Home সায়েন্স ফিকশন কাহান ষড়যন্ত্র -মোস্তফা ইউনুস জাভেদ

কাহান ষড়যন্ত্র -মোস্তফা ইউনুস জাভেদ

‘ভাইয়া, তাড়াতাড়ি এসো।’
ভাইয়ার কম্পিউটারে খেলছিলো ছোট বোন নুযহাত। হঠাৎ ঘরের এক কোণে মিহি লাল আলো জ্বলে উঠেই আবার নিভে যেতে দেখলো সে। তারপরই এতো ডাকাডাকি।
বোনের আচমকা এমন চিৎকারে বারান্দা থেকে নিজের ঘরে গেলো তুহিন। ভালোভাবে সব কোণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো সে। কিন্তু কিছুই পেলো না বলার মতো। নুযহাতকে ভুল ভাবার কোনো কারণও সে দেখছে না। মাত্র ১০ বছর বয়সেই এবার আন্তঃস্কুল বিজ্ঞানমেলায় শ্রেষ্ঠ শিশুবিজ্ঞানীর পুরস্কার পেয়েছে তার বোন। কাজেই নিতান্ত দৃষ্টিভ্রম হওয়ার মতো মেয়ে সে না। তবুও নিশ্চিত হতে জিজ্ঞাসা করলো নুযহাতকে-
‘তুই ঠিকমতো দেখেছিস তো? আলো জ্বলেই নিভে গিয়েছে?’
‘ভাইয়া, আমি পুরোপুরি নিশ্চিত। আলোটা খুব বেশি তীক্ষè ছিলো না বলে দেখতে একটুও অসুবিধা হয়নি।’
‘আলো দেখে তোর কী মনে হলো? কোনো বিশেষ ধরনের?’
‘দেখে যতদূর মনে হয়েছে এটা ইনফ্রারেড রশ্মিই হবে।’
‘ইনফ্রারেড হলে দেখলি কী করে?’
‘ভাইয়া, এক সপ্তাহ আগে তুমি নিজেই ঘরে ভিজ্যুয়াল অ্যাম্পিøফায়ার লাগালে তা কি ভুলে গেছো? আলোটা শুধু অ্যাম্পিøফায়ারেই বোঝা গেছে, তা ছাড়া পুরো ঘরে খালি চোখে দেখা যায়নি। আর তখন ঘরের তাপমাত্রাও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মনে হয়েছে।’
কাহানদের বিরুদ্ধে পৃথিবীকে রক্ষায় অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য মাত্র ২৫ বছর বয়সেই প্রফেসর পদে উন্নীত হয়ে কিশোর বিজ্ঞানী তুহিন এখন প্রফেসর ড. ফারাহ তুহিন। কাহানদের যেই সেলে বন্দী রাখা হয়েছে, তা তুহিনের বাড়ির কাছেই হওয়ায় সেল সিকিউরিটি ম্যানেজমেন্টের চিফ করা হয়েছে তাকে। নাসার আরো ২ জন বিজ্ঞানী কাহানদের সেলের সিকিউরিটি ম্যানেজমেন্ট সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। সেলের আশপাশের এলাকাগুলোয় সতর্কতাবশত ভিজ্যুয়াল অ্যাম্পিøফায়ার লাগানোর পাশাপাশি নিজের বাসায়ও এই সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ভিশন মিটার খুব সম্প্রতিই লাগিয়েছে সে।
বোনের উত্তরে অবাক হয়ে গেলেও খুশি হওয়ার পরিবর্তে কপালে ভাঁজ ফেললো তুহিন। ইনফ্রারেডের ব্যবহারে কাহানরা ব্যাপক উন্নতি করেছেÑ এ খবর বেশ পুরনো।

২.
কাহানদের সেলের ৩৭ নম্বর কক্ষ। গতকালও এই সেলে ৫৬ জন বাঁধা অবস্থায় ছিলো। আজ সকালের দিকে হঠাৎ সেলের মধ্যে তীব্র আলো জ্বলে উঠলো। সে আলোর তীব্রতায় সিসিটিভির মনিটর নষ্ট হয়ে গেলো। অ্যালার্ম বেজে ওঠায় প্রহরীরা দ্রুত সেল চেক করতে গিয়ে দেখতে পেলো একজন নেই। ৫৫ জনকে বারবার ভালো করে চেক করেও তেমন কোনো অস্ত্র বা এরকম কোনো ডিভাইস পেলো না যার দ্বারা ঐ আলো উৎপন্ন করা সম্ভব। একজন বন্দীও হাওয়া। কোনো কূলকিনারা করা গেলো না।
জরুরি মিটিং বসেছে নাসায়, তদন্ত কমিটির ৫ জন সদস্যসহ নাসার দায়িত্বপ্রাপ্ত বিজ্ঞানীদের নিয়ে। তাদের অধীনে থাকা অবস্থায় এমন রহস্যজনক ঘটনা কী করে ঘটলো তা নিয়ে আলোচনায় বসেছেন তাঁরা। ইতোমধ্যে সিসিটিভির শেষ ভিডিও ফুটেজ ভালোভাবে দেখেছেন তারা। প্রকান্ড এক আলো D-46  বন্দীর মাথার ভেতর থেকে উঠে এসে পুরো ঘর উজ্জ্বল করে নিমেষেই অদৃশ্য হয়ে গেলো। আল্ট্রা সেøামোশন ক্যামেরা দিয়েও বের করতে পারা যায়নি কিছুই। D-46  বন্দী সেই আলোর সাথেই অদৃশ্য।
ভিডিও দেখে তুহিন-ই প্রথম কথা বললো, ‘তার মানে ওরা আলোকে ব্যবহার করে পালানোর পথ বের করেছে।’
‘তা কিভাবে সম্ভব?’ ড. ফিন্স বললেন, ‘আলো কে বাহন করে আমাদের এই নিñিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে কে পালাবে?’
‘আমিও তা বুঝতে পারছি না। কোনো প্রাণী আলোর পিঠে চড়তে পারা যে কল্পনারও বেশি।’ বললেন ড. তারেক।
‘আদৌ যদি তা প্রাণী হয় তাহলে তা অসম্ভবই বটে স্যার।’ জবাব দিলো তুহিন।
উপস্থিত সবার চোখ তুহিনের দিকে ঘুরে গেলো। ‘আদৌ প্রাণী হলে’ বলতে কী বুঝাতে চাচ্ছে তুহিন? তাহলে কি D-46  কাহানদের কেউ না?
‘আমি জানি আমার কথা একটু অন্যরকম শোনাচ্ছে, কিন্তু আমার ধারণা, D-46  কোনো কাহান নয়। আমি যতটা আঁচ করতে পেরেছি D-46  একটি পলিপ্লাস্টিক রোবট ছাড়া আর কিছুই না, যার কাজ ছিলো সেলের ভেতরের পরিস্থিতি সম্বন্ধে বাইরে অবহিত করা।’
পিনপতন নীরবতা সভাস্থলে। এভাবে আসলেই কেউ ভাবেনি। কিছুক্ষণ নীরবতার পর ড. হাওয়ার্থ বলে উঠলেন,
‘D-46  পালিয়েছে না তাকে প্রয়োজন শেষে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে এটাও একটা প্রশ্ন। লাইটিং এক্সিটের পদ্ধতি যদি রোবটটি ব্যবহার করেই থাকে তাহলে সেলের আশপাশেই অন্য কোথাও এরকম আলো খুব সামান্য সময়ের জন্য হলেও দেখা যাবে। সে রকম তো সেলের আশপাশে কোথাও দেখা যায়নি।’
‘দেখা গেছে।’ যেন বিজলির মতো নিজের ঘরের কথাটা মনে পড়ে গেলো তুহিনের। দ্রুতই আবার জিজ্ঞাসা করলো তদন্ত কমিটির একজন অফিসারকে-
‘মি. ওয়াটসন দয়া করে একটু সময় দেখুন তো, কখন সেলে আলো জ্বলেছিলো?’
‘কেন প্রফেসর তুহিন? তুমি কি…’
ড. হাওয়ার্থের কথা থামিয়ে অস্থির হয়ে তুহিন আবার বললো,
‘স্যার প্লিজ আমি সবই বলবো। আমাকে আগে বলুন সময় কত ছিলো?’
‘স্যার ঠিক সকাল ১০টা ৪৩ মিনিট ৫৬ সেকেন্ড সময়ে।’ একটু দেখে নিয়ে জবাব দিলো ওয়াটসন।
তুহিন সাথে সাথে কল দিলো বোনকে। নুযহাত ফোন করে সালাম দিতেই তুহিন জিজ্ঞাসা করলো,
‘আচ্ছা নুযহাত তুই আমার ঘরে ঠিক কখন দেখেছিলি আলো?’
‘এক্স্যাক্ট সময় তো বলতে পারবো না, তবে ১১টার মিনিট ১৫ আগে হবে। কেন ভাইয়া কিছু হয়েছে?’
‘ধন্যবাদ বোন, তোকে পরে সব জানাচ্ছি। আল্লাহ হাফিজ।’ বলে উত্তরের অপেক্ষা না করেই ফোন কেটে দিলো তুহিন।
সভায় সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে তুহিনের দিকে। তুহিনের ঘরের আলোর সাথে এই ঘটনার কী সম্পর্ক হতে পারে?
কিছুটা বুঝতে পেরে হাঁ হয়ে গেলেন ড. হাওয়ার্থ। বিস্মিত কণ্ঠে বললেন,
‘তার মানে তুমি সন্দেহ করছো তোমার ঘরকেই ওরা….’
‘সন্দেহ নয় স্যার, আমি নিশ্চিতভাবেই বলছি স্যার, ওরা লাইটিং এক্সিট ব্যবহার করেছে। লাইটিং এক্সিটের এক্সিটওয়েটা আমার ঘরেই। কিছুদিন আগে ঘুমের ঘোরে আমি আমার ঘরের এক কোণে একটা ফ্লাইং মাইক্রোসসার দেখেছিলাম, তবে জোনাকি পোকা ভেবে পাত্তা দেইনি। আমার ছোট বোন আমার ঘরে যেই সময়ে ইনফ্রারেড রে দেখে, তার কিছুক্ষণ আগেই আমাদের সেল থেকে উ-৪৬ হারিয়ে যায়। সব হিসাব মিলিয়ে আমি মোটামুটি নিশ্চিত, ওরা আমার ঘরেই এক্সিটওয়ে তৈরি করেছিলো, যেন আমি কেন, এখানকার কেউই কোনো সন্দেহ করতে না পারে।’
‘ইনফ্রারেড রে তোমার বোন দেখলো কিভাবে?’
তুহিন সবাইকেই আগের ঘটনা বিস্তারিত খুলে বললো। ড. তারেক বললেন, ‘কিন্তু সেলে যেই আলো জ্বলেছে তা তো ইনফ্রারেড ছিলো না।’
‘স্যার, কাহানদের সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক কার্যক্রম দেখে যা বুঝেছি, ওরা খুব সহজেই এখন ভিজ্যুয়াল লাইট থেকে ইনভিজিবল ইনফ্রারেড লাইটে পরিবর্তন করতে পারে। যারা আলোকে বাহন হিসেবে ব্যবহার করতে পারে তাদের জন্য এটা খুব সহজই বলতে পারেন।’
‘বুঝলাম।’ ড. তারেক-ই আবার বললেন, ‘তাহলে এখন কী হবে? কাহানদের হাতে আমাদের সেলের সব তথ্যই তো চলে গেলো। ওরা তো বন্দীদের মুক্ত করতে আবার হামলা চালাতে পারে।’
‘চালাতে পারে নয়, চালাবে। তবে এবার আমার খঅইঝ কাজে আসবে বলে মনে হয় না। এবার ওদের অস্ত্র দিয়েই ওদের বধ করতে হবে।’
‘স্যার, কাহানরা আমাদের যে ক্ষতি করেছে, তারপর তাদের বাঁচিয়ে রাখার আর কি কোনো দরকার আছে?’ এই প্রথম কথা বললো অফিসার ফায়াজ। স্বভাবতই কম কথা বলায় অভ্যস্ত সে।
‘তাহলে কাহানদের সাথে আমাদের কী পার্থক্য থাকবে ফায়াজ? তুমি কি কুরআন পড়োনি? সূরা মুহাম্মাদের ৪ নং আয়াতে আল্লাহ কী বলেছেন? ‘বন্দীদের প্রতি অনুগ্রহ করো, না হয় মুক্তিপণ দিয়ে তাদের ছেড়ে দাও।’ আমাদের ছেড়ে দেয়ার সুযোগ যেহেতু নেই, তাই তাদের করুণা করতে হবে ফায়াজ।’ বকার সুরেই কথাগুলো বললো তুহিন।
‘স্যরি স্যার।’ অনুতপ্ত হয়ে বললো ফায়াজ। ড. ফিন্স বললেন,
‘কিন্তু ওদের কোন অস্ত্রের কথা বলছো তুহিন? ওরা তো আগ্নেয়াস্ত্র ছাড়া আর কিছু আনেনি গতবার। নিউক এনেছিলো কতগুলো, তুমি কি তাহলে…’ ড. ফিন্সের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললো তুহিন, ‘না না স্যার, তা হবে কেন? এবার কোনো নিউক নিয়ে আসবে না ওরা। আগেরবার ওদের পরিকল্পনা ছিলো ধ্বংসাত্মক, এবার হবে রক্ষণাত্মক। আমি যতদূর ধারণা করছি এবার ওরা আসবে ইনফ্রারেড গান নিয়ে। এই বিশেষ ধরনের গান ওদের সর্বাধুনিক ও সর্বশেষ অস্ত্র। আমাদের সাথে নিউক্লিয়ার অস্ত্র দিয়ে ওরা যেহেতু পারেনি, আর এবার ওদের মিশন যেহেতু বন্দী নিয়ে পালানো, সেহেতু এবার ওদের আক্রমণ এভাবেই হতে পারে।’
‘কিন্তু ইনফ্রারেড গানের মোকাবেলা কিভাবে করা যাবে? আমাদের তো ড. আব্দুল্লাহ ছাড়া ইনফ্রারেড বিষয়ে বিশেষজ্ঞ তেমন কেউ নেই। তিনিও তো এখন প্রবীণ, আর তা ছাড়া যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, ড. আব্দুল্লাহর গবেষণা ছিলো ইনফ্রারেডের জীবনমুখী ব্যবহারের দিকেই।’ বললেন ড. ফিন্স।
কিছুক্ষণ ভাবলো তুহিন। শেষে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, ‘প্রিয় সহকর্মীবৃন্দ, আমি এখনই ড. আব্দুল্লাহ স্যারের বাসায় যেতে চাই। কাহানদের হাতে আমাদের সেলের সকল তথ্য চলে গেছে ৯ ঘণ্টা হয়ে গেলো। এখনও আমরা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারিনি। ওরা আগামী দুই-একদিনের মধ্যেই হামলা করে বসতে পারে। আপনারা সকলে অনুমতি দিলে বৈঠক এখানেই সমাপ্তি হোক।’
সবাই সম্মতি জানালো। তুহিন ঝড়ের গতিতে তার প্রাইভেট জেটপ্লেনের দিকে দৌড় দিলো। ড. আব্দুল্লাহ মুমূর্ষু অবস্থায় আছেন, যেকোনো সময়ে যেকোনো কিছু হয়ে যেতে পারে। এই অবস্থায় এক মুহূর্তও বসে থাকা যায় না।

৩.
ড. আব্দুল্লাহর ঘর। বিছানার এক কোণে হতাশ হয়ে বসে আছে তুহিন। নিথর হয়ে পড়ে আছেন ড. আব্দুল্লাহ। হাতের আঙুল নাড়ানো ছাড়া পুরো শরীরই প্যারালাইজড বলা যায়। কথা শোনেন, কিন্তু বলার ক্ষমতা হারিয়ে গেছে।
সব ঘটনাই খুলে বলেছে তুহিন, তাঁর এই অবস্থায়ও। কিন্তু তিনি নিশ্চুপ। প্রায় দুই ঘণ্টা বসে থেকে উঠতে যাবে তুহিন, এমন সময়ে আঙুল দিয়ে কি যেন ইশারা করলেন ড. আব্দুল্লাহ। আঙুলের দিক তাকালো তুহিন। একটা ছোট কেবিনেটের দিকে ইশারা করে আছেন ড. আব্দুল্লাহ। দৌড়ে কেবিনেটের কাছে গেলো তুহিন। আনলক থাকায় খুলতে অসুবিধা হলো না তার। ড্রয়ার খুলতেই বেরিয়ে এলো কয়েকটা ফাইল, আর সকল গবেষণার শিকড় অর্থসহ একটা কুরআন শরিফ। ধীরে ধীরে ফাইলগুলো উল্টাতে থাকলো সে। এভাবে কতক্ষণ কেটে গেলো জানা নেই তার। ৪-৫টা ফাইল উল্টানোর পর একটা অধ্যায় দেখতে পেলো তুহিন, যার নাম ‘উঋওজ (উবভবহপব ঋবহপব ধহফ ওহভৎধৎবফ জধু)’। আনন্দে চোখ নেচে উঠলো তার। এক একটা পাতা উল্টে যেতে থাকলো তুহিন, আর উন্মোচিত হতে থাকলো ইনফ্রারেড ফেন্স এর সফলতার নতুন দ্বারগুলো।
রাত আড়াইটা বাজে, উঋওজ এর সব অধ্যায় পড়ে বুঝে অনেকটা আত্মস্থ করে ফেলেছে তুহিন। একটা অধ্যায়-ই বাকি, তা হলো, ঝঃধনরষরুরহম রহভৎধৎবফ ফবভবহপব ঈড়ধঃ. অধ্যায়টা খুলতেই কিছু লেখা দেখলো তুহিন, যার বাংলা এরকমÑ
‘ইনফ্রারেডের প্রায় সব ডিফেন্স তৈরিই সম্ভব, কিন্তু এই ডিফেন্স মেশিনের স্থায়িত্ব হতে পারে সর্বোচ্চ ১ দিন। দীর্ঘদিন মেয়াদে এই ডিফেন্স কোট আকারে কোনো বাড়িতে বা কোনো স্থাপনায় বসানো আমার কাছে অসম্ভব মনে হয়েছে। আমি এখন বৃদ্ধ, হয়তো এটাই আমার শেষ লেখা। কিন্তু আমি জানি, কেউ এই অসম্ভবকে ঠিকই সম্ভব করতে পারবে। সেই প্রত্যাশায় আমার এই গবেষণার মূল হাতিয়ার আমার কুরআন এই ফাইলগুলোর সাথে রেখে যাচ্ছি। আমি জানি, এর মধ্যে অবশ্যই এর সমাধান আছে। কিন্তু আমি তা বের করে যেতে পারছি না। কেউই কি পারবে না?…
ড. আব্দুল্লাহ।’
‘ইনশাআল্লাহ পারবো স্যার।’ কণ্ঠ আত্মবিশ্বাসে ভরে উঠলো তুহিনের। মূল হাতিয়ার তুহিনের কাছেও আছে। এখন চাই শুধু বাস্তবায়ন। তুহিন ফাইলগুলো নিয়ে বিদায় নিলো ড. আব্দুল্লাহর কাছ থেকে। ড. আব্দুল্লাহ চোখের অশ্রু ছাড়া আর কোনো উপদেশ দিতে পারলেন না।
বাইরে ফজরের আজান দিচ্ছে। নামাজ পড়ে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়বে দৈনন্দিন কাজে, আর তুহিনের নির্ঘুম চোখ নামাজ সেরেই ব্যস্ত হয়ে পড়বে পবিত্র কালামে হাকিমে। দুই রাকাআত নফল নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইলো প্রফেসর ড. ফারাহ তুহিন।

৪.
চোখ দুটো লাল হয়ে আছে তুহিনের। দুই দিন না ঘুমিয়ে আর ক্রমাগত পড়ার চাপ মাথা যেন আর নিতে পারছে না। কিন্তু সাফল্য আর এক কদম দূরে। এখন ঘুমানো যাবে না তুহিনের। শেষবারের মতো সূরা কাহাফের কয়েকটা আয়াত পড়ে নিয়ে আবারো ফাইলের শেষ দিকের একটা পাতা বের করলো সে। পড়তে পড়তে আনন্দ চিকচিক করে উঠলো তার। মুখের হাসিটা ক্রমশ বিস্তৃত হয়ে উঠতে থাকলো…
তিন দিন পার হয়ে গেছে। সফলভাবে ইনফ্রারেড রে কোটিং করা হয়েছে কাহানদের সেলে। টানা ১৬ ঘণ্টা ঘুমিয়েছে তুহিন, মাঝে শুধু নামাজ আর খাওয়া। আজ সকালে উঠে সেলের বাইরের দিকটা দেখছিলো সে। তার আড়াই দিনের টানা পরিশ্রমের ফসল গতকালকেই সেট করা এই ‘ইনফ্রারেড কোট’। তাই ঘুরে ঘুরে দেখছিলো তুহিন।
হঠাৎ উত্তর দিক থেকে ভয়ঙ্কর শব্দ আসতে থাকলো। সাথে সাথে চোখে ভিজ্যুয়াল অ্যাম্পিøফায়ার গ্লাস লাগালো তুহিন। যা দেখলো, তাতে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো তার।
কয়েক শ’ রোবটগান একসাথে একই রেঞ্জে ক্রমাগত ইনফ্রারেড রে ফায়ার করে যাচ্ছে ইনফ্রারেড কোটের ঠিক উত্তর কোণটায়। প্রায় এক ঘণ্টা ফায়ারিং চললো। খুব ভয় পাচ্ছিলো তুহিন, তার কোট এই আক্রমণ ঠেকাতে পারবে তো?
আলহামদুলিল্লাহ কোনো ক্ষতি হলো না। সেলের গার্ডদের হস্তক্ষেপে অধিকাংশ রোবটগান ধ্বংস করলেও কিছু রোবটগান পালিয়ে যেতে সক্ষম হলো। তুহিনের কাছে একটি রোবটের ধ্বংসাবশেষ আনা হলো। নেড়েচেড়ে কিছুক্ষণ দেখলো তুহিন। তারপর ঘরে নিয়ে এলো রোবটের ধ্বংসাবশেষটাকে।
রাতে খেতে বসলো তুহিন। এমন সময় নিজের ঘর থেকে কিছু অদ্ভুত শব্দ শুনতে পেয়ে দৌড়ে ঘরে গেলো সে। সেই রোবটের ধ্বংসাবশেষের একটা চিপ থেকে কাহানদের ভাষায় কেউ কিছু বলছে। কালবিলম্ব না করে ভাষা অনুবাদক যন্ত্র নিয়ে আসতে বললো নুযহাতকে। এরপর একসাথে শুনতে লাগলো কাহানদের ভেসে আসা কথাগুলো-
‘… আমি জানতাম না তুমি কে। কিন্তু তোমার হাত এই রোবটে যাওয়ার সাথে সাথে তোমার পরিচয় আমরা পেয়ে গেছি। তুমিই সেই প্রফেসর তুহিন, যে পৃথিবীতে আমাদের দুটো অভিযানই ব্যর্থ করে দিয়েছো। তোমাকে আমরা দেখে নেবো। তোমার LABS (Laser Air Bubble Sprayer)  কে আমরা অতিক্রম করেছি ইনফ্রারেড রে দিয়ে। আজ তাও ব্যর্থ করে দিলে। কিন্তু পরবর্তী চ্যালেঞ্জ রুখে দিতে পারবে তো তুমি? মনে রেখো, এর পরের অভিযান শুধু তোমাকে তুলে নিয়ে আসার জন্যই হবে। No offense, no defense. Only Vengeance…  আক্রমণ, প্রতিরক্ষার মিশন আর নয়। এরপর তোমাকে কিডন্যাপ করে প্রতিশোধ নেয়াই আমাদের মিশন হবে। সেদিনের অপেক্ষায় দিন গুনতে থাকো…. হা হা হা…..’
তুহিনের সাথে সাথে নুযহাতও শুনছিলো। কথা শুনতে শুনতে মুখে অন্ধকার নেমে এলো তার। তুহিন তার দিকে তাকিয়ে হেসে দিলো। বললো, ‘ভয় পাচ্ছিস? শোন, যতদিন এই কুরআন আমার টেবিলে থাকবে ততদিন সব চ্যালেঞ্জকেই আমি রুখে দিতে পারবো যদি আল্লাহ চান। একদম চিন্তা করিস না।’
নুযহাতের মুখ স্বাভাবিক হয়ে এলো। বললো, ‘আল্লাহ ভরসা।’
তুহিন বললো, ‘এসব বাদ দে তো। তুই আগে আমাকে একটা প্রশ্নের উত্তর দে। সেদিন তো তুই গেম খেলছিলি কম্পিউটারে। কিভাবে বুঝলি যে আমার ঘরে ইনফ্রারেড রে জ্বলেছে? ভিজ্যুয়াল অ্যাম্পিফায়ার তো আমার কম্পিউটারের উল্টো দিকে।’
কিছু না বলে একটা রহস্যের হাসি হাসলো ছোট্ট নুযহাত। কম্পিউটারে তখন শুরু হয়েছে অমিয় গ্রন্থের তেলাওয়াত, ‘তারাও ষড়যন্ত্র করলো, আল্লাহও কৌশল অবলম্বন করলেন। আর আল্লাহর কৌশলই উত্তম কৌশল…।’ (সূরা আলে ইমরান : ৫৪)

SHARE

Leave a Reply