Home ধারাবাহিক: দুর্গম পথের যাত্রি দুর্গম পথের যাত্রী -আসাদ বিন হাফিজ

দুর্গম পথের যাত্রী -আসাদ বিন হাফিজ

(গত সংখ্যার পর)

যুবক সন্ধ্যার অন্ধকারে হাঁপাতে হাঁপাতে শহরে পৌঁছলো। নিজের ঘরের দিকে না গিয়ে সে চললো রাসূল (সা)-এর হুজরাখানায়। লোকজন তাকে দেখেই বুঝতে পারলো কিছু একটা ঘটেছে। বলল, ‘কী হয়েছে আবিদ?’
আবিদ কারো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সোজা রাসূলের দরবারে হাজির হলো। রাসূলের কাছে খুলে বললো সব ঘটনা। বলল, ‘এক মহিলা এক দ্রুতগামী উটনীতে চড়ে মক্কার দিকে ছুটে যাচ্ছে। তার মাথার চুলের ভেতর আছে ইহুদিদের দেয়া এক পত্র। পত্রটি সে নিয়ে যাচ্ছে আবু সুফিয়ানের কাছে। এখনো সে পথেই আছে।’
সব শুনে মহানবী (সা) হযরত আলী (রা) এবং হযরত জোবায়ের (রা)কে ডেকে পাঠালেন। তারা এলে তাদেরকে জানালেন সব ঘটনা। এরপর তাদের নির্দেশ দিলেন দ্রুত মক্কার পথে রওনা হতে এবং মহিলাকে পথেই আটক করে তাকে নিয়ে আসতে।
রাতের আঁধারেই বেরিয়ে পড়লেন দুই সাহাবী। তাদের দু’জনেরই ছিল তেজস্বী আরবি ঘোড়া। মদিনার পথ দু’জনেরই ভালো করে জানা ছিল। মরুভূমিতে রাতের অন্ধকার খুব গাঢ় হয় না। চাঁদ না থাকলেও তারার আলোতেই পথঘাট পরিষ্কার দেখা যায়। সেই আবছা আলোতে বিরামহীন গতিতে ছুটলেন দুই মহান সাহাবী। হিসাব করে দেখলেন, একজন নারীর উটে চড়ে কতদূর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। কল্পনায় সেই নারীকে দেখতে পাচ্ছিলেন তারা। ভেবে দেখলেন, মহিলার সাথে খাবার আছে, পানি আছে। অতএব সে কোনো লোকালয়ে আশ্রয় নেয়ার চাইতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে কোনো মরূদ্যানে বিশ্রাম করাকেই অধিক ভালো মনে করবে। তারা পথের দু’পাশের মরূদ্যানগুলো ভালো করে দেখে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তাদের ধারণাই সত্যি হলো। মধ্যরাতের কিছু পর এক মরূদ্যানে তাকে পেয়ে গেলেন তারা।
পরদিন ভোর। রক্তিম সূর্য উঠলো পূর্বাকাশে। ফজরের পর মদিনাবাসী দেখলো মক্কার দিক থেকে ছোট একটি কাফেলা এগিয়ে আসছে। কাফেলা আরো নিকটবর্তী হলে দু’টি ঘোড়া ও একটি উটের অবয়ব স্পষ্ট হলো। আরেকটু এগিয়ে এলে তারা চিনতে পারলো তাদের। উটনীর ওপর সেই মহিলা আর দু’পাশে সাহাবী আলী ও জোবায়ের (রা)।
মহিলাকে নিয়ে যাওয়া হলো রাসূলে করীম (সা)-এর কাছে। নবীজীর কাছে পেশ করা হলো উদ্ধারকৃত চিঠি। এটা সেই চিঠি যা এই মহিলার চুলের মধ্যে ছিল। তাকে পাকড়াও করার পর আলী (রা) প্রথম যে কথাটি বলেছিলেন তা হলো, ‘তোমার চুলের মধ্যে যে চিঠিটা আছে সেটা আমার হাতে দাও।’
মহিলা বিস্মিত হয়েছিল। এ চিঠির বিষয় তো কারো জানার কথা নয়। মহিলা তবু আগন্তুকদের যাচাই করার জন্য বলেছিল, ‘কিসের চিঠি? কোন চিঠির কথা বলছেন আপনারা? আমিতো আপনাদের কোনো কথাই বুঝতে পারছি না।’
আলী (রা) বললেন, ‘অযথা চালাকি করে নিজের বিপদ বাড়িয়ে লাভ কী? আবু সুফিয়ানের কাছে দেয়ার জন্য যে চিঠিটা নিজের চুলের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছো সেটা আমার হাতে দাও। তোমাকে আমরা ভালো করেই চিনি। তুমি কোথায়, কী কাজে যাচ্ছো সেটাও আমাদের জানা আছে। দুর্ভাগ্য তোমার, মক্কা আর যাওয়া হবে না তোমার। এখানে বিশ্রাম নেবে সে সময়ও দিতে পারছি না। চিঠিটা আমার হাতে দিয়ে মদিনায় ফিরে চলো।’
ইহুদি মহিলা আর কথা বাড়ায়নি। সে চুলের খোঁপা খুলে চিঠিটি আলী (রা)-এর হাতে তুলে দিল।
হুজুর (সা) চিঠিটি মনোযোগ দিয়ে পড়লেন। তাঁর চেহারা মোবারক রাগে লাল হয়ে গেল। এ চিঠির বিষয়বস্তু ছিল খুবই মারাত্মক। তাতে মুসলমানদের যুদ্ধযাত্রার বিশদ বর্ণনা ছিল। আর ছিল পথে কোন কোন ইহুদি গোত্র মুসলমানদের ওপর গুপ্ত হামলা চালাবে তার বর্ণনা। মক্কার কোরাইশরা কাদের কাছ থেকে কী ধরনের সাহায্য পেতে পারে তারও পরিকল্পনা ছিল এই চিঠিতে। মহিলা নিজের দোষ স্বীকার করলো আর যে ইহুদি তাকে পাঠিয়েছিল তার নাম বলে দিল। সাথে সাথে সে বাড়ি ঘেরাও করে তাতে তল্লাশি চালানো হলো, কিন্তু চালাক ইহুদি তার আগেই সেখান থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। মহিলার অপরাধ এতই মারাত্মক ছিল যে, মহানবী (সা) তার মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করলেন।
এ ঘটনার পর অভিযান চালাতে কিছুতেই বিলম্ব করা সমীচীন মনে করলেন না মহানবী (সা)। তিনি সেনাপতির নাম ঘোষণা করে অভিযান শুরু করার হুকুম দিলেন। মুসলিম বাহিনী মদিনা ছেড়ে মক্কার পথ ধরলো। এই বাহিনীতে অশ্বারোহী ও পদাতিক মিলিয়ে সৈন্যসংখ্যা ছিল দশ হাজার। এই বাহিনীতে মদিনার পাশের দুটি কবিলার লোকও ছিল, যারা ছিল নওমুসলিম। এ ছাড়া মুসলমানদের সাথে সহযোগিতার চুক্তিতে আবদ্ধ কিছু অমুসলিমও শরিক ছিল।
ঐতিহাসিকরা লিখেছেন, মুহাম্মদ (সা)-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী দ্রুত মক্কার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। তাদের জোশ ও জজবা ছিল অতুলনীয়। সৈন্যসংখ্যাও আগের যেকোনো অভিযানের তুলনায় ছিল অধিক। মুসলিম বাহিনী কোনো রকম প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই ঝড়ের গতিতে এগিয়ে গিয়ে মক্কার মাত্র দশ মাইল দূরে ওয়াদিয়া ফাতেমা নামক প্রান্তরে পৌঁছলো। জায়গাটা ছিল মক্কা থেকে উত্তর-পশ্চিমে। নবী করীম (সা) নির্বিঘেœ মক্কার সন্নিকটে পৌঁছতে পেরে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন। তিনি নিশ্চিত, মক্কাবাসী মুসলমানদের এই আগমনের কোনো খবর পায়নি। এখন খবর পেয়েও আর তেমন কোনো লাভ হবে না। কারণ অন্য কারও সাহায্য চাওয়ার মতো সময় তাদের হাতে নেই।
নবী করীম (সা) ওয়াদিয়া ফাতেমায় মুসলিম বাহিনীকে হালকা তাঁবু খাটিয়ে বিশ্রামের হুকুম দিলেন। তারপর কয়েকজনকে ছদ্মবেশে পাঠিয়ে দিলেন মক্কায়। নবী করীম (সা) যখন বুঝলেন, মুসলিম বাহিনীর পথশ্রমের ক্লান্তি খানিকটা কমেছে এবং এখন তারা আবার পূর্ণোদ্যমে চলতে সক্ষম তখন তাদেরকে তাঁবু গুটিয়ে প্রস্তুত হতে বললেন। মক্কায় যাদের পাঠিয়েছিলেন তারা তখনো ফিরে আসেনি। মহানবী (সা) বাহিনীকে সামনে অগ্রসর হতে হুকুম দিলেন। মুসলিম বাহিনীর অগ্রবর্তী দল যখন জুকা নামক স্থানে পৌঁছলো তখন তারা দেখতে পেলো মক্কার দিক থেকে একটি ছোট্ট কাফেলা এগিয়ে আসছে। অগ্রবর্তী বাহিনী ওখানেই থেমে গেল এবং তাদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। প্রিয় নবী (সা) তখন অগ্রবর্তী বাহিনীর সঙ্গেই ছিলেন। তিনি কাফেলাকে কাছে আসতে দিলেন। মহানবী (সা) দেখলেন এই কাফেলা মক্কার একটি বিশিষ্ট পরিবারের। নবীজি (সা) তাদের ভালোমতই চিনতেন। আব্বাসীয় বংশের প্রবীণ পুুরুষ আব্বাস তাঁর পুরো পরিবার নিয়ে মক্কা থেকে মদিনায় রওনা হয়েছেন। এই সেই ব্যক্তি, যিনি ইসলামের ইতিহাসে হযরত আব্বাস (রা) নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন।
কাফেলাপ্রধান মহানবী (সা)কে চিনতে পেরে নিঃসঙ্কোচে তাঁর কাছে এগিয়ে গেলেন। মহানবী (সা) বললেন, ‘আপনি কেন? আপনি কি এই কারণে পালিয়ে যাচ্ছেন যে, এখন মক্কায় কেয়ামত শুরু হবে?’
‘খোদার কসম! মক্কাবাসীরা কেউ জানেই না যে, তাদের মাথার ওপর কেয়ামতের প্রলয় নিয়ে মুসলমানরা চলে এসেছে। না মুহাম্মদ, ভয়ে নয়, আমি মনেপ্রাণে তোমার আনুগত্য কবুল করার জন্য মদিনা রওনা হয়েছিলাম।’
‘আমার নয়, আনুগত্য সেই আল্লাহর গ্রহণ করুন যিনি আমাদের সকলের উপাস্য, যিনি আমাদের ¯্রষ্টা ও রব। ইবাদাতের যোগ্য একমাত্র তিনি, আমি শুধু তাঁর প্রেরিত রাসূল।
আব্বাস (রা) ওখানেই পুরো পরিবারসহ ইসলাম কবুল করলেন। মহানবী (সা) বুকে জড়িয়ে ধরলেন আরবের প্রবীণ এই নেতাকে। মক্কাবাসী এখনো তাঁর আগমন সংবাদ জানে না এ খবর শুনে নবীজি (সা) বেশ খুশি হলেন। তিনি বাহিনীকে আবারও তাঁবু খাটানোর হুকুম দিয়ে আব্বাস (রা)কে নিয়ে নিজের তাঁবুতে বসলেন। কী কারণে এবং কোন প্রেক্ষাপটে তিনি এখানে এসেছেন আব্বাস (রা)কে তা খুলে বললেন। আব্বাস (রা) ছিলেন মক্কার একজন প্রবীণ নেতা। মহানবী (সা)-এর কথা শুনে তিনি বললেন, ‘তুমি উপযুক্ত কাজ করেছো। তোমার সাথে এখন দশ হাজার সৈন্য আছে। এই বাহিনী নিয়ে তুমি ঘুমন্ত মক্কাবাসীকে পিষে মারতে পারবে। এই তা-বে অসহায় নারী ও শিশুরাও মারা পড়বে। আমি যতদূর জানি, আমার মতো আরো অনেকেই তলে তলে তোমার আনুগত্য কবুল করার কথা চিন্তা করছে। এমনও হতে পারে, তুমি চাইলে তারা তোমার দলে শামিল হয়ে যাবে। কিন্তু বেপরোয়া অভিযান চালালে তারা এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। আরেকবার কি মক্কাবাসীকে তোমার সঙ্গে আসার মওকা দেয়া যায় না?’
একজন জনদরদি নেতার মতোই ছিল আব্বাস (রা)-এর কথা। তিনি এমন এক লোকের কাছে এ আবেদন রাখছিলেন যিনি দুনিয়ায় এসেছিলেন জগদ্বাসীর রহমত তথা রাহমাতুল্লিল আলামিন হিসেবে। ছোট্ট একটি ঘটনা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিল। তিনি আব্বাস (রা)কে বললেন, ‘আপনি মক্কা ফিরে যান। মক্কাবাসীকে জানান আমাদের আগমন সংবাদ। আবু সুফিয়ানকে বলবেন, ‘লড়াই করে সে মৃত্যু ছাড়া কিছুই পাবে না। তারচেয়ে মক্কার কর্তৃত্ব আমাদের হাতে ছেড়ে দিতে বলুন, কারো গায়ে আমরা আঁচড়ও কাটবো না।’
আব্বাস (রা)-এর আর মদিনা যাওয়া হলো না, যেভাবে তিনি মক্কা থেকে বেরিয়েছিলেন সেভাবেই আবার ফিরে চললেন মক্কায়।
আবু সুফিয়ান মদিনায় মুসলমানদের যে অবস্থা দেখে গিয়েছিলেন তাতে তার মন ছিল উতলা। মুসলমানদের শৌর্যবীর্য, জোশ আর ত্যাগের কথা মনে হলে ভয়ে তার মন ছিটিয়ে যায়। যদিও তার স্ত্রী হিন্দা এবং সেনাপতি আকরামা ও সাফওয়ান তাকে সাহস ও উদ্দীপনা দেয়ার চেষ্টা করে কিন্তু তিনি কিছুতেই মদিনার মুসলমানদের জজবার কথা ভুলতে পারেন না। তার মন বলে, যেকোনো দিন মুসলমানরা অতর্কিতে মক্কার ওপর আঘাত হানতে পারে। হয়তো একদিন ঘুম থেকে উঠে তিনি দেখবেন, মুসলমানরা মক্কা ঘেরাও করে বসে আছে। এমন মনে হওয়ায় তার প্রতিটি মুহূর্ত কাটছিল ভীতি ও শঙ্কার মধ্যে। এক ধরনের অস্থিরতা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল তাকে। নিঃসন্দেহে তিনি একজন বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ মানুষ ছিলেন। সে জন্যই অস্থিরতা তার বেড়েই চলছিল। মক্কার নেতা তিনি। কী করে তিনি মৃত্যুভয়হীন একদল লোকের হাত থেকে নিজের জনগণ ও শহরকে রক্ষা করবেন? এ প্রশ্ন তাকে আরো পেরেশান করে তুলছিল। মদিনা থেকে ফিরে আসার পর মাঝেমধ্যেই তিনি একাকী ঘোড়া হাঁকিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। একসময় লক্ষ্য করতেন, তার ঘোড়া তাকে নিয়ে মক্কা থেকে বেরিয়ে মদিনার পথে চলে এসেছে। তিনি তাকিয়ে থাকতেন মদিনার পথের দিকে। না, মুসলমানদের কোনো বাহিনী দেখা যাচ্ছে না। তিনি তখনকার মতো সাময়িক স্বস্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করতেন। তারপর ঘোড়ার মুখ আবার ঘুরিয়ে দিতেন মক্কার দিকে।
সেদিনও এভাবেই তিনি একাকী বেরিয়ে এসেছিলেন মক্কা থেকে। শহর থেকে মাইল দুই পথ এগিয়েও গিয়েছিলেন। মন তার ভারাক্রান্ত। আরবের প্রবীণ নেতা আব্বাস তার পরিবার পরিজন নিয়ে মদিনা রওনা হয়ে গেছেন। খবরটা আর দশ জনের মতো তার কানেও এসেছিল। এটাই ছিল তার দুশ্চিন্তার কারণ। কয়দিন আগে তাকে ছেড়ে চলে গেল তার প্রিয় সেনাপতি খালিদ। আজ চলে যাচ্ছে আব্বাস। এভাবে একের পর এক তার সঙ্গ ত্যাগ করে মুহাম্মদের দলে নাম লিখাচ্ছে মক্কার মানুষগুলো। ফলে দিনকে দিন তিনি হচ্ছেন দুর্বল আর মুহাম্মদ হচ্ছে শক্তিশালী। তিনি মদিনার পথের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তার মনে হলো কোনো ছোট্ট কাফেলা মদিনার দিক থেকে তার দিকেই এগিয়ে আসছে। তিনি ওখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। কাফেলা এগিয়ে এলো। এক সময় তিনি চিনতে পারলেন তাদের। আরে, এই তো আব্বাস! তবে কি সে তার মনোভাব পরিবর্তন করেছে? আবু সুফিয়ান ঘোড়া হাঁকিয়ে আব্বাসের কাছে গেল। বলল, ‘কী ব্যাপার আব্বাস! ফিরে এলে যে! তোমরা ভালো আছো তো?’
আব্বাস (রা) বললেন, ‘আমরা ভালো আছি। আমাদের নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই। নিজের কথা চিন্তা করো তুমি। তুমি মক্কার নেতা। মুসলমানরা অশ্বারোহী ও পদাতিক মিলে দশ হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে তোমার ঘাড়ের ওপর বসে আছে। তারা এত কাছে চলে এসেছে যে, আর একটু এগোলেই তাদের নিক্ষিপ্ত তীর মক্কার দেয়াল স্পর্শ করবে। তুমি নিজের সেনাবাহিনী ডাকবে, বন্ধুদের ডাকবে সে সময়ও তোমার হাতে নেই। তুমি মক্কার নেতা। তাদের প্রথম টার্গেট তুমি। মক্কার অন্য কাউকে হত্যা করার আগে তারা তোমাকে হত্যা করতে চাইবে। সত্যি বলছি, তোমার বাঁচার আর কোনো পথ নেই। আমার পেছনেই মুহাম্মদ তোমার জন্য ওঁৎ পেতে বসে আছে। মক্কা থেকে বেরিয়েই তার নাগাল পেয়ে যাই আমি। আমি ও আমার পরিবার তাঁর কাছে ইসলামের বাইয়াত নিয়েছি। তিনিই আমাকে ফেরত পাঠালেন। বললেন, যাও আব্বাস, আমি অযথা মক্কার মানুষের রক্তে আমার তলোয়ার রঞ্জিত করতে চাই না। আবু সুফিয়ানকে বলো মক্কার কর্তৃত্ব আমাদের হাতে ছেড়ে দিতে। নইলে মক্কার অলিতে গলিতে রক্তের বন্যা বইবে।’
আবু সুফিয়ান বুক চাপড়ে বলল, ‘আমি জানতাম এমনটি ঘটবে। আমি জানতাম একদিন মুসলমানরা ঢুকে পড়বে মক্কায়। এত তাড়াতাড়ি সেদিন এসে গেল? আজই সেই ঘটনা ঘটে গেল?’
আব্বাস (রা) তাকে সান্ত¡না দিয়ে বললেন, ‘মুহাম্মদ কোনো হিংসাপরায়ণ মানুষ নন যে, অযথাই তিনি রক্তপাত ঘটাবেন। তার কথা মেনে নিলে হয়তো তিনি রহমদিল হবেন। আমি কথা দিচ্ছি, তোমাকে বাঁচানোর জিম্মা আমার। তবে মক্কার মানুষের জীবন বাঁচানোর জিম্মা তোমাকে নিতে হবে। চলো তাঁর কাছে যাই। তিনি কোনো অন্যায় করেন না, অন্যায়কে প্রশ্রয়ও দেন নো। নিশ্চয়ই তিনি মক্কার মানুষকে বাঁচানোর কোনো সুযোগ দেবেন। চলো, তাঁর কাছেই চলো। আমাদের এ শহরকে ধ্বংস ও বরবাদির হাত থেকে রক্ষা করো। মক্কার মানুষকে বাঁচাও।’
আবু সুফিয়ান যেন স্বপ্নের জগৎ থেকে ফিরে এলেন। আব্বাস (রা)-এর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘চলো।’
আব্বাস (রা) তার পরিবার পরিজনকে মক্কায় ফিরে যাওয়ার হুকুম দিয়ে আবু সুফিয়ানকে নিয়ে মুসলমানদের ক্যাম্পের দিকে চললেন। তারা যখন মুসলিম তাঁবুতে পৌঁছলেন তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। এ সময় মুসলিম শিবিরের প্রহরীদের কাজ তদারক করছিলেন হযরত ওমর (রা)। তিনি আব্বাস (রা)-এর সাথে আবু সুফিয়ানকে দেখে রেগে গেলেন। বললেন, ‘আল্লাহর দুশমনের এত বড় সাহস, সে রাসূল (সা)-এর অনুমতি না নিয়েই আমাদের শিবিরে চলে এসেছে?’ তিনি আবু সুফিয়ানকে হত্যার অনুমতি নেয়ার জন্য ছুটে গেলেন রাসূলের দরবারে। প্রায় একই সময় সেখানে পৌঁছলেন আব্বাস (রা) ও আবু সুফিয়ান।
আব্বাস (রা) বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি একে চিনেন। এই ব্যক্তি মক্কার সবচেয়ে সম্মানিত বংশের সরদার। মক্কার নেতা। তিনি আপনার কাছে কিছু আবেদন পেশ করতে চান।’
রাসূল (সা) উত্তেজিত ওমর (রা)কে বিদায় দিয়ে আবু সুফিয়ানের দিকে তাকালেন। আবু সুফিয়ানের গর্বিত মুখমন্ডলে এখন আর কোনো উদ্ধত ভাব নেই। তার ফর্সা চেহারা বেদনামলিন। মহানবী (সা) আব্বাস (রা)-এর দিকে ফিরে বললেন, ‘রাত হয়ে গেছে। তিনি কী বলতে চান ভালোভাবে ভেবে নিতে বলুন। আজ আর কোনো আলোচনা নয়, কাল ভোরে ওনার সাথে কথা হবে। আপনি ওনাকে নিয়ে যান। আজ রাত উনি আপনার মেহমান হিসেবে থাকবেন।’
আব্বাস (রা) আবু সুফিয়ানকে সঙ্গে নিয়ে চলে গেলেন। পরদিন ভোরে রাসূলের দরবারে এলেন আবু সুফিয়ান ও আব্বাস (রা)। রাসূল (সা) বললেন, ‘আবু সুফিয়ান, আপনি কি জানেন না, আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরিক নেই। তিনিই একমাত্র উপাস্য। আমাদের জন্ম-মৃত্যু সবই তাঁর হাতে?’
আবু সুফিয়ান বললেন, ‘আমি স্বীকার করছি, আমরা যে মূর্তির পূজা করি তার কোনো ক্ষমতা নেই। ওগুলো কেবলই মূর্তি মাত্র। মানুষের ভালো-মন্দ কোনো কিছু করারই ওদের ক্ষমতা নেই।’
‘তবে কেন এটা মানবেন না যে আল্লাহই আমাদের একমাত্র মালিক, মুনিব, একমাত্র উপাস্য? আর আমাকে আল্লাহ পাঠিয়েছেন তাঁর রাসূল হিসেবে?’
‘আপনাকে আল্লাহ রাসূল করে পাঠিয়েছেন এটা মানা আমার পক্ষে দুষ্কর।’ আবু সুফিয়ান পরাজয় মেনে নিয়েও এ কথা উচ্চারণ করলেন। সঙ্গে সঙ্গে রেগে গেলেন আব্বাস (রা)। গর্জে উঠলেন, ‘আবু সুফিয়ান, খামোশ। তুমি কি আমার তলোয়ারের আঘাতে তোমার মাথা দ্বিখন্ডিত করতে চাও? আমরা আমাদের নবীর সাথে বেয়াদবি কিছুতেই সহ্য করি না।’
আব্বাস (রা)-এর অগ্নিমূর্তি দেখে আবু সুফিয়ান খামোশ হয়ে গেলেন। শেষে আব্বাস (রা)-এর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমি স্বীকার করি, আমাদের একজন ওপরওয়ালা আছেন। তিনিই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। মক্কার লোকদের রক্ষা করার জন্য যদি মুহাম্মদকে আল্লাহর রাসূল বলতে হয় তাহলে তা বলতেও আমি রাজি।’
আল্লাহর রাসূলের ইশারায় আব্বাস (রা) শান্ত হলেন। মহানবী (সা) আবু সুফিয়ানের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আবু সুফিয়ান, যাও, মক্কায় ফিরে যাও। মক্কায় গিয়ে ঘোষণা করে দাও, মুসলমানদের তলোয়ার থেকে নিরাপদ থাকবে তারা, যারা আবু সুফিয়ানের ঘরে আশ্রয় নেবে। যারা কাবার চত্বরে আশ্রয় নেবে আর তারাও নিরাপদ থাকবে যারা নিজেদের ঘরে দরজা জানালা বন্ধ করে থাকবে।’
আবু সুফিয়ান সঙ্গে সঙ্গে মক্কার উদ্দেশে রওনা হয়ে গেল।
আবু সুফিয়ান চলে গেলে নবীজি বিশিষ্ট সাহাবীদের নিয়ে মতবিনিময় সভায় বসলেন। সভায় সাহাবীরা বললেন, আকরামা ও সাফওয়ানের মতো বীর ও বিখ্যাত সেনাপতিরা কিছুতেই আপসে মক্কার ভার আমাদের হাতে ছেড়ে দিতে রাজি হবে না। তারা প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করবেই।’ সুতরাং সেভাবে প্রস্তুতি নিয়েই মক্কায় প্রবেশের সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো।    (চলবে)

SHARE

Leave a Reply