Home দেশ পরিচিতি হিমালয় পর্বতের দেশ নেপাল -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

হিমালয় পর্বতের দেশ নেপাল -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

ফেডারেল গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র নেপাল দক্ষিণ এশিয়ার একটি ভূমি পরিবেষ্টিত দেশ। এ দেশের জনসংখ্যা ২ কোটি ৬৪ লাখ। আয়তন ১ লাখ ৪৭ হাজার ১৮১ বর্গকিলোমিটার (৫৬ হাজার ৮২৭ বর্গমাইল)। প্রধান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে রয়েছে হিন্দু ৮১.৩ শতাংশ, বৌদ্ধ ৯ শতাংশ, মুসলিম ৪.৪ শতাংশ, কিরান্ত ৩ শতাংশ, খ্রিষ্টান ১.৪ শতাংশ এবং অন্যান্য দশমিক ৯ শতাংশ। বহু জাতি-গোষ্ঠী ভিত্তিক এই দেশটির সরকারি ভাষা নেপালি। কাঠমান্ডু দেশটির রাজধানী এবং বৃহত্তম নগরী। আধুনিক নেপাল একটি ধর্মনিরপেক্ষ সংসদীয় প্রজাতন্ত্র।
নেপালের নাগরিকদেরকে নেপালি বলা হয়। এদেশের জনগণ বহু ভিন্ন জাতীয় উৎস থেকে এসেছে। এ কারণে নেপালিরা জাতিগত সত্তার সাথে জাতীয়তাকে মিলিয়ে দেখে না বরং নাগরিকত্ব ও আনুগত্যের সাথে মিলিয়ে দেখে। এ দেশের নাগরিকদের মধ্যে রয়েছে সংখ্যাগুরু নেপালি, অ-নাগরিক অধিবাসী, দ্বৈত নাগরিক এবং নেপালি বলে দাবিকারী প্রবাসীরা। বেশ কয়েকটি ক্ষুদ্র রাজ্য দখল করে গঠিত হওয়ার কারণে নেপাল মূলত বহু সংস্কৃতি ও জাতিগোষ্ঠীর দেশ। ঐ ক্ষুদ্র রাজ্যগুলোর মধ্যে কয়েকটি হলো মুসতাং, ভিদেহা (মিথিলা), মাধেশ ও লিম্বুয়ান। নেপালিরা ভারত, তিব্বত, উত্তর বার্মা এবং চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে আসাম হয়ে আসা অভিবাসীদের অধস্তন বংশধর। এ দেশের মানুষের গড় আয়ু ৬৬.১৬ বছর। সাক্ষরতার হার ৬৬ শতাংশ। নেপালের প্রধান ভাষাগুলোর মধ্যে রয়েছে নেপালি (৪৪.৬%), মাইথিলি (১১.৭%), ভোজপুরি (৬%), থারু (৫.৮%), তামাং ৫.১%), নেপাল ভাষা, বাজিকা ও মাগার।
নেপালের সীমান্তে রয়েছে উত্তরে চীন এবং দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমে ভারত। দেশটি একটি সঙ্কীর্ণ ভারতীয় করিডোরের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে এবং ভারতীয় সিকিম রাজ্যের মাধ্যমে ভুটান থেকে পৃথক হয়ে আছে। নেপাল হিমালয় পর্বতমালায় অবস্থিত। বিশ্বের ১০টি উচ্চতম পর্বতের মধ্যে ৮টিই নেপালে অবস্থিত। এগুলোর মধ্যে এভারেস্ট পর্বত বিশ্বের সবচেয়ে উচ্চতম স্থান। এদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় মাধেশ অঞ্চল উর্বর ও আর্দ্র। নেপাল আয়তনের দিক দিয়ে বিশ্বের ৯৩তম বৃহত্তম দেশ। এটি ৪১তম সবচেয়ে জনবহুল দেশও।
নেপাল পূর্ব-পশ্চিম লম্বা আয়তাকার দেশ। লম্বায় ৮০০ কিলোমিটার এবং চওড়ায় ২০০ কিলোমিটার। নেপালের ভূমি সাধারণত তিন ভাগে বিভক্ত : পর্বত, পাহাড় ও টেরাই। উত্তর-দক্ষিণ প্রবাহিত প্রধান নদীগুলো দেশটিকে কয়েকটি অংশে বিভক্ত করেছে। ভারতের সীমান্তে দক্ষিণাঞ্চলীয় নি¤œ সমভূমি বা টেরাই ইন্ডো-গাঙ্গেয় সমভূমির অংশ। তিনটি প্রধান হিমালয়ান নদী কোসি, নারায়ণী ও কর্ণালীর মাধ্যমে এ অঞ্চলের সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া এ অঞ্চলে স্থায়ী তুষাররেখার নিচ দিয়ে বহু ছোট ছোট নদী বয়ে গেছে। এই অঞ্চলে প্রায় গ্রীষ্মমন্ডলীয় ও গ্রীষ্মমন্ডলীয় আবহাওয়া বিরাজ করে। সিভালিক হিল নামে পরিচিত পর্বত পাদদেশীয় পাহাড়গুলোর একেবারে বাইরের এলাকা বা চুরিয়া রেঞ্জ ৭০০ থেকে ১০০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এবং এটাই গাঙ্গেয় সমভূমির সীমা। তবে ইনার তেরাই ভ্যালি (ভিত্রি টেরাই উপত্যকা) নামে পরিচিত চওড়া নিচু উপত্যকাগুলো পর্বতপাদদেশীয় পাহাড়গুলোর উত্তরে অবস্থিত।
পাহাড়ি অঞ্চল (পাহাড়) পর্বতগুলোর সাথে গিয়ে মিশেছে এবং এ অঞ্চলটি ৮০০ থেকে ৪,০০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত। এখানকার ১,২০০ মিটার উচ্চতার প্রায় গ্রীষ্মমন্ডলীয় আবহাওয়া ৩৬০০ মিটার ওপরে গিয়ে আলপাইন আবহাওয়ায় রূপ নিয়েছে। ১৫০০ থেকে ৩০০০ মিটার উচ্চতার নিম্ন হিমালয়ান রেঞ্জ হচ্ছে এই অঞ্চলের দক্ষিণ সীমানা। এই অঞ্চলের উত্তরে রয়েছে পর্যায়ক্রমে প্রায় গ্রীষ্মমন্ডলীয় নদী উপত্যকা ও পাহাড়। উপত্যকা-গুলোতে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি এবং ২,০০০ মিটারের ওপরে লক্ষণীয়ভাবে কম। ২,৫০০ মিটারের ওপরে যেখানে মাঝেমধ্যে শীতকালে তুষার পড়ে সেখানে জনসংখ্যা খুবই কম।
পার্বত্য অঞ্চল (হিমেল) গ্রেট হিমালয়ান রেঞ্জে অবস্থিত। এই অঞ্চলটি নেপালের উত্তর অংশ। এই অঞ্চলে চীনের সাথে সীমান্তে রয়েছে বিশ্বের সর্বোচ্চ স্থান মাউন্ট এভারেস্ট যার উচ্চতা ৮,৮৪৮ মিটার (২৯,০২৯ ফুট)। বিশ্বের ৮,০০০ মিটার উচ্চতার অপর ৭টি পর্বত নেপালে বা এর চীন সীমান্তে রয়েছে, সেগুলো হলো লহোস্তে, মাকালু, চো ওইউ, কাঞ্চনজংঘা, ধলাগিরি, অন্নপূর্ণা ও মানাসলু।
বহলাংশে উচ্চতা সাপেক্ষে নেপালে পাঁচটি আবহাওয়া অঞ্চল রয়েছে। ১,২০০ মিটারের নিচে রয়েছে গ্রীষ্মমন্ডলীয় থেকে প্রায় গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চল, ১,২০০ থেকে ২,৪০০ মিটার উচ্চতার মধ্যে রয়েছে নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল, ২,৪০০ থেকে ৩,৬০০ মিটার উচ্চতার মধ্যে রয়েছে ঠান্ডা অঞ্চল, ৩,৬০০ থেকে ৪,৪০০ মিটার উচ্চতার মধ্যে প্রায় সুমেরু অঞ্চল এবং ৪,৪০০ মিটারের ওপরে সুমেরু অঞ্চল।
নেপালে পাঁচটি ঋতু রয়েছে : গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ. শীত ও বসন্ত। নেপাল পর্বতারোহণের জন্য খুবই জনপ্রিয়। এদেশে এভারেস্ট পর্বতসহ বিশ্বে বেশ কয়েকটি সবচেয়ে উঁচু ও চ্যালেঞ্জিং পর্বত রয়েছে। কৌশলগতভাবে পর্বতের নেপাল অংশে দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্ত দিয়ে পর্বতে ওঠা সহজ, সে কারণে বেশির ভাগ পর্বতারোহী নেপালের মধ্য দিয়ে এভারেস্টে ওঠা পছন্দ করেন।
নেপালের প্রশাসনিক এলাকা সাতটি প্রদেশ ও ৭৫টি জেলায় বিভক্ত। নেপালের বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধান প্রেসিডেন্ট বিদ্যা দেবী ভান্ডারী এবং সরকারপ্রধান প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল দাহাল।
নেপালে একাধিক প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। বৈদিক যুগের নথিপত্রে প্রথম নেপাল নাম রেকর্ড করা হয়। উল্লেখ্য, বৈদিক যুগে এ দেশে হিন্দু ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়। নেপাল ছিল বিশ্বের সর্বশেষ হিন্দু রাজ্য। বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা সিদ্ধার্থ গৌতম দক্ষিণ নেপালের লামবিনিতে জন্মগ্রহণ করেন। নেপালের প্রধান সংখ্যালঘু ধর্মাবলম্বীরা হলো তিব্বতি বৌদ্ধ, মুসলিম, কিরাতান ও খ্রিষ্টান। নেপালিরা গুর্খা নামেও পরিচিত। গুর্খারা প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাদের সাহসিকতার জন্য বিখ্যাত।
নেপাল ১৭৬৮ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয়। পৃথ্বি নারায়ণ শাহ এই অঞ্চলের ক্ষুদ্র রাজ্যগুলোকে একীভূত করার পর শাহ রাজবংশ নেপাল শাসন করে। যে কয়েকটি এশীয় দেশে কখনই উপনিবেশ প্রতিষ্ঠিত হয়নি নেপাল সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। ১৮১৬ সালে ইংরেজ-নেপালি যুদ্ধ এবং সুগউলি সন্ধি চুক্তির পর নেপাল ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যের মিত্রে পরিণত হয়। রাজা মাহেন্দ্র পঞ্চায়েত ব্যবস্থা চালু করলে ১৯৫১ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে নেপালে বহুদলীয় গণতন্ত্র বিকশিত হয়। ১৯৯০ সালে রাজা বীরেন্দ্র সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। নেপাল দশকব্যাপী কমিউনিস্ট মাওবাদী বিদ্রোহ মোকাবেলা করে এবং ২০০৫ সালে স্বৈরশাসক রাজা জ্ঞানেন্দ্রর বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ হয়। আর এর ফলে ২০০৮ সালে নেপালে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হয়। নেপালের দ্বিতীয় সংবিধিবদ্ধ আইনসভা ২০১৫ সালে নতুন সংবিধান জারি করে। বর্তমানে নেপালের প্রধান রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো হলো কমিউনিস্ট, সামাজিক গণতান্ত্রিক এবং হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা।
নেপাল সরকার সাতটি ফেডারেল প্রদেশসহ প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক কাঠামোর আওতায় কাজ করে। নেপাল উন্নয়নশীল দেশ। দেশটিকে রাজতন্ত্র থেকে প্রজাতন্ত্রে উত্তরণে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। দেশটিকে এখনো ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের মোকাবেলা করতে হয়।
ভারত ও যুক্তরাজ্যের সাথে নেপালের মৈত্রী চুক্তি রয়েছে। নেপাল দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং সংস্থাটির স্থায়ী সচিবালয় নেপালে অবস্থিত। নেপাল জাতিসংঘ ও বিমস্টেকেরও সদস্য। এশিয়ার দুই বড় শক্তি চীন ও ভারতের মধ্যবর্তী হওয়ায় নেপাল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নেপাল তার জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

SHARE

Leave a Reply