Home গল্প দাঁত -দেলোয়ার হোসেন

দাঁত -দেলোয়ার হোসেন

শরৎ গিয়ে হেমন্তের শুরু। সকালে শিশির সন্ধ্যায় কুয়াশা। রাতে মেঘের গুড়গুড় কানে বাজলেও বৃষ্টি ঝরেনি এক ফোঁটাও। সকাল তখন ৮টা। সূর্যের দেখা নেই। পুব আকাশ জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে ছেঁড়া ফাটা মেঘের মিছিল। পানুর নানাভাই বাসা থেকে বেরিয়ে একবার আকাশের দিকে তাকালেন।
বৃষ্টি আসার আগেই আমাকে বাস ধরতে হবে। ঘূর্ণি বাতাসও হতে পারে। আকাশের যে অবস্থা। একথা ভেবে তিনি একটু জোরেই পা চালালেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত হলোও তাই। বাসে ওঠার আগেই বাতাসে পথের ধুলাবালি উড়িয়ে পথ চলতি মানুষগুলোর বেহাল অবস্থা করে ছাড়লো। পানুর নানাভাই চোখ দুটো প্রায় বন্ধ করে কানার মতো হাতড়ে হাতড়ে বাসের হ্যান্ডেল ধরে উঠে পড়লেন বাসে।
ভদ্রলোক কয়দিন ধরে সর্দি-কাশিতে ভুগছেন। সিটে বসতেই নাকের মধ্যে কেমন সুড় সুড় করে উঠলো। অমনি তিনি বিকট শব্দে দিলেন একটা হাঁচি। সঙ্গে সঙ্গে ঘটে গেলো এক মজার ঘটনা। খট্টাস শব্দে একটা কিছু ছুটে পড়লো বাসের মধ্যে। বাসের লোকজন তাকালো ভদ্রলোকের দিকে। ভদ্রলোক তখন পাগলের মতো সামনের সিটের নিচে কিছু একটা খুঁজছেন। ভাগ্য ভালো যে, পেয়েও গেলেন সেই বিশেষ জিনিসটা। পেয়েই দুই হাতে ধুলাবালি মুছে চালান করে দিলেন মুখের মধ্যে। জিনিসটা আর কিছু নয়Ñদাঁত। ভদ্রলোকের ওপরের পাটির বাঁধানো দাঁত। তারপর চুপচাপ বসে থাকলেন তিনি। মনে মনে ভাবলেন হয়তো কেউ বুঝতে পারেনি। তবে যার যা বুঝার তা ঠিকই বুঝে নিয়েছে। কেউ মুখ টিপে হাসছে, কেউ আবার বয়সী মানুষটার লজ্জাকর অবস্থা দেখে মনে মনে কষ্টও পাচ্ছিলো।
পাশের সিটের এক কলেজছাত্রী গলাটা নিচু করে তার বান্ধবীকে বললো, সিটের নিচ থেকে ভদ্রলোক কী কুড়ালোরে? মেয়েটি বললো, দাঁত। মনে হলো ভদ্রলোকের ওপরের পাটিতে একটা দাঁতও নেই, সবগুলোই বাঁধানো। হাঁচির ফোর্সে দাঁতের পাটি গেছে ছুটে। বলেই মুখে রুমাল চাপা দিলো মেয়েটি।
বাপ-রে-বাপ হাঁচির শব্দে আমি তো চমকে উঠেছি। সেও মুখ চেপে হাসতে হাসতে বললো, তুই কী করে বুঝতে পারলি যে, ভদ্রলোক তার দাঁত কুড়ালেন?
দেখেছি।
তাই? চুল পাকলে কী হবে ভদ্রলোক দেখতে কিন্তু বেশ।
বেশি কথা বলিস কেনরে! সবার আগে আমাদের দৃষ্টি পড়ে মানুষের দাঁতের ওপর। দাঁত সুন্দর না হলে সুন্দর মানুষও পচা হয়ে যায়।
আস্তে বল, ভদ্রলোক শুনতে পাবে। এমন অবস্থা যদি আমার বা তোর হতো তাহলে কি যে হতো একবার ভাবতো!
এই জন্যই কথায় আছে ‘আমরা দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বুঝি না।’
আমার মাকে দেখেছি ছোটদের ঘাড় চেপে ধরে কয়লার গুঁড়া আঙুলে নিয়ে জোরে জোরে ঘষে দাঁত মেজে দিতে।
কেন, গ্রামে তখন ব্রাশ পেস্ট ছিলো না?
ছিলো কিন্তু মা বলে, ছোট থাকতেই এভাবে দাঁত মাজলে দাঁত সমান হয়, উঁচু-নিচু থাকে না। বাঁকা দাঁতও সমান হয়ে যায়। রক্ত চলাচল করেÑ দাঁত ভালো থাকে।
সেই জন্যই তোর দাঁতগুলো সুন্দর।
বলেই মেয়েটি ফিক করে হেসে উঠলো। ভদ্রলোকের কানে অনেক কথাই এলো কিন্তু তিনি ভালো মন্দ কিছুই বললেন না।
একদিন সকালে ঘটলো আরেক ঘটনা। ভদ্রলোক ব্রাশ করতে গিয়ে দেখেন তার মুখের ভেতর কোন দাঁত নেই। অমনি তিনি চেঁচামেচি শুরু করে দিলেন। ওপরের ঠোঁট নিচের ঠোঁটের ওপর ঝুলে পড়েছে। মুখটা থুরথুরে বুড়োদের মতো লাগছে। তিনি চিৎকার করে বললেন, আমার দাঁত কোথায় গেলো? কে নিয়েছে আমার দাঁত? চিৎকার শুনে ছুটে এলো বাসার সবাই।
আমার দাঁত কোথায়? বৃদ্ধের এ রকম কথা আর মুখের অবস্থা দেখে সবাই হাসতে শুরু করলো। সে হাসি আর থামে না। পানুর নানি বললো, ওই মুখে আর কথা বলো না। আয়নায় একবার ভালো করে মুখটা দেখো। ছোট্ট পানু তখন ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে নানার হাত ধরে বললো, নানাভাই আমার মনে হচ্ছে তোমার দাঁত তোমার বিছানার ওপরেই আছে। চলো আমি খুঁজে দিচ্ছি। ভদ্রলোক মনে মনে ভাবলেন, হতেও পারে। তিনি তখন কোনো কথা না বলে নাতনীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর পানুর হাত ধরে গেলেন নিজের রুমে।
তিনি ফ্লোরে তোশক পেতে ঘুমোন। ছোট্ট রুমের দুইদিকে জিনিসপত্রে বোঝাই। বিছানার ওপর বই আর কাগজপত্র ছড়ানো। তো পানু সেই কাগজপত্র গোছাতে গোছাতে পেয়ে গেলো নানার বাঁধানো দু-টুকরো দাঁত। নানাভাই, এই যে তোমার দাঁত। তুমি কি রাতে ঝগড়া করেছো?
ঝগড়া? কার সঙ্গে?
ভূতের সঙ্গে। তোমার কাছে তো আবার ভূতরা আসে।
নানা হেসে বললেন, এখন ভূতরাও আসে নারে নানু!
তুমি তো এখন আর আমাকে ভূতের গল্প শুনাও নাÑতাই না!
তখন মজা দেখতে পানুর নানিও এসে দাঁড়িয়েছে দরজায়। সে বললো, পাওয়া গেলো? দাঁতগুলো আবার বাঁধায়ে নিলেই তো হয়। নিচের পাটিওতো ভাঙা বেড়ার মতো হয়ে গেছে। পানুর নানা বললেন, কথাটা তুমি মন্দ বলোনি। দাঁত বাঁধাতে লাগবে পঞ্চাশ হাজার টাকা। আমাকে বেচলেও তো এতো টাকার জোগাড় হবে না।
ক’দিন পর গ্রাম থেকে এক ছেলে এলো বেড়াতে। ড্র্ইংরুমে গল্প হচ্ছিলো। পানু তাকে বললো, জিল্লু মামা তোমার দাঁত তো ভালোই। নানি পান খায় নানির দাঁত কালো, নানার দু-তিনটা দাঁত আছে কিন্তু সেগুলো হলদে দেখা যায়। মামা হো হো করে হেসে উঠে বললো, এতো সামান্য ব্যাপার। আমি তিন দিনে দাঁত কদুর ফুলের মতো সাদা করে দিতে পারি। জিল্লুর চটাং চটাং কথা শুনে অনেকেই এসে বসলো ড্রইংরুমে। পানুর নানি বললো, তুই কি কয়লা আর পোড়ামাটির কথা বলতে চাইছিস?
না। পাকা কলার ছিলকা।
পাকা কলার ছিলকা দিয়ে কেউ আবার দাঁত মাজে নাকি?
কাকী, কলার ছিলকা ছোট ছোট করে কেটে ভেতরের দিকটা দাঁতের ওপর ঘষতে হবে। থুথু ফেলা যাবে না। দশ মিনিট পর পেস্ট দিয়েও দাঁত মেজে ফেলা যাবে। এভাবে তিন দিন দাঁত মাজলেই দাঁত সাদা হয়ে যায়। আবার কিছুটা বেকিং পাউডারের সাথে তিন চার ফোঁটা লেবুর রস মিশিয়ে বুদবুদ কেটে যাওয়ার পর ব্রাশে নিয়েও দাঁত মাজতে পারেন। দাঁত মাজার নিয়ম হলো দাঁতের ওপর আর ভেতর দিকেও ব্রাশ চালাতে হবে। এ ছাড়াও আঙুল দ্বারা মাজতে হবে। তাতে রক্ত চলাচল করবে, ফলে দাঁত রোগমুক্ত থাকবে।
তুই এসব টোট্কা শিখলি কোথা থেকে?
কাকী! এসব টোট্কা নয়। আর একটা কথা শুনে রাখেন। মাঝে মাঝে যদি দাঁত ব্যথা করে, তাহলে ব্যথার জায়গায় এক টুকরো আদা বা রশুন ছেঁচে সেখানে লাগিয়ে রাখতে পারেন। তাতে ব্যথা কমে যাবে। বেশি হলে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।
জিল্লুর কাকী হাসতে হাসতে বললো, সবই বুঝলাম, এখন তোর কাকার দাঁতের কী করা যায় বলতো! জিল্লুও একটু হেসে বললো, কাকার জন্য একটা পথই খোলা আছেÑতা হলো নতুন করে দাঁত বাঁধাতে হবে।
হঠাৎ সবাইকে অবাক করে দিয়ে পানু বললো, নানা ভাইয়ের অতো টাকা-পয়সা নেই। আমার দাঁতগুলো পড়লে সেগুলো আমি নানাভাইকে দেবো। নানাভাই তখন দাঁত বেঁধে নেবেন। পানুর কথা শুনে যেনো হাসির হাট জমে উঠলো। নানি তখন বললেন; তোমার কয়টা দাঁত পড়েছে রে নানু?
পানু আঙুল উঁচিয়ে বললো, তিনটা। ওগুলো আমি কৌটায় রেখে দিয়েছি। তাই না নানাভাই? নানাভাই তখন মুখটা গম্ভীর করে বিজ্ঞের মতো বললেন, ভাবছি সেটাই আমার জন্য ভালো হবে। যদি ততদিন বেঁচে থাকি।

SHARE

Leave a Reply