Home চিত্র-বিচিত্র পৃথিবীর সবচেয়ে লম্বা পোকা -মৃত্যুঞ্জয় রায়

পৃথিবীর সবচেয়ে লম্বা পোকা -মৃত্যুঞ্জয় রায়

আমি যখন তোমাদের মতো ছোট ছিলাম, পোকাদের দেখে খুব ভয় পেতাম। কাঠিপোকা দেখলে তো ভয়ে রক্ত জমে যেত। ভাবতাম, এই বুঝি ওরা উড়ে এসে আমার গায়ে ওদের বিষাক্ত কাঠি ফুটিয়ে দিলো। পরে পোকামাকড়দের নিয়ে নাড়াচাড়া আর পড়াশুনা করতে গিয়ে বুঝেছি, আসলে ওটা আমার ভুল ছিল, কাঠিপোকাদের কোনো বিষই নেই। ওরা কখনো কামড়ায় না। ওটা ছিল মিথ্যে কথা। এখন ওদের সত্যি কথাগুলোই তোমাদের বলছি। এ পোকার দেহ কাঠির মতো বলেই নাম কাঠিপোকা বা স্টিক ইনসেক্ট। তোমাদের আশপাশে ফুলের গাছে খুঁজলে কাঠিপোকাদের তোমরা দেখতে পাবে। পাখি বা অন্য পোকারা যাতে খেতে না পারে সেজন্যই ওদের এই ছদ্মবেশ। ওদের যারা শিকার করে তারা কাঠিপোকাদের দেখেও বুঝতে পারে না যে ওটা আসলে পোকা। বরং মরা শুকনো ডালের টুকরো বা কাঠি মনে করে ওদের না খেয়ে শিকারিরা চলে যায়। কাঠিপোকারা এমন চালাক যে, বিপদ বুঝলে ওরা ওদের পা পর্যন্ত খসিয়ে শুধু কাঠির মতো দেহটা নিয়ে গাছের ডালে আটকে থাকে। তরুণ পোকাদের পরে আবার সেখান থেকে পা গজায়। ওরা বারবারই এ কাজ করতে পারে।
স্ত্রী কাঠিপোকারা পুরুষ পোকার কোনো সাহায্য ছাড়াই ডিম উৎপাদন ও বাচ্চার জন্ম দিতে পারে। এসব ডিম থেকে সাধারণত মেয়ে পোকার জন্ম হয়। কিন্তু কখনো যদি কোনো পুরুষ পোকার সাথে মেয়ে কাঠিপোকার মিলন হয়, তাহলে সেসব মেয়ে পোকাদের প্রায় অর্ধেক বাচ্চা হয় পুরুষ। মেয়ে কাঠিপোকারা ইচ্ছে করলে সারা জীবন কোনো পুরুষের সাথে মিলিত না হয়ে বা পুরুষ পোকার সাথে না থেকেও শত শত বাচ্চার জন্ম দিতে পারে। গবেষকরা ওদের এমন অনেক দলই দেখেছেন যে দলে একটাও পুরুষ কাঠিপোকা নেই। মেয়ে কাঠিপোকা শুধু ডিম দিয়েই খালাস, বাচ্চাদের ওরা কোনো দেখাশুনা করে না। গাছের ডালে বসে মেয়ে পোকারা দানার মত শত শত ডিম গাছের তলায় মাটি বা ঘাসের ওপরে ছেড়ে দেয়। ডিমগুলো দেখতে বীজের মতো দেখায়। ফলে ডিমখেকো প্রাণীরা ওদের ডিমও খায় না। পিঁপড়ারা আবার বীজ মনে করে খাওয়ার জন্য ওদের ডিম কাঁধে করে ওদের বাসায় নিয়ে যায়। কিন্তু বাসায় নেয়ার পর খেতে গিয়ে যখন পিঁপড়ারা বুঝতে পারে যে ওগুলো আসলে বীজ না, অন্য পোকার ডিম তখন তারা ওগুলো আবর্জনার গাদায় ছুড়ে ফেলে দেয়। সেখানেই ডিম ফুটে কাঠিপোকার বাচ্চারা বের হয়। কিছু কাঠিপোকা আবার বেশ সাবধানী। তারা ডিম পাড়ার পর সেগুলো বাকলের ফাঁকে বা পাতার আড়ালে লুকিয়ে রেখে দেয়।
ডিম ফুটে বাচ্চা বের হলে ওদের গায়ের রঙ গাঢ় না হওয়া পর্যন্ত ওরা বিপদের ঝুঁকিতে থাকে। কেননা, এ অবস্থায় শিকারিরা সহজে ওদের চিনে ফেলে ও খেয়ে ফেলে। এজন্য বাচ্চারা দ্রুত খোলস বদলানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠে। খোলস বদলানো ওদের কাছে যেন জামা বদলানোর মতোই একটা ব্যাপার। বদলানো খোলস পড়ে থাকলে তা দেখেও শিকারিরা ওদের অস্তিত্ব হয়তো বুঝতে পারবে। সে জন্য বদলানোর পর সেসব খোলসও বাচ্চারা খেয়ে ফেলে। এসব খোলস খাওয়ার পর তা ওদের দেহে প্রোটিনের মতো কাজ করে। যদি কখনো ওরা কোনো শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হয়, তাহলে ওরা মুখ-পা উঁচিয়ে শত্রুকে প্রথমে ভয় দেখায়। তাতে ব্যর্থ হলে দেহ থেকে এক ধরনের দুর্গন্ধযুক্ত রাসায়নিক পদার্থ শত্রুর দিকে ছিটিয়ে দেয়। এই জিনিস শত্রুর মুখে লাগলে মুখ এমন বিস্বাদ হয়ে যায় যে তার খাওয়ার রুচিই নষ্ট হয়ে যায়। এটা অনেকটা টিয়ার গ্যাসের মতো।
কাঠিপোকাদের দেহের রঙ বাদামি, কালো বা সবুজ হয়। ওদের দেহের যেরূপ রঙ সেরূপ রঙের গাছেই ওরা থাকে ও সেসব গাছ খায়। এজন্য এদের অন্য নাম ছদ্মবেশী পোকা। কিছু কাঠিপোকা বিশ্রামের সময় তাদের দেহের রঙ বদলাতে পারে। ওদের পাখা আছে। তবে সচরাচর তা ওরা লুকিয়ে রাখে। যদি কখনো কোনো পাখি বা শত্রুর মুখে পড়ে যায়, তবে তখন ওরা ওদের সেই রঙিন পাখা ঝাপটে শত্রুকে বিভ্রান্ত করে। এমনকি কখনো কখনো ওরা শত্রু দেখলে মরার মতো ভান করে নিশ্চল পড়ে থাকতে পারে। শিকারিরা কখনো মরা পোকা খায় না। তাই কাঠিপোকাদের মরা পোকা ভেবে না খেয়ে চলে যায়। পৃথিবীতে অনেক প্রজাতির কাঠিপোকা আছে। চযড়নধবঃরপঁং পযধরহ প্রজাতির কাঠিপোকা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে লম্বা পোকা। এ পোকার দেহ ১৪ ইঞ্চি লম্বা আর পা ছড়িয়ে বসলে হয় ২২ ইঞ্চি লম্বা! বোর্নিওতে এ পোকারা আছে।

SHARE

Leave a Reply