Home ফিচার বিলের রানী চলন বিল -ড. রফিক রইচ

বিলের রানী চলন বিল -ড. রফিক রইচ

ইতিহাসের বাহক আমার মিষ্টি সোনামণিরা, তোমাদের জন্য আজকের লেখাটি বাংলাদেশের একটি বিখ্যাত বিল ‘চলন বিল’ নিয়ে। তার আগে জেনে নিই বিল কী, কাকে বলে। আসলে বিল স¤পর্কে তোমাদের সবারই কিছু না কিছু ধারণা আছে। তারপরও বলছি, আবদ্ধ মিঠাপানি বা স্বাদুপানির বিশাল পানিভরা স্থানকে বিল বলা হয়। অন্য কথায় বৃষ্টি মৌসুমে বা বর্ষাকালে দেশের নিচু ভূমির যে অঞ্চল অতিরিক্ত পানি এসে ভরাট হয়ে যায় ও শুকনো মৌসুমে দু-এক জায়গা ব্যতীত প্রায় সবটুকুই শুকিয়ে যায় এবং চাষাবাদ ও গো-বিচরণক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার হয় তাকে বিল বলে।
বাংলাদেশে অসংখ্য বিল রয়েছে, যে বিলগুলোর সাথে মানুষের রুটি-রুজির সম্পর্ক। এসব বিলে ৬-৭ মাস পানি থাকায় বিভিন্ন ধরনের মাছ ও পানির নানা প্রজাতির প্রাণীতে ভরপুর থাকে। ভরপুর থাকে নানা প্রজাতির পাখিতে। আর এগুলোর সাথে বিলের আশপাশের নানা বর্ণের মানুষের জীবন ও জীবিকা জড়িত। আবার বিল শুকিয়ে গেলেও বিলের কোথাও না কোথাও পানি জমে থাকে, যা শুকনো মৌসুমে চাষাবাদে ব্যবহার করা হয়। কখনো কখনো শুকনো মৌসুমে বিস্তৃত সবুজ ঘাসে গরু, ছাগল, ভেড়া ইত্যাদির বিচরণক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার হয়।
চলন বিলও এর বাইরে নয়। আমি আগেই বলেছি চলন বিল হলো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও বিখ্যাত বিল। এ বিল চারটি জেলা (রাজশাহী, নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ), আটটি উপজেলা ও আটটি পৌরসভা, ষাটটি ইউনিয়ন, এক হাজার ছয়শতটি গ্রাম ও চৌদ্দটি প্রধান নদী নিয়ে গঠিত। লোকসংখ্যা ২০ লাখের বেশি। বিলটির গড় গভীরতা দুই মিটার অর্থাৎ ছয় দশমিক ছয় ফুট। সার্বিক গভীরতা চার মিটার অর্থাৎ তেরো ফুট।
চলন বিল আগে পাবনা জেলার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, বেড়া; সিরাজগঞ্জ জেলার তারাশ, রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া; নাটোর জেলার সিংড়া, গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম; নওগাঁ জেলার রানীনগর, আত্রাই এবং বগুড়া জেলার দক্ষিণ অঞ্চল নিয়ে গঠিত ছিল। ভারতের গঙ্গা থেকে পলি প্রবাহিত হয়ে এসে পড়ার কারণে দেড় শ’ বছরে বিলটি দক্ষিণ দিক থেকে ১৯.৩২ কিলোমিটার সরে এসেছে।
চলন বিলের পানি নিষ্কাশন প্রণালি এবং পানির বিষয়টি ভালো করে দেখার জন্য ১৯০৯ সালে গণপূর্ত বিভাগ জরিপ করে দেখেছে বিখ্যাত চলন বিল আগের আয়তন এক হাজার পঁচাশি বর্গ কিলোমিটার থেকে কমতে কমতে ৩৬৮ বর্গ কিলোমিটারে এসেছে। তবে শুকনো মৌসুমে বিলটি শুকিয়ে গিয়ে ২৪.৯ বর্গ কিলোমিটার থেকে ৩১.০৮ বর্গ কিলোমিটারে এসে পড়ে।
চলন বিলের উৎপত্তি নিয়ে নানা মত রয়েছে, তবে উল্লেখযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য মতটি হলোÑ কেউ কেউ বলে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে বিদ্যমান ছিল। যুক্তিসঙ্গত মতÑ ব্রহ্মপুত্র নদ যখন ময়মনসিংহের দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মেঘনায় পড়তো তিস্তা তখন ব্রহ্মপুত্রে মিশতো না। তিস্তা তখন জলপাইগুড়ি অঞ্চল থেকে তিনটি ধারায় বিভক্ত হয়ে পুনর্ভবা, আত্রাই ও করতোয়া নামে প্রবাহিত হয়ে পদ্মায় মিশতো। এ তিনটি নদী পরবর্তীকালে চলন বিল অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত হতো। ভূমিকম্পের কারণে ব্রহ্মপুত্র পশ্চিম দিকে বর্তমান খাতে সরে এলে এবং বন্যায় তিস্তা পূর্ব দিকে সরে গিয়ে সরাসরি ব্রহ্মপুত্রে মিলিত হলে পুনর্ভবা, আত্রাই ও করতোয়া তাদের অগণিত শাখা নদী-উপনদী সহযোগে বৃহৎ বদ্ধ জলাশয়ের সৃষ্টি করে চলন বিলের উৎপত্তি ঘটায়।
চলন বিল আসলে একটি বিল নয়। এ বিলটি ছোট বড় নব্বইটি বিল ও আঠারোটি খালের সমষ্টি। আসলে বিল, খাল ও নদীর সমষ্টি হলো চলন বিল। চলন বিলের অন্তর্ভুক্ত বিলগুলো যথাক্রমেÑ পূর্ব মধ্যনগর, পিপরুল, ভাঙ্গাপাড়া, লারোর, তাজপুর, নিয়ালা, চলন, মাঝগাঁও, ব্রিয়াশো, চোনমোহন, শাতাইল, খাইদই, দারিকুশি, কাজীপাড়া, গজনা, বড়বিল, সোনাপাতিলা, ঘঘুদহ, কুরলিয়া, চিরল, দিক্ষিবিল ও গুরকা বিল। বড় বিলগুলো পাবনা জেলায় পড়েছে। যেমনÑ গজনা, বড়বিল, সোনা পাতিলা ঘঘুদহ, চিরল বিল ও গুরকা বিল। নদীগুলোর মধ্যে করতোয়া, বানগঙ্গা, আত্রাই, বড়াল, মরা বড়াল গুড়, ভাদাই, বরোনজা, চিকনাই, চেচুয়া তুলসি, তেলকুপি নদী উল্লেখযোগ্য। খালগুলোর মধ্যে দোবিলা খাল, কিশোরখলি খাল, নবীর হাজীর জোলা, নিয়ামত খাল বেহুলার খাড়ী, বাকাই খাড়ী, বেপানী ওমামি খাল, হজসাহেবের খাল, উলিপুর মাওড়া খাল, দারচখালি খাল, জানিগাছার জোলা, পানাউল্লা খাল, সাত্তার সাহেবের খাল উল্লেখ্য।
বিলের পানি সাধারণত স্থির থাকে। বদ্ধভাবে থাকে। আবদ্ধ থাকে। কিন্তু চলন বিলের পানি উৎপত্তিগতভাবেই আবদ্ধ বা বদ্ধ বা স্থির নয়। নদীর স্রোতের মত গতিশীল। এক সময় এর রূপ ছিল খুবই ভয়ঙ্কর। চলন বিলকে খরস্রোতা বিল বললে ভুল বলা হবে না। যদিও বর্তমান সময়ে রেললাইন হাইওয়ে সড়ক, মাঠ, ব্রিজ, কালভার্ট নির্মাণের ফলে এর স্রোতের পরিমাণ কমেছে, তবুও বর্ষার সময় এ বিলের স্রোত ব্যাপক আকার ধারণ করে। যেহেতু এ বিলের পানি স্থির নয় চলনশীল। নদীর স্রোতের ন্যায় প্রবহমান। সে কারণে এ বিলকে চলন বিল বলে। আবার অন্য দিক দিয়ে দেখলেও এর নামকরণের সার্থকতা পাওয়া যাবে। যেমন- প্রতি বছর চলন বিলে পানি এসে প্লাবিত করে এবং পানিসম্পদে ভরপুর হয়ে ওঠে। আবার শুকনো মৌসুমে চাষাবাদ কার্যক্রম ব্যাপকভাবে শুরু হয়। এ ধারাটিও চলমান। যে কারণেও এটিকে চলন বিল বলা হয়ে থাকে।
ঐতিহ্যের রক্ষক আমার সোনামণিরা, চলন বিল এ দেশের বড় ধরনের ঐতিহ্য। এ বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যে কাউকে আন্দোলিত করবে পুলকিত করবে। এ বিলে বালি হাঁস, গাংচিল, পানকৌড়ি, ডাহুকসহ নানা প্রজাতির রঙবেরঙের পাখি ও অতিথি পাখিদের কলরব, কলকাকলি, উড়ে চলা, ঘুরে বেড়ানো এবং বিভিন্ন প্রজাতির মাছের ঝাঁক বেঁধে পানির ওপর স্তরে ভেসে চলা, নানা প্রজাতির শাপলা ও পদ্মফুলের পানির বুকে শান্ত ও স্নিগ্ধভাবে ফুটে থাকা ও মৃদু বাতাসে দোল খাওয়া দেখে পর্যটকসহ যে কারো মন ভরে যায়। ভরে যাবে।
অথচ এক সময় সমুদ্রের মত পানির এই দেশে তেমন কোনো লোকের বসবাস ছিল না। এখানে কেউ আসতেই চাইতো না। বিপদে পড়লে বা দায়ে না পড়লে এ পানির রাজ্যে কেউ আসতো না। ইংরেজরা সাজা ভোগের জন্য যেমন অস্ট্রেলিয়া বা আন্দামানে মানুষ পাঠাতো, এ পানির রাজ্যেও মানুষেরা মাথায় করে ভারী দন্ড বা সাজা নিয়ে আসতো। এ দেশের এ অঞ্চলটি ছিল খুবই দুর্গম। সেটা প্রাকৃতিক ও মানুষের অস্বাভাবিক আচরণের দিক থেকেও। আসলে এখানে এক সময় দন্ডপ্রাপ্ত বা সাজাপ্রাপ্ত মানুষ বা বিভিন্ন কারণে পলাতক মানুষ ছাড়া কোনো মানুষ ছিল না। সে সময় চলন বিলের এ অঞ্চলটি সাংঘাতিক হিংস্র ছিল। আর যারা আসতো তারাও হিংস্র হয়ে উঠতো। শখের বসে কেউ এখানে আসতো না। সমাজে নানাভাবে অত্যাচারিত হয়ে কেউ বা তাড়া খেয়ে কেউ বা সামাজিক অনুশাসনের ভয়ে পড়ে, কেউ বা রাজ রাজাদের নির্মম অত্যাচার সইতে না পেরে বাসযোগ্যহীন এই দুর্গম পানিময় স্থানে এসে বাস করতো। পূর্বের জীবনের দুঃখ-দুর্দশার চিত্র তাদের মধ্যে সব সময় ভেসে ওঠায় মানসিকভাবে তারা হয়ে পড়ে বিপথগামী। প্রতিশোধপরায়ণ। ফলে এ অঞ্চলটি তখন কিছু মানুষের আশ্রয়স্থল হলেও এটি আসলে পরিণত হয় হিংস্র পশুদের এলাকা বা দস্যুদের এলাকায়। ডাকাতদের এলাকায়। যেখানে কেউ নিরাপদ ছিল না। সে সময় চলন বিলের ডাকাতদের জমিদারি দেয়ার বিনিময়ে অনেক ডাকাত-দস্যু স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করে। ফলে চলন বিল অঞ্চল ক্রমান্বয়ে স্বাভাবিক হতে শুরু করে। ১৯১৪ সালে সিরাজগঞ্জ থেকে ঈশ্বরদী পর্যন্ত পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা রেললাইন স্থাপন করা হলে চলন বিল অঞ্চল দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
পাকিস্তান আমলে নানা নির্মাণকাজ শুরু হলেও চলন বিল অঞ্চলে রাস্তাঘাট নির্মাণ শুরু হয় স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে। এ সময়ে রাস্তাঘাট ও ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ করার ফলে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন সম্পন্ন হয়। অন্য দিকে ২০০১ সালে বনপাড়া হাটিকুমরুল মহাসড়ক নির্মিত হলে যোগাযোগ ব্যবস্থায় আরো উন্নতি সাধিত হয়। ফলে চলন বিল অঞ্চলের মানুষের থানা, জেলা ও বিভাগীয় শহরে যোগাযোগ ও যাতায়াত করা পথ সহজ ও সুন্দর হয়।
ছোট বন্ধুরা, চলন বিলের মাছ এ দেশের মানুষের অনেকখানি চাহিদা মেটাতো। এ বিল মাছের বৈচিত্র্যে ভরা ছিল। যেসব মাছ এ বিলে পাওয়া যায় সেগুলো নিম্নরূপÑ শোল, টাকি, বোয়াল, গজার, চিতল, ফলি, রুই, কাতল, মৃগেল, কালবাউশ, কই, মাগুর, শিং, বাচা বাটকা, শিলং, গুচি, পাবদা, ভেদা, খসল্ল্যা, বিটা, বাঘাইর, সরপুঁটি, তিতপুঁটি, পাঁচ চোখা, কাইখল্যা, বাঁশপাতা, ঘাইরা, মোসি, চান্দা, খলিসা, বাঈন, ফাঁসি, পাঙ্গাশ, গাগর, এলং, গুতুম, পটকা, বউ, টেংরা, বাইলা, বাতাসী, দারকিনা, চ্যাং, চ্যালা ও বিভিন্ন প্রজাতির চিংড়িসহ অনেক মাছ।
বিলের পানি কমা শুরু হলে দেশী এ মাছগুলো বেশি পরিমাণে ধরা পড়ে। এ মাছকে ঘিরেই চলন বিল অঞ্চলে গড়ে উঠেছে প্রায় তিনশতাধিক শুঁটকির চাতাল। রোদে শুকিয়ে তৈরি করা হয় শত শত মণ শুঁটকি। ভাদ্র মাসে সাধারণত শুরু হয় এ শুঁটকি তৈরির কাজ। চালু থাকে আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত। চলন বিল অঞ্চলের শুঁটকি ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, দিনাজপুর, রংপুর, সৈয়দপুর ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
সুন্দরবনকে পাখির রাজধানী বলা হলে চলন বিলকে বলতে হবে পাখির রাজকীয় বিভাগীয় শহর। এ বিলে হরেক রকম প্রজাতির পাখির দেখা মেলে। দেশীয় পাখি ছাড়াও বিদেশী নানা অতিথি পাখির কলরবে চলন বিল অঞ্চল সরগরম থাকে। যেসব পাখির দেখা মেলে তাদের মধ্যে কিছু পাখির নাম নিম্নে উল্লেখ করা হলো :
বালিহাঁস, বাটুলে, তিরমূল, মুরগিহাঁস, বকধেনু, কাছিচোরা, খয়রা, মানিকজোড়, ডুটরা, চা পাখি, নলকাক, বোতক, সাদাবক, কানাবক, লোহাড়াং, শামুকখোল পানকৌড়ি, কায়ুম, ফেফী, ইচাবক, রাতচোড়া, ভুবনচিলা, মাছরাঙা, পানিকউর, ডাহুক, চখাচখি ইত্যাদি। চাটমহরের বিল কুরালিরা খলিসাগাড়ী, চিরইল, জিয়েলগাড়ী, ডিকশিবিল, শাপলার বিল ও ঝাঁকড়ার বিলে সবচাইতে বেশি পাখির দেখা মেলে।
উদ্ভিদ প্রজাতির মধ্যে নানা প্রজাতির শাপলা ফুল, পদ্মফুল ও নানা গুল্মলতা, পদ্মমধুসহ নানা রকম পানির ফলের সমাহার এ বিল অঞ্চল। স্বাদু পানির নানা মাছ ছাড়াও চলন বিলের পানিতে নানা প্রজাতির সাপ, কচ্ছপ, কুচিয়া ও নানা প্রজাতির শামুক ঝিনুকসহ অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী পাওয়া যায়।
চলন বিল শুধু বিল নয়, এ বিলের যেমনি রয়েছে ইতিহাস তেমনি রয়েছে তার ঐতিহ্য। এ বিল অঞ্চলে আজও কালের সাক্ষী হয়ে রয়েছে মোগল ও পাঠান স্থাপত্য। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ সম্রাট আকবরের সেনাপতি মাসুম খাঁর মসজিদ। বিখ্যাত লেখক প্রমথনাথ বিশীর আদি জমিদার বাড়ি, নাটোর রাজবাড়ী, দিঘাপতিয়া জমিদার বাড়ি। বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরের সহচর প্রতারক বিশ্বাসঘাতক জগৎশেঠের বাংলো। বেহুলা লখিন্দরের ব্যবহৃত নৌকা, কূপ। তাড়াশে রয়েছে বেহুলার ভিটা। সেনাবাহিনী প্রধান জি এন চৌধুরীর জ্ঞাতি পুরুষদের বাড়ি। চাটমহরে আছে সমাজশাহি মসজিদ। রয়েছে গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজিপুর গ্রামে চলন বিলে প্রাপ্ত জিনিসপত্রের জাদুঘর। বুড়ো পীরের মাজার রয়েছে সমাজ শীতালাই গ্রামে। সম্রাট শেরশাহ পুত্র শাহজাদা সেলিম নির্মিত মসজিদ, আশরাফ জিন্দানী (রহ:)-এর মাজার ও খানিকটা পথ অতিক্রম করলেই শীতালাই জমিদার বাড়ির দেখা মিলবে।
বিলের আকার আকৃতি, অর্থনৈতিক নানা সম্পদ যেমন মাছ ও অন্যান্য পানির প্রাণী, হরেক প্রজাতির পাখি বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদ প্রজাতিসহ গুল্মলতা, ফুল, ফল, ইতিহাস-ঐতিহ্য বিলের নৈসর্গিক সৌন্দর্যÑ সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বিলের রানী হলো এই চলন বিল।
ছোট বন্ধুরা, তোমাদের খারাপ লাগছে না তো? হয়ত না। তবে এখন চলন বিলের যেসব বিষয় নিয়ে লিখবো সেগুলো পড়লে তোমাদের খারাপ লাগতে পারে। কারণ এত ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জীববৈচিত্র্য ভরা এত রূপের চলন বিলের বিরূপ কথা পড়লে খারাপ লাগাটাই স্বাভাবিক। তবে এ বিলটি ভালো রাখতে তোমাদের জানার কোনো বিকল্প নেই। তাই কথা কম বলে এ বিষয়ে কিছু কথা লিখেই শেষ করতে চাচ্ছি।
আগেই বলেছি এক সময় চলন বিল ছিল এক হাজার পঁচাশি বর্গ কিলোমিটার। সেটি কমে কমে বর্তমানে ৩৬৮ বর্গ কিলোমিটারে এসে দাঁড়িয়েছে। এটা হলো আকারের দিক থেকে কমে যাওয়া। অন্য দিকে চলন বিলের পানিতে ছিল হাজার হাজার প্রাণী। বাংলাদেশের মিঠা পানির ২৬০ প্রজাতির মিষ্টি মাছের মধ্যে প্রায় অধিকাংশ মাছই এই চলন বিলে পাওয়া যেত। কিন্তু এখন তার ধারেকাছেও নেই। গালিব এবং তার সহযোগী গবেষকরা ২০০৯ সালে গবেষণা করে দেখেছেন এ বিলে এখন ৮১ প্রজাতির মাছ পাওয়া যাচ্ছে। আর এর মধ্যে ৭২টি দেশীয় এবং ৯টি বিদেশী প্রজাতির মাছ। চলন বিলের কই মাছ খুবই বিখ্যাত ছিল। রাজ-রাজা, জমিদার, প্রধানমন্ত্রীদের প্রিয় খাবার ছিল এই চলন বিলের কই। কিন্তু আজ কোথায় সেই চলন বিলের কই! যা আছে, তাকে থাকা বলে না। বলে, না থাকা। তাহলে বুঝতেই পারছো, মাছের বর্তমানে কী অবস্থা এ বিলে। শুধু তা-ই নয়, অন্যান্য মাৎস্যসম্পদ যেমন শামুক, ঝিনুক, কুচিয়া, চার প্রজাতির কচ্ছপও সাপের সংখ্যা এখন যারপরনাই কমে গেছে। কমে গেছে পাখির বিভাগীয় শহর চলন বিলের নানা প্রজাতির পাখি। আগের মতো পাখির দেখা আর চলন বিলে চোখে পড়ে না। না দেশী পাখি না অতিথি পাখি। চোখে পড়ে না পাখিদের হৃদয় জাগনিয়া কলতান। নানা বর্ণের শাপলা ও পদ্ম ফুলের সমারোহে কোথাও কোথাও পাখির স্তর চোখে পড়তো না। মনে হতো পানির ওপর শাপলা ও পদ্য ফুলের গালিচা পাড়া কোনো স্বর্গীয় স্থান। সে রকম আর চোখে পড়ে না। চোখে পড়ে না বিভিন্ন গুল্মলতা। বর্ষার প্রথম থেকে হেমন্ত পর্যন্ত বিখ্যাত এ চলন বিলে ঘাড় ও মাথা উঁচু করে সটান দাঁড়িয়ে থাকতো চোখ জুড়ানো বেগুনি লাল ও সাদা শাপলা। এগুলোর পরিমাণ কমে গেছে অতিমাত্রায়।
বন্ধুরা, এগুলো কমে যাবার পেছনে রয়েছে মানুষ। মানুষই নানাভাবে এসব প্রাণী প্রজাতি ও উদ্ভিদ প্রজাতির সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে এসব প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতি বিপন্ন হওয়ার ফলে চলন বিলের পরিবেশ বিপন্ন হয়ে পড়েছে। তোমাদের আগেই বলেছি এ অঞ্চলে বিভিন্ন শ্রেণীর আদিবাসীর বাস রয়েছে। তারা এসব প্রাণীকে সরাসরি তীর-ধনুক দিয়ে হত্যা করে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। ইদানীং এক শ্রেণীর অর্থলোভী মানুষ এসব আদিবাসীকে ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রজাতির কচ্ছপ বিশেষ করে সন্ধি কচ্ছপ তাদের কাছ থেকে নিয়ে প্রতিটি ৪-৫ শত টাকা দরে ক্রয় করছে। এগুলো ক্রয় করে তারা আরো চড়া দামে ভারত, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, কম্বোডিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার করছে। প্রতিদিন মণকে মণ কচ্ছপ এভাবে পাচার হতে হতে এদের সংখ্যা এখন চলন বিলে প্রায় শূন্যের কোঠায়। একইভাবে অতিমাত্রায় আহরণ হয় কুচিয়া এবং পাচার হয় বিভিন্ন দেশে। মাছের প্রজাতির সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছে চলন বিলে প্রতি বর্ষা মৌসুমে ডাকাতি করে। বাউত নেমে অর্থাৎ হাজার হাজার লোক সংঘবদ্ধ হয়ে চিরুনি অভিযানের মতো করে পলোসহ বিভিন্ন ধরনের জাল ব্যবহার করে চলন বিলের মাছ লুণ্ঠন করছে বললে আমার ভুল বলা হবে না। তা ছাড়া চাষাবাদের সময় বিভিন্ন কীটনাশক, সার, ব্যবহার; মানুষের অসচেতনতা দায়িত্বহীনতার জন্য পানিদূষণ এবং জনসংখ্যার বাড়তি চাহিদার জোগান দিতে অতিমাত্রায় আহরণ প্রায় সময় হচ্ছেই। অন্য দিকে দেশী ও বিদেশী মাছ চাষকার্যক্রম অতিমাত্রায় এগিয়ে নিতে এসব ছোট মাছ বা বিভিন্ন ধরনের মাছকে অবাঞ্ছিত মাছ বা রাক্ষুসে মাছ বলে বিষ দিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে। অন্য দিকে ডিমওয়ালা মাছ, পোনা মাছ অবাধে ধ্বংস করা হচ্ছে। বিলের গভীরতা পলি জমে জমে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। আগের মত সারা বছর সবখানে পানি থাকে না। শুকিয়ে যায়। ফলে দেশী নানা মাছ, শাপলা, পদ্ম ও নানা গুল্মলতা ও পানির অন্যান্য প্রাণী কমে যেতে যেতে শূন্যের কোঠায় নেমে আসছে, যা ঐতিহ্যবাহী এ বিলের জন্য হুমকি হয়ে দেখা দিচ্ছে। চলন বিলের নদীগুলোর অবস্থা খুবই করুণ হচ্ছে। ফলে নৌচলাচল এখন প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দখল, দূষণ ও ভরাট হওয়ায় এসব নদী সরু হয়ে পানির অভাবে এমনটি হচ্ছে। এক সময় নদী আর নৌকা নিয়েই বিলের নাজিরপুর, সিংড়া, গুরুদাসপুর, চাচকৈড়, তাড়াশের ঠামাইচ নাদো, সৈয়দপুর, চাটমোহরের ছাইকোলা, অষ্টমনিষা, মির্জাপুর ও ভাঙ্গুড়ায় গড়ে উঠেছিল বড় বড় নৌবন্দর। এখন এগুলো শুধুই স্মৃতি। ফলে চলন বিলের চলন ঐতিহ্য এখন হারাতে বসছে। চলন বিলে দেশী প্রজাতির নানা পাখিসহ অতিথি পাখিদের পেশাদার ও সৌখিন শিকারিরা নির্বিচারে গুলি করে অথবা ফাঁদে ফেলে মেরে ভূরিভোজন ও কেউ কেউ রমরমা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। পাখিনিধন দ-নীয় অপরাধ হলেও আইনের প্রয়োগ হচ্ছে বলবো না, বলতে হবে নেই বললেই চলে। সে কারণে পাখির বিভাগীয় শহর চলন বিলে আর আগের মতো পাখি নেই। কমে যাচ্ছে এসব নিরীহ পাখি। এ ছাড়া চলন বিলের আনাচে কানাচে ফেরিঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট, বিভিন্ন নদীতে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষসহ নানাবিধ কারণে চলন বিলের অবস্থা এখন যারপরনাই খারাপের দিকে যাচ্ছে।
ছোট বন্ধুরা! তাই তোমাদের ও আমাদের ঐতিহ্যবাহী এ চলন বিল সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান অর্জন করতে হবে এবং পদক্ষেপ নিতে হবে যার যার অবস্থান থেকে চলন বিলের সম্পদগুলোকে রক্ষা করার। সর্বোপরি এ দেশের ঐতিহ্যবাহী চলন বিলকে রক্ষা করার।

SHARE

Leave a Reply