Home প্রচ্ছদ রচনা আমাদের বিজয় -ড. এম এ সবুর

আমাদের বিজয় -ড. এম এ সবুর

প্রিয় বন্ধুরা! বিজয়ী হলে কেমন লাগে? নিশ্চয়ই ভালো লাগে, মনে আনন্দ জাগে! তাই না? ধর, কোনো খেলায় তোমাদের দল বিজয়ী হয়েছে। তাহলে নিশ্চয়ই তোমাদের ভালো লাগবে। তোমরা অনেক মজা করবে, আনন্দ-উল্লাস করবে! যেমন বাংলাদেশ জিতলে আমরা ছোট-বড় সবাই মিলে আনন্দ-উল্লাসে মেতে উঠি। অনেক মজা করি। আসলে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে বিজয় অর্জনের মজাই আলাদা। তাই ডিসেম্বর মাস এলেই আমাদের মনে আনন্দ জাগে। আমরা অনেক আনন্দ-উল্লাস করি। কারণ, ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস। ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালের এ দিনে আমাদের বিজয় হয়েছে। এতে আমাদের দেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েছি, লাল-সবুজের গৌরবান্বিত পতাকা পেয়েছি। আর বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমারেখা অঙ্কিত হয়েছে। কিন্তু আমাদের স্বাধীনতা সহজে আসেনি। এজন্য অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করতে হয়েছে। অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম করতে হয়েছে। এমনকি দীর্ঘ ৯ মাস পর্যন্ত যুদ্ধ করতে হয়েছে। এ যুদ্ধের নাম মুক্তিযুদ্ধ।
স্বাধীনতার আগে আমাদের দেশ পরাধীন ছিল। পরাধীনতা খাঁচায় বন্দি পাখির মত। খাঁচায় বন্দি পাখিকে যত ভালোই খাওয়ানো হোক, যতই আদর-যতœ করা হোক তার মনে কোনো সুখ থাকে না। সে সবসময় খাঁচা থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে। আর সুযোগ পেলেই খাঁচা থেকে বেরিয়ে যায়। মুক্ত ডানায় আকাশে উড়ে বেড়ায়। তেমনিভাবে পরাধীন মানুষের মনেও সুখ থাকে না। তারাও স্বাধীন হওয়ার চেষ্টা করে। সুযোগ পেলেই স্বাধীনতার পথ খুঁজে। কোনো মানুষই পরাধীনভাবে বাঁচতে চায় না। কেউ বন্দি হয়ে থাকতে চায় না। সবাই মুক্ত থাকতে চায়। স্বাধীনভাবে বাঁচতে চায়।
আমাদের দেশের মানুষ সব সময়ই স্বাধীনচেতা। তারা কখনোই পরাধীনতা পছন্দ করে না। কিন্তু প্রাচীনকাল থেকেই বেশির ভাগ সময় আমাদের এ দেশ শাসন করেছে বিদেশীরা।
কিন্তু সময় গড়ায়, ইতিহাসও তৈরি হয় নতুনভাবে এটাই নিয়ম। যেমনÑ ১২০৩ খ্রিস্টাব্দে তুর্কি বীর ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি মাত্র ১৮ জন সৈন্য নিয়ে রাজপ্রাসাদ আক্রমণ করেন। এ সময় রাজা লক্ষ্মণ সেন ভয়ে রাজপ্রাসাদ ছেড়ে পালিয়ে যান। আর ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার ক্ষমতায় বসেন। ফলে সেন শাসনের অবসান ঘটে এবং তুর্কি-পাঠান শাসনের সূচনা হয়। পরে তারা ধীরে ধীরে এ দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন এবং ক্ষমতাকে শক্তিশালী করেন। আর সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ (১৩৪২-১৩৫৮) ‘লাখনৌতি’ ও ‘বঙ্গদেশ’কে একত্রিত করেন। তিনি এ একত্রিত অঞ্চলের নাম দেন ‘বাঙালাহ্’ এবং এর অধিবাসীদের নাম দেন ‘বাঙালি’। আর তিনি নিজে ‘শাহ-ই-বাঙালাহ্’ উপাধি ধারণ করেন। তিনি ‘বাঙালাহ’ দেশ স্বাধীনভাবে শাসন করেছেন। তার শাসনামল থেকে পরবর্তী দুই শত বছর বাঙালাহ্ (বাংলাদেশ) সম্পূর্ণ স্বাধীন ছিল। তাই এ সময়কালকে স্বাধীন সুলতানি শাসনামল বলা হয়। এরপর এ দেশের বার ভূঁইয়ারা বিদেশী শাসকদের বাধা দেন। আর সুবাহদার মুর্শিদ কুলী খাঁ ১৭১৭ থেকে ১৭২৭ সাল পর্যন্ত প্রায় স্বাধীনভাবেই বাংলাদেশ শাসন করেন। তার পর থেকে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাহ পর্যন্ত সব নবাবই নামে মাত্র দিল্লির মুঘলদের অধীনে ছিলেন। কিন্তু তারা স্বাধীনভাবেই বাংলা শাসন করেছেন। তবে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতা নস্যাৎ হয়। এ যুদ্ধে চক্রান্ত করে বাংলার নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাহকে হারিয়ে দেয়া হয়। আর ইংরেজরা এ দেশের ক্ষমতা দখল করে নেয়। তারা প্রায় দুই শ’ বছর এ দেশ শাসন করেছে। এ সময় তারা এ দেশের অনেক সম্পদ লুটে নিয়েছে এবং এ দেশের লোকজনকে নির্যাতন-নিপীড়ন করেছে। এ জন্য এ দেশের মানুষেরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। আমাদের স্বাধীনতা ফিরে পেতে চেয়েছেন। অনেক কবি-সাহিত্যিকও ইংরেজদের বিরুদ্ধে কলমযুদ্ধ করেছেন, মানে লিখেছেন। যেমন কবি (কাজী নজরুল ইসলাম) লিখেছেন,
‘এদেশ ছাড়বি কি না বল
নইলে কিলের চোটে
হাড় করবো জল।’
১৯৪৭ সালে ইংরেজরা আমাদের দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। ফলে আমাদের দেশ স্বাধীনতা ফিরে পায়। কিন্তু পূর্ণ স্বাধীনতা নয় বরং পাকিস্তানের সাথে একত্রিত হয়ে। তখন আমাদের দেশের নাম রাখা হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান’। আর পাকিস্তানের নাম রাখা হয় ‘পশ্চিম পাকিস্তান’। দুই পাকিস্তান মিলে এক দেশ হলেও দূরত্বের অনেক ব্যবধান ছিল। এ ছাড়া অনেক বৈষম্যও ছিল। আমাদের অধিকার আদায়ের জন্য ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং আমরা বিজয় লাভ করি।
স্বাধীনতার মজাই আলাদা। তবে স্বাধীনতা শুধু অর্জন করলেই হবে না, একে রক্ষাও করতে হবে। কথায় আছে, ‘স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন।’ তার মানে হলো, স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যত কষ্ট-সাধনা করতে হয়েছে তা রক্ষার জন্য আরও বেশি ত্যাগ-সাধনা করতে হবে। তা না হলে স্বাধীনতা হারিয়ে যেতে পারে। তাই যে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে তার দাবি পূরণ করতে হবে এবং সেই দায়িত্ব তোমার আমার, আমাদের সকলের।
দেশের জন্য কাজ করতে হলে ভালোভাবে পড়ালেখা করতে হবে। ভালো মানুষ হতে হবে। খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকতে হবে। অন্যায় কাজের বাধা দিতে হবে। হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে সবাই মিলে একসাথে থাকতে হবে। মারামারি-বিবাদ-বিশৃঙ্খলা পরিহার করতে হবে। গরিব-দুঃখীদের সহযোগিতা করতে হবে। বড়দের সম্মান আর ছোটদের স্নেহ করতে হবে। দেশের সকল মানুষের অধিকার আদায় করতে হবে। মানুষে মানুষে বৈষম্য দূর করতে হবে। দেশকে ভালোবাসতে হবে, দেশের মানুষকে ভালোবাসতে হবে। দেশের জন্য, দশের জন্য কাজ করতে হবে। এতে আমাদের দেশ উন্নত হবে। বিশ্বের বুকে আমাদের দেশের সম্মান বাড়বে। আমাদের স্বাধীনতা সুসংহত হবে। বিজয়ের আনন্দের সাথে সাথে এসব বিষয়ও আমাদের মনে রাখতে হবে। তাহলে বিজয়ের আনন্দ সার্থক হবে।

SHARE

Leave a Reply