Home স্মরণ চিরতরুণ শিরাজী -আবদুল হালীম খাঁ

চিরতরুণ শিরাজী -আবদুল হালীম খাঁ

সত্যিকার অর্থে মানুষের বার্ধক্য বয়সে হয় না, হয় মনে। এমন কিছু লোক আছেন, যাদের বয়স তেমন না হলেও কথাবার্তা, চালচলন, চিন্তাভাবনা ও মনের দিক থেকে মনে হয় একেবারে বুড়ো। তাদের চালচলনে কথাবার্তায় নেই উৎসাহ-উদ্দীপনা ও সাহস। আবার কিছু লোক আছেন তাদের বয়স বেশ হলেও তাদের কথাবার্তা, কাজ-কর্ম ও উৎসাহ-উদ্দীপনায় একেবারে তরুণের মতো প্রাণবন্ত, উৎসাহ ও সাহসে পাহাড় ঠেলে যান।
মহাকবি ইসমাইল হোসেন শিরাজী ছিলেন এমনি এক চিরতরুণ। তিনি ছিলেন অসীম আত্মমর্যাদাসম্পন্ন সাহসী এবং দারুণ নির্ভীক। প্রতিভার বড় পরিচয় যে সাহস, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সে সাহস ছিল শিরাজীর সঙ্গী। আজীবন মাথা নত না করা ইসমাইল হোসেন শিরাজীর জীবন ও সাহিত্যকর্ম আমাদের ব্যক্তি, সমাজ, স্বদেশ ও জাতিগঠনের প্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
স্বদেশ ও স্বজাতি প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মুসলমানদের জাগিয়ে তোলার জন্য ও ইংরেজদের এদেশ থেকে তাড়ানোর উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন- ‘অনল প্রবাহ’ নামে এক কাব্য। ইংরেজ সরকার এ কাব্য লেখার অপরাধে তাঁকে কারাদন্ড প্রদান করে। বাঙালি মুসলমান কবিদের মধ্যে সর্বপ্রথম শিরাজীই হাসিমুখে কারাবরণ করেন।
একবার ম্যাজিস্ট্রেট মি. রক্স বার্গ শিরাজী সাহেবকে জিজ্ঞেস করেছিলেন- আমরা তো সর্বোকৃষ্ট গভর্নমেন্ট (best government)তোমাদের দিয়েছি তবু তোমরা বিরক্তি বোধ করছো কেন? শিরাজী জবাব দিলেন, সাহেব ঠিক আছে, তোমরা best government দিয়েছো মেনে নিলাম। মনে করো, আমরা স্বাধীন ও পরাক্রান্ত হয়ে ৫-৭ শত রণতরী নির্মাণ করে ইংল্যান্ড অধিকার করবো, আর তোমাদিগকে তোমাদের গভর্নমেন্ট অপেক্ষা (best government) প্রদান করবো, তোমরা কি তা পছন্দ করবে? আমি তো বুঝতে পারছি যে আমার এই কথাতেও তোমার মনে ক্রোধের সঞ্চার হচ্ছে। এখন চিন্তা করে দ্যাখো, কাল্পনিক পরাধীনতার কথাতেই যদি তোমার মনে ক্রোধের সঞ্চার হয়, তাহলে যথার্থ গোলামির কঠোর পেষণে আমাদের পক্ষে ক্রুদ্ধ ও বিরক্ত হওয়াটা কি অন্যায় হচ্ছে? মানবপ্রকৃতি তো সর্বত্রই সমান।’
সিরাজীর এ যুক্তিপূর্ণ কথা শুনে শ্বেতাঙ্গ-ইংরেজ আর কী জবাব দেবে? সে হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ শিরাজীর তেজোদীপ্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।
আরেকটি ঘটনা। একবার শিরাজী সাহেব এবং মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ এক রেলস্টেশনে গিয়ে নেমেছেন। স্টেশন থেকে বের হবার গেটে টিকিট কালেক্টর উপস্থিত ছিল না। দু’টি টিকিটই মাওলানা তর্কবাগীশের হাতে। চারদিকে তাকিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে তারা গেট পেরিয়ে এসেছেন। শিরাজী সাহেব আগে ভাগে হাঁটছিলেন আর পেছনে মাওলানা ছিলেন। যখন তারা কিছু দূর এগিয়ে চলে গেছেন, তখন টিকিট কালেক্টর চিৎকার করে বললোÑ ও মশাই, আপনাদের টিকিট দিয়ে যান। মাওলানা তখন বেরিয়ে বললেন, আপনি তো গেটে ছিলেন না, আসুন টিকিট নিয়ে যান।’ টিকিট মাস্টার বাবু রেগে বললো, আমি আসবো কেন? এ সময়ে মাওলানা দুটি টিকিট ছুড়ে ফেলে চলে এলেন।
শিরাজী সাহেব পুরো ঘটনাটাই দূরে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করছিলেন এবং খুশিতে তাঁর চোখ-মুখ উপচে উঠেছিল। তারপর আবেগে মাওলানাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘বাপকা বেটা’!
তিনি বলতেন, অন্যায়ের কাছে মুসলমানদের শির কখনো নত হয় না। মুসলমানরা যদি এসব তুচ্ছতাচ্ছিল্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না করে, শির উঁচু করে না দাঁড়ায় তাহলে তাদের পুনর্জাগরণের কথা বক্তাদের কণ্ঠে কণ্ঠেই থাকবে, বাস্তবে রূপায়িত হবে না। তাই মুসলমানদের মধ্যে মর্যাদাবোধ জাগিয়ে তোলাই জরুরি কাজ। বলা বাহুল্য, এই জরুরি কাজটি কবি ইসমাইল হোসেন শিরাজী সারা জীবন ভরে তাঁর কবিতা, গান, উপন্যাস, প্রবন্ধ, আলোচনা ও বক্তৃতায় করে গেছেন। এটি ছিল তাঁর চরিত্রের নিরাভরণ বৈশিষ্ট্য।

SHARE

Leave a Reply