Home প্রচ্ছদ রচনা সুন্দরবন অতীত ও বর্তমান -ফকির আব্দুল্লাহ আল ইসলাম

সুন্দরবন অতীত ও বর্তমান -ফকির আব্দুল্লাহ আল ইসলাম

চির রহস্যময় এক অরণ্য, এটা হলো বিশ্বঐতিহ্য সুন্দরবনের জানা-অজানা কথা। প্রথমে জানব সুুন্দরবন কী?
সুন্দরবন হলো প্রধানত সুন্দরী বৃক্ষে ভরপুর যে বন তাকে সুন্দরবন বলা হয়। অবশ্য সুন্দরবনের নাম নিয়ে আরো কয়েকটি মতামত প্রচলিত আছে। তবে এটিই বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্য ও পরিচিত নাম। উপমহাদেশের মধ্যে গঙ্গা অন্যতম শ্রেষ্ঠ নদী। হিমালয় পর্বতের সানুদেশে গঙ্গোত্রী নামক স্থান থেকে এর উৎপত্তি বলে এর নামকরণ হয়েছে গঙ্গা। বিশাল এলাকা বিস্তৃত সুউচ্চ, চির তুষারাবৃত হিমালয়ের তুষার নিঃসৃত পলিযুক্ত পানিকণা শত-শত নির্ঝরণী পথের শেষে গঙ্গা নদীতে পতিত হয়। গঙ্গা নদী থেকে আরেকটি শাখা ভাগীরথী নাম ধারণ করে মুর্শিদাবাদ ও কলকাতা হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। ভাগীরথী ও পদ্মা-মেঘনার মধ্যবর্তী ভূ’ভাগের দক্ষিণে এবং বঙ্গোপসাগরের উত্তরে অবস্থিত পানিবেষ্টিত ভূ-ভাগকে সুন্দরবন নামে আখ্যা  দেয়া হয়েছে। মূল কথা এই যে, হিমালয়ের পলিযুক্ত পানিকণা প্রবাহ হতে হতে বঙ্গোপসাগরে পতিত হওয়ার কালে সমুদ্রতীরে যে চরের সৃষ্টি করেছে, সেখানেই গড়ে উঠেছে এই সুন্দরবন। এই হচ্ছে সুন্দরবনের আদি উৎপত্তি ও ভূ-তত্ত্বের কথা। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় সুন্দরবনও ভাগ হয়ে যায়। এর এক অংশ বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। আর অপর অংশ ৬২ শতাংশ বর্তমান আমাদের বাংলাদেশের মধ্যে পড়ে।

সুন্দরবনের অবস্থান
সুন্দরবনের অবস্থান ভারতের পশ্চিমবঙ্গে, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৩টি জেলা খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায়। এ ছাড়া এ বন পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলাকেও স্পর্শ করেছে।

সুন্দরবনের আয়তন
সুন্দরবনের আয়তন ১৭৭৬ সালে ছিল ভারতীয় অংশে ৮ হাজার ৮ শত ৩৩ বর্গ কিলোমিটার। বাংলাদেশ অংশের আয়তন ছিল ১১ হাজার ২ শত ৫৬ বর্গ কিলোমিটার। দুই অংশ মিলিয়ে মোট আয়তন ছিল ২০ হাজার ৮৯ বর্গ কিলোমিটার। বর্তমান বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশের সরকারি নথি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসাবে সুন্দরবনের আয়তন ধরা হয় ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটার। বাংলাদেশ অংশে ৬ হাজার বর্গ কিলোমিটার আর ভারতীয় অংশে ৪ হাজার বর্গ কিলোমিটার। তবে সাম্প্রতিক বাংলাদেশের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ট্রাস্টি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সুন্দরবনের ভূমি ও উদ্ভিদের পরিবর্তনের ধরন নিয়ে দু’টি গবেষণায় সুন্দরবনের আয়তনসহ জীববৈচিত্র্যের বড় ধরনের পরিবর্তন বা বিপর্যয় দেখা গেছে। সিইজিআইএসের সুন্দরবন জয়েন্ট ল্যান্ডস্কেপ ন্যারেটিভ-২০১৬ শীর্ষক ওই গবেষণায় সুন্দরনের বর্তমান আয়তন ভারতীয় অংশে ৩ হাজার ৯৪ বর্গ কিলোমিটার। আর বাংলাদেশ অংশে ৫ হাজার ৩ শত ২০ বর্গ কিলোমিটার। দুটো মিলিয়ে তাহলে মোট আয়তন ৮ হাজার ৪শত ১৪ বর্গ কিলোমিটার। ভাবা যায়! অবাক হওয়ার ব্যাপারও বটে?

বিশ্বঐতিহ্যে সুন্দরবন
অনেক দেরিতে হলেও জাতিসংঘের ইউনেস্কো ১৯৯৭ সালে ৬ ডিসেম্বর সুন্দরবনের তিনটি প্রাণী-অভয়ারণ্য পূর্বাঞ্চলীয় সুন্দরবন, পশ্চিমাঞ্চলীয় সুন্দরবন ও দক্ষিণাঞ্চলীয় সুন্দরবন নিয়ে গঠিত ১ লক্ষ ৩৯ হাজার ৭ শত হেক্টর বনাঞ্চলকে বিশ্বঐতিহ্য ঘোষণা করে। এটি ৫২২তম বিশ্বঐতিহ্য। ইউনেস্কো আবার সুন্দরবনকে দু’ভাগে ভাগ করে। ভারতীয় অংশকে বলে সুন্দরবন ন্যাশনাল পার্ক। আর আমাদের অংশকে বলে সুন্দরবন। সুন্দরবন হচ্ছে গোটা পৃথিবীর একক বৃহত্তম প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বা লবণাক্ত কানন। এটি টাইডাল বা জোয়ার-ভাটার বনও। বাংলাদেশের একক বনভূমি হিসেবেও প্রথম এবং এটি বাংলাদেশের জাতীয় বন।
সুন্দরবনের গাছপালা
সুন্দরী গাছ ছাড়াও এখানে রয়েছে গোলগাছ, হোগলা, পশুর, গেওয়া, কেওড়া, বাইন, কাক্ড়া, গরান, গর্জন, ধুন্দল, হেন্ডাল, ওড়া, আমুড়, শিঙ্গাড়া, ভাদাল, গ’ড়ে, খলসী, হিঙ্গে, মা’লে ইত্যাদি।

সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী
এই বনে বন্যপ্রাণীর সংখ্যাও অন্য বনাঞ্চলের চেয়ে বেশি। এখানে রয়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার। সুন্দরবনের বাঘের মতো এত শক্তিশালী, হিংস্র, বাঘ পৃথিবীর আর কোথাও নেই। আকারে এরা ৮ ফুট পর্যন্ত দীর্ঘ এবং প্রায় ৪ ফুট উঁচু হয়। এখানে রয়েছে কয়েক প্রজাতির হরিণ। শুকনো গাছের ডাল-পালার মতো আঁকাবাঁকা শিংওয়ালা চিত্রল হরিণ, মায়াভরা চোখের মায়া হরিণ, আর শুধু ম্যানগ্রোভ বনেই দেখা যায় তাদের। পশুদের মধ্যে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে অগণিত বানর, শূকর, লোনা পানির কুমির, হাঙ্গর, ডলফিন, শুশুক, কচ্ছপ, কাঁকড়া, অজগর, গুইসাপসহ বিষধর সাপ আছে বেশ কয়েক প্রজাতির। ইলিশ, বাগদা, গলদা, লইট্টা, ছুরি পোয়া, রূপচাঁদা, ভেটকি, পারসে, চিত্রা, ট্যাংরা, দাতনা, পাঙ্গাশ, মাগুর, কাইনসহ মৎস্য রয়েছে প্রায় ১২০ প্রজাতির। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে যখন বড় ধরনের জরিপ করা হয়েছিল তখন সুন্দরবনের মাছের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৩৪ প্রজাতির।

মাছরাঙা, বালিহাঁস, বন মোরগ-মুরগি, গাঙচিল, বক, মদনটাক, চিল, ঈগল, পানকৌড়ি, শালিক, টিয়া, দোয়েলসহ পাখি আছে ২৭০ প্রজাতির। স্তন্যপায়ী প্রাণী আছে ৪২ প্রজাতির।
সরীসৃপ (বুকে ভর দিয়ে চলে এমন প্রাণী) সাপ, কুমিরসহ ৩৫ প্রজাতির। উভচর প্রাণী আছে ৮ প্রজাতির। রয়েছে বিভিন্ন রকমের পোকা-মাকড়সহ ঝাঁকে-ঝাঁকে মৌমাছি!
সুন্দরবনের নদ-নদী
সুন্দরবনের নদ-নদীর উপমা হলো দেহ যেমন প্রাণ ছাড়া চলতে পারে না আবার প্রাণও দেহ ছাড়া চলতে পারে না। সুন্দরবনের নদ-নদীর সংখ্যা অগণিত যা পুরো সুন্দরবনের মধ্যে জালের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবার ৬ ঘণ্টা করে দুইবার জোয়ার ও দুইবার ভাটা হয়। এ কারণে এখানকার বৃক্ষ-লতা বিশ্বের যেকোনো জঙ্গল থেকে আলাদা ধরনের।
এ বনের অন্যতম নদী পশুর, শিবসা, বলেশ্বর, রায়মঙ্গলসহ প্রায় ৪ শ’ নদ-নদী, খাল-নালাসহ ২শ’টি ছোট-বড় দ্বীপ ছড়িয়ে আছে সুন্দরবনে।

সুন্দরবনের প্রশাসনিক কাঠামো
১৬৫৮ সালে শাহ সুজা সুন্দরবনকে তার শাসনের অন্তর্ভুক্ত করেন। টোডরমলের রাজস্ব তালিকা ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে প্রণীত হয়। ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে সুলতান সুজা এই তালিকা পুনর্বিন্যাস করেন। মোগল আমলে সুন্দরবনকে মোরাদখানা ও জেরাদখানা বলা হতো। তখন সুন্দরবনের সামান্য রাজস্ব নির্ধারিত ছিল। ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে ক্লড রাসেল সুন্দরবনকে আবাদ করেন। এরপর ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে যশোরের জজ ম্যাজিস্ট্রেট টিলম্যান হেংকেলের সময় সুন্দরবন জমিদারদের দখলমুক্ত হয়ে জাতীয় সম্পদে পরিণত হয়। ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে ২৩ রেগুলেশন অনুসারে সুন্দরবনের শাসনব্যবস্থা আলাদাভাবে দেখানো হয়। তখন ওই বিধান বলে ‘কমিশনার অব সুন্দরবনস’ পদের সৃষ্টি করে তার শাসনব্যবস্থা শৃঙ্খলিত হয়। লেফটেন্যান্ট হজেস ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে সুন্দরবন জরিপ করেন। আলীপুরে সুন্দরবন বিভাগের সর্বপ্রথম হেডকোয়ার্টার স্থাপিত হয়। বাস্তবে ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে সুন্দরবন থেকে রাজস্ব আদায় করা হয়নি। সুন্দরবন সর্বপ্রথম পোর্ট-ক্যানিং কোম্পানিকে বছরে ৮ হাজার টাকায় বন্দোবস্ত দেয়া হয়। ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে গভর্নমেন্ট সুন্দরবনের শাসনভার নিজ হাতে গ্রহণ করেন। ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে ডেপুটি কনজারভেটর অব ফরেস্ট মি. শ্লিট বন বিভাগের আর্থিক গুরুত্ব উপলব্ধি করেন। ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার গভর্নর স্যার রিচার্ড টেম্পল সুন্দরবনের অবস্থা সরেজমিনে তদন্ত করেন এবং এটি বন এলাকার মানুষের জন্য কত গুরুত্বপূর্ণ তা বুঝতে পারেন। এ সময় সুন্দরবনের বিভিন্ন স্থানে চাষাবাদযোগ্য জমি সৃষ্টি করেন স্থানীয় জনগণ।
১৮৭৪-৭৫ খ্রিস্টাব্দে সুন্দরবনের জন্য স্বতন্ত্র বিভাগের সৃষ্টি করা হয়। মাত্র ৮৮৫ স্কয়ার মাইল জঙ্গল সংরক্ষিত বলে ঘোষণা করা হয়।
১৮৭৫-৭৬ খ্রিস্টাব্দে আরো ৩১৪ বর্গ মাইল এলাকা বৃদ্ধি করা হয়। এভাবে ধীরে ধীরে সমগ্র এলাকা সংরক্ষিত হয়ে সরাসরি সরকারের তত্ত্বাবধানে আসে। সুন্দরবন এলাকায় ধীরে ধীরে লোকালয়ের মতো আইন-কানুন চালু হতে থাকে। বর্তমানে সুন্দরবনের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে ২টি বন বিভাগÑ বাগেরহাট পূর্ব বন বিভাগ ও খুলনা পশ্চিম বন বিভাগ। চারটি প্রশাসনিক রেঞ্জ আছে- চাঁদপাই, শরণখোলা, খুলনা ও বুড়িগোয়ালিনি। রয়েছে ১৬টি বন স্টেশন। ৯টি ব্লক ও ৫৫টি কম্পার্টমেন্ট।
বন সংরক্ষণের জন্য তাতে একটি সংরক্ষক পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। বন বিভাগ প্রধানের পদটি খুলনাকেন্দ্রিক। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য বিভাগীয় বন কর্মকর্তার অধীনে রয়েছে বহুসংখক পেশাদার জনবল। ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রীয় একক হলো চারটি বন স্টেশনের অধীনে থাকা ৫৫টি কম্পার্টমেন্ট।

সুন্দরবনের কিছু তথ্য
আজকের সুন্দরবন অতীতে বহুজাতির অধিকারে ছিল। সেসব বিবর্তনের সবটুকু জানাও সম্ভব নয়। তবে যতটুকু জানা যায়, সুন্দরবন এক সময় পালদের দখলে ছিল। তারপর আসে হিন্দুদের দখলে। তারপর তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খিলজির দখলে। তারপর গাজি-কালু-চম্পাবতী, মুকুটরায় ও দক্ষিণরায়-এর কাহিনী জানা যায়। এ ছাড়া বুনোদের সুন্দরবনে বসবাস, রাজা প্রতাপাদিত্য, বাংলার বারো ভূঁইয়া, পর্তুগিজ-মগ-ফিরিঙ্গিদের প্রভাবের কথাও জানা যায়। জানা যায় খানজাহান আলীর শুভাগমনের কথা। এবং তারই হাতে সুন্দরবনের প্রকৃত উৎকর্ষতা সাধন হয়। তাকে সুন্দরবনের চির স¤্রাটই বলা চলে। ষাটগম্বুজ মসজিদ, খাঞ্জেলি দিঘিসহ আরো অনেক দিঘি ও উন্নত রাস্তাঘাট নির্মাণ করেন। এ ছাড়া মোগল, ব্রিটিশ, পাকিস্তানি কোনো আমলই বাদ পড়েনি সুন্দরবন কালের সাক্ষী থাকতে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সুন্দরবন ৯ নং সেক্টরের অধীনে ছিল। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর আব্দুল জলিল। সাব-সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর জিয়াউদ্দিন।

পর্যটন শিল্পে সুন্দরবন
বিশ্বঐতিহ্য সুন্দরবন ভ্রমণের জন্য বর্তমানে নদীপথে করমজল, হাড়বাড়িয়া, কটকা, কচিখালী, হিরণপয়েন্ট ও দুবলারচর নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকা রয়েছে। সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার দেশের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দর মোংলা। এটি বাগেরহাটের মোংলায় পশুর নদীর তীরে গড়ে তোলা হয় ১লা ডিসেম্বর ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে।
প্রথমে অবশ্য চালনা বন্দর নামে যাত্রা শুরু হয়। পরে নাম পরিবর্তন করে মোংলা বন্দর রাখা হয়। এখানে সরকারি পরিচালনায় পশুর হোটেল নামে একটি বিলাসবহুল আবাসিক হোটেল রয়েছে। সরকারি হোটেল ছাড়াও কয়েকটি আবাসিক হোটেল ও রেস্তোরাঁ রয়েছে। এখানে দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা চমৎকারভাবে ভ্রমণকালীন সময় পার করেন। এখানে একটি পিকনিক কর্নার রয়েছে বন্দর এলাকায়। এখান থেকে সুবিধামতো লঞ্চ, ট্রলার, নৌকাযোগে সুন্দরবনে যাতায়াত করতে হয় এবং সড়কপথে সুন্দরবনের লোকালয়গুলোও ঘুরে আসা যায়। ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে বহুসংখ্যক পাশ্চাত্য সাংবাদিক সুন্দরবন ভ্রমণে আসেন। ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ব বন্য জন্তু তহবিলের পক্ষে পাঁচ সদস্যের একটি দল গাই মাউন্টফোর্টের নেতৃত্বে তথ্যানুসন্ধানের জন্য সুন্দরবন ভ্রমণ করেন। তারা সরকারকে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দেন। সুন্দরবন বিশ্বের বিরল অনেক ঐতিহ্যে ভরপুর থাকলেও এখনো যথাযথ পর্যটন কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি বললেই চলে। এটা আমাদের শুধু নয়, বিদেশিদের কাছেও দারুণ দুঃখের বিষয়! এমনও দেখা যায় যে নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় কয়েক কিলোমিটার জুড়ে কোনো বিশ্রামাগার নেই। গাছের বাকল, শিকড় ইত্যাদির ওপর বসে বিশ্রাম নিতে হয়। অভিজ্ঞদের মতে জয়মনির ঘোল থেকে উড়াল সেতুযোগে সুন্দরবনের ওপর আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা যায়। এতে করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সুন্দরবনের পর্যটন শিল্প একেবারে প্রথম সারিতে চলে আসতে পারতো।

সুন্দরবনের ঔষধি গাছ
অবাক হয়ে ভাবি আল্লাহ তায়ালা সুন্দরবনকে কেন এত সুন্দর করে সাজালেন? বাংলাদেশে জন্ম হওয়ার পরও যাঁরা সুন্দরবনের রূপ-মাধুর্য দেখেনি, তাঁরা আসলে বাংলাদেশের রূপ উপলব্ধি না করেই বিদায় নিয়েছেন! তাইতো এক কবি কঠিন আবেগে বলে ওঠেন-
হে সুন্দরবন, ক্ষণ প্রতিক্ষণ, নাও কেড়ে মন/ লবণী কানন, বিশ্ব সেরা ধন, দেখে যাও জন!
সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে আধুনিক গবেষণাগার গড়ে তুললে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূলে অর্থাৎ এক নম্বর অবস্থানে সুন্দরবনের নামই উচ্চারিত হতো! তারই বাস্তব নমুনা পেশ করেছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আর জে কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের বিজ্ঞানীরা। তারা পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন অংশের লাগোয়া লোকালয়ের মানুষদের ভেষজ চিকিৎসা ও খাদ্যাভ্যাস নিয়ে একটি গবেষণা শুরু করেন। শুরুর পর জানতে পারেন সুন্দরবনের প্রধান গাছ সুন্দরীর পাতা ও শ্বাসমূলে এমন কিছু ভেষজ উপাদান রয়েছে যা ‘টাইপ-টু-ডায়াবেটিস’ সারিয়ে তুলতে বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে। মজার ব্যাপার হলো সুন্দরীর পাতা, শ্বাসমূলসহ অন্যান্য অংশেও এমন কিছু উপাদান আছে যা সুগার লেভেল স্বাভাবিক করে দেয়। কিন্তু স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে আরো কমিয়ে হাইপোগ্লাইসেমিয়ার বিপদ ডেকে আনে না। ডায়াবেটিস সারাতে সুন্দরী গাছের এমন ঔষধি গুণের কথা চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর আগে কখনো জানা যায়নি। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে পাঁচ বছর ধরে সুন্দরবনের ভারতীয় অংশে গবেষণাটি চালানো হয়। কেওড়ার ফলেও ডায়াবেটিস সারান সম্ভব বলে জানা গেছে। এছাড়া আমাদের সুন্দরবন অংশের বাসিন্দাদের কাছ থেকে জানা যায়, আরো অনেক তথ্য তত্ত্ব। তার মধ্যে পশুর গাছের ছাল-পাতা ও শ্বাসমূলকে আমাশয়ের ডাক্তার মশাই বলা হয়। আকন্দ পাতার সমান পিঠ দিয়ে পচা ঘা সারান, গোল গাছের রস ও গুড় ঔষুধিগুণ সম্পন্ন। তা ছাড়া সুন্দরবনের প্রসিদ্ধ মধু তো রয়েছেই! তাই সুন্দরবনের জন্য স্থায়ীভাবে আধুনিক গবেষণাগার গড়ে তোলা একান্ত দরকার।

অর্থনীতিতে সুন্দরবন
সুন্দরবনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে দ্বিতীয় অবস্থান দখল করে আছে সুন্দরবনের চিংড়ি মাছ। চিংড়িকে তাই হোয়াইট গোল্ড বা সাদা সোনা বলা হয়। বাংলাদেশের চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্র বাগেরহাটে অবস্থিত। চিংড়ি চাষের জন্য খুলনা অঞ্চলকে বাংলাদেশের কুয়েত সিটি বলা হয়। দেশের আমিষের চাহিদা ৬০ ভাগ পূরণ হয় মাছ থেকে। আর এ মাছেরও একটা বড় প্রাকৃতিক উৎস এ সুন্দরবন। বাংলাদেশে ব্যবহৃত কাঠের ৬০ ভাগই সুন্দরবনের। নিউজপ্রিন্ট কাগজ, বাক্স, দিয়াশলাইয়ের কাঠি তৈরি করা হয় গেওয়া কাঠ থেকে। পেন্সিল তৈরি করা হয় ধুন্দল কাঠ দিয়ে। পশুর ও গরান দিয়ে রঙ তৈরি করা হয়। গোলপাতা দিয়ে দেশের অগণিত ঘরের ছাউনি ও বেড়া দেয়া হয়। হোগলা দিয়েও বেড়া দেয়াসহ চাঁই তৈরি, ডালা তৈরি ইত্যাদি কাজে ব্যবহৃত হয়। এমনিভাবে সুন্দরী দিয়ে নৌকা, ট্রলার তৈরিসহ অসংখ্য কাজে ব্যবহৃত হয়। হেন্তাল দিয়েও অনেক রকমের কাজ করা হয় বাসা-বাড়ির। সুন্দরবন থেকে কাঁকড়া ও কুঁচে চিংড়ি মাছের মতো বিদেশে রফতানি করা হয়। আর তাতেও দেশের অর্থনৈতিক খাতে বড় ধরনের ভূমিকা থাকে। সুন্দরবনের বিভিন্ন ফল যেমনÑ ওড়া, কেওড়া, গোল, বনবরুই, বেত ফল, শিঙ্গাড়া, সুন্দরীর ফল, হেন্তালের মাথি এগুলোও অর্থনৈতিক সম্পদ। সুন্দরবনের মধু জগদ্বিখ্যাত এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং সুন্দরবনের উঁচু অংশে তেঁতুল, কদবেলসহ নানা রকমের ফল গাছ চাষ করা সম্ভব। এ ছাড়া বন বিভাগের জেলে, বাওয়ালি, মৌয়াল, কাঠুরিয়া, পর্যটক, গবেষকসহ অনেক খাতে সরকারি রাজস্ব উপার্জিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রেও সুন্দরবনের ভূমিকা ব্যাপক। সুন্দরবনের কারণেই খুলনা অঞ্চল পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে। আর বাগেরহাটে তো পরিবেশ রক্ষায় স্বয়ংসম্পন্নর থেকেও বেশি বনভূমি রয়েছে। সুন্দরবন শুধু বাংলাদেশের নয়, পুরো পৃথিবীর পরিবেশ রক্ষায় অবদান রাখছে। সুন্দরবন নিয়ে মাঝে মধ্যে তবে অবাক হই কিছু কিছু বুদ্ধিজীবীর কথা শুনে, যারা বলে ‘সুন্দরবন থাকলে বা কি আর না থাকলে বা কি? অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এর কী গুরুত্ব আছে?’ তারা এই বনের প্রকৃত গুরুত্ব বুঝে কথা বলেন বলে মনে হয় না।
সুন্দরবনের বর্তমান অবস্থা
বনদস্যু-জলদস্যু-চোরা শিকারিদের দ্বারা সুন্দরবন ধ্বংসের খবর নতুন নয়, সেই প্রাচীনকাল থেকেই। তবে বর্তমানে আরো বহুগুণে বেড়ে গেছে। এ ছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেও সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বন ভেঙে নদীতে বিলীন হচ্ছে। পশু-পাখি মারা পড়ছে ইত্যাদি। আগেই বলেছি সুন্দরবনের বহু প্রাণী আজ বিলুপ্ত। কেউ কেউ বলে হিং¯্র প্রাণী না থাকলেই তো ভালো তাই না? ওরা মানুষের অনেক ক্ষতি করে! এটি একেবারেই অজ্ঞ কথা। ওরা ছিল বা আছে বলেই সুন্দরবনের মহাসম্পদগুলো সংরক্ষিত ছিল বা আছে। একটি প্রাণী জাত বিলুপ্ত হওয়ার সাথে সাথে গোটা প্রাণিকুলেরই বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। ১৯৯৮ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাঘের ৮ উপ-প্রজাতির সংখ্যা ছিল ৭ হাজার ৬শ’টি। ২০১০ সালে এ সংখ্যা কমে গিয়ে ৩ হাজার ২শ’ টিতে দাঁড়ায়! বাঘ বিশেষজ্ঞদের মতে এ ধারা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে ২০২২ সালে গোটা পৃথিবীতে বাঘ প্রজাতির পুরোপুরি বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে! ১৯৮২ সালে প্রথম সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘ গণনা শুরু হয়। তখন পায়ের ছাপ সংগ্রহের মাধ্যমে ৪৫০টি বাঘ রয়েছে বলে জানতে পারে বন বিভাগ। একই পদ্ধতিতে ১৯৯২ সালে বাঘের সংখ্যা ৩৫৯টি, ১৯৯৩ সালে ৩৬২টি, ২০০৪ সালে ৪৪০টি, ২০০৬ সালে ২শ’টি এবং সর্বশেষ ক্যামেরা টপিংয়ের গণনায় বাঘের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০৬টি। তবে আরো ৭৭টি বাঘ চিহ্নিত করা হয়েছে পায়ের ছাপ ও স্যাটেলাইটের ছবি দেখে। চোরা শিকারিদের তৎপরতা ছাড়াও বাঘ-মানুষের সঙ্ঘাতে গড়ে বছরে ৩টি বাঘ মারা পড়ছে সুন্দরবনে। এছাড়া প্রাকৃতিক বৈরী আচরণেও প্রাণ হারাচ্ছে বাঘ। সুন্দরবন রক্ষার ক্ষেত্রে বন বিভাগের নানা রকম ত্রুটিও বন ধ্বংসের জন্য অন্যতম কারণ। সেসব কারণেরই ফলে আগের তুলনায় অপরাধ তৎপরতা বাড়লেও বন মামলা কমে যাচ্ছে দিন-দিন। এখন বন মামলা প্রায় নেই বললেই চলে। জেলেদের বিষ দিয়ে মাছ ধরাও একটি ভয়ঙ্কর কারণ। মূল-কথা বনজীবীরা মোটেও বন ব্যবহারে সচেতন না। আর তাদেরকে সচেতনতার জন্য উপযুক্ত কোনো কর্মশালারই আয়োজন করা হয় না। আরেকটি অন্যতম কারণ হলো ১৯৭৫ সালে ভারত কর্তৃক গঙ্গা নদীর ওপর ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ। আগে গঙ্গা নদীর মিঠা পানি গড়াই হয়ে পশুর ও শিবসা নদীর মাধ্যমে সুন্দরবনে প্রবাহিত হতো। এতো সেই আদিকাল থেকে বহমান ছিল। আগেইতো বলেছি সুন্দরবনের আদি কথা। এখন মিঠা পানিপ্রবাহ কম থাকায় অপর দিক থেকে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়েছে সুন্দরবনের মধ্যে। বাঁধ চালুর পর থেকে সুন্দরবন প্রতি সেকেন্ডে শূন্য থেকে ১৭০ ঘন মিটার পলিযুক্ত মিঠা পানি গ্রহণ করছে। সেখানে লবণাক্ততার পরিমাণ ঠিক রাখার জন্য দরকার কমপক্ষে ১৯৪ দশমিক ৪ ঘন মিটার মিঠা পানি। যদিও ১ শতাংশের বেশি লবণাক্ততা থাকলে সুন্দরী গাছের বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, ফারাক্কা বাঁধ চালু হওয়ার পর থেকে প্রধানত মিঠাপানির অভাবেই বাঘ, হরিণসহ প্রায় সকল প্রাণীরই বেঁচে থাকা কঠিনতর হয়ে পড়েছে। ১৯৫৯ সালে সুন্দরবনে প্রতি হেক্টরে ২৯৬টি গাছ ছিল। তাতে সুন্দরীর সংখ্যা ছিল ২১১টি। ১৯৮৩ সালে হেক্টরপ্রতি গাছের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৮০তে সুন্দরী ১২৫, ও ১৯৯৬ সালে তা আরো কমে হয় ১৪৪ সুন্দরীর সংখ্যা ১০৬টিতে। এভাবে চললে ২০২০ সালের মধ্যে গাছের সংখ্যা হেক্টরপ্রতি নেমে আসবে ১০৯টিতে। আর সুন্দরীর সংখ্যা ৮০টিতে নেমে আসবে। ফারাক্কা বাঁধের পর শুধু আমাদের সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা নয়। সমগ্র দেশের অর্থনৈতিক ব্যাপক ক্ষতি হয়ে আসছে এবং উজানের দেশ ভারতেরও নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে পলি জমে। বন্যায় প্লাবিত হচ্ছে বিহারের গ্রামের পর গ্রাম। সর্বশেষ এবং সর্ব বৃহত্তম যে ঝুঁকি-হুমকি সিডরের মতো এসে হাজির হয়েছে সুন্দরবনের সামনে তাহলো বাগেরহাটের রামপালে সুন্দরবন থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরত্বে নির্মাণ হতে যাওয়া এবং পশুর নদীর সাথে সংযুক্ত, ভারত-বাংলাদেশ যৌথ বিনিয়োগে প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। কয়লা আসবে সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট-বড় নদীর মধ্য দিয়ে জাহাজে করে। বিশেষজ্ঞরা অনেক আগেই বলেছেন, সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে চলাচলকারী কয়লা, ছাই, সার ও তেলবাহী জাহাজ সুন্দরবনের প্রাণিকুলের জন্য ভ্রাম্যমাণ বোমা!। ইআইএ প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বছরে ৪৭ লাখ ২০ হাজার টন কয়লা পোড়াতে হবে। যাতে গড়ে বছরে ১০ লাখ টনের বেশি ছাই উৎপন্ন হবে। বছরে ৮০ লাখ টন কার্বনড্রাই-অক্সাইড উৎপন্ন হবে। এ ছাড়াও বছরে ৫১ হাজার ৮৩০ টন বিষাক্ত সালফার ডাই-অক্সাইড ও ৩১ হাজার ২৫ টন নাইট্রোজেন ড্রাই-অক্সাইড নির্গত হবে। এবার হিসাব করুন সুন্দরবনসহ এ অঞ্চলের ভবিষ্যৎ জীবন কোন্ পথে? তবে আশার দিক হলো এ ব্যাপারে জাতিসংঘের ইউনেস্কো সুন্দরবনের ক্ষতিকারক দিক বিবেচনা করে ৩০ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছে বাংলাদেশ সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে, যাতে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি অন্যত্রে সরিয়ে নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এবং ১১ অক্টোবরের ’১৬ মধ্যে সরকারের মতামত চেয়েছেন। এখন আমাদের অপেক্ষার পালা! হ

SHARE

Leave a Reply