পৃথিবী তো দূরের কথা খোদ সৌরজগতের কোনো গ্রহ-নক্ষত্রেও লোহার একটি অণু বা পরমাণু সৃষ্টি হওয়া সম্ভব নয়। আসলে এটির উৎপত্তি পৃথিবীতে নয়, আসমানে।
এবার আর সাদিতের কথায় আপ্লুত না হয়ে পারলেন না মামা। তিনি মুখ খুললেন- ভেরি ইন্টারেস্টিং। তারপর তিনি আর কী বললেন রে?
– কি বললেন সেকি আর তুমি শুনতে দিলে। চিল্লাপাল্লা করে আমার ঘুম ভাঙিয়েই ছাড়লে।
– আরে হাদারাম! এবার তো বুঝলি, আসলেই তুই স্বপ্নের মাঝে সবকিছু একেবারে গুমলেট করে ফেলেছিস, হা: হা: হা:।
মামার উপহাসে এবার সাদিত রীতিমত ক্ষেপে যায়। ও দ্রুত শোবার ঘরে ছুটে গিয়ে প্রায় দেড় কেজি ওজনের একটা চকচকে লোহার বার এনে মামার প্রায় নাকের সামনে তুলে ধরে বলে- তাহলে এটা কি?
চকচকে লোহার বারটা দেখে মামার তো খাবি খাবার দশা। তিনি গোল্লা গোল্লা চোখ করে ঢোক গিলতে গিলতে শুকনো কণ্ঠে বললেন- এ্যাঁ! এটা তুই পেলি কোথায়!!

SHARE

Leave a Reply