Home আইটি কর্নার ভার্চুয়াল রিয়েলিটি -সোলায়মান খান

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি -সোলায়মান খান

ছোট্ট বন্ধু নাহিদ ঘরের এক কোণে মন খারাপ করে বসে আছে। এমন সময় তার মামা শফিক সাহেব এলেন। নাহিদকে  সোহাগ করে তার মন খারাপের কারণ জানতে চাইলেন। নাহিদ এবার আসল ঘটনা খুলে বলল। নাহিদের ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগে, সমুদ্রসৈকতে ঘোরা, পাহাড়, ঝর্ণা দেখা, এসব তার ভালো লাগে। কিন্তু তার বাবা অফিসের কাজের চাপে তাকে নিয়ে বাইরে ঘোরার সময় পান না। আজও নাহিদ তার বাবাকে বলেছে ঘুরতে যাওয়ার কথা। তার বাবা এক কথায় না করে দিয়েছেন। আর এ জন্য তার মন খারাপ। সব শুনে তার মামা বললেন, মন খারাপ করো না, আমি আগামীকালই তোমাকে ঘরে বসেই এসব পাহাড়, ঝর্ণা দেখানোর ব্যবস্থা করব। নাহিদ তো অবাক। বলে কী! ঘরে বসেই এসব দেখা যাবে কিভাবে? তাহলে কি তার মামা ল্যাপটপে ভিডিও দেখার কথা বলছেন? তার মামা তাকে জানালেন এটা ভিডিও থেকেও বেশি বাস্তব। আর এটা তার জন্য সারপ্রাইজ।
পরদিন তার মামা হেডসেট, গ্লোভস, স্যুট টাইপের কিছু জিনিস নিয়ে হাজির হলেন। হেডসেটটি নাহিদের মাথায় বসিয়ে দিলেন, আর তার হাতে গ্লোভস পরিয়ে দিলেন। হঠাৎ নাহিদের মনে হলো সে যেন এক পাহাড়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে, ওপর থেকে ঝর্ণা প্রবাহিত হচ্ছে। সে একটি প্রজাপতিকে ধরার চেষ্টা করল সেটা ছুটে পালিয়ে গেলো। কিন্তু একটু আগেও তো সে তার বাসার সোফায় বসা ছিলো। সব কিছু তার কাছে জাদুর মত মনে হচ্ছে। কিছু সময় পর তার মামা তার মাথা থেকে হেডসেটটি খুলে নিলেন। নাহিদ নিজেকে আগের মতোই তার বাসার সোফায় বসা দেখতে পেল। তাহলে মাঝের এই সময়টুকু কী হলো? অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে সে তাকিয়ে আছে তার মামার দিকে। তার মামা মুচকি হেসে বললেন, পাহাড় তো দেখা হলো, এবার এসো আকাশভ্রমণ করে আসি। এই বলে হেডসেটটি তিনি আবার নাহিদের মাথায় বসিয়ে দিলেন। নাহিদের এবার মনে হলো সে বিমানে চড়ে আকাশে উড়ছে। চার পাশে সাদা মেঘের ভেলা, শাঁই-শাঁই করে উড়ে যাচ্ছে।
কী বন্ধুরা, অবাক হচ্ছো? আসলেই কি এমনটা সম্ভব? হ্যাঁ বন্ধুরা, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি বা কাল্পনিক বাস্তবতার জগতে এমনটাই সম্ভব। প্রকৃত অর্থে বাস্তব নয় কিন্তু বাস্তবের চেতনার উদ্রেককারী বিজ্ঞাননির্ভর কল্পনাকে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি বা অনুভবের বাস্তবতা কিংবা কাল্পনিক বাস্তবতা বলে। ভার্চুয়াল রিয়েলিটি হচ্ছে ক¤িপউটার নিয়ন্ত্রিত সিস্টেম, যাতে মডেলিং ও অনুকরণবিদ্যা প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষ কৃত্রিম ত্রিমাত্রিক ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পরিবেশের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন বা উপলব্ধি করতে পারে। ভার্চুয়াল রিয়েলিটিতে অনুকরণকৃত পরিবেশ হুবহু বাস্তব পৃথিবীর মতো হতে পারে। এ ক্ষেত্রে অনেক সময় ভার্চুয়াল রিয়েলিটি থেকে বাস্তব অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। আবার অনেক সময় অনুকরণকৃত বাসিম্যুলেটেড পরিবেশ বাস্তব থেকে আলাদা হতে পারে। যেমনÑ ভার্চুয়াল রিয়েলিটি গেমস। এতে ত্রিমাত্রিক ইমেজ তৈরির মাধ্যমে অতি অসম্ভব কাজও করা সম্ভব হয়।
ভার্চুয়াল রিয়েলিটিতে ব্যবহারকারী স¤পূর্ণরূপে একটি ক¤িপউটার নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে নিমজ্জিত হয়ে যায়। তথ্য আদান-প্রদানকারী বিভিন্ন ধরনের ডিভাইস সংবলিত হেডমাউন্ডেড ডিসপ্লে, ড্যাটা গ্লোভ, পূর্ণাঙ্গ বডিস্যুইট ইত্যাদি পরিধান করার মাধ্যমে ভার্চুয়াল রিয়েলিটিতে বাস্তবকে উপলব্ধি করা হয়। এ এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতাÑ  এক বিশেষ ধরনের ডিভাইস যা মাথায় বা চোখে পরিধেয় এবং তোমার মাথার নড়াচড়াকে ট্র্যাক করে সৃষ্ট ত্রিমাত্রিক জগতের সাথে তোমাকে একাত্ম করে; তার মানে তুমি যে দিকেই ফিরে তাকাবে, ত্রিমাত্রিক পরিবেশও সেভাবে ঘুরে যাবে। তাতে মনে হবে তুমি ঐ ত্রিমাত্রিক জগতের সাথেই মিশে গেছো।
শুধু কি এভাবে তোমার ঘুরে বেড়ানোর স্বপ্ন বাস্তবায়নই ভার্চুয়াল রিয়েলিটির কাজ? না, ভার্চুয়াল রিয়েলিটিকে অনেক ইতিবাচক কাজে ব্যবহার করা যায়। এই যেমন ধরো তুমি সৌরজগতে গ্রহগুলোর আবর্তন নিয়ে পড়ছো, ঠিক এমন সময় তোমার এ ব্যাপারে বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভের ইচ্ছা হলো। এ জন্য তুমি ইন্টারনেট থেকে ভিডিও দেখতে পারো। কিন্তু ভার্চুয়াল রিয়েলিটি এই কাজকে তোমার জন্য আরো অধিক বাস্তব করে তুলবে। এটি তোমাকে এমন এক জগতে নিয়ে যাবে যেখানে তুমি সেই একই জিনিসকে একেবারে সামনাসামনি দেখার অনুভূতি পাবে, ফলে জিনিসটি স¤পর্কে তোমার ধারণা আরও পাকাপোক্ত হবে। এভাবে শিক্ষা ক্ষেত্রে হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়ার জন্য ভার্চুয়াল রিয়েলিটির ব্যবহার করা হয়।
চিকিৎসা ক্ষেত্রে নবীন ডাক্তারদের অনেক জটিল অপারেশনের কার্যাবলি শিক্ষা দিতে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির ব্যবহার করা হয়। এর ফলে তারা অন্তত সহজে ও সুবিধাজনক উপায়ে বাস্তবে অপারেশন থিয়েটারে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
খেলাধুলার জগতে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির রয়েছে সদর্প বিচরণ। বিভিন্ন খেলা যেমন- গলফ, অ্যাথলেটিকস, সাইক্লিং ইত্যাদির ট্রেনিংয়ের জন্য এটি বহুল ব্যবহৃত। এ ছাড়া খেলাধুলায় ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী ডিজাইন করতেও ভার্চুয়াল রিয়েলিটির সফল প্রয়োগ রয়েছে; যেমনÑ রানিংস্যু।
সামরিক বাহিনীতে অনেক বছর ধরে মিলিটারি প্রশিক্ষণে ফ্লাইট সিম্যুলেটর ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ব্যবহার করে প্রচলিত ফ্লাইট সিম্যুলেটরের আরও উন্নতি সাধন করা সম্ভব। এ ছাড়া ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মাধ্যমে সিম্যুলেটেড যুদ্ধের দ্বারা সেনাদের অনেক বেশি বাস্তব ও উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া যাবে।
এসব ছাড়াও আমোদ-প্রমোদ, ব্যবসা-বাণিজ্য, মিডিয়া, সিনেমা, টেলিকমিউনিকেশন, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, ফ্যাশন ডিজাইনিং ইত্যাদি ক্ষেত্রেও ভার্চুয়াল রিয়েলিটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
ইতিবাচক প্রভাবের পাশাপাশি ভার্চুয়াল রিয়েলিটির কিছু নেতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। মানবসমাজ টিকে থাকার জন্য দরকার মানুষের মনুষ্যত্ব, যা সৃষ্টি হয় মানুষের পারপরিক যোগাযোগ ও ক্রিয়ার ফলে। কিন্তু ভার্চুয়াল রিয়েলিটিতে মানুষ বাস্তবের চেয়েও বেশি ভালো বন্ধু ও মনের মতো পরিবেশ পাবে। যার ফলে মানুষের পারপরিক যোগাযোগ কমে যাবে এবং মানবসমাজ ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে অগ্রসর হবে।
ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মাধ্যমে মানুষ তার কল্পনার রাজ্যে ইচ্ছেমতো বিচরণ করতে পারে। ফলে দেখা যাবে মানুষের বেশির ভাগ সময় কাটবে তার কল্পনার জগতে এবং খুব কম সময় বাস্তব জগতে। কিন্তু এভাবে মানুষ যদি কল্পনা ও বাস্তবের মধ্যে পার্থক্য করতে না পারে তাহলে এই পৃথিবী চরম অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হবে।
এছাড়াও গবেষণায় দেখা গেছে যে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও হানিকর। এটি মানুষের দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তির ক্ষতি সাধন করে।
তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া

SHARE

Leave a Reply