Home গল্প শাওনের গল্প লেখা -আহসান হাবিব বুলবুুল

শাওনের গল্প লেখা -আহসান হাবিব বুলবুুল

ছোট মামা গ্রাম থেকে এসেছেন। শাওন বেশ ফুর্তিতে আছে। বিকেলে ওর বন্ধুরা আসে। অন্ত, রুমী ও পবন। ওরা পাশের বাসার। বাড়ির সামনে এক চিলতে প্রাঙ্গণে কাঁঠাল গাছের নিচে খেলছে ওরা। শাওন মাতিয়ে তোলে সবাইকে। মামা ড্রয়িং রুমের বেলকুনিতে বসে বই পড়ছেন। মাঝে মধ্যে ভাগ্নের অদ্ভুত ধরনের খেলাও দেখছেন। বইয়ের বিষয়বস্তুর চেয়ে শাওনের খেলাটাই বেশি মনোযোগ কাড়ে মামার।
শাওনের মামার নাম সৈয়দ শাহীন তারেক। তিনি একজন স্কুল টিচার। নতুন জয়েন করেছেন। সিরাজগঞ্জ জেলা স্কুলে। এডুকেশন সাইকোলজির ওপর গ্র্যাজুয়েশন করেছেন তিনি। শিশু শিক্ষা মনস্তত্ত্ব বিষয়ে তাঁর লেখালেখি আছে। তিনি ভাবছেন শাওনদের খেলাটা কী হতে পারে।- “ছোটবেলায় আমরা চোর-পুলিশ খেলেছি। যে পুলিশ হতো, সে চোর খুঁজে বের করত। সে রকম কিছু মনে হচ্ছে না। তবে খেলাটা কী? …. ছোটখাটো একটা জনসভার মতোই মনে হচ্ছে। একজন বক্তৃতা করছে। বক্তা কথার চেয়ে হাত ছোড়াছুড়িই বেশি করছে। হঠাৎ হট্টগোল। ছোটাছুটি! শাওন রঙিন কাগজের চারকোনা প্যাকেটের মতো একটা বস্তু হাতে নিয়ে ছবি তোলার ভঙ্গিতে ক্লিক-ক্লিক করছে।”
মামার আর বুঝতে বাকি থাকে না খেলাটি কি। মামা মিষ্টি মিষ্টি হাসেন। খুব উপভোগ করেন ওদের খেলা। শাওনরা ঢাকায় থাকে। ওর বাবা মাহবুব জামান একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। শাওনের মামা আসার খবর পেয়ে তিনি আজ একটু আগেই বাসায় ফিরেছেন। সন্ধ্যার পর ছোট মামাকে নিয়ে মেতেছে শাওন আর রুমকী। দু’ভাইবোন ওরা। রুমকী ছোট। কেজি স্কুলে স্ট্যান্ডার্ড ওয়ানে পড়ে। শাওন স্ট্যান্ডার্ড ফোর-এ এবার ফার্স্ট হয়েছে।
মামা তাই শাওনকে একটি দামি কলম গিফট করেছেন। শাহীন সাহেবের ঢাকা আসার উপলক্ষের কথা বলা হয়নি। এবার একুশে বইমেলায় শাহীন সাহেবের লেখা বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হবে। এটি তার লেখা প্রথম বই। শিশু শিক্ষা মনস্তত্ত্বের উপর লেখা। তাই শাহীন সাহেব যেমন আনন্দে আছেন। তেমনি বাড়ির সবাই- আপা, দুলাভাই, ভাগ্নে-ভাগ্নি তাঁকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত। সেদিন সবাই যাবে বইমেলায়। বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে অংশ নিবে। গল্পের আসরে আব্বু আম্মুও এসে যোগ দেন।
আম্মু এসো, আব্বু এসো, মামা গল্প বলবেনÑরুমকী এভাবেই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। শাওন বলে, মামা! গল্প পরে হবে। আজ আমি তোমাকে ইন্টারভিউ করবো। মামা বলেন, তাতো দেখেই বুঝেছি। তখন সাংবাদিক-সাংবাদিক খেলছিলে না! জি মামা। কেমন করে বুঝলেন? তোমার অ্যাকটিং দেখেই বুঝেছি। শাওন! এবার তোমার ইন্টারভিউটা শুরু করো।
: মামা জানো! আমার না সব হতে ইচ্ছে করে। টেলিভিশনে যখন গান শুনি তখন খুব গাইতে ইচ্ছে করে। আর্ট গ্যালারিতে যখন প্রদর্শনী দেখতে যাই তখন বড় শিল্পী হতে ইচ্ছে করে। মিডিয়ায় চাঞ্চল্যকর রিপোর্টিংগুলো দেখলে আবার সাংবাদিক হতে ইচ্ছে করে। আর বিশ্বকাপ ক্রিকেট আসলে তো আর কথাই নেই। এমনটা হয় কেন?
: সব মানুষের মধ্যে কমবেশি সৃজনশীলতা থাকে। তাই ইচ্ছেগুলো এভাবে উঁকি দেয়। তারপর বয়সের একটি পর্যায়ে সে তার লক্ষ্য স্থির করে নেয়। এবং সেই বিষয়ে পারদর্শী হয়ে ওঠে। তুমিও দেখবে, একসময় তোমার সবচেয়ে পছন্দের বিষয়টি বেছে নিতে পারবে।
: আচ্ছা মামা! তুমি তো একজন লেখক। তোমার বই প্রকাশ হয়েছে। আমি লেখক হতে চাই। আমাকে কী করতে হবে।
: তুমি লিখবে? তাহলে তোমাকে প্রচুর পড়তে হবে। লিখতে পারার ভেতর একটা অনাবিল আনন্দ আছে। এই আনন্দটাই তোমার কাম্য। তোমাকে পড়ার মাঝে প্রচুর আনন্দ খুঁজে পেতে হবে। বই মানুষকে জ্ঞান দেয়। বই মানুষকে যোগ্য করে তোলে। পড়তে পড়তে দেখবে তোমার ভেতর এক নতুন ভুবনের সৃষ্টি হয়েছে। খন্ড খন্ড অনুভূতি ভাবনার ঢেউ তুলে তোমায় আচ্ছন্ন করছে। তুমি তখন মনের অজান্তে দু’কলম লিখে ফেলতে পারবে। বিখ্যাত লেখক টলস্টয় মনে করতেন, লেখাটা কেবলমাত্র প্রতিভার ব্যাপারই নয়; বরং অন্য যে জিনিসটি তুমি করতে চাও তারই মতো অনুশীলনের বিষয়। টলস্টয় তার একটি লেখাকে বার বার সংশোধন করতেন। ক্রমাগত অনুশীলনের মাধ্যমে তিনি তার চিন্তাকে কাগজ-কলমে রূপ দিতেন। তিনি বলেছেন, জীবনে তিনটি বস্তুই বিশেষভাবে প্রয়োজন, তা হচ্ছে বই, বই এবং বই। আজকাল ছেলে-মেয়েরা কম্পিউটার, মোবাইল ও ইন্টারনেট নিয়েই ব্যস্ত থাকে। তাদের বই পড়ার সময় কোথায়। কিন্তু তুমি যদি লেখক হতে চাও তবে তোমাকে পড়তে হবে।
: কী পড়বো?
: পাঠ্যপুস্তক তো পড়বেই। এর বাইরে গল্প-কবিতা উপন্যাস নাটক, ইতিহাস বিজ্ঞান ভূগোল সব পড়বে। নিয়মিত পত্রপত্রিকা পড়বে। ইন্টারনেটেও বই পড়ার সুযোগ রয়েছে। আমার একজন শিক্ষক কী বলতেন জানো! উনি যেদিন পড়ার কিছু না পেতেন, সেদিন হাতের কাছের পঞ্জিকাটাই নিয়ে পড়তেন। পাঠ্যপুস্তকের বাইরে অতিরিক্ত পড়াশোনার জন্য তোমাকে একটা সময় বের করে নিতে হবে। যাতে স্কুলের লেখাপড়ার ক্ষতি না হয় কেমন!
এসব গল্প হচ্ছে বুঝি!-
রুমকীর মৃদু শাসনে নড়েচড়ে বসে ওরা। আম্মু আশ্বস্ত করেন রুমকীকে। ঘুমানোর সময় মজার গল্প বলা হবে তোমাকে এখন লেখাপড়ার কথাই শোনা যাক।
: মামা! এবার একুশের বইমেলায় তোমার বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হবে-এখন তোমার কেমন লাগছে?
: সব সৃষ্টিরই একটা সুখ আছে। কবি নজরুল ইসলাম বলেছেন, সৃষ্টি সুখের উল্লাসে…। যখন গল্প কবিতা বা বই প্রকাশ পায়, তখন সব লেখকেরই ভালো লাগে। আমারও খুব ভালো লাগছে। নিজেকে গর্বিত মনে হচ্ছে।
: মামা! তুমি কি তোমার ছাত্রদের পেটাও। আজকাল খবরের কাগজে দেখা যাচ্ছে, শিক্ষক ছাত্রদের বেদম প্রহার করছে। আহত ছাত্রকে হাসপাতালে চিকিৎসা পর্যন্ত নিতে হয়েছে। এটা কি ঠিক।
: এটা মোটেও ঠিক না। শিক্ষা দানের জ্ঞানের অভাবে দু’ একজন শিক্ষক এমনটা করছেন। দুষ্ট প্রকৃতির ছাত্রদের প্রহার না করে তাদের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। অভিভাবককে ডাকা যেতে পারে। শিক্ষকদের উচিত ছাত্রদের জ্ঞান অর্জনের প্রতি অনুরাগী করে তোলা। লেখাপড়ার মাঝে যে একটা অনাবিল আনন্দ আছে সেটা খুঁজে পেতে শিক্ষার্থীদের সাহায্য করা।
Ñএবার মামা-ভাগ্নের আড্ডায় আব্বু অংশ নেন। মাহবুব সাহেব বলেন, ‘তোমাদের সবার জন্য একটা আনন্দের খবর আছে।’ সবাই উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। সবার দৃষ্টি তাঁর প্রতি। কী সেই খবর।
: তোমরা হয়ত সবাই জেনে থাকবে সম্প্রতি আমাদের মহামান্য হাইকোর্ট শিশুদের জন্য শরীরের ওজনের দশ শতাংশের বেশি ভারী স্কুলব্যাগ বহনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আইন করতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন। এখন থেকে শিশুরা আর ভারী ব্যাগ বহন করবে না।
Ñরুমকী ও শাওন খবরটা শুনে খুব খুশি হয়।
গল্পে গল্পে সময় কেটে যায়। ওদিকে রাতের খাবারের ডাক পড়ে। রুমকী ওঠে পড়ে। মামা চল খেতে চল। তোমাদের এসব গল্প আমার মোটেও ভালো লাগলো না। শুধু বাবার খবরটা ভালো লাগলো। এখন থেকে আমাকে আর এত এত বই নিয়ে স্কুলে যেতে হবে না।
দেখতে দেখতে সেই শুভ সময়টি এসে গেল। আজ ১ ফেব্রুয়ারি। একুশে বইমেলার উদ্বোধন। আজই মামার বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হবে। মেলার নজরুল মঞ্চে অনুষ্ঠান।
শাওন ও রুমকী মামা এবং বাবা-মাকে নিয়ে দুপুরের পর পরই মেলায় গিয়ে উপস্থিত হলো।
দীপ্ত প্রকাশনীর বর্ণাঢ্য আয়োজন। তারা দশজন লেখকের বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করবে। তাদের মধ্যে সৈয়দ শাহীন তারেক অন্যতম। শাওন-রুমকীর মনে আনন্দ আর ধরে না। তাদের মামা সংবর্ধিত হবে। অনুষ্ঠান শুরু হলো। প্রধান অতিথি লেখকদের হাতে হাতে বই তুলে দিলেন। অনেক অনেক করতালি পড়লো। রজনীগন্ধা আর গোলাপের সৌরভে সংবর্ধিত হলেন লেখকরা। তারপর সবাই মেলা ঘুরে ঘুরে বেড়ালো। মামা শাওন ও রুমকীকে বই কিনে উপহার দিলেন।
– সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করে বাসায় ফিরলো ওরা।
রাতে শুয়ে শুয়ে শাওন ভাবে মামাকে ও একটা সারপ্রাইজ দিবে। আজকের অনুষ্ঠানমালার একটা বর্ণাঢ্য চিত্র ‘ও’ মনে মনে এঁকে নেয়।
গত এক মাসে শাওন প্রতিদিন একটু একটু করে লেখে। একুশে বইমেলায় মামার বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের ঘটনা প্রবাহ অনুষ্ঠানমালার চিত্র একটা গল্পে রূপ দেয়ার চেষ্টা করে। অনেক ঘষামাজা আর যতেœর পর একটা গল্প দাঁড় করা ‘ও’।
শাওন লেখাটি একটি জাতীয় দৈনিকের শিশুদের পাতায় পাঠিয়ে দেয়, ছাপানোর জন্য।
বসন্তকাল। ভোরের মৃদুমন্দ হাওয়ায় ঘরের দরজার পর্দাটা দুলছে। দু’টি চড়ুই পাখি ঘরের ভেন্টিলেটারে কিচির-মিচির শব্দ তুলছে। শাহীন সাহেব চা’র টেবিলে পত্রিকা পড়ছেন। পাতা উল্টাতে গিয়ে শিশুদের বিভাগ ‘পাতা বাহার’-এ চোখ আটকে যায়। ছোট্ট একটি লেখা। শিরোনাম ‘মামার হাতে রজনীগন্ধা’ লিখেছে, শাওন আহমেদ।
মামার বিস্ময় আর কাটে না। এতো তারই বইমেলার কাহিনী। ভাগ্নে শাবাশ! শাওন সোনা সত্যি তুমি বড় লেখক-সাংবাদিক হবে। দেশ ও জাতির কল্যাণ করবে।

SHARE

Leave a Reply