Home তোমাদের গল্প পরীক্ষা -হিমেল রহমান

পরীক্ষা -হিমেল রহমান

ওর নাম ছিলো নাঈম। বড়লোক বাবার একমাত্র ছেলে। স্বভাবতই প্রয়োজনাধিক টাকা নিয়ে ঘুরে বেড়াতো। এ জন্য তাজা ফুলের চারপাশে মধুপিপাসী মৌমাছির মতোই ওর চারপাশেও সবসময় অর্ধক্লাসের ছেলেমেয়েদের উপস্থিতি থাকতো। ব্যতিক্রম বলতে গেলে হয়তো আমি ছিলাম, কারণ ওকে দেখলে ছুটে কাছে যাওয়ার চাইতে যতটা সম্ভব দূরত্ব বজায় রাখতাম। বড্ড রাগ আর হিংসা ছিলো ওর প্রতি, তবে কখনো প্রকাশ করতাম না।
এ অপ্রকাশিত হিংসা গড়ে উঠেছিলে তিন বছর ধরে। বাবার বদলির সুবাদে পুরনো স্কুল ছেড়ে নতুন স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম অষ্টম শ্রেণীতে। আর তখন যে বাসায় আমরা থাকতাম, ওটা নাঈমদের ছিলো। ভাড়া বাসা হলেও ওদের পরিবারের সাথে আমাদের সম্পর্ক ছিল আত্মীয়র মতোই। একদিন দুপুরে ছাদে বসে ছবি আঁকছিলাম। রঙতুলির নাচানাচিতে আমি পাকা নই, তবু ভালো লাগতো। এর মাঝেই ছাদের দরজায় সোজা হয়ে একটি ছেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। বয়স আমার মতোই হবে। মুখ হাসি হাসি আর প্যান্টের পকেটে দুই হাত ঢুকিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো। নীল রঙের একটা টি-শার্ট আর একটা জিন্স পরা। সুন্দর লাগছিলো, তবে সুন্দরের প্রতি আমার হিংসা হয় তো জন্ম থেকেই। মুখ ঘুরিয়ে আমি আঁকায় মনোযোগ দিলাম। একটু পর আমার কাঁধে একটা গরম নিঃশ্বাস অনুভূত হচ্ছিলো। ঝট করে পেছনে তাকিয়ে দেখি ছেলেটা খানিকটা ঝুঁকে বেশ মনোযোগ দিয়ে আমার আঁকা দেখছে। চোখাচোখিতে বিব্রত হয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো, মুখে তখনো হাসি ছিলো। আমি তখন বিরক্ত, আধঘন্টা ধরে চেষ্টার পরও একটা মানুষের মুখ আঁকতে পারছিলাম না। কিছু বলার আগেই ছেলেটা মুখ খুললো।
– কেমন আছেন?
– ভালো (একান্ত অনিচ্ছায় উত্তর দিলাম)
– আমার নাম নাঈম।
– ও তাই!
– এটা আমাদের বাসা।
– ও।
– আমি কি তোমাকে সাহায্য করবো?
এটা বলে আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই আমার পাশে বসে পড়লো। আঁকতে শুরু করল পেন্সিল দিয়ে। আমি বিরক্ত হয়ে অন্য দিকে মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করছিলাম। দশ মিনিটের মাথায় আমার দিকে একটা কাগজ এগিয়ে দেয় সে, একটা মানুষের হাসি মুখের পেন্সিল স্ক্যাচ। কাগজটা হাতে নিয়ে আমি চোখগুলো রসগোল্লার মতো করে তাকিয়ে ছিলাম।
‘যদি তোমার ভালো লাগে তাহলে আমি আরও এঁকে দেবো। আর আমার ঘরে এসো রাতে, অনেক স্ক্যাচ আছে। আমার তো কোন বন্ধু নেই, তোমাকেই দেবো।’ বলতে বলতে চলে গেল সে। কিছু বলতে পারিনি, আমাদের পরিচয় এভাবেই। সাহায্যের শুরুটা ও-ই করেছিলো, ব্যস এর পর থেকে নিজের দখলেই রেখেছিলো। সেদিন রাতে ওর ঘরে যাইনি। আমি ভিক্ষুক নই যে ও দিতে বললো আর আমি নিতে যাবো। বরং যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। পরদিন সকালে আমার টেবিলে অনেক পেন্সিল স্ক্যাচ আবিষ্কার করলাম। সবার উপরে যেটা ছিলো সেটা আমারই অবয়ব, রাত জেগে করেছে হয়তো। কারণ দিনে আমাদের আর দেখা হয়নি। যাই হোক সেদিনের পর থেকে খানিকটা দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম। তার পর একসাথে স্কুল যাওয়া, বিকেলে ছাদের কোনায় বসে ছবি আঁকা, কম্পিউটারে গেম খেলা, একজন আরেকজনের জীবনের মজার ঘটনা বলা চলতে লাগলো। স্কুলে যাওয়ার পথে একটা তালগাছের সামনে দেখতাম একটা লোক আপনা আপনি কথা বলছে, আমরা দু’জনে অবাক হয়ে দেখতাম। লোকটাকে সবাই পাগল বলে, কিন্তু লোকটা বেশ গোছালো ছিলো। এমন কাউকে আপন মনে বিড়বিড় করতে দেখতে অবাক হবারই কথা, তাও নাকি লোকটা গাছের সাথে কথা বলতো!
প্রতিদিন কোন না কোন গিফট দিত নাঈম, কম করে হলে একটা পেন্সিল বা চকোলেট। আমার জন্য ছবি আঁকত নাঈম। ওর ছবিগুলোতে আমি দেখেছি দৃষ্টিহীন মেয়ে, বৃদ্ধ। ও আমাকে জিজ্ঞেস করত অন্ধ হলে কেমন দেখায়, আমি চুপ থাকতাম। ওর এমন প্রশ্নের কারণ কখনো খুঁজে দেখিনি, প্রয়োজন পড়েনি। মাঝে একবার ভুল করে আমার কালারবক্সটা ছাদ থেকে পড়ে গিয়েছিলো, ওর হাত থেকে সোজা ফ্ল্যাটের পাশের ড্রেনে। ওর সুন্দর মুখটা গোলাপি রঙ ধারণ করেছিলো, হয়তো সমবেদনায়। তার প্রায় দু-তিন দিন পর ক্লাস ব্রেকে বসে ছিলাম স্কুলের বারান্দায়। কখন যে নাঈম পেছনে এসে দাঁড়ালো বুঝতে পারিনি। যখন ওকে দেখলাম তখন ‘এটা তোর জন্য’ বলে একটা কালার বক্স এগিয়ে দিয়েছিল ও। চোখে মুখে রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম ওর দিকে। ওহ মাথা নিচু করে বললো, ‘স্যরি হিমেল, আমি ইচ্ছে করে তোমার পেন্সিল নষ্ট করিনি।’ ততক্ষণে হয়তো আমার চোখে নোনাজল চলে এসেছিলো, কারণ বুকের একপাশে চিনচিন ব্যথা আর চোখ দুটো ঘোলাটে লাগছিলো। বাম হাতে আমার বাহুতে চাপড়ে দিয়ে বুকে টেনে নিয়েছিলো সে। মুখে কিঞ্চিৎ হাসিভাব ফুটিয়ে ক্লাসের দিকে নিয়ে চললো আমাকে, ততক্ষণেও কিছু বলা হয়নি ওকে। ততদিনে আমাদের বন্ধুত্ব গভীর, অনেকটা। নবম শ্রেণীর পরীক্ষা দিলাম, দশম শ্রেণীতে প্রিটেস্টও শেষ। ওর প্রতি আমার আর কখনো রাগ হয়নি, প্রচন্ড ভালোবাসতাম ওকে। মিথ্যা বললাম, কারণ আমার হিংসাত্মক মনে আবার উদয় হয়েছিল ভয়ঙ্কর ক্রোধের। প্রতিটি পরীক্ষায় ওর ক্রমাগত এগিয়ে যাওয়া, ওর প্রতি আমার বাবা-মায়ের আদর আমি মন থেকে মেনে নিতে পারছিলাম না। কিন্তু বন্ধুত্বের শিকলে আমি বাঁধা ছিলাম। আমি পারিনি প্রথম হতে, ও সবসময় আমাকে পেছনে ফেলতো। দূরত্ব আবার বাড়তে লাগলো। ভুল বললাম, দূরত্ব আমি-ই বাড়াচ্ছিলাম। এড়িয়ে চলতে লাগলাম ওকে। ওর সাফল্যের দ্যুতিটা আমার চামড়ায় স্ফুলিঙ্গের মতো মনে হতো।
একদিন হঠাৎ করে, যেমনটা আমি চাইতাম তেমন নয় তার চেয়েও ভয়ানক কিছু ঘটলো। আমার অজান্তে আমি পুড়ে যাচ্ছিলাম, আমার পৃথিবীটা অন্ধকার মনে হচ্ছিলো। প্রশান্তি পাচ্ছিলাম না আমি। কারণ আমার সামনে যে দৃষ্টিহীন হয়ে চলতে হবে আমার বন্ধুকে। না বন্ধু নয়, আমার প্রতিদ্বন্দ্বী। কালো ফ্রেমের চশমাতে নাঈমকে অনেক সুন্দর লাগত, কিন্তু কালো পৃথিবীতে নয়। কখনো বুঝতে পারিনি নাঈমের এমন বন্ধুভাব, হাসিমুখ আর আলোকোজ্জ্বল দেহটা শিগিরই অন্ধকারে ডুবে যাবে। তাই যখন ওকে সবাই হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলো, আমি তখন যাইনি। দু’চোখের কর্নিয়া লোপে হঠাৎ করে এবং অভিশাপের মতো দৃষ্টি হারায় নাঈম। আমার হয় তো কষ্ট হচ্ছিলো, খানিকটা অভিমানও হয় তো জন্মেছিলো। তারপর আমাদের মেট্রিক পরীক্ষা এগিয়ে এসেছিলো। আমি পড়তাম, কিন্তু মনোযোগ দিতে পারতাম না। নাঈমের হাসিমুখটা মনে পড়তো। দেখতাম অসহায়ের মতো নাঈম বসে থাকতো। ওর চোখ দুটো তখনো যেন দ্যুতি ছড়াচ্ছিলো। দরজায় আমার উপস্থিতি টের পেত নাঈম, হয় তো আমার প্রতিটি পদক্ষেপ ওর চোখে আঁকা ছিলো। দরজার সামনে গেলে আমাকে ডাকত ‘হিমেল আসবি? তোর সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে।’ কখনো যেতাম, কখনো চুপ করে চলে আসতাম। তারপর একদিন আমার জন্য সুযোগ এলো প্রথম হবার, ওকে পেছনে ফেলার। হ্যাঁ আমি মেতে উঠেছিলাম জেতার নেশায়। নাঈম পরীক্ষা দিতে চাচ্ছিলো, ওর প্রয়োজন হলো শ্রুতি লেখকের। আমি সুযোগ পেলাম, এবার তুই আর পারবি না আমাকে টপকাতে নাঈম। তোরে এবার পরাজয় বরণ করতেই হবে। আমি জোগাড় করে দিলাম শ্রুতি লেখক।
পরীক্ষা হলো, আর নাঈম পরীক্ষা দিলো তবে শুধুই হারার জন্য। হ্যাঁ আমি ওকে হারতে বাধ্য করেছি। শ্রুতি লেখক সাহায্য করেছিলো। তবে নাঈমকে নয়, আমাকে। আমার কথা মতোই নাঈমের খাতায় লেখা হয়েছিলো। কী করেছি আমি জানি না, তবে আমার ভালোর জন্যই করেছিলাম। এরপর আমার পরম স্বস্তি পাওয়ার কথা ছিলো, কিন্তু পাচ্ছিলাম না। ও জিতেও আমাকে পীড়া দিচ্ছিলো, আর ওর হারার অগ্রিম বার্তা আমার জন্য অপরাধবোধ বয়ে আনছিলো। রেজাল্ট বের হলো, আমি জানতাম কী হবে। তবে অপেক্ষা করছিলাম নিজ কানে ওর সর্বনাশের কথা, ওর হারার গল্প শোনার জন্য। হ্যাঁ আমি প্রথম হয়েছি। আর ফেল করেছে নাঈম। আমি অট্টহাসিতে ফেটে পড়তে চাচ্ছিলাম, কিন্তু পারছিলাম না। কষ্ট হচ্ছিলো। নাঈমকে ঠকিয়েছি আমি, ওর বন্ধুত্বের বিশ্বাসের বন্ধনে ফাটল ধরিয়েছি আমি। ও কখনো এটা করত না। জানতাম ও দেখতে পায় না, তবু ওর সামনে যেতে ভয় করত আমার। ছোট মনে হতো নিজেকে, ওর দৃষ্টিহীন চোখে চোখ মেলাতে আমার লজ্জা হচ্ছিলো। এমনি একদিন দরজায় গিয়ে দাঁড়ালাম। ওর দিকে তাকাতেই ও আমাকে ডাকলো। মনের চোখ দিয়ে দেখেছে হয় তো !
ওর সামনে গিয়ে বসলাম, ওর হাতে আমার মুখাবয়ব পেন্সিল স্ক্যাচটা। ও কি তাহলে আমাকে দেখছিলো? তবে কিভাবে?
‘আমি জানি তুই আমাকে কত ভালোবাসিস। এভাবে হঠাৎ করে আমার হারিয়ে যাওয়া তোকে অনেক কষ্ট দেয়, তাই না? জানিস প্রতিবার আমি যখন প্রথম হতাম তখন তোর চাপা অভিমান বুঝতাম। কিন্তু আমি তো জানতাম আমি বেশিদিন তোর সাথে থাকব না, তাই তোকে অনেক বড় সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছি। অপেক্ষা করতে হয়েছে তোর, স্যরি রে। আমি জানতাম পরীক্ষা আমার ভালো হবে না, আর আমি তো পরীক্ষা দিয়েছি শুধু তোর জন্য। ইচ্ছে করে ভুল বলতাম আর শ্রুতি লেখক তা-ই লিখতো। আমি শ্রুতি লেখককে বলেছি যাতে খুব কম আর ভুল লেখে। আমি চেয়েছি তুই অনেক ভালো করে পড়বি, আর তোর এগিয়ে যাওয়ার রাস্তাটা সুগম করতে সাহায্য করলাম আমিও। তুই অনেক কষ্ট করে পড়াশুনা করেছিস তাই না রে? নিশ্চয়ই ভেবেছিস, ভালো করে না পড়লে এবারও নাঈম প্রথম হবে। কথাগুলো তোকে এখন বলছি কারণ আমরা কানাডা চলে যাচ্ছি। আমি পরীক্ষায় খারাপ করেছি ভেবে তুই যাতে কষ্ট না পাস সে জন্য বলছি। আমার অন্ধকার জীবনে এই রেজাল্ট দিয়ে কী হবে বল? তুই-ই আমার গৌরব নিয়ে এগিয়ে যাস। আর মনে রাখবি তো আমাকে? আমি কিন্তু কানাডা থেকে প্রতিদিন তোকে ফোন করবো।’
আমার চোখ ততক্ষণে ভিজে গেছে, বুকের পাশে প্রচন্ড ব্যথা হচ্ছিলো। নাঈম নিজেই সব ঠিক করে নিয়েছে, আর আমি কী করলাম! ও ঠিকই আবার প্রথম হলো বন্ধুত্বের পরীক্ষায়, আমি আবারও হেরে গেলাম। নাঈমের কাছে কখনোই আমি জিততে পারিনি। 

SHARE

Leave a Reply