Home ভ্রমণ ঘুরে এলাম ইউরোপ -ফরিদা ইয়াসমিন

ঘুরে এলাম ইউরোপ -ফরিদা ইয়াসমিন

শুরুতেই মহান আল্লাহর অশেষ শুকরিয়া, যাঁর দয়ায় আমার মতো নগণ্য এক পল্লীগৃহিণী মায়ের বিদেশ ভ্রমণ করার সৌভাগ্য হয়েছে। তবে যাদের চেষ্টায় আমাদের এই ভ্রমণ তাদের কথা একটু না লিখলে মনে হয় তাদের প্রতি কার্পণ্য করা হবে। ১৯৮২ সালে আমার বড় মেয়ে ও জামাই যুক্তরাজ্যের ইস্ট লন্ডন যায়। আমার মেয়ের জামাই LEA AND AL-MIZAN  স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান শিক্ষক পদে দীর্ঘ ২০ বছর চাকরি করে। মেয়েও স্কুলশিক্ষিকা ছিল এখন অবসরপ্রাপ্ত। তাদের ৪ মেয়ে ও ১ ছেলে। জন্মসূত্রে ওরা সবাই ব্রিটিশ নাগরিক এবং সবাই নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে কৃতিত্বের সাথে অবদান রাখছে।
প্রথমবার ইংল্যান্ড সফর
আমার বড় মেয়ের একমাত্র ছেলের বিয়ে উপলক্ষে আমি এবং আমার স্বামী প্রথমবার লন্ডন যাই। ২০১২ সালের ৭ জুলাই রাত ৯টায় ইউরোপের সর্ববৃহৎ বিমানবন্দর (বিশ্বের ৪র্থ ব্যস্ততম বিমানবন্দর) হিথ্রোতে আমরা পৌঁছাই। এত বড় এবং এত ব্যস্ত হওয়া সত্ত্বেও যাত্রীসেবায় তারা খুবই আন্তরিক। ৫-৭ মিনিটের মধ্যেই আমরা আমাদের লাগেজ হাতে পাই এবং টার্মিনাল থেকে বের হয়ে দেখি মেয়ে ও জামাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
১৪ জুলাই মহা ধুমধামের সাথে নাতির বিয়ে হলো। দুই বাড়িতে বেড়ানো হলো প্রায় ১ সপ্তাহ। ২১ জুলাই পবিত্র মাহে রমজান শুরু। লন্ডনে তখন দীর্ঘ ১৮ ঘণ্টার রোজার সময়সীমা। আমরা আল্লাহর ওপর ভরসা করে কোনো সমস্যা ছাড়াই ১ মাস সিয়াম পালন করলাম। আলহামদুলিল্লাহ!
ইস্ট লন্ডন মসজিদে ৫ জন হাফেজ তারাবির ইমাম ছিলেন। এর মধ্যে একজন (হাফেজ তানভীর) আমাদের বাংলাদেশী। সে তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার ছাত্র ছিল।
আমাদের গ্রামের মসজিদে মহিলাদের নামাজের ব্যবস্থা না থাকায় অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। কিন্তু লন্ডনে ২ রাত মসজিদে তারাবির নামাজ পড়ার সুযোগ হয়েছিল। বাসা থেকে মসজিদে গাড়ি দিয়ে যেতে ৩০ মিনিট সময় লাগে। শারীরিক দুর্বলতার কারণে পরবর্তীতে আর যাওয়া হয়নি।
রমজানে সবাই রোজাদার এবং চাকরি করে, তাই বেশি দূরে ঘোরা হয়নি। ঘুরে দেখার পর্ব শুরু হলো ঈদুল ফিতরের পর।
রানী এলিজাবেথের বাড়ি ‘বাকিংহাম- প্যালেস’ ব্রিটিশ মিউজিয়াম, রয়েল কিউ গার্ডেন, ব্রাইটন ফ্রুট পিকিং, আটলান্টিক মহাসাগরের পাড়, এই সাগরের এপার লন্ডন ওপার আমেরিকা। জামাই বললো প্লেনে যেতে ৬ ঘণ্টা লাগে। মেয়ে জামাই দাওয়াতের কাজে অবশ্য নিউ ইয়র্কে গিয়েছিল কয়েকদিন আগে। তা ছাড়া ওরা ইতালি, ফ্রান্স, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, স্পেন, পর্তুগাল, মিশরসহ বিভিন্ন দেশে দাওয়াতি কাজে যায়। যাক্ লিখতে ছিলাম আমাদের ঘুরে দেখার প্রসঙ্গ। টেমস নদীর তলদেশে ট্রেনলাইন, মোটরওয়ে ও পায়ে চলার পথ আছে। প্রথম দিন এয়ারপোর্ট থেকে জামাই বাসায় যাওয়ার পথে গাড়ি ড্রাইভ করে আর বলে আপনাদেরকে নিয়ে টেমস নদীর নিচ দিয়ে যাচ্ছি।
আর একদিন পায়ে হেঁটে দেখতে গেলাম। এই নদীর ওপর দিয়ে Cable Car আমাদের দেশের সিএনজির মতো দেখতে কিন্তু সেগুলো আরো উন্নত। ৪-৫ জন যাত্রী নিয়ে অনেক ওপর দিয়ে চলাচল করে। ক্যাবল কারে চড়ে নদীর দুই পাড়ে দেখলাম। অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশাল জায়গাজুড়ে আছে। অনেক হল। হলগুলোর সামনে বেশ বড় বড় মাঠ। মাঠে সবুজ ঘাস মনে হয় যেন সবুজ কার্পেট বিছানো। মেশিন দিয়ে ঘাসগুলো ছেঁটে সমান করে রাখা। বার্কিংহাম একটি বড় শহর, সেখানেও যাই।
লন্ডনের বাড়িগুলো যেন এক সুতোয় গাঁথা কোনো আগ-পিছ নেই সবার বাড়ির সামনে গাড়ি পার্কিং পেছনে বাগান। বিদেশের সব ঘর বাহির থেকে বিল্ডিং কিন্তু ভেতরে দোতলা, তিনতলা ফ্লোরগুলো কাঠের। মেঝেতে কার্পেট বিছানো। শহরে অনেক পার্ক রয়েছে। বিভিন্ন পার্কে গিয়ে ফুলের সমারোহ গাছগাছালি দেখে বলতাম এগুলো তো ওরা তৈরি করে নাই এ তো মহান প্রভুর সৃষ্টি।
দেখতে দেখতে ৩ মাস কেটে গেলো। যদিও ভিসা ৬ মাসের আমরা টিকিট কেটেছিলাম ৩ মাসের। জামাইয়ের আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও মেয়ের সংগঠনের মহিলাদের থেকে যে আতিথেয়তা ও আন্তরিকতা পেয়েছি তা কোনোদিন ভুলব না। বিদায়ের দিন ঘনিয়ে এলো। নাতি-নাতনীরা সবসময় বলতো আবার আসবেন। তখন বলেছি নাতির বিয়েতে আসছি, আল্লাহ চাহেনতো আবার আসবো নাতির বাচ্চা-কাচ্চা হলে। আমার এ কথা শুনে সবাই হেসেছিলো।
সবাই বিদায় জানাতে এয়ারপোর্ট এলো। সবাইকে রেখে আসতে কষ্ট হলেও আসতে তো হবেইÑ এই ভেবে কান্নাভেজা চক্ষু নিয়ে বিদায় নিতে হলো। ৫ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টায় ফ্লাইটে ৬ তারিখ সকাল সাড়ে ৯টায় দিল্লি পৌঁছি। দিল্লি থেকে দুপুর ১২টায় ছেড়ে বেলা আড়াইটায় ঢাকা পৌঁছি।

আবার ইংল্যান্ড ভ্রমণ
৩ বছর হলো এসেছি গত বছর ২২ নভেম্বর রায়হানের (নাতির) ছেলে হয়েছে, বড় নাতনীর দুই মেয়ে আমরা দেখে এসেছিলাম। গত বছর তারও ছেলে হয়েছে। আমার ১ নাতনীর বিয়েÑ সব মিলে আবার যাবার সুযোগ হলো। পাসপোর্টের মেয়াদ ২০১৭ পর্যন্ত তাই ভিসার আবেদন করতেই মাত্র ২ সপ্তাহের মধ্যে ভিসা পেয়ে গেলাম। যেহেতু আগেও ব্রিটিশ ভিসা ছিল। এবার টিকিট হলো ‘কাতার এয়ারওয়েজ’ ৪-৭-২০১৫ সকাল ৮টা ১০ মিনিটে ঢাকা থেকে ফ্লাইট। বেলা ১টায় কাতারের দোহা বিমানবন্দরে পৌঁছি। সেখান থেকে বেলা ২টায় ফ্লাইটে লন্ডন পৌঁছি সন্ধ্যা ৮টায়। তখন ইফতারের সময় ছিল ৯.২২ মিনিট। এয়ারপোর্ট থেকে বাসায় পৌঁছতে ঘণ্টাখানেক সময় লাগে, তাই আমরা ইফতারের আগেই বাসায় পৌঁছে যাই।
অপার সৌন্দর্যের সুইজারল্যান্ড ভ্রমণ
নাতনীর বিয়ে উপলক্ষে আসা ওর শ্বশুরের বাসা ঢাকায় যাত্রাবাড়ী। নাত জামাই ছোটবেলায় তা’মীরুল মিল্লাতে পড়াশুনা করে। পরে সুইজারল্যান্ড চলে যায়। ওর বাবা অনেক আগে থেকেই সেখানে থাকতো। এখন ওরা সুইস নাগরিক। ১৫ আগস্ট লন্ডন বিয়ের অনুষ্ঠান হয়। ১৬ আগস্ট বরযাত্রী মেহমানসহ আমাদের ফ্লাইট LONDON STANDSTEAD AIRPORT থেকে সকাল সাড়ে ৯টায় সুইজারল্যান্ড BASEL AIRPORT  পৌঁছি বেলা সাড়ে ১১টায়। ওদের বাসা ‘জুরিখ’। ১ ঘণ্টার মধ্যে বাসায় পৌঁছি। বাসায় যারা ছিল তারা নববধূকে ফুল দিয়ে বরণ করে ঘরে তুললো। বাংলাদেশী প্রচলন অনুযায়ী আমরা নানা-নানী নাতনীর সাথে যাই। কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর গোসল, নামাজ, খাওয়া দাওয়ার পর গল্প হলো। তারপর আসরের নামাজ আদায় করে নাতজামাই আমাদের নিয়ে বের হলো। বিভিন্ন জায়গা দেখার পর বলেÑ রাতে পাহাড়ের ওপর থেকে জুরিখ কী রকম দেখা যায় তা দেখে যাবেন। পাহাড়ঘেরা শহর যেদিকে তাকাই শুধু পাহাড়। পাহাড়ের ওপর বাড়িগুলো আলোয় ঝলমল করছে, নিচে লেকের পানিতে সে আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। ওপরে আলো, নিচে আলো মনে হয় যেন আলোর মিছিল। সে সৌন্দর্য উপভোগ করে ভাবি আল্লাহ মানুষকে সামান্য জ্ঞান দিয়েছেন, সে জ্ঞান দিয়ে মানুষ কত কিছু আবিষ্কার করে। রাত ১০টার পর বাসায় ফিরলাম। তার পরদিন সকালে নাস্তার পর আমাদের নিয়ে বের হয়ে জুরিখের বিভিন্ন মার্কেট, ইউনিভার্সিটি, অপেরা দেখার পর ক্যাবল কারে চড়ে এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড় যাই। পাহাড়ে বিরাট বিরাট গাছ, পায়ে চলার পথ, হোটেল রেস্তোরাঁ বিদেশীদের জন্য সুব্যবস্থা দেখে অবাক হলাম। সারাদিন ঘুরাফেরার পর বাসায় ফিরি প্রায় ৩টার সময়।
নাতজামাই ওর বাবা-মাকে বলে ১ সপ্তাহ আমাদেরকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গা দেখবে। আরো একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার আমার নাতনীর নাম ‘রাদিয়া’ আর জামাইয়ের নাম ‘রেদোয়ান’। একজন লন্ডন আরেকজন সুইজারল্যান্ড, আল্লাহ যেন ওদের নামেরও জোড়া মিলিয়ে দিয়েছেন।
সুইজারল্যান্ডে রেদোয়ানের বাবার বন্ধুদের মধ্যে ওর বাবাই বয়সে বড়। কারো ছেলের এখনও বিয়ে হয়নি, তাই সবাই খুব আন্তরিকতার সাথে সব কাজে সহযোগিতা করেছে। ২৩ আগস্ট সেখানে ‘ওয়ালিমা’ অনুষ্ঠান হয়। ৭০০ লোকের আয়োজন করে। লন্ডন থেকে বাবা-মা, ভাই-বোন আরো আত্মীয়স্বজন যায়। ২৪ আগস্ট সবাই বিভিন্ন জায়গায় ঘুরাফেরা করে আমরা লেকের মধ্যে বোটে চড়ে আনন্দ উপভোগ করি।
সময় বেশি ছিল না, তাই বাসায় গিয়ে খাওয়া দাওয়া করে এয়ারপোর্ট চলে আসি। ৪.১০ মিনিটের ফ্লাইটে করে লন্ডন পৌঁছি ৬টায়।
এবার পালা স্পেনের : ২ দিন লন্ডনে থেকে ২৭ আগস্ট সন্ধ্যা ৭টার ফ্লাইট হয়ে স্পেন BILL BOU AIRPORT পৌঁছি রাত সাড়ে ৯টায়। সেখানে অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিল আমার বড় ছেলে ও ছেলের বউ। আমার ছেলে দীর্ঘ ১৭ বছর ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ঘুরে স্পেনে আছে ১০ বছর হলো। চেক হয়ে যাবার পর বের হতেই ওদের সাথে দেখা। জড়িয়ে ধরে ছেলে বলে, মা! কেমন লাগছে? আমি বলি, বাবা মনে হয় যেন স্বপ্ন দেখছি। সাথে মেয়ে ও জামাই এসেছিল। ওদেরকে আমার ছেলে বলেছে আমাদেরকে নিয়ে যেতে। স্পেনের ভাষা আলাদা। ওরা ইংরেজি জানে না, এখন স্কুল-কলেজে ইংরেজি চালু করেছে। সুইজারল্যান্ডে চলে জার্মান ভাষা। বাসায় যখন পৌঁছি তখন রাত ১১টা। নামাজ, খাওয়া-দাওয়া, গল্প করতে করতে রাত ২টা বাজে। দুই বছর আগে ছেলে দেশে এসেছিল, এই সময়ের মধ্যে বাড়ির, এলাকার কত রকমের পরিবর্তন হয়েছে। এসব কথা বলতে বলতে এত রাত। পরে সবাই ঘুমাতে যাই।
প্রবাসী সবার মুখে এক কথা- অনেকের বাবা-মা নেই, যাদের আছে তাদের পক্ষে বাবা-মা নেয়া সম্ভব হয় না। খুব কম লোকই তা করতে পারে। তাই আল্লাহর অশেষ মেহেরবানি যেখানেই যাই সেখানেই কত যে শ্রদ্ধা, সম্মান, আন্তরিকতা ও আতিথেয়তা করেছে তা কখনও ভুলবার নয়। ৩০ আগস্ট রোববার ছেলের ছুটিতে আমাদেরকে সাগরপাড় নিয়ে যায়। একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে সাগর। সাগরের নীল জলে সূর্যাস্তের দৃশ্য খুব মনোরম লেগেছিলো। বাসায় ফিরতে রাত হলো। পরদিন স্থানীয় বড় হোটেলে (KIMTXU) দুপুরের খাবার খাই। এমনিভাবে আনন্দ উদযাপনে এক সপ্তাহ কাটিয়ে ২ সেপ্টেম্বর মেয়ে ও জামাই লন্ডন চলে যায়। আমরা দেড় মাসের জন্য থেকে গেলাম। স্পেন শহরটাতে পাহাড়ের ওপর বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, মার্কেট, রেললাইন এসব দেখে বোঝা যায় না এগুলো পাহাড় না সমতলভূমি। লিফটে পাহাড়ে ওঠার ব্যবস্থা আছে। আরেকটা পাহাড় কেটে ট্রেনের লাইন করেছে। দূর থেকে দেখে মনে হয় উলটে পড়ে যাবে কিন্তু যখন চড়লাম তখন ভয় কেটে গেলে। কারণ স্বাভাবিকভাবেই ওপরে উঠলাম। এটা খুব উঁচু পাহাড়, এখানেও গিয়ে দেখি বাড়িঘর, হোটেল, পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা ঐ পাহাড় থেকে পুরো ‘বিল বাও’ শহরটা দেখা যায়। আমরা বিকেলে যাই, আসি সন্ধ্যার পর। আবার সেই দৃশ্য-আলোকিত পুরো শহর। কিছুক্ষণ পর বাসায় ফিরলাম। স্পেনের একটা জায়গার নাম ‘পর্তুগালতে’। সেখানে একটা নদীর অনেক ওপরে লোহার ব্রিজ, সেটা লোক চলাচলের জন্য নয়। ওইটা কেবল ফেরি। আমাদের দেশের ফেরির মতো একপাশে গাড়ি অন্যপাশে লোকজন। ব্রিজের সাথে ফেরি সাথে ক্রেন দিয়ে লাগানো। ওইটা ফেরিটি টেনে নেয় পানি থেকে প্রায় ১০০ ফুট ওপর দিয়ে নদীর এপার থেকে ওপারে। ঐ নদী পারাপারের এই একটাই পথ। এ দিয়ে সরকার কোটি কোটি টাকা আয় করছে। ফেরি পার হয়ে ওপার গেলাম। শহর, পাহাড় আবার সাগর। পাহাড়ের ওপর বিরাট বিরাট গাছ। কত বৈচিত্র্যময় আল্লাহর সৃষ্টি তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। চোখে দেখে শুধু উপভোগ করা যায়। বাসায় ফিরতে রাত হলো।
রোববার সবার ছুটি, তাই আমাদের দাওয়াতের পালা। মাত্র ৩ জনের বাসায় বেড়ানোর সময় পেয়েছি। সেখানে বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ঈদুল আজহা। ঈদের ছুটি নেই। তাই সবাই পরামর্শ করলো আমাদেরকে নিয়ে পিকনিকে যাবে।
২০ সেপ্টেম্বর রোববারে ওরা বাস ভাড়া করে কয়েক পরিবার মিলে প্রায় ২৫-৩০ জন। বেলা ১১টায় রওনা দিলাম। পিকনিকের জায়গার নাম হলো ‘সানসা বাস্তেন’। সেখানেও সেই পাহাড় আর সাগর। বেলা ১টায় সেখানে পৌঁছি। যারা সাগরতীরে নেমে গোসলের প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে তারা নামলো। বাকি সবাই পার্কে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরাফেরা করে। তারপর বেলা ৩টায় খাবার পর্ব শেষ করে সবাইকে বলে দেয়া হয় সাড়ে ৭টায় রওনা দেবে, যে যেখানে যায় ঠিক সময়মত যেন উপস্থিত হয়। তারপর আবার শুরু হলো এদিক ওদিক দেখতে যাওয়া। সবাই সঠিক সময়ে এলো, গাড়ি ছাড়লো। বাসায় পৌঁছতে রাত ১০টা।

৫ দিনের ঝটিকা সফরে ফ্রান্স
২৪ সেপ্টেম্বর পবিত্র ঈদুল আজহা। এবার ঈদের পর আমাদের ফ্রান্সে যাওয়ার পালা। সেখানে এক নাতি (জামাইয়ের ভাগ্নে) ২০১২ সালে যখন লন্ডন যাই তখন সেও রায়হানের বিয়েতে এসেছিল। ওর সাথে আমাদেরকে নিয়ে যেতে চাইছিল, আমরা যাইনি। সে নাছোড়বান্দা এবার যেতেই হবে। পরিবারসহ থাকে, ওর মা খুব অসুস্থ। তাই ভাবলাম তাকে দেখে যেতে হবে। আমার ছেলের বাসা ‘কাচকি বিউকু’ সীমান্ত থেকে ৩-৪ ঘণ্টার পথ। সীমান্ত এলাকার নাম ইরুন-ফ্রান্স শুধু একটা ব্রিজ। ব্রিজের মাঝামাঝি দুই দেশের দুটো পতাকা। হাঁটতে হাঁটতে স্পেনের লোক ফ্রান্স যায়, ফ্রান্সের লোক স্পেন আসে কোনো চেক নেই। চেকপোস্ট আছে অবশ্য। সন্দেহ ছাড়া কাউকে চেক করে না। কুমিল্লা বাড়ি আমার ছেলের বন্ধুর বাসা ইরুন, ৭ অক্টোবর সেখানে ছিলাম। বউ বাচ্চারাতো আমাদেরকে পেয়ে মহাখুশি। ভোর ৬টা ৪৫ মিনিটে ট্রেন। ফজর পড়ে নাস্তা করে ওর বাসা থেকে বের হই ঠিক সময়েই ট্রেন যাত্রা করলাম। সকালবেলা কুয়াশাচ্ছন্ন। মনে হলো অন্ধকার, সূর্য উঠতেই সব আলো। দুই পাশে বিস্তীর্ণ এলাকা শুধু সবুজ ফসল মাঝখানে ট্রেনলাইন আবার দূরে পাহাড়, ঘন বন, গাছ-গাছালি কোথাও কাশবন। লন্ডন, সুইজারল্যান্ড, স্পেন ফ্রান্স সবখানেই কাশবন দেখলাম। ঠিক বাংলাদেশের চর এলাকার মতো। অনেক মনোরম দৃশ্য দেখতে দেখতে বেলা ১২টা ৪৫ মিনিটে প্যারিসে পৌঁছলাম। নাতি আগেই গাড়ি নিয়ে অপেক্ষায় ছিল। বাসায় পৌঁছলাম প্রায় ২টা নাগাদ। সে ব্যবসায়ী লোক মোবাইলের দোকান। বেশ দামি ১টা মোবাইল আমাকে গিফ্ট করেছে। আমাদের পেয়ে ওর মা বলে, মনে হয় সুস্থ হয়ে গেছি, বউ বাচ্চারাও খুশি। আমাদের পেয়ে ওর বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন সবাইকে দাওয়াত করলো। বলল, বাংলাদেশ থেকে আমার নানা-নানী এসেছেন। সবাই এলো, ওরাও মহাখুশি। আমি প্যারিসে বেড়াতে এসেছি চোখে দেখেও যেন অবাক হয়েছে।
৯ অক্টোবর রাত ১০টায় নাতি ‘রূপসী প্যারি’র বিখ্যাত আইফেল টাওয়ার দেখাতে নিয়ে যায়। নেপোলিয়নের বাড়ি, সংসদ ভবন, প্যারিস গেট আরো বিভিন্ন কলেজ, ভার্সিটি, মার্কেট, সিন নদীর পাড় অনেক কিছুই দেখার সৌভাগ্য হলো। ১২ অক্টোবর রোববার দুপুর ১২টা ২৮ মিনিটে নাতি আর ওর মা এসে আমাদেরকে ট্রেনে উঠিয়ে দেয়। বিকেল ৬টা ১১ মিনিট ইরুন পৌঁছি। সেখানে আমার ছেলে বউ স্টেশনে অপেক্ষা করছে। ছেলের বন্ধু বৌ-বাচ্চা নিয়ে আমাদের সাথে দেখা করে। ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা ট্রেনে উঠে বাসায় আসি রাত ১০টায়। ১২ অক্টোবর স্পেনের ‘কলম্বাস’ আমেরিকা আবিষ্কার করে তাই স্পেন ঐদিন স্বাধীনতা দিবস পালন করে। সেদিন ছুটির দিন আমার ছেলে ওর ৩-৪ জন বন্ধুকে সপরিবারে দাওয়াত করে। সবাই এসে খাওয়া দাওয়া করে আমার ছেলে-বৌকে সান্ত্বনা দিয়ে আমাদের কাছ থেকে দোয়া চেয়ে বিদায় নেয়। মাত্র দেড় মাস যেন দেখতে দেখতে কেটে গেল। দিন দিন মনে হতো কিভাবে ওদেরকে রেখে যাবো। বিদায়ের সময় ঘনিয়ে এলো। ১৫ অক্টোবর ছেলে ও বৌমাকে কাঁদিয়ে নিজেও কেঁদে বিদায় নিলাম। ওরা এয়ারপোর্ট এসে বিদায় দিয়ে গেল। পৌনে ১২টায় ফ্লাইট হলো, ১টা ১৫ মিনিটে লন্ডন এসে পৌঁছি। মেয়ে জামাই আগেই গাড়ি নিয়ে অপেক্ষায় ছিল, তাই আর দেরি না করে বাসায় চলে আসি। দেড় মাস পর নাতি-নাতনীদের সাথে আবার দেখা। সবাই খুশি কিন্তু মাত্র ১৫ দিন পর দেশে ফেরার পালা।
গুনতে গুনতে দিন ফুরিয়ে যেতে লাগলো। ২৯ অক্টোবর ব্রিটিশ পার্লামেন্টের House of Parliament Britain দেখতে যাই। এক নাতনী সেখানে চাকরি করে, তাই পরিদর্শক হিসেবে আমাদের ভেতরে প্রবেশ করে বিভিন্ন হল দেখার সুযোগ হলো। এবার দেশে ফেরার সময় হলো। ২ নভেম্বর হিথ্রো থেকে সকাল ৯টায় ফ্লাইট দোহা পৌঁছি বিকেল পৌনে ৬টায়। দোহা থেকে রাত ১০টায় ফ্লাইট ৩ নভেম্বর ভোর সাড়ে ৫টায় আল্লাহর অশেষ রহমতে ফিরে এলাম প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে। পেছনে পড়ে রইল অনেক স্মৃতি, আনন্দ, বিদায়ের বেদনা।

SHARE

Leave a Reply