Home তোমাদের গল্প মায়ের ভালোবাসা -মুনাওয়ার শাহাদাত

মায়ের ভালোবাসা -মুনাওয়ার শাহাদাত

আজ বৃহস্পতিবার। সালমান পুরো সপ্তাহ শুধু এ দিনটির অপেক্ষায় থাকে। কখন বৃহস্পতিবার আসবে আর বন্ধুদের সাথে খেলা করবে। সপ্তাহজুড়ে ক্লাসের চাপে ভালোভাবে খেলা করার সুযোগ হয় না। তাই প্রতীক্ষিত দিনটির আগমনে এতো আনন্দ-উত্তেজনা। খুশিতে প্রায় আত্মহারা হওয়ার জোগাড়।
সালমান এবার ক্লাস থ্রিতে উঠেছে। দফ্তরি আক্কাস আলী বেলা দেড়টায় থালার মতো বিশাল আকৃতির কাঁসার প্লেটে লোহার হাতুড়ি দিয়ে ঢং ঢং করে টুনটুনির মাধ্যমে ছুটি ঘোষণা করার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে স্কুলের বড় গেট দিয়ে সালমানের মতো ছোট ছোট শিশু-কিশোররা দলবেঁধে নাচতে নাচতে বাড়ির উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ে। সালমান বাড়ি পৌঁছেই দেখে তার মা পুকুরঘাটে। গোসল করছেন। মা তাকে দেখেই ডাক দিলেন-‘সালমান! স্কুলের ড্রেস খুলে তাড়াতাড়ি পুকুরঘাটে এসো।’ পুকুরঘাটে যেতেই সালমানকে ধরে সপ্তাহজুড়ে তার গায়ে বসে থাকা সব ময়লা সাবান মাখিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করে গোসল করিয়ে দিলেন। আসলে ছেলেমেয়ের জন্য মায়ের মতো এমন মমতাময়ী এই ধরণীর বুকে আর দ্বিতীয়জন খুঁজে পাওয়া যাবে না। দুপুরে খাবারের পর মা সালমানকে বললেন, ‘এ রোদের মধ্যে বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। সোজা বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়। বাইরে যে রোদ! গা একদম পুড়ে যাবে। ঘুম থেকে উঠে বিকেলে খেলা করো। সালমান কিছু বললো না। সুবোধ বালকের মত সোজা বিছানায় গিয়ে চুপটি মেরে ঘুমের ভান ধরে শুয়ে রইলো। আর শুয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো, কখন মা এসে তার পাশে ঘুমিয়ে পড়বে আর অমনি সে বেরিয়ে যাবে খেলা করতে। তার যেন আর তর সইছে না, বারবার উঁকি দিয়ে রান্নাঘরের দিকে দেখতে লাগল। মা এখনো আসছেন না কেন? অবশেষে মা আসছেন দেখে সাথে সাথে ঘুমের ভান ধরে শুয়ে থাকলো সে। মা এসে ছেলেকে ঘুমিয়ে পড়েছে মনে করে, ছেলের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে এক সময় তিনিও ঘুমিয়ে পড়লেন। আর সালমান তো সে অপেক্ষায়-ই ছিল এতক্ষণ। অমনি আস্তে আস্তে উঠে দরজাটা একটু ফাঁক করে এক দৌড়ে মাঠে পৌঁছে গেল, যেখানে তার বন্ধুরা তার জন্য অপেক্ষা করছে।
আজ দক্ষিণপাড়ার ঝন্টুদের সাথে ক্রিকেট ম্যাচ খেলার কথা। তাই এতক্ষণ সবাই সালমানের জন্য অপেক্ষা করছিল। তাকে আসতে দেখে সবাই একসঙ্গে হাততালি দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করতে লাগল। ঝন্টু এক টাকার একটা কয়েন পকেট থেকে বের করে টস দিল। টসে সালমানরা জয়ী হলো। মানে সালমানদের প্রথম ব্যাটিং। সালমান ভালো ব্যাটসম্যান। তাই সে আর রাকিব ওপেনিংয়ে নামলো ব্যাট হাতে। সবাই হাততালি দিয়ে তাদের অভিনন্দন জানালো। কিছুক্ষণ ব্যাট করার পর ঝন্টুর একটা পেস বলে শর্ট দিতে গেলে বলটি লক্ষ্যচ্যুত হয়ে ব্যাটে না লেগে তার বাঁ চোখের একটু ওপরে লাগে। সঙ্গে সঙ্গে ওমা! বলে চিৎকার করে সালমান মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। প্রায় সাথে সাথে রাকিব, সাকিব, ঝন্টু সবাই দৌড়ে এসে তাকে ধরলো। তারা দেখতে পেল, দ্রুতগতির বলের আঘাতে সালমানের বাম চোখের ওপরের পাশটা ফুলে গেছে। আর চোখ দুটোতে রক্ত জমাট হয়ে গেছে! সালমান আর মাঠে থাকতে পারলো না। ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে মাঠের বাইরে গিয়ে বসে পড়ল। তার আজকে আর খেলার সুযোগও রইলো না। বসে বসে খেলা দেখছে আর যে স্থানে বল লেগেছে সে স্থান এক হাত দিয়ে আলতোভাবে ম্যাসেজ করছে। একসময় খেলা শেষ হলে যে যার বাড়িতে ফিরে যেতে লাগলো। কিন্তু শুধু সালমান মাঠের এক কোণে বসে বসে ভাবছে, ‘এমনিতে মাকে না বলে এসেছি, তারপর আবার বলের আঘাতে মুখটা ফুলে গেছে মিষ্টি কুমড়ার মত! এখন আম্মুর সামনে কিভাবে দাঁড়াবো। আম্মুকে কী বলব, কী উত্তর দেবো!’ এ কথাগুলো ভাবতে ভাবতে মসজিদের মিনার থেকে মুয়াজ্জিনের সুমধুর কণ্ঠে মাগরিবের আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে শুনে আর বসে রইলো না। ফোলা ফোলা মুখে আস্তে আস্তে বাড়ির দিকে পা বাড়ালো। আর মনে মনে বললো, ‘আল্লাহ যা করেন তাই হবে। আগে বাড়ি গিয়ে দেখি।’
এদিকে সালমানের মা তাকে খুঁজতে খুঁজতে অস্থির। এখনো সালমানের বাড়ি ফেরার নাম নেই। তাই তিনি অস্থির হয়ে বাড়ির উঠোনে অশ্রু টলমল চোখে মোড়া পেতে বসে আছেন। সালমান উঠোনে পা রাখতেই প্রায় দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলেন, ‘এতক্ষণ কোথায় ছিলি বাবা! আমি তো চিন্তায় সেই কখন থেকে অস্থির হয়ে আছি। সূর্যাস্ত হয়ে গেছে সেই কখন। আর তুই এখন এলি।’ এতক্ষণ সালমানের মা খেয়াল করেননি। পরক্ষণে তার চোখের দিকে ভালোভাবে তাকাতেই চিৎকার দিয়ে বলে ওঠেন ‘বাবা! তোর কী হয়েছে। তোর চোখ মুখ ফোলা কেন? কোথায় গিয়েছিলি? এবার সালমান ভয়ে ভয়ে আস্তে আস্তে বলল, ‘খেলার সময় একটা বল এসে চোখের ওপর লেগেছে। আর তাতে চোখ মুখ ফুলে গেছে। মা বললেন, ‘বলটা একেবারে চোখে লাগলে তখন কী হতো! তোর কিছু হলে আমার কী হতো? আমি কাকে নিয়ে বাঁচবো? তুই ছাড়া যে আমার পৃথিবীতে আর কেউ নেই। তবু কেন আমার কথা শুনিস না! সালমান তার মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল; ‘মা আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। আমাকে মাফ করে দাও। আজকের পর আমি আর কখনো তোমার কথার অবাধ্য হবো না। সবসময় তোমার আদেশ-নিষেধ মেনে চলবো। আমিও তোমাকে অনেক ভালোবাসি মা! তুমি ছাড়া আমারও যে আর কেউ নেই। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও।’

SHARE

Leave a Reply