Home দেশ পরিচিতি শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত মিসর -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত মিসর -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

আরব প্রজাতন্ত্র মিসর একটি আন্তঃমহাদেশীয় দেশ। আফ্রিকার উত্তর-পূর্ব কোণ এবং এশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিম কোণজুড়ে মিসর অবস্থিত। সিনাই উপদ্বীপ দুই মহাদেশের মধ্যে দেশটির স্থল সেতুবন্ধ সৃষ্টি করে রেখেছে। মিসর ভূমধ্যসাগরীয় দেশ। এদেশের সীমান্তে রয়েছে উত্তর-পূর্বে গাজা উপত্যকা ও ইসরাইল, পূর্বে আকাবা উপসাগর, পূর্ব ও দক্ষিণে লোহিত সাগর, দক্ষিণে সুদান এবং পশ্চিমে লিবিয়া। আকাবা উপসাগরের অপর পাড়ে রয়েছে জর্দান এবং সিনাই উপদ্বীপের অপর পার্শ্বে রয়েছে সৌদি আরব। সৌদি আরব ও জর্দানের সাথে মিসরের কোনো স্থল সীমানা না থাকলেও এটা বিশ্বের একমাত্র নিকটস্থ আফ্রো-এশীয় দেশ।
যেসব আধুনিক দেশের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে মিসর সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। খ্রিষ্টপূর্ব দশম শতাদ্বি বিশ্বের অন্যতম প্রথম জাতি রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয় মিসর। ধীরে ধীরে মিসর শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। যে আলো ছড়িয়ে পড়ে গোটা বিশ্বে। প্রাচীন মিসরে লেখার পদ্ধতি, কৃষি, শহরায়ন, সংঘবদ্ধভাবে ধর্মপালন ও কেন্দ্রীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
মিসরে খুব সামান্য বৃষ্টিপাত হয় এবং এর ভূমির বেশির ভাগ জুড়ে রয়েছে শুষ্ক বায়ুপ্রবাহ পীড়িত মরুভূমি। মরুভূমির মধ্য দিয়ে উত্তর দিকে বয়ে যাওয়া নীল নদই মূলত এদেশে প্রাণ সঞ্চার করেছে। শতকরা ৯৯ ভাগ মিসরীয় নীল নদ ও সুয়েজ খাল বরাবর বসবাস করে। বাকি ১ শতাংশ বসবাস করে মরুভূমি ও পর্বতে। এদেশের জনপদ মোট ভূমির মাত্র ৪ শতাংশ। মিসরের আয়তন ১০ লাখ ১০ হাজার ৪০৭ বর্গ কিলোমিটার (৩ লাখ ৮৬ হাজার ৬৬২ বর্গমাইল)। জনসংখ্যা ৯ কোটি ২০ লাখ ১৭ হাজার। জনসংখ্যার দিক দিয়ে মিসর আফ্রিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। আফ্রিকায় নাইজেরিয়ার জনসংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। কায়রো মিসরের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। কায়রো সমগ্র আফ্রিকারও বৃহত্তম শহর। বেশির ভাগ মিসরীয় নিজেদেরকে আরব বলে মনে করে। জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ মুসলিম। এদেশের জনগণের পারিবারিক জীবন, সামাজিক সম্পর্ক ও বাণিজ্যিক কর্মকান্ডে ইসলামের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। কায়রোর আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র। ৯৭০ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
মিসরের সরকারি ভাষা আরবি। কিছু কিছু মরু পল্লীতে লোকেরা বারবার ভাষা ব্যবহার করে। শিক্ষিত মিসরীয়রা দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ফরাসি ও ইংরেজি শেখে। এদেশের মুদ্রার নাম মিসরীয় পাউন্ড।
হাজার হাজার বছর ধরে নীল নদের বন্যার পানি নদীতীরবর্তী কৃষিভূমিকে উর্বর করে আসছে। এর ফলে মিসরের নীল উপত্যকা এবং ডেল্টা অঞ্চল অসাধারণ উর্বর কৃষিপ্রধান অঞ্চল হয়ে আছে। অন্য যেকোনো অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের তুলনায় কৃষিখাতে বেশির ভাগ মিসরীয় কাজ করে থাকে। তুলা মিসরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৃষি রফতানি পণ্য। মিসরে জন্মায় এমন অন্যান্য ফসলের মধ্যে রয়েছে কমলা, ধান, আখ ইত্যাদি। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে এদেশে নানা ধরনের শিল্প গড়ে উঠেছে। তুলাভিত্তিক বস্ত্র শিল্প ও প্রক্রিয়াজাতকৃত খাদ্য প্রধান শিল্পপণ্য। পেট্রোলিয়াম থেকে বেশির ভাগ জ্বালানির জোগান আসে। এছাড়াও নীল নদের ওপর নির্মিত আসওয়ান হাই ড্যাম থেকে আসে পানিবিদ্যুৎ।
মিসরের গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া প্রাচীন মিসরীয় সংস্কৃতির বহু নিদর্শন সংরক্ষণে সহায়ক হয়। সারা বিশ্ব থেকে পর্যটকরা আজও বিশাল স্ফিংক মূর্তির মতো বিস্ময়কর বস্তু দেখতে মিসরে আসে। পাথরের তৈরি এই বিশাল মূর্তির মাথা মানুষের মতো এবং দেহ সিংহীর মতো। তারা বিশাল বিশাল পিরামিডও দেখতে আসে। প্রাচীন মিসরীয়রা ফেরাউনদের সমাধি হিসেবে এসব পিরামিড নির্মাণ করে।
প্রাচীন কালের পর বেশ কতগুলো বৈদেশিক আগ্রাসী শক্তি মিসরকে শাসন করে। ১৯৫৩ সালে মিসর একটি স্বাধীন প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। সেই তখন থেকে মিসর বিশেষ করে আরব বিষয়ে মধ্যপ্রাচ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
মিসর ২৬টি রাজনৈতিক ইউনিট বা গভর্নরেটে বিভক্ত। প্রত্যেক গভর্নরেট আবার জেলা ও গ্রামে বিভক্ত। মিসরের প্রায় ৪ লাখ ৪৫ হাজার সদস্যের একটি বিরাট সেনাবাহিনী রয়েছে। সবচেয়ে শক্তিশালী আরব দেশ হওয়ার বাসনা এবং শান্তি চুক্তি সত্ত্বেও ইসরাইলের সাথে উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের কারণে মিসর তার এই বিশাল বাহিনী গড়ে তোলে।
মিসরের নগরীগুলোর জীবনধারা এবং গ্রামের জীবনধারার মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। শহরের সমস্যার মধ্যে রয়েছে গৃহায়ন ও যানজট। অনেকেই দারিদ্র্যের মধ্যে জীবনযাপন করলেও অন্যরা আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও সরকারি সেবা ভোগ করে। গ্রামবাসীরা সাধারণত শতবর্ষ আগের তাদের পূর্ব-পুরুষদের মতোই জীবন-যাপন করে। তাদের অনেকেই ফসল ফলিয়ে ও পশুপালন করে জীবিকা নির্বাহ করে। এতকিছু সত্ত্বেও মিসরের জনগণের মধ্যে ইসলামের ঈমান ও ঐতিহ্যই ঐক্যের বন্ধন সৃষ্টি করে রেখেছে। মসজিদ ধর্মীয় ও সামাজিক উভয় জীবনের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।
মিসরে পোশাকের স্টাইলে ভিন্ন জীবনধারার প্রতিফলন রয়েছে। বিত্তবান নগরবাসীরা পাশ্চাত্যের মতো পোশাক পরে। গ্রামবাসী ও সাধারণ নগরবাসীরা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে। পুরুষরা ইসলামী রীতি অনুযায়ী দাড়ি রাখে, লম্বা, হালকা রঙের গাউন পরে এবং মাথায় টুপি ব্যবহার করে। মেয়েরা ঢিলেঢালা পোশাক পরে এবং বোরখা দিয়ে চুল, কান ও বাহু ঢেকে রাখে।
এককালে নবী ইউসুফ (আ) মিসর শাসন করেন। সে সময় তিনি তার পিতা ইয়াকুব (আ) ও তাঁর ভাইদেরকে নিজ দেশ ফিলিস্তিন থেকে মিসরে আনেন এবং তারা মিসরেই অভিবাসন করেন। মুসা (আ) ও হারুন (আ)-এর আগমন ঘটে এদেশে। নবীদের স্মৃতিবিজড়িত এই দেশে ইসলামপন্থীরা আবারো আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। এগুলোর মধ্যে ইখওয়ানুল মুসলিমুন প্রধান। ১৯২৮ সালে ইখওয়ানুল মুসলিমুন গঠিত হয়। সমগ্র আরব জাহানে বর্তমানে এই দলটির দৃঢ় ভিত্তি রয়েছে। ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে এদেশের ইসলামপন্থীদের বহু চড়াই-উতরাই পার হতে হয়েছে। ১৯৫৬ সালে প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুন নাসের ইখওয়ানুল মুসলিমুন নিষিদ্ধ করেন এবং ১৯৬৬ সালে ইখওয়ান নেতা সাইয়েদ কুতুবকে ফাঁসি দেন।
২০১২ সালের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইখওয়ানুল মুসলিমুন বা মুসলিম ব্রাদারহুড সমর্থিত প্রার্থী মুহাম্মদ মুরসি নির্বাচিত হন কিন্তু এর মাত্র এক বছরের মাথায় ষড়যন্ত্রমূলক গণবিক্ষোভ এবং সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন সামরিক বাহিনী প্রধান জেনারেল আবদুল ফাত্তাহ আল-সিসি। সিসি বর্তমানে মিসরের প্রেসিডেন্ট।

SHARE

Leave a Reply