Home সম্পূর্ণ কিশোর উপন্যাস উজানগড়ের রাজা -জিয়াউল আহ্সান

উজানগড়ের রাজা -জিয়াউল আহ্সান

[গত সংখ্যার পর]

শিক্ষক চোখেমুখে আগ্রহ ফুটিয়ে বললেন, তুমি না বললে দিদিমা বলেছে, ভূত অনেক লম্বা হয়? আর বোতলে বন্দী থাকলে ভূতগুলো কি না খেয়ে থাকে?
কোনো উত্তর খুঁজে না পেয়ে রাজপুত্র হঠাৎ চুপ হয়ে গেলো। বোকা বোকা চেহারায় আমতা আমতা করে বললো, তাতো জিজ্ঞেস করিনি। আচ্ছা কবিরাজ মশাইকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেবো।
প্রসঙ্গ পরিবর্তন করতে ওস্তাদ বললেন, তোমরা কি জানো বাংলার নবাবের সাথে ইংরেজ ফৌজের লড়াই হবে?
আমরা শুনেছি, ভরদ্বাজ বলেছে।
ভরদ্বাজ কে?
ঘোড়াশালের প্রধানকর্তা।
ভরদ্বাজ আর কী বলেছে?
বড় রাজকুমার বললো, লড়াইয়ে গোরা সেপাই জয়ী হবে।
কেন?
গোরা সেপাইরা অনেক সাহসী আর চালাক। তাদের অনেক আরবি ঘোড়া আছে। ছোট ছোট তোপ দিয়ে তারা অনেক গোলা ছুড়তে পারে।
ছোট রাজকুমার কথার মাঝে বলে উঠলো, নবাবের সেনাপতিদের অনেকের সাথে ইংরেজদের দোস্তি আছে।
কে বলেছে?
ভরদ্বাজ।
তোমরা যা বলেছ, এসব তো সবাই জানে। এমন কিছু জানো কিংবা দেখেছ, যা অন্যরা জানে না, কিংবা দেখেনি?
বড় রাজকুমার বললো, আমরা কিছু দেখিনি, জানিও না। তবে ভরদ্বাজ অনেক কিছু জানে। আমাদের অনেক গল্প বলে। ভরদ্বাজ খুব ভালো লোক। খুব আদর করে, যা বলি তাই করে।
ছোট রাজকুমার এতক্ষণ কথা বলার সুযোগ খুঁজছিল। হঠাৎ বলে উঠলো, আমরা জানবো কিভাবে?
ওস্তাদ বললেন, মানুষের মনের কথা জানা খুব কঠিন কাজ। এ জন্য জ্ঞানী হতে হয়। অনেক লেখাপড়া করতে হয়।
ইংরেজ ফৌজের কয়েক হাজার সিপাহি কয়েকটি চাকা লাগানো ছোট কামান নিয়ে কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদের দিকে যাত্রা করেছে। পথে হুগলি, কাটোয়ার দুর্গ, অগ্রদ্বীপে নবাবের সৈন্য থাকা সত্ত্বেও কেউ কোনো বাধা দেয়নি।
ইংরেজ ফৌজের গোরা ও দেশী সিপাহি মিলিয়ে কয়েক হাজার সৈন্য এগিয়ে যাচ্ছে। তারা লোহার চাকার ওপর বসানো কয়েকটি ছোট কামান ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। ফৌজের সেনারা যেসব জমি-জিরাতের পাশ দিয়ে পথ অতিক্রম করছিল হালচাষ কিংবা নিড়ানিতে ব্যস্ত চাষি কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখে আবার নিজের কাজে মন দিলো। ঘরের উঠানে পাটকাঠিতে গোবরের মুঠি বসিয়ে রোদে শুকিয়ে রান্নার জ্বালানি তৈরি করছিল আমিনা। তাকে অতিক্রম করে যাওয়া দেবর ও তার বন্ধুর কথাবার্তায় বুঝলো ইংরেজ ফৌজের সাথে নবারের আবার যুদ্ধ হবে। আমিনা বেগমের এতোশতো বোঝার সময় নাই, আগ্রহও নাই। ঘুটে বানানোর কাজ শেষ করে তাকে রান্নার জোগাড়ে বসতে হবে। চুলায় বসিয়ে দেয়া ভাত ফুটতে আরো সময় নেবে।
যেসব ক্ষেতে এখনো হালচাষ শুরু হয়নি কিংবা জমি পতিত থেকে থেকে খেলার মাঠ হয়ে গেছে সেখানে ভরদুপুরে কাবাডি খেলারত কিশোরেরা খেলা থামিয়ে অদ্ভুত পোশাক পরা তরবারি-বন্দুকধারী সাদা-কালো মানুষদের দেখে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে খেলা ভুলে দাঁড়িয়ে রইলো।
ফৌজের যাত্রাপথে স্থানে স্থানে খুচরা দোকানদার, টুকরি মাথায় ব্যবসায়ী, পথিক, পথচারী, উদ্দেশ্যহীন দর্শক, মক্তবের ছাত্র সবাই এককথায় আবাল-বৃদ্ধ, তরুণ-যুবা, পাগল-ফকির পথ ছেড়ে দিয়ে কিংবা নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে দেখল খাকি রঙের ছোট প্যান্ট, কব্জি পর্যন্ত জামা পরা সঙ্গিনধারী লম্বা বন্দুক কাঁধে দলে দলে ভাগ হয়ে সারিবদ্ধভাবে পথ চলছে। চোখে মুখে ভয়ের চিহ্ন অনেকটাই স্পষ্ট। পেছনে এদেশীয় কালো সৈনিকদের বিশাল দল। এদের কাছে বন্দুকের চাইতে তরবারি বেশি এবং শৃঙ্খলার অভাব স্পষ্ট। ঘন্টাখানেকের মধ্যে ধুলোবালি উড়িয়ে পথের লতা-গুল্ম, আগাছা, কোথাও মাঠের ফসল মাড়িয়ে তারা চলে গেল। যারা পথের ধারে দাঁড়িয়ে কিংবা দূর থেকে দেখছিল তাদের অনেকের চোখে মুখেই ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপের ভাব স্পষ্ট। কয়েকজন পাশের জনকে শুনিয়ে বলেই ফেললো, নবাবের লাখো সৈন্যের বাহিনী আর হাতিটানা মস্ত কামানের সামনে ইংরেজের এই ফৌজ কয়েক মুহূর্তের বেশি টিকতে পারবে না, তুলার মতো উড়ে যাবে। কেউ কেউ বললো, গোরা ফৌজ মার খেয়ে পালাতে ভালোবাসে। এ রকম অসংখ্য মন্তব্য শোনা গেল বিভিন্ন জনের মুখ থেকে। ইংরেজ ফৌজ চোখের আড়ালে চলে গেলে যে যার মতো ব্যস্ত হয়ে পড়ল, সেই সাথে ভুলেও গেল।
অপরাহ্নে প্রাসাদের এক খাস কামরার বিশেষ দরবারে রাজা গোয়েন্দাদের কাছ থেকে তাদের এইসব খবরাখবর, মতামত ও ব্যাখ্যা শুনছেন। কিন্তু এসব কথাবার্তা রাজাকে উৎফুল্ল করলো না। তিনি বরং ভাবতে লাগলেন, কয়েক হাজার ফৌজ নিয়ে নবাবের পঞ্চাশ হাজার ফৌজের মোকাবেলা করার সাহস ইংরেজরা কি করে পেল? নবাবের দরবারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী, অমাত্যের সাথে ইংরেজদের দোস্তি সবাই জানে। ষড়যন্ত্রের কথাও বাতাসে ভেসে বেড়ায়। কিন্তু এসব উড়োকথার ওপর যুদ্ধ চলে না। যুদ্ধ অনেক কঠিন ব্যাপার। ইংরেজদের সুগভীর কোনো চক্রান্ত আছে। তিনি চরদের নির্দেশ দিলেন আরো বেশি খবরাখবর জোগাড় করে আনতে। আরো নির্দেশ দিলেন, উজানগড়ের বন্দরে ইংরেজদের যেসব বাণিজ্যতরী ব্যবসা করছে তাদের ওপর আরো ঘনিষ্ঠ নজরদারি করার জন্য। ইংরেজ বাণিজ্য প্রতিনিধি ও ব্যবসায়ীরা কোথায় যায়, কাদের সাথে যোগাযোগ রাখে, ইংরেজদের প্রতি সহানুভূতিশীল কারাÑ এসব জানার ওপর জোর দিলেন। অভ্যন্তরীণ তথ্য সংগ্রহকারীদের বললেন, জনগণের মধ্যে কোন অসন্তুষ্টি আছে কি না, তাদের চিন্তাভাবনার গতি-প্রকৃতি কি রকম সে সম্পর্কে খোঁজ নিতে।
পরদিন মধ্যাহ্নভোজে রাজা রাজপুত্রদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের লেখাপড়া কেমন হচ্ছে?
ছোট রাজপুত্র এককথায় বললো, ভালো। একটু থেমে আবার বললো, ওস্তাদ খুব মজার মানুষ। অনেক গল্প বলেন। মাঝে মাঝে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে নিয়ে যান। কত কিছু দেখান।
বড়ো রাজপুত্র বললো, ওস্তাদ শুধু দেখান না, তিনি আমাদের সবকিছু বুঝিয়েও বলেন।
রাজা পুত্রদের উচ্ছ্বাস দেখে খুশি হলেন। ওস্তাদ অন্তত পুত্রদের দৌরাত্ম্য কমাতে পেরেছে।
তিন নদীর মিলনস্থলে উজানগড় বন্দর। দক্ষিণবঙ্গের রাজ্য হওয়ায় সাগর থেকে দূরত্ব কম। ফলে দুই বেলা সাগরের জোয়ার-ভাটা বন্দরের মোহনায় খেলা করে। মোহনায় গভীরতা থাকায় বড়ো বড়ো বাণিজ্য জাহাজ নোঙর করতে অসুবিধা হয় না। রাজ্যের প্রধান আয়ের উৎস্য এই বন্দর। কর আদায়কারী কর্মকর্তারা রাজার পক্ষ থেকে দিনরাত এখানে কাজ করে যাচ্ছে।
রাজার অনুমতি নিয়ে ওস্তাদ রাজপুত্রদের উজানগড় বন্দরে যাওয়ার আগ্রহ দেখালে রাজপুত্রদ্বয় সাথে সাথে রাজি হয়ে গেল। রাজার হুকুমে কয়েকজন বন্দুকধারী প্রহরীও সামনে ও পেছনে চললো। তবে তারা কাছাকাছি থাকলো না, দূরে থেকে পাহারা দিয়ে চললো।
পথ কোথাও সোজাসুজি গিয়েছে, কোথাও এঁকেবেঁকে। সমস্ত পথটাই দু’পাশের ছোট-বড়ো গাছপালায় ঢাকা। পথ কোথাও মাঠের সমান্তরাল, কোথাও দু’পাশের জমি থেকে উঁচু। আবার কোথাও কোথাও পথের দু’পাশে দীর্ঘ ঘন জঙ্গল। দুই ঘোড়ায় টানা রাজগাড়ি হেলেদুলে এগিয়ে চলেছে। পথে মানুষজন খুব কম। পথের কাছাকাছি যেখানে চার-পাঁচ ঘরের ছোট ছোট গ্রাম কিংবা কখনো যদি একটা বড়ো গ্রাম পড়ে সেখানে পথে কিংবা মাঠে দু’চারজন মানুষের দেখা মেলে। প্রায় কোন মানুষের গায়েই জামা নেই। কদাচিৎ দু’একজনের গায়ে কাপড় কেটে ঘরে তৈরি কাঁধ পর্যন্ত জোড়া দিয়ে বানানো হাতকাটা জামা। জামার সামনের দিকে কাটা। ফিতা কিংবা কাঠের বোতাম দিয়ে সামনের কাটা অংশটা লাগানো যায়। শরীরের নিচের অংশে কারো হাঁটু পর্যন্ত ধুতির মতো সেলাই ছাড়া কাপড় পেঁচানো। কেউ গোড়ালির ওপর পর্যন্ত ঢোলাঢালা পাজামা ধরনের কাপড় পরে আছে। কিন্তু সবার পা খালি।
ছোট রাজপুত্র বললো, ওদের গায়ে জামা নেই, পা খালি কেন?
ওস্তাদ বললেন, কাজ করার সময় কেউ গায়ে জামা পরে না। আবার ওদের অনেকেরই কাপড় কেনা ও বানানোর মতো অর্থ-কড়ি নেই। কারণ ওরা গরিব।
কথাটা হয়তো রাজপুত্রকে ভাবালো। কারণ এরপর সে আর কোন কথা বললো না। হয়তো গরিব শব্দটার অর্থ বোঝার চেষ্টা করছে।
বন্দর যতো কাছাকাছি হতে লাগলো মানুষের চলাচলও ততো বেশি চোখে পড়তে লাগলো। প্রাসাদের ঘোড়ায় টানা গাড়ি সাধারণ মানুষ ভালোভাবেই চেনে। মানুষজন সম্মান দেখিয়ে সরে গিয়ে গাড়ি চলার পথ করে দিতে লাগলো। সেই সাথে মানুষের পোশাক-আশাকের ধরন-ধারণ, চলা-ফেরা, কথা-বার্তা, কাজকর্মেও পরিবর্তন দেখা যেতে লাগলো।
সব ব্যাপারেই ছোট রাজপুত্রের উৎসাহ বেশি। তাই বেশিক্ষণ সে চুপ করে থাকতে পারলো না। ওস্তাদকে সে আবার বিভিন্ন প্রশ্ন করে যেতে লাগলো। ওস্তাদ সহজ ভাষায় প্রশ্নের জবাব দিয়ে যাচ্ছেন। ওস্তাদ এবার কথার মাঝে তাকে বললেন, সবচেয়ে ভালো রাজা কে বলতে পারবে?
ছোট রাজপুত্রের বয়সই বা কতো। বড়জোর দশ-এগারো। অতশতো বোঝে না। বুঝতে না পেরে সে ওস্তাদের দিকে তাকিয়ে রইলো।
ওস্তাদ আরো সহজ করে বললেন, রাজার কী কী গুণ থাকলে তাকে ভালো রাজা বলে।
ছোট রাজপুত্র কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। ভাইয়ের এই অবস্থা দেখে বড়ো রাজপুত্র বললো, যে রাজা প্রজাদের মঙ্গল করে সেই ভালো রাজা।
ওস্তাদ বললেন, ঠিক বলেছ। তবে রাজা প্রজাদের মঙ্গল কিভাবে করবেন?
প্রজাদের সুখ-শান্তি দেখতে হবে!
ঠিক তাই। কিন্তু প্রজাদের সুখ-শান্তি দেখতে হলে প্রজাদের কাছে যেতে হয়। তাদের অভাব অভিযোগ শুনতে হয়। তোমরা খলিফা ওমর (রা)-এর কথা শুনেছ?
হ্যাঁ শুনেছি।
তিনি প্রতিরাতে একা একা নগরের রাস্তা-ঘাটে ঘুরে বেড়াতেন। নিজের চোখে দেখে বোঝার চেষ্টা করতেন তাঁর রাজ্যে প্রজারা কেমন আছে। তাই প্রজাদের উপকার করতে চাইলে রাজাকে প্রজাদের কাছেই যেতে হবে। এরচেয়ে সহজ কোনো উপায় নেই।
পথের একপাশ দিয়ে দু’জন লম্বা লোক হেঁটে যাচ্ছে। দেখেই বোঝা যায়, ওরা ভিনদেশি। একজনের গায়ে কাবুলি পোশাক, মাথায় টুপি। অন্যজনের হাঁটুর নিচ পর্যন্ত লম্বা জোব্বা, মাথায় পাগড়ি।
বড়ো রাজপুত্রের জিজ্ঞাসার জবাবে ওস্তাদ বললেন, ডানদিকের কাবুলি পোশাক পরা ফর্সা-লম্বা লোকটা আফগানিস্তান থেকে এসেছে। ওখানে পশুপালন আর কৃষিকাজ ছাড়া তেমন কোনো কাজ নেই। তাই ওরা এদেশে কাজ করতে অথবা ব্যবসা করতে আসে। বামদিকের লোকটা আরব দেশের। ওরাও ব্যবসা করে। তবে ওদের কেউ কেউ আবার ইসলাম ধর্ম প্রচারের কাজও করে।
মানুষের আনাগোনা ও দোকানপাট বাড়াতে বোঝা গেল বন্দর নিকটে। সরু রাস্তার দু’পাশে বাঁশ, বাঁশের বেড়া ও কাঠ দিয়ে হরেক রকমের দোকান, বাড়িঘর। কিছু বাড়িঘর পাকা, ইট-চুন-সুড়কি দিয়ে বানানো। দোকানঘরগুলোর অধিকাংশই বাঁশ কিংবা কাঠের বেড়া দিয়ে বানানো। দোকানে পণ্যসম্ভার থরে থরে সাজানো। সাদা-কালো কতরকমের মানুষের যে আনাগোনা। মানুষজন মহাব্যস্ত। কেউ দোকানে জিনিসপত্রের দরদাম করছে, কেউ পণ্যসামগ্রী মাথায় করে ছুটছে। দুই রাজপুত্র বন্দর এলাকায় এই প্রথম এসেছে। অবাক চোখে তারা এসব দেখছে।
ওস্তাদ একটি পাকাবাড়ির দিকে আঙুল তুলে দেখালেন, এটা সরাইখানা। সামনে গরু ও ঘোড়ায় টানা কয়েকটি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। দূর অঞ্চল থেকে যেসব ব্যবসায়ী আসে তারা এখানে রাত্রিযাপন করে। সরাইখানার পাশে গোয়ালঘরের মতো একটি খোলা বাড়ি। সেখানে গরু ও ঘোড়া বেঁধে রাখা। প্রাণীগুলো বসে কিংবা দাঁড়িয়ে থেকে জাবর কাটছে।
পথ গিয়ে শেষ হয়েছে নদীর পাড়ে। অনেক প্রশস্ত একটা নদী। ছোট বড় মাঝারি শত শত রকমের নৌযান ভেড়ানো। বড় বড় নৌযানের অধিকাংশই মাঝনদীতে নোঙর ফেলে স্থির হয়ে আছে। বেশ কিছু ছোট-বড়ো নৌকা মাঝনদীতে যাতায়াত করছে। যেগুলো যাতায়াত করছে সেগুলোর পাল তোলা। বাতাসে ফুলে আছে। পালগুলোও বিভিন্ন রঙের কাপড় দিয়ে তৈরি।
রাজগাড়ি পাড় ধরে আরো কিছুটা এগিয়ে যেখানে কোলাহল কিছুটা কম সেখানে গিয়ে থামলো। ওস্তাদ রাজপুত্রদের নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালেন। ওস্তাদ বড়ো নৌযানগুলোকে দেখিয়ে বললেন, ওগুলো জাহাজ সাগরে চলে, বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছে।
ব্যস্ত বন্দরের একপাশে দু’টি বড়ো জাহাজ নোঙর করে আছে। সাদা চামড়ার কয়েকজনকে দেখা গেল ব্যস্ততার সাথে কি যেন করছে। ওস্তাদ জাহাজ দুটো দেখিয়ে বললেন, ইংরেজদের জাহাজ। আর সাদা চামড়ার লম্বা মানুষগুলো ইংরেজ।
বড়ো রাজপুত্র বললো, ওরা কোথা থেকে এসেছে?
ওস্তাদ বললেন, ওরা হাজার হাজার মাইল দূর থেকে জাহাজে চড়ে এসেছে ব্যবসা করার জন্য।
তাহলে ওরা যুদ্ধ করে কেন?
ওদের উদ্দেশ্য ভালো না। ওরা ব্যবসা করবে কিন্তু নবাবকে কর দিতে চায় না। ব্যবসায়ে লাভ বেশি করার জন্য ওরা অনেক অন্যায় কাজ করে। নবাবের বিরুদ্ধে ওরা ষড়যন্ত্র করছে যাতে স্থায়ীভাবে ব্যবসা করতে পারে। ওদের কাজ-কর্ম দেখে মনে হয় আসলে ব্যবসা নয়, ওরা এদেশে এসেছে মূলত চুরি-ডাকাতি, রাহাজানি আর লুটতরাজ করার জন্য।
ছোট রাজপুত্র বললো, ওরা কিসের ব্যবসা করে?
ওদের দেশের কলের সস্তা কাপড়, লবণ, অন্যদেশ থেকে নিয়ে আসা মসলা ইত্যাদি জিনিস বিক্রি করে, আর এখান থেকে দামি মসলিন কাপড়, সোনাদানা ইত্যাদি নিয়ে যায়।
ওরা কি গরিব?
ওদের দেশ আমাদের চাইতে গরিব। ওরা এখানে এসেছে ধনী হওয়ার জন্য।
তাহলে ওরা ষড়যন্ত্র করে কেন?
ওদের চরিত্রই হচ্ছে ষড়যন্ত্র করা।
তাহলে ওদের বের করে দেয়া উচিত।
নবাব সেই চেষ্টাই করে যাচ্ছেন। কিন্তু ওরা খুব চালাক, ধূর্ত আর সাহসী। ওদের সাথে পেরে ওঠা কঠিন।
বড়ো রাজপুত্র এতক্ষণ শুনে যাচ্ছিলো। এবার বললো, ওদের সাথে জিততে হলে কী করতে হবে?
তোমাকে শিক্ষিত, জ্ঞানী আর বুদ্ধিমান হতে হবে। এ জন্য মনোযোগ দিয়ে পড়ালেখা করতে হবে।
আজ রাজদরবারে পারিষদবর্গ অন্যদিনের চেয়ে বেশ আগেই এসে উপস্থিত হয়েছে। উপস্থিতির সংখ্যাও বেশি। তাই বেশ সকাল থেকেই দরবার যথেষ্ট সরগরম। রাজ্যজুড়ে বিস্তর কানাঘুষা-গালগপ্পের ছড়াছড়ি। সেনাপতিসহ সৈন্যদলের বিভিন্ন সেনাধ্যক্ষ থেকে শুরু করে দরবারের আমির-ওমরাহ-অমাত্য যার যার লোক মারফত এই কানাঘুষা-গালগপ্প-উড়োকথা শুনে রীতিমতো উত্তেজিত ও উৎকণ্ঠিত। তারা এসবের সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে যার যার রুচিমতো গাল-গপ্পে মেতে উঠেছে। এদের অনেকেই বিভিন্ন সুবিধা লাভের আশায় ঘটনার বুদ্ধিদীপ্ত বর্ণনা ও বিশ্লেষণ সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে রাজার মনোযোগ আকর্ষণ করতে চায়, যাতে রাজার বিশেষ অনুগ্রহভাজন ও আস্থাভাজন হতে পারে। সুতরাং সবচেয়ে সঠিক ও সম্ভাব্য বর্ণনা ও বিশ্লেষণ পেশ করার জন্য সবাই বেশ উদগ্রীব।
যথাসময়ে রাজা এসে সিংহাসনে আসন নিলেন। দরবারের সবাই উঠে দাঁড়িয়ে কুর্নিশ করে রাজাকে সম্মান দেখালেন। সভা শুরুর ঘোষণা দেয়ার পর পদবি উল্লেখ করে কথা বলার অনুমতি পেলেই কেবল বক্তব্য দেয়ার সুযোগ পাওয়া যায়। অধিকাংশ দিনের মতো আজও সভার শুরুতেই রাজা পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর রাজ্যের সমস্যা ও পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনায় প্রবৃত্ত হলেন।
প্রধানমন্ত্রী চন্দ্রপালকে রাজা সভার মূল আলোচনা শুরুর নির্দেশ দিলেন। চন্দ্রপাল সত্তর বছর বয়সী একজন অভিজ্ঞ ও বুদ্ধিমান মন্ত্রী। আগের রাজার সময়ে সাধারণ একজন রাজকর্মচারী হিসেবে নিয়োগ পেয়ে নিজের যোগ্যতা বলে আজ তিনি প্রধানমন্ত্রী। রাজার অত্যন্ত প্রিয়ভাজন। রাজা তাকে খুব বিশ্বাসও করেন। চন্দ্রপাল কথাবার্তাও বলেন শান্তভাবে খুব সাজিয়ে গুছিয়ে। দরবারে পিনপতন নিস্তব্ধতা। সবাই খুব মনোযোগ দিয়ে কথা শুনছে। প্রধানমন্ত্রী চন্দ্রপাল এমনভাবে বলে যাচ্ছেন যেন লিখিত বক্তব্য পাঠ করছেন। বোঝাই যায় এ বিষয়ে কথা বলার জন্য তিনি আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে সবাই পরিস্থিতি সম্পর্কে আরো স্পষ্টভাবে যা জানতে পারলো তা হলো, রাজধানী মুর্শিদাবাদের কাছে ভাগিরথী নদীর পাড়ে পলাশী গ্রামের মাঠে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত যে যুদ্ধ হয় তাতে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা ইংরেজদের কাছে পরাজিত হয়ে দুই হাজার সৈন্য নিয়ে রাজধানী মুর্শিদাবাদে ফিরে গেছেন। সেনাপতি রায় দুর্লভ, ইয়ার লতিফ, মীর কাশিম, মীর জাফর যুদ্ধে নবাবকে কোন ধরনের সহযোগিতা না করে ইংরেজদের পক্ষে কাজ করেছে। রাজধানীতে নবাবের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। বাংলা প্রদেশের শাসনক্ষমতা সম্ভবত অন্য কেউ পেতে যাচ্ছে।
রাজার কপালে দুশ্চিন্তার রেখা। দরবার কয়েক ঘণ্টা চললো। পারিষদবর্গের কয়েকজন মন্ত্রী, অমাত্য তাদের মতামত পেশ করলেন। মধ্যাহ্নভোজের পরে রাজা গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন মন্ত্রী ও অমাত্যকে নিয়ে পুনরায় বিশেষ সভার ঘোষণা দিলেন। অপরাহ্নে সভা বসলে রাজা এই অবস্থায় করণীয় জানতে চাইলেন। উজির সামাদ শাহ বললেন, আমাদের অবিলম্বে নবাবের কাছে দূত পাঠিয়ে জানতে চাওয়া উচিত, তিনি আমাদের কাছে কী আশা করেন কিংবা কোন ধরনের সমর্থন তিনি চান। গুরুত্বপূর্ণ অমাত্য শক্তিরাজ বললেন, নবাব নিজে থেকে কোনো ঘোষণা না দিলে কিংবা দূত পাঠিয়ে কোনো সাহায্য না চাইলে কোনো ধরনের তৎপরতায় যাওয়া আমাদের উচিত হবে না। এতে আমরা ইংরেজসহ সেনাপতি মীর জাফর, রায় দুর্লভ, ইয়ার লতিফদের কুদৃষ্টিতে পড়ে যেতে পারি। হাজী শফিউল্লাহ খাঁ রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ধনী ব্যক্তি এবং রাজার বিশেষ বন্ধু। তিনি বললেন, এই অবস্থায় নবাব সাহায্য চেয়ে দূত পাঠাবেন কিভাবে? তাঁর তো নিজের ঘরই ঠিক নেই। আরো কয়েকজন তাদের মতামত দিলেন। কিন্তু রাজা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারলেন না। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি বললেন, আমাদের করণীয় কী?
চন্দ্রপাল কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, এখন পরিস্থিতি দেখে যাওয়া ছাড়া আমাদের করণীয় কিছু নেই।

উজানগড় রাজ্য বলে এখন কিছু নেই। কালের বিবর্তনে সবকিছু হারিয়ে গেছে। ইংরেজরা ক্রমে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা দখল করে নিলে ক্ষুদ্র করদরাজ্য উজানগড়ও সীমিত সামর্থ্য নিয়ে টিকে থাকতে পারেনি। একসময় যা ছিলো বর্ধিষ্ণু রাজধানী, তা এখন গ্রামীণ জনপদ। কয়েক শ’ বছর কেউ এর কোনো হদিস করেনি। কেবল বংশানুক্রমে গল্পের ভেতর দিয়ে আট দশ গ্রামের বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের স্মৃতির ভেতরেই বেঁচে ছিলো উজানগড়। পাতলা ইট আর চুন-সুড়কির মিশ্রণে তৈরি ভবনের ধ্বংসাবশেষ এখনও এখানে ওখানে ছড়িয়ে আছে। তা-ও বিলুপ্ত হওয়ার পথে। পলিমাটির এই দেশে আর কিছুদিন পর তাও থাকবে না। কৃষকদের লাঙ্গলের ফলায় এখনও উঠে আসে সে সময়ে ব্যবহৃত গৃহস্থালি জিনিসপত্র, বিভিন্ন মানের মুদ্রাসহ অনেক কিছু। সবই সেকালের সোনালি অতীতের কথা মনে করিয়ে দেয়। বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা তাদের পূর্বপুরুষের কাছ থেকে শোনা ঐতিহ্যের পুনরাবৃত্তি করে বিভিন্ন কথা প্রসঙ্গে। তবে মহাকালের পরিক্রমায় একটি কবিতা শব্দ ও সুরে পরিবর্তন হয়ে এখনও মুখে মুখে ফেরে। আর তাতেই সেকালের সুশাসন, সুকীর্তি, সুসময়ের কথা বাঙ্ময় হয়ে ওঠে।
উজানগড়ের রাজা
শাসক বেজায় কড়া।
প্রজার সুখে রাজা সুখী
সবাই্ জানে ভাই,
কথার চেয়ে কাজে ভালো
দেখতে হবে তাই।
বুদ্ধিমতো কর্ম করেন
ধরা বড়ো কষ্ট,
মন্দ লোকের মন্দ কর্ম
হলো যতো নষ্ট।
সুজাত কুজাত সবে মিলে
একই সাথে থাকে,
রাজা প্রজা সবার ভালে
সুখেরই নাও ভাসে।

SHARE

Leave a Reply