Home তোমাদের গল্প লোকটির খোঁজে -সাব্বির হোসাইন

লোকটির খোঁজে -সাব্বির হোসাইন

খুব ছোট একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন ভ্রমণপ্রিয় রাশেদ আলী। মাস শেষে যা মাইনে পান তা দিয়েই চালিয়ে নেন পরিবারকে। ছেলেমেয়েদের অনেক বায়না। তাদের ইচ্ছা পূরণ করতে পারলেই রাশেদ আলীর স্বস্তির নিঃশ্বাস। স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়েই তার ছোট সংসার। এই ছেলেমেয়েকে নিয়েই তার অনেক স্বপ্ন। তারা বড় হয়ে মানুষের মতো মানুষ হবে। মানুষের বিপদে আপদে পাশে গিয়ে দাঁড়াবে। সর্বোপরি ভালো মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। এটাই রাশেদ আলী চান। এই স্বপ্ন নিয়েই তিনি বেঁচে আছেন।
রাশেদ আলী খুব ভ্রমণপ্রিয় মানুষ। অফিস শেষে সুযোগ পেলেই যেকোনো দর্শনীয় স্থান ভ্রমণ করেন। এর মাঝেই তিনি প্রচুর আনন্দ খুঁজে পান। ছোটবেলা থেকেই তিনি খুব প্রকৃতিপ্রেমিক। প্রকৃতির মাঝেই খুঁজে পান তার নিজের সত্তাকে। ঘুরে বেড়ানোই তার প্রিয় কাজ। একবার এক অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতা হয়েছিল তার জীবনে।
সেদিন তার ইন্টারভিউ ছিল একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে। সকালবেলা ধানমন্ডি লেকের পাশে কিছুক্ষণের জন্য বসেছিলেন। বসে বসে ভাবছিলেন অতীতের স্মৃতিগুলো। সেই অতীত স্মৃতি ভোরের সূর্যের মতো উঁকি দিচ্ছে বারবার। পাশাপাশি ভাবছিলেন তার জীবনের স্বপ্ন, আশা-আকাক্সক্ষা। সবকিছুই পাখির ডানার মতো তার হৃদয়ে মেলে দিচ্ছে।
হঠাৎ এক মধ্যবয়স্ক লোক এদিক ওদিক তাকিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন। দেখেই বোঝা যায় তিনি ঢাকা শহরে প্রথম এসেছেন। রাশেদ সাহেবকে দেখে তার দিকে এগিয়ে এসে সালাম দিলেন। বললেন ‘আমি গেরাম থেকে আসিছি। শুনেছি ঢাহা শহরে আইলে ভাগ্য রেহা বদল অয়। এইহানে নাকি অনেক কাম পাওয়া যায়। আমায় একটা কাম দেন। আমরা খোপ গরিব।’
রাশেদ সাহেব আগেই অনুমান করেছিলেন লোকটি এই শহরে প্রথম এসেছেন। তার কথায় বোঝা যায় তিনি খুব ক্ষুধার্ত। তাকে কাজ দিবেন কী করে। তিনি নিজেই চাকরি পাচ্ছেন না। কিন্তু মনে পড়ে গেল আজকে তার ইন্টারভিউ আছে। তাই দেরি না করে লোকটাকে বললেন, আমার হাতে কোনো কাজ নেই। অমনি লোকটা মুখ ভার করে চলে যাচ্ছিলেন। রাশেদ আলী ডেকে লোকটার হাতে কিছু টাকা দিতে চাইলেন। এবং বললেন ‘ভাই, কিছু খেয়ে নেবেন! ভাগ্যে থাকলে হয়তো আপনার কাজ জোগাড় হয়ে যাবে। চিন্তা করবেন না। শান্ত, মনমরা লোকটি ফোঁস করে বলে উঠলো ‘আমি আফনের কাছে কাম চাইছিলাম, ভিক্ষা চাইনি।’ মিনিট দশেক পর লোকটিকে বোঝাতে পারলেন কোন একদিন হয়তো তারও সুযোগ হবে বিপদে পড়া কোন মানুষের জন্য কিছু করা। তখন না হয় শোধ হয়ে যাবে। জোর করে লোকটির বুক পকেটে কিছু টাকা ভরে দিয়ে তাকে বিদায় দিলেন রাশেদ আলী।
রশেদ সাহেবের ভাগ্যটা সেদিন খুব ভালো ছিল। অবশেষে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে তার চাকরিটা হয়ে গেল। তিনি মনে মনে খুব খুশি। এবার তিনি ছেলেমেয়ের বায়না পুরোপুরিভাবে মেটাতে পারবেন। পরিবারে আর অভাব থাকবে না। এই কথা ভাবতে ভাবতেই তিনি বাড়ির দিকে রওনা হলেন। পরক্ষণেই মনে পড়লো সকালের সেই মধ্যবয়স্ক লোকটির কথা। তাই ঝটপট ধানমন্ডি লেকের পাশে চলে গেলেন সেই লোকটির খোঁজে। কিন্তু লোকটি সেখানে নেই। হয়তো কাজের সন্ধানে লোকটি ঘুরে বেড়াচ্ছেন ঢাকা শহরে।
লোকটির খোঁজ না পেয়ে রাশেদ আলী বাড়িতে চলে এলেন। স্ত্রীর কাছে চাকরি হওয়ার কথা বললেন। স্ত্রী তো খুশিতে আত্মহারা। কিন্তু রাশেদ আলীর মুখ ভার। তিনি হাসতে পারছেন না। তার মনে মধ্যবয়স্ক লোকটির সেই বিস্ময়কর কথাটি ভেসে উঠলো। ‘আমি আফনের কাছে কাম চাইছিলাম, ভিক্ষা চাইনি।’ স্ত্রী জানতে চাইলে তিনি সব খুলে বললেন। লোকটার খোঁজ পেলে রাশেদ আলী তাকে একটি কাজ দেয়ার ব্যবস্থা করতেন।
রাশেদ আলী লোকটার খোঁজ পেলেন না। এত বড় শহর কেইবা তাকে কাজ দেবে। হয়তো লোকটা কাজ না পেয়ে দিশেহারা হয়ে গ্রামে ফিরে গেছেন।
কিন্তু না! লোকটা কাজের জন্যই ঢাকায় এসেছেন। তার কাজ করার তীব্র ইচ্ছা আছে। হয়তো কাজ পেয়েও যেতে পারেন। আল্লাহই ভালো জানেন। রাশেদ আলী ভাবতে ভাবতে শুয়ে পড়লেন। কিন্তু তার ঘুম আসছে না। লোকটার সেই বিস্ময়কর বাক্যটি তার হৃদয়ে বারবার ভাসছে ‘আমি আফনের কাছে কাম চাইছিলাম, ভিক্ষা চাইনি!’
রাশেদ আলী লোকটির জন্য দোয়া করলেন, তিনি যেন সত্যি সত্যিই একটা কাজ জোগাড় করে নিতে পারেন। দোয়া শেষে একটা হাই তুলে রাশেদ আলী ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করলেন। তবে লোকটিকে আবার দেখা পাওয়ার জন্য তার মনটা আনচান করে উঠলো। তিনি মনে মনে লোকটিকে এখনো খুঁজে বেড়াচ্ছেন। আর তার শুভ কামনা করছেন।

SHARE

Leave a Reply