Home গল্প সেলফি ফাতেমা নার্গিস

সেলফি ফাতেমা নার্গিস

জানালাটা খোলাই ছিল। সকালের স্নিগ্ধ বাতাস আর পাখির কলকাকলিতে ঘুম ভাঙে তন্ময়ের। ঘুম ভাঙতেই প্রচন্ড ক্ষুধার তাড়না বোধ হয় তার। মনে পড়ে রাতে কিছু খাওয়া হয়নি। মা বার বার ভাত খাওয়ার জন্য ডাকছিলেন কিন্তু তন্ময় কিছুতেই খেতে আসেনি। কিছু দিন ধরেই তন্ময় মায়ের কাছে আবদার করছিলো একটা মোবাইল ফোনের জন্য। বন্ধুদের সবারই কত সুন্দর আধুনিক মোবাইল ফোন রয়েছে। সেগুলোর মধ্য দিয়ে কত কী যে দেখা যায়। ছবি তোলা যায়। স্কুল ফাংশনে সবাই যার যার ফোন দিয়ে স্যারদের সাথে কত ছবি তুলল শুধু তারই ফোন নেই বলে সে একটি ছবিও তুলতে পারেনি। এই অক্ষমতাটুকু যেন তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। তাই মায়ের শরণাপন্ন হতে হয়েছিলো তাকে।
– মা, আমার একটা মোবাইল ফোনের খুব শখ মা। বাবাকে বলো না একটা ফোন কিনে দিতে। আমাদের ক্লাসের সব ছেলেরই ফোন আছে। শুধু আমারই নেই।
– মা ছেলের কথায় বাধা দেন।
– এখন তোমার লেখাপড়ার সময়। তুমি ফোন দিয়ে কী করবে?
– ফোন দিয়ে কী করবো মানে? পরীক্ষার সময় বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করতে হয়। তা ছাড়া কোচিংয়ের পড়ার জন্য তো সবার সাথে যোগাযোগ করতে হয় মা। মা ছেলের কথা বাবার কাছে বলেছিলেন।
– তন্ময় একটা মোবাইল ফোনের জন্য ঘ্যান ঘ্যান করছে কদিন ধরে। দাও না একটা ফোন কিনে।
মায়ের কথা শুনে বাবা খিঁচিয়ে উঠেছিলেন।
– কী বললে? ছেলের জন্য উমেদারি করছো? ছেলে তো লায়েক হয়ে উঠেছেন তার জন্য ফোন দরকার তাই না? এখনও স্কুলের গন্ডিই পার হয়নি, এখনই সব বাবুগিরি দেখাতে হবে? তোমার ছেলেকে বলো ওসব চিন্তা মাথা থেকে বের করে লেখাপড়ায় মন দিতে।
এই বলে বাবা চলে গিয়েছিলেন অফিসে। সরকারি অফিসের নিম্নেমান সহকারী পদে কাজ করেন। তাই মা বুঝিয়েছিলেন তাকে।
– তোর বাবার কথা চিন্তা কর। তোদের চার ভাইবোনের লেখাপড়ার খরচ, বাসা ভাড়া, বাজার খরচের টাকা- এরপর তো হাতে আর কোনো কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। কথাটা শুনে অবাধ্য ঘোড়ার মতো ঘাড় বাঁকায় তন্ময়।
– সবার বাবাই তো সংসার চালায় মা। তাই বলে এমনতো কারো বাবাই করে না। সবার বাবাই তাদের শখগুলো পূরণ করে। বলতে বলতে চোখের পানি টপ টপ করে পড়তে থাকে তন্ময়ের। মা অসহায়ের মতো তাকান। বাবা অফিস থেকে ফেরার পর আবার বাবার কাছে ছেলের শখের কথাটা বলেছিলেন। সারাদিন অফিসের খাটা-খাটনি আর যাতায়াতের ঝক্কির জন্য এমনিতেই বাবার মাথাটা গরম ছিল। তাই মায়ের কথাটা শুনেই বাবা রাগে ফেটে পড়েছিলেন। তন্ময়কে ডেকে বললেন।
– শোন তন্ময়। সামনে তোমার স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা, মোবাইল ফোন এখন ছাত্রদের ধ্বংস করে দিচ্ছে। ছেলেরা এখন ফোন নিয়েই সারাদিন ব্যস্ত থাকে। ফলে পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হয়। তাই এখন মন দিয়ে লেখাপড়া কর। কলেজে যখন যাবে তখন মোবাইল ফোনের ব্যবস্থা হবে। তোমার ছোট ভাইবোনরা তোমাকেই অনুসরণ করবে। তাই ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে তৈরি কর।
এ কথা শুনে তন্ময় ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। মা ব্যাকুল হয়ে ডাকাডাকি করছিলেন।
– তন্ময় বাবা। দরজাটা খোল। ভাতটা খেয়ে নে বাবা, সারারাত ক্ষুধায় কষ্ট পাবি।
মায়ের কথায় কর্ণপাত করেনি তন্ময়। বাতি নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে তন্ময়। কিন্তু রাতে ভালো ঘুম হয়নি। ক্ষুধার তাড়নায় এপাশ ওপাশ করেছে, বারবার মায়ের মায়াবী মুখখানা, স্নেহভরা কণ্ঠ সবই মনে পড়ছে। মনে হয়েছে সমস্ত রাগ অভিমান ভুলে ভাত খেয়ে নিলে হতো। ক্ষুধার তাড়না সত্যিই কষ্টকর। সকালে ঘুম থেকে উঠেই খাবার জন্য ডাইনিং রুমে যায় তন্ময়। দেখে মা দ্রুত সবার খাবার গোছাচ্ছেন। ছেলেকে দেখে সস্নেহে হাসেন।
– আয় বাবা তাড়াতাড়ি নাস্তাটা খেয়ে নে। রাতে কিছু খেলি না।
খেতে বসে তন্ময়। চারটে আটার রুটি আর আলু ভাজি। তাই খেতে অমৃতের মতো লাগে। আসলে মায়ের হাতের রান্নাই অন্য রকম। স্বাদের সাথে মেশানো থাকে মায়ের মমতাটুকু। ঝটপট খেয়ে উঠে পড়ে তন্ময় স্কুলের জন্য রেডি হয়। স্কুল খুব দূরে নয় ১৫-২০ মিনিট হাঁটা পথ। তন্ময়ের স্কুলের পাশেই মেয়েদের স্কুল। স্কুলের কাছাকাছি গিয়ে দেখে তার বন্ধু আবীর আর অন্যরা। আবীর দূর থেকে মেয়েদের ছবি তুলে নিচ্ছে। তন্ময় দ্রুত পাশ কাটিয়ে স্কুলে ঢুকে পড়ে। কিছুক্ষণ পরই আবীর তার অন্য বন্ধুদের নিয়ে ক্লাসে আসে। ওকে লক্ষ্য করে বলে-
– কি রে তন্ময় তোকে ডাকলাম তুই শুনলি না?
– তন্ময় নিরুত্তর থাকে। আবার প্রশ্ন করে আবীর।
– কি রে কথা বলছিস না কেন? এড়িয়ে যায় তন্ময়। এমন সময়ই ক্লাস টিচার ক্লাসে এসে ঢোকেন। প্রথম ক্লাসটাই অঙ্কের। মেজাজটাই খারাপ হয় তন্ময়ের। কাল রাতে নানা ঝামেলায় হোমওয়ার্ক করা হয়নি। তাই ক্লাসে দাঁড়িয়ে থাকতে হলো। ক্লাস শেষ হতেই আবার হইচই শুরু হয়ে যায়। তন্ময় চুপচাপ বসে থাকে। স্কুল ছুটির পর বাড়ির দিকে পা বাড়ায় তন্ময়। পেছন থেকে এসে আবীর ডাক দেয় এই তন্ময়! কখন থেকে ডাকছি। কিরে আজ কি  তোর খুব মন খারাপ? তা দোস্ত বিকাল ৪টায় আমার বাসায় আয়, রফিক সুমন ওরাও আসবে মা আর বাবা দেশে গেছে সকালে। ফিরবে রাত দশটার দিকে। সারা বিকেল আড্ডা মারবো, দোস্ত চলে আসিস। নীরবে সম্মতি জানিয়ে চলে আসে তন্ময়। বাসায় গিয়ে খাওয়া-দাওয়া করতে করতে বেলা ৩টা হয়ে যায়। মা তখনই বলেন-
-তন্ময় তুই একটু কষ্ট করে তমাকে স্কুল থেকে নিয়ে আয়। আমার শরীরটা ভালো নেই।
তন্ময়ের মনে পড়ে যায় তার তো বিকেলে আবীরের বাসায় যাওয়ার কথা। তাই মাকে বলে-
– মা! তুমি বরং একটা রিকশা করে চলে যাও। কারণ আমাকে স্কুলের স্যার বিকেলবেলা দেখা করতে বলেছেন।
বিকেল ৪টার একটু আগেই তন্ময় আবীরের বাসার সামনে এসে দাঁড়ায়। ইতোমধ্যে রফিক আর সুমনও এসে পড়ে। বিশাল হাইরাইজ বিল্ডিং। আবীররা আট তলায় থাকে। ওরা লিফটে করে উঠে গেল ওপরে। আবীরদের বাসায় ঢুকেই চমৎকৃত হয় তন্ময়। এত সুন্দর দামি দামি আসবাবপত্র। কী সুন্দর করে সাজানো ফ্ল্যাট। আবীরের বাবা বড় ব্যবসায়ী। আবীর ডাইনিং টেবিলে খেতে ডাকে সবাইকে। সবাই বসে খেয়ে নেয় কেক আর কোল্ডড্রিংকস। তন্ময় বলেÑ
– আবীর আমাকে সন্ধ্যার আগেই বাসায় যেতে হবে।
– ওরে গুডি গুডি বয়। যাবি বাসায়ই তো এতো তাড়াহুড়ো করার কী আছে? এখন চল ছাদে যাই। ছাদে বিকেলে অনেক ভালো লাগে।
দ্রুত ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ করে আবীর ছাদে চলে যায়। ছাদে গিয়ে পকেট থেকে বড় ফোন সেট বের করে আবীর। বলে এই ফোন সেট বাবা আমার জন্মদিনে উপহার দিয়েছেন।
– দেখি দেখি সেটটা। বলে সেটটি হাতে নিয়ে দেখতে থাকে তন্ময়। কী সুন্দর! তন্ময় তো এতো দামি সেট কল্পনাই করতে পারে না। বলে এখন আমি যাই আবীর। আবীর বলেÑ যাবি কিরে?
– আরে এসেছিলি তো আড্ডা মারতে আমার বাসায় এখন আমার সময় হলেই তোকে যেতে দিবো। এখন চল সবাই মিলে সেলফি তুলি। তন্ময়কে টানতে টানতে নিয়ে যায় ছাদের কিনারায়। আবীর বসে ছাদের কার্নিশে। আর তন্ময়ের হাত ধরে টানতে থাকে। তন্ময় সজোরে এক ধাক্কা দেয় আবীরকে। আর্তনাদ করে ওঠে সুমন!
– এই কী করলি তন্ময়? ততক্ষণে যা হওয়ার তাই হয়েছে ছাদের কার্নিশে বসে টাল সামলাতে পারেনি আবীর। তন্ময়ের ধাক্কায় পড়ে যায় নিচে। ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াতে থাকে তন্ময়। বাবার স্নেহভরা মুখ আর মায়ের মায়াবী মুখ মনে পড়ে। চোখে দেখতে পায় ধোঁয়াশা ভরা পৃথিবী।
তারা যদি এমনটি না হয়ে ভালো স্বভাবের হতো তাহলে আর এমন দুর্ঘটনা হয়তো ঘটতো না। তাদের এই দুর্ঘটনা থেকে সবার শিক্ষা নেয়া উচিত।

SHARE

Leave a Reply