Home ফিচার সাতকড়ার হাতছানি -আবদাল মাহবুব কোরেশী

সাতকড়ার হাতছানি -আবদাল মাহবুব কোরেশী

প্রকৃতির রূপসী রূপলাবণ্য আর চিরাচরিত সবুজে ঘেরা আমাদের দেশ। মহান মাবুদের রহমত আর নিয়ামতে পরিপূর্ণ দেশটিতে যেমন আছে জালের মতো হাজার নদী, তেমনি আছে আকাশছোঁয়া উঁচু উঁচু পাহাড়-টিলা আর নানা প্রজাতির গাছ-গাছালি। সময়ে সময়ে একেক রকম একেক বর্ণের ফল-মূল নিয়ে আমাদের কাছে হাজির হয় আম, জাম, কাঁঠালসহ নানান ধরনের ফল। ভিন্ন স্বাদে টইটম্বুর এসব ফল খেতে আমরা কত না আনন্দ পাই। এ বাগান ও বাগান বা বাড়ির উঠোনের কাছে দাদুর হাতের লাগানো গাছে ধরে কামরাঙ্গা, জাম্বুরা, পেয়ারা লিচু ইত্যাদি। এসব ফল খেতে ভাইবোনদের সে কি আনন্দ, তা কি ভোলা যায়? আবার কখনো কখনো মনকষাকষি, হৈ-হুল্লোড়, মান-অভিমান, মনোমালিন্য যার প্রতিটি কারণে বাবার চোখ রাঙানোÑ এ সবই যেন এক অমৃত স্বাদ ঠিক রসালো কোন এক ফলের রসের মতো। বন্ধুরা এ রকম একটি ফল নিয়েই আজ তোমাদের সাথে আমার যতো আয়োজন। কী? তোমরা তৈরি আছো তো? প্রচারবিমুখ এ ফলটি স্বাদে গন্ধে অতুলনীয় হলেও তা অন্য ফল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। বলতে পারি ভিন্ন স্বাদের এ ফলটির নামের সাথে অনেকেই পরিচিত নন। কী? ফলটির নাম জানতে মনটা খুব ছটফট করছে বুঝি। হ্যাঁ। ফলটির নাম সাতকড়া। এটি একটি ঐতিহ্যবাহী কমলালেবু বা জাম্বুরা সদৃশ টক ফল। ফলটি অন্যান্য ফলের মতো খাওয়া যায় না। খেতে হয় তরকারি করে এক বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করে। মজা করে ভাতের সাথে বা আচার করে। যাকগে, আর দেরি নয় বন্ধুরা। এসো জেনে নিই, সাতকড়া ফল সম্বন্ধে না জানা অনেক কথা।
সাতকড়া ফলের পরিচয় : সাতকড়া হলো বিশেষ ধরনের সুস্বাদু ঘ্রাণযুক্ত এক প্রকার কমলালেবু অথবা জাম্বুরা জাতীয় আমলা ও টক ফল। আকৃতি কমলার চেয়ে সামান্য বড় ও জাম্বুরা থেকে অনেকটা ছোট। তবে কমলা বা জাম্বুরা থেকে সাতকড়া আলাদা এক বৈশিষ্ট্য নিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। দেখতে অনেকটা চ্যাপ্টা গোলাকার, শাঁস পরিমাণে খুব কম, টক ও তিতা। সাতকড়ার বাইরের অংশ এক ধরনের খসখসে সবুজ ও পুরু। এর ভেতরে অংশটাও অনেকটা কমলার মতো এবং তা রসে টইট¤ু^র থাকে। সাতকড়া কিন্তু সারা বছর তার ফলন দেয় না। এটি একটি মৌসুমি ফল। গাছের প্রতিটি শাখায় শত শত সাতকড়া ঝুলে থাকে চমৎকারভাবে। সাতকড়া সাধারণত গাঢ় সবুজ রঙের হলেও একটি পরিপূর্ণ বয়সের সাতকড়ার গায়ের রঙ গাঢ় হলদে বা চিত্রা হালকা হলদে রঙের হয়। প্রতিটি ফলের গড় ওজন প্রায় ৩২৯ গ্রাম, যা সবজির আনুষঙ্গিক হিসেবে রান্নায় ব্যবহৃত হয়।
সাতকড়ার আদি নিবাস : সাইট্রাস গোত্রের অন্তর্ভুক্ত লেবুজাতীয় এই ফল ভারতের পাহাড়ি এলাকার আদি ফল হিসেবেই গণ্য করা হয়। জানা যায়- আঠারো শতকে সিলেটের সীমান্তের ওপারে ভারতের আসাম রাজ্যে ব্যাপকভাবে ‘সাতকড়া’র চাষ করা হতো। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ‘সাতকড়া’ বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে প্রবেশ করে। এলাকার চাষিরা সিলেটের পাহাড়ি ভূমিতে সাতকড়ার চাষ ব্যাপকভাবে শুরু করেন। খুবই অল্প সময়ে সাতকড়া সিলেটবাসীর মন জয় করে নিতে সক্ষম হয়। ফলে অত্র এলাকার মানুষের কাছে সাতকড়া ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে সিলেট বিভাগের তিনটি জেলা যথাক্রমে মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সিলেট জেলার পাহাড়ি অঞ্চলে ‘সাতকড়া’ চাষে ব্যাপক উদ্যোগ হাতে নেয়া হয়। বর্তমানে অত্র অঞ্চলে বিশেষ করে সিলেটের জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাটের জাফলং ছাড়াও এখানকার পাহাড়-টিলায় সাতকড়া চাষ হচ্ছে। এ ছাড়া মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল, বড়লেখা ও জুড়ীতে প্রাকৃতিকভাবেই সাতকড়ার চাষ হচ্ছে এবং ভালো ফলনও হচ্ছে। চাহিদা বিবেচনা করে এখানকার সাতকড়া সিলেটের প্রবাসীদের মাধ্যমে বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। ‘সাতকড়া’ চাষে খরচ কম এবং সাতকড়ার উচ্চমূল্যের কারণে এ ফলটি অত্যন্ত লাভজনক হওয়ায় অনেকেই ‘সাতকড়া’ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের বাঙালি পরিবার বিশেষ করে সিলেটি পরিবারে সাতকড়া ঠাঁই করে নেয়ার কারণে বর্তমানে এ ফলটির বাজারমূল্য অত্যধিক। সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে অর্থাৎ বাজার দিনে ব্যাপক হারে সাতকড়া তোলা হয় স্থানীয় হাটবাজারে। চড়া মূল্য থাকায় স্থানীয় ক্রেতারা সাতকড়া কিনতে হিমশিম খান বটে। এখানকার প্রতি হালি ভালো মানের হাতকরা ১৫০ টাকা থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে হরদম।
জলবায়ু ও বর্ণনা
দেশের জলবায়ু সাতকড়া চাষের জন্য পুরোপুরি উপযোগী। সাতকড়া গাছে সাধারণত ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে ফুল আসে এবং নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে ফল পরিপক্বতা লাভ হয়। বর্তমানে ‘পাতলা’ ও ‘ছোলা’ নামে দুই প্রকারের সাতকড়া বাজারে পাওয়া যায়। এক গবেষণায় দেখা গেছে বংশবিস্তারের ক্ষেত্রে সাতকড়ার বীজ খুব যে একটা কার্যকর ভূমিকা পালন করে তা কিন্তু নয়। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন যে জাম্বুরা গাছের ওপরে কলম করে সাতকড়ার চারা উৎপাদন করলে সে গাছ বৃদ্ধি ও সাতকড়ার ফলন ভালো হয়। সিলেটের জৈন্তায় অবস্থিত সাইট্রাস গবেষণা কেন্দ্রে এই ফল নিয়ে বেশ গবেষণা করা হয়েছে। তবে এ কথা বলে রাখা ভালো যে, কমলা চাষের মতো নিরবচ্ছিন্ন কোনো চাষপদ্ধতি না থাকার কারণে সাতকড়ার উৎপাদন সংক্রান্ত কোনো পরিসংখ্যান বা অন্যান্য তথ্যাবলি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে যথেষ্ট নেই। একটি পরিপূর্ণ সাতকড়া গাছ মাটি থেকে প্রায় ২০ থেকে ২৫ ফুট লম্বা হয়, যা অনেকটা লেবুগাছ বা কমলা গাছের মতো। কাঁটাভরা সাতকড়া গাছে সাতকড়া ধরে প্রচুর। সাতকড়া কমলার কোয়ার মতো কেটে শুকিয়ে সংরক্ষণ করা যায় মাস থেকে বছর পর্যন্ত। প্রয়োজন অনুসারে যে কোন সময় সে কোয়া দিয়ে তরকারি রান্না করা যায় অনায়াসে। এতে স্বাদ বা গন্ধের কোনো ব্যতিক্রম বা কোনো সমস্যাও হয় না।
সাতকড়ার ঔষধি গুণাগুণ : সাতকড়া একটি ভিটামিনসমৃদ্ধ ফল এবং এর পুষ্টিমান অনেক উন্নত। সাতকড়ায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস, যা সচরাচর অনেক ফলে দেখা যায় না। তাই সাতকড়াকে একটি ঔষধি ফল হিসেবেও বিবেচনায় আনা যেতে পারে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের একটি সূত্র জানায়, সাতকড়া যে শুধু সুস্বাদু তরকারি ও টক তা নয়। এ ফলটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও বিশেষ উপকারী। শরীরের বাত, শিরা-উপশিরা ব্যথায় যারা ভুগছেন তারা ‘সাতকড়া’ খেতে পারেন। সাতকড়া এসব রোগ থেকে উপশম দেবে সন্দেহ নেই। তবে গ্যাস্ট্রিকের জন্য সাতকড়া বিশেষ উপযোগী ফল নয়। সুতরাং গ্যাস্ট্রিক রোগীদের এ ফল এড়িয়ে চলাই ভালো।
সাতকড়ার ব্যবহার : প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেট বিভাগের প্রায় প্রতিটি মানুষের কাছে সাতকড়া অতি পরিচিত এক নাম। মানুষের খাদ্যতালিকার বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে সাতকড়া স্বমহিমায় ভাস্বর। এখানকার প্রতিদিনের রান্নায়, বিশেষ করে মাংস জাতীয় তরকারি রান্নায় ‘সাতকড়া’ অবশ্যই অপরিহার্য। মূলত সাতকড়া আর গরুর পায়ের হাড় দিয়ে জনপ্রিয় খাট্টা (ঝোলযুক্ত টক) তৈরি করা হয়। এ ঝোলযুক্ত টক একবার খেলে তা বারবার খেতে ইচ্ছে হয়। এ ছাড়া মাংসের ভুনায় সাতকড়া মিশ্রিত করলে এক অভাবনীয় স্বাদ পাওয়া যায় যা বর্ণনা করা দুষ্কর। তাই সতকড়া ছাড়া অধিকাংশ খাদ্যবিলাসী মানুষের রসনা বিলাসই যেনো অসম্পূর্ণ। বড় আকারের মাছ ও মাংসের তরকারিতে স্বাদ বাড়াতে ‘সাতকড়া’ ব্যবহার করা অতীব প্রয়োজন। শৌখিন পরিবারের সদস্যদের জিবে টলমল পানি আনে এই সাতকড়া। সিলেটের বহু পাকা রাঁধুনি মাংস বা মাছের তরকারিতে এই সাতকড়া ব্যবহার করে অতিথিকে খাইয়ে চমক দেখিয়ে থাকেন। আবার সিলেটের অনেক পরিবার নিত্যদিনের তরকারিতেও তা ব্যবহার করে থাকে। আবার এই সাতকড়া দিয়ে তৈরি করা হয় ভিন্ন রকমের আচার। এসব আচার বিক্রি করা হচ্ছে দেশের বাজারে। আবার লেবুর মতো এসব আচার ভাতের সাথে মিশিয়ে খাওয়ার মজাই আলাদা।

শেষ কথা
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রয়েছে নিজস্ব কিছু বিশেষ খাবার। যে খাবারের সঙ্গে রয়েছে ওই অঞ্চলের পরিচিতি ও তার বর্ণিল ইতিহাস। সে ক্ষেত্রে সাতকড়া সিলেটের অঞ্চলভিত্তিক ফল হলেও ইতোমধ্যে সে তার খ্যাতি বিশ্বব্যাপী মেলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। সুতরাং সাতকড়াকে আর অঞ্চলভিত্তিক ফল বলে আবদ্ধ করা যাবে না। ইতোমধ্যে এ ফল সিলেটের প্রবাসীদের কল্যাণে নিয়মিতভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে রফতানি হচ্ছে এবং এদের মাধ্যমেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ সাতকড়ার স্বাদ গ্রহণ করছে। তার মধ্যে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ অন্যতম। এছাড়া দেশের মধ্যেও বিভিন্ন জেলার মানুষের খাবার টেবিলে সাতকড়া তার উপস্থিতি সুনামের সাথে জানান দিচ্ছে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সরকার সাতকড়া চাষে মনোযোগী হলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানি করে হাজার হাজার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম হবে অনায়াসে।

SHARE

Leave a Reply