Home গল্প মারিয়ার পড়াশোনা -মির্জা মুহাম্মদ নূরুন্নবী নূর

মারিয়ার পড়াশোনা -মির্জা মুহাম্মদ নূরুন্নবী নূর

সকাল থেকেই রিমঝিম বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টির পানিতে রাস্তা-ঘাট কর্দমাক্ত। এমন দিনে গ্রামের মেঠোপথে স্বাভাবিক চলাফেরা কষ্টকর। রাস্তার যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনার স্তূপ। গ্রামীণ এলাকায় মান্ধাতার সেই পুরনো সংস্কৃতি এখনও চলমান। রাস্তার ধারে আজও মলমূত্রের অবস্থান চোখে পড়ে। স্বাস্থ্যসম্মত পারিপার্শ্বিক পরিবেশ এখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি পাড়াগাঁয়ে। এমনই একটি গ্রামে বসবাস কামালের।
কামালের পরিবারের সদস্য সংখ্যা তিনজন। কামাল তার স্ত্রী এবং শিশুকন্যা মারিয়া। পাঁচ বছর বয়সী মারিয়া বেশ চটপটে। আল্লাহর রহমতে এই বয়সে সে অনেক কিছুই আয়ত্তে আনতে সক্ষম হয়েছে। বাংলা বর্ণমালা, ইংরেজি বর্ণমালা, আরবি হরফসহ গণিতের প্রাথমিক ধারণাও অর্জন হয়েছে মারিয়ার। এ ছাড়াও ইসলামের প্রাথমিক প্রয়োজনীয় দোয়া কালামও শিখে ফেলেছে সে। বাবা-মায়ের সাথে নিয়মিত নামাজের কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজের তালিমও নেয় শিশু মারিয়া। কিন্তু সে যে খুব চঞ্চল। কথাবার্তায়, কাজে-কামে ওর চঞ্চলতার ভাবটা খুব বেশি। যার কারণে ওর বাবা-মা অনেকটাই দুশ্চিন্তায় দিন অতিবাহিত করছেন।
মারিয়া এখন পড়ায় মশগুল। ছোট্ট মারিয়া পড়াশোনায় বেশ ভালো। নিয়মিত পড়ার টেবিলে বসা ওর রুটিন ওয়ার্ক। কাউকে বলতে হয় না পড়তে বসতে। বাবাকে নিয়মিত পড়া শিখিয়ে দিতে আবদার শিশু মারিয়ার। মাকে তো উৎপাত করা ওর প্রতিদিনের হোম ডিউটি। এমনই সেই মারিয়া সম্প্রতি পড়ালেখায় উদাসীন। বই যেন ওর প্রাণের শত্রু। খাতা কলম যেন এখন ওর জানের দুশমন। কেন হচ্ছে এমনটি। ভাবনা মারিয়ার বাবা-মায়ের। ডাক্তার কবিরাজও দেখানো হয়েছে অনেক। ভালো কোনো ফলাফল আসেনি এখনও। কামালের চিন্তার অন্ত নেই মারিয়াকে নিয়ে। মারিয়া যেন ওদের কলিজার টুকরা। জানের জান। চোখের পুতুলি। নয়নের প্রশান্তি।
চাকরিজীবী কামাল এখন বাসা নিয়ে গ্রাম ছেড়ে শহরে বসবাস করছেন। মেয়ে মারিয়াকে একটি আদর্শ স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছেন। কামাল মেয়েকে তেমন একটা সময় দিতে পারেন না। তাই মারিয়ার মা-ই পড়ালেখার খোঁজ খবর রাখেন বেশি।
অনেক চিকিৎসার পর মারিয়া এখন কিছুটা সুস্থ। আগের মতো অতটা দুষ্টামি না করলেও পুরোপুরি স্বাভাবিক সেটিও নয়। পড়তে বসলেই হাজারো বায়না মারিয়ার। এই খাতা দাও। ওটা হবে না, নতুন আরেকটা দাও। কলম যেটা আছে ওটা ভালো না। নতুন কলম এনে দিলেও রং পছন্দ হয়নি ইত্যাদি হাজারো বাহানা মারিয়ার। মায়ের সাথে পড়তে বসেছে মারিয়া। বেশ মনোযোগের সাথেই পড়ছিল সে। ওর পাশেই পড়ছে মুজাহিদ। কামালের মামাতো ভাই মুজাহিদ আর মারিয়া একই স্কুলে পড়ে। মুজাহিদদের গ্রামের এলাকায় ভালো কোনো পাঠশালা নেই। তাই কামালের বাসায় থেকে পড়াশোনা করছে মুজাহিদ। মুজাহিদ চতুর্থ শ্রেণীতে আর মারিয়া শিশু শ্রেণীতে পড়ে। ওরা দু’জন যেন ভাইবোন। যেন একান্ত আপন ভাইবোন। মুজাহিদ কিছুটা বুঝতে পারলেও মারিয়ার সে বুঝ হয়নি এখনও। তাই মারিয়ার দুষ্টামি চলে নিয়মিতই। ভাইবোনের মতোই। সারাক্ষণ। সারাবেলা।
আজকের রাতে ওরা দু’জন এক সাথেই পড়তে বসেছে। পড়ার মাঝেই মারিয়া দুষ্টামি শুরু করে দেয় মুজাহিদের সাথে। খুব বেশি দুষ্টামি শুরু করেছে মারিয়া। একেবারেই মাত্রাতিরিক্ত। একসময় মুজাহিদ কেঁদে ফেলে। পড়া ছেড়ে বসে থাকে আনমনা হয়ে। অনেক করে বুঝিয়েও আর পড়াতে মনোযোগী করা যায়নি মুজাহিদকে। তাই মারিয়ার ওপর চড়াও হন ওর আম্মু মারজান। মারিয়াকে আঘাত করেন মারজান। এতেও শান্ত হয় না মারিয়া। চিৎকার করে কেঁদে ওঠে মারিয়া। পাশের রুম থেকে মারিয়ার কান্না শুনে কাছে আসেন মারিয়ার আব্বু। মারিয়াকে কোলে তুলে নিয়ে বুঝাতে চেষ্টা করেন আব্বু। কিন্তু কিছুই বুঝতে রাজি নয় মারিয়া। অবশেষে কৌশলে শান্ত করা হয় মারিয়াকে। মারিয়া এখন বেশ শান্ত। অনেকটাই স্বাভাবিক।
আম্মুর সাথে পড়ছে মারিয়া।
‘আলিফ-তে আল্লাহ।
আল্লাহ আমার রব
রব-ই আমার সব।’
ছন্দ ছড়ায় রবের ধারণা বুঝিয়ে দেন মা মারজান। আল্লাহ তায়ালার ক্ষমতার কথা বুঝিয়ে দেন মারিয়াকে। মারিয়াকে জানানো হয়Ñ
‘আল্লাহ আমাদের সৃষ্টিকর্তা।
আল্লাহ আমাদের পালনকর্তা।
আল্লাহ আমাদের রিজিকদাতা।
আল্লাহ আমাদের জীবনদাতা।’
আরো অনেক কিছুই। মারিয়া তন্ময় হয়ে শোনে মায়ের উপদেশবাণী। মাকে আদরে জড়িয়ে ধরে মারিয়া। মায়ের কপালে চুমু খায় মারিয়া। মারিয়ার আদরের পরশে আনন্দে নুয়ে পড়ে মারজান। আবারও পড়ায় মনোযোগী হয় মারিয়া।
‘অ-তে অসীম।
অসীম ক্ষমতা আছে যাঁর-
আল্লাহ তায়ালা নাম তাঁর।’
‘বি-তে বুক।
বুক মানে বই-
এসো সবাই জ্ঞানী হই।’

মামণি?
জি, আব্বু।
তোমার পড়া শেষ হইছে, মা।
না।
কখন শেষ হবে, মা।
আর একটু পরে।
পড়া শেষ করে এসো মা। তোমার জন্য একটি গিফট এনেছি।
আচ্ছা। আসছি আব্বু। পড়া শেষ করে মারিয়া। দৌড়ে চলে আসে আব্বুর কাছে। একান্ত কোলের পাশে।
মারিয়া ওর আব্বুর কোলে বসে পড়ে। আব্বু ওকে একটি সুন্দর কলম ধরিয়ে দেন। খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়ে মারিয়া। আব্বুর কপালে চুমু খায় মারিয়া। আব্বুও মারিয়াকে আদর দেন প্রাণ ভরে। আব্বু মারিয়াকে আরো ভালো করে পড়ার উৎসাহ দেন। আব্বু বলেন, জীবনে উন্নতি করতে হলে পড়াশোনার বিকল্প কিছুই নেই। যারা লেখাপড়া করবে কেবল তারাই জীবনে সফলতা অর্জন করতে পারবে। মানুষের মত মানুষ তারাই হবে, যারা হবে শিক্ষিত এবং জ্ঞানী। মারিয়া বাবার কথা মনোযোগের সাথে শোনে। বাবার কথাগুলো ভালো লাগে মারিয়ার। বাবার আদেশ মানার ব্যাপারে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় ছোট্ট মারিয়া।

SHARE

Leave a Reply