Home গল্প লিলিপুট -মাহমুদ শরীফ

লিলিপুট -মাহমুদ শরীফ

বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে সাইফ। এবার অষ্টম শ্রেণীতে পড়ছে সে। জেএসসি পরীক্ষার্থী। কিন্তু ওর শারীরিক গঠন দেখলে কেউই বিশ্বাস করতে চাইবে না এই লিলিপুট মার্কা ছেলেটির বয়স পনেরো বছর। কারণ, সাইফের উচ্চতা, ওজন আর স্বাস্থ্য পনেরো বছরের একজন কিশোরের সাথে কিছুতেই বিন্দুমাত্র মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। অপরিচিত কেউ প্রথম দেখাতেই বলবে- ছেলেটির বয়স আর কত হবে! সর্বোচ্চ ছয় কিংবা সাত বছর হতে পারে। এর কারণ, ছয়-সাত বছর বয়সী কিশোরদের গঠনাকৃতি এবং স্বাস্থ্যের সাথে সাইফের গড়নে মিল করা যাবে বৈকি!
ওর বাবা একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন। মাঠে দুই- চার বিঘা আবাদি জমিও রয়েছে। গ্রামে বসবাস তাদের। বেশ সুখেই চলছে ওদের চার সদস্যের সংসার। সাইফের বড় বোন সুমাইয়া সিমু গত বছর এসএসসি পরীক্ষায় জোতমোড়া মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে অংশ নিয়ে যশোর বোর্ডের মধ্যে মেধাতালিকায় তৃতীয় হয়েছে। স্কুল এবং বাবা-মায়ের আশা পূরণ করেছে সিমু। এই ভালো ফলাফলের জন্য দরবেশপুর গ্রামের এই ছোট পরিবারকে আশপাশের ৫-১০ গ্রামের মানুষ নতুন করে চিনেছে। বিভিন্ন মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচারিত হয়েছে সিমুর বোর্ড স্ট্যান্ড করার খবরটি। মহেন্দ্রপুরে নতুন প্রতিষ্ঠিত আইডিয়াল কলেজের শিক্ষকরা তো সিমুকে অনেকটা জোর করেই তাদের কলেজে ভর্তি করিয়েছেন। পিতা-মাতার আপত্তি সত্ত্বেও শিক্ষকবৃন্দ তার পড়ালেখার যাবতীয় খরচ কলেজ বহন করবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
সাইফের লিলিপুট মার্কা তালপাতার সিপাই শরীরে যে রোগবালাই বাসা বেঁধেছে তা কিন্তু প্রমাণিত নয়। পুষ্টিহীনতার জন্য ওর পরিবার দায়ী সেটাও বলা যাবে না। অবশ্য সাইফের একটিই সমস্যা, ও খেতে চায় না। খাওয়ার প্রতি সাইফের রুচি কিংবা কোনো আগ্রহ একদম নেই। খাবার সময় হলেই নানান ঢং, বিভিন্ন অজুহাত। এই পনেরো বছর বয়সের ছেলেকে রাতদিনে নিয়মিত কমপক্ষে তিনবার ভাত মেখে মুখে তুলে দিতে হয় মা শবনম খানমকে। এতে সাইফের মায়ের বিরক্তিও কম নয়। মাঝে মধ্যে তিনি ছেলের মুখের মধ্যে জোর করেই ভাত ঢুকিয়ে দেন। আদরের সুরে রাগ করে বলেন, ‘এত বড় ছেলে, আজ পর্যন্ত নিজের হাতে খাওয়া শিখলো না। আর কতদিন মুখে তুলে খাওয়াবো তোকে!’ বড় বোন সিমুও বহুবার খাওয়াতে যেয়ে ব্যর্থ হয়েছে। বাবা শাজাহান আলী রাগ করেন মাঝে মধ্যেই। রাগ করে বলেন, ‘থাক ওকে আর খাওয়া লাগবে না, খিদের জ্বালায় যখন পেট চোঁ-চোঁ করবে, নাড়িতে টান লাগবে, তখন ঠিকই হাতে তুলে খাবে গপাগপ, খিদের জ্বালা বড় জ্বালা…।’
ইতঃপূর্বে বাবা শাজাহান আলী ছেলেকে ২০-৩০ টাকা স্কুলে যাওয়ার সময় হাতে গুঁজেও দিয়েছেন। এই ভেবে যে, বাড়িতে ভাত না খেলেও স্কুলের পাশের দোকান থেকে কিছু কিনে খাবে ইচ্ছেমতো। কিন্তু এই টাকা দেয়া থেরাপিতেও কোনো কাজ হয়নি। সাইফ ঐ টাকা থেকে ২-৩ টাকার চকোলেট বা চুইংগাম খেয়ে অবশিষ্ট টাকা আবার তার হাতে ফিরিয়ে দিয়েছিল। তা ছাড়া কোনো আত্মীয়-স্বজন খুশি মনে সাইফকে টাকা দিলে সে সব টাকা মায়ের কাছে জমা করে রেখেছে।
শুধু ভাত, মাছ, গোশত ও ডিমের প্রতি যে ছেলেটার অনাগ্রহ তা নয়, শাজাহান আলী কুমারখালী বাজার থেকে আপেল, কমলা, বেদানা, আম ও কলা নিয়ে এসে বাড়িতে রাখলেও ছেলে সাইফ সেদিকে ফিরেও তাকায় না। ফলগুলো টেবিলের ওপর পচে নষ্ট হয়। ছোটবেলায় আপেল-কমলা দিয়ে ফুটবল খেলার বহু ঘটনা রয়েছে ছেলেটির। একমাত্র ছেলের খাওয়ার প্রতি এমন অনাগ্রহ আর অরুচি দেখে বাবা শাজাহান আলী কতবার যে রাগ করেছেন তার হিসাব নেই। ছেলেকে খাওয়ানোর সময় মা কত যে বকুনি দেন সেটাও কেউ গুনে রাখেনি।
একদিন মা ইচ্ছে করেই সাইফকে মুখে তুলে খাওয়ানো থেকে বিরত থাকেন। তাতেও কোনো কাজ হয়নি। সারাদিন ভুল করেও সাইফ ‘খিদে লেগেছে খাবো, মা খেতে দাও’ এমন বাক্য মুখেও উচ্চারণ করেনি। রাতে না খেয়েই ঘুমাতে যাচ্ছে দেখে মা শবনম খানম ছেলের চিবুক ধরে খিস্তি খেউর করতে করতে পটাপট কয়েক লোকমা ভাত মেখে জোর করে ওর মুখে ঢুকিয়ে দেন। সাইফ তার স্বভাব ভঙ্গিতে বিরক্তির সাথে কয়েক লোকমা খেয়ে ‘আর খাবো না, খেতে ভালো লাগছে না, পেট ভরে গেছে’ বলে এ্যাঁ এ্যাঁÑ সুরে কান্না জুড়ে দেয়।
সেদিনের পর থেকে শবনম খানমের চিন্তা বহুগুণে বেড়ে গেছে। কী হলো ছেলেটার! খাওয়ার প্রতি এই অরুচি সাইফের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করছে নাতো? তাহলে ওর ভবিষ্যৎ কী হবে?
ইদানীং আরো একটি সমস্যা এসে জুটেছে। এ যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। আর সেটা হচ্ছে সাইফের সব কিছুতেই ভুলে যাওয়া। ভুলে যাওয়ার কারণে ওর উল্টো-পাল্টা কাজ-কর্ম বাবা-মাকে নতুন করে চিন্তায় ফেলেছে। অবশ্য তারুণ্য চটপটে চঞ্চলতা স্বভাবের কোনো কমতি হয়নি সাইফের আচরণ-ব্যবহারে। হৈ হুল্লোড় আর হইচই করতে সে বেশ কাজের লোক! তবে ভুলে যাওয়ার ঘটনা খুব বেশি ঘটেছে গত দেড় মাসের মধ্যে।
সাইফের ভুলে যাওয়ার ঘটনা অনেক। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- ফুটবল খেলতে যেয়ে ভুল করে নিজেদের গোলপোস্টে বল পাঠিয়ে গো-ও-ও-ও-ল-ল বলে আনন্দে চিৎকার দিয়ে ওঠা। স্কুলে যাওয়ার সময় নিজের স্কুলব্যাগ না নিয়ে বড় বোনের ব্যাগ পিঠে ঝুলিয়ে ভোঁ দৌড় দেয়া। যাওয়ার সময় এক পায়ে জুতা অন্য পায়ে স্যান্ডেল পরা। অর্ধ বার্ষিক পরীক্ষার খাতায় নিজের নাম না লিখে খাতা জমা দেওয়া। বিকেলে স্কুলের মাঠে খেলতে যেয়ে দেড় মাসের মধ্যে চার জোড়া স্যান্ডেল রেখে বাড়ি চলে আসা। শার্ট গায়ে দেওয়ার সময় উল্টা করে গায়ে দেওয়া কিংবা ওপরের বোতাম নিচে লাগানো। সবশেষে গতকাল সাইফ স্কুলে নিজের ক্লাস অষ্টম শ্রেণীতে না যেয়ে সপ্তম শ্রেণীতে ঢুকে পড়ে। এ জাতীয় অনেক ভুল-ভাল কান্ড ঘটিয়ে সে হাসির পাত্র হতে চলেছে।
এসব উল্টোপাল্টা কাণ্ড আর ভুলে যাওয়ার বিষয়টি বেশ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে স্কুল পাড়ায়। ২-৪ জন দুষ্ট ছেলে সাইফকে ইতোমধ্যেই ‘ভোলানাথ, ভুলু’ উপনামে ডাকতে শুরু করেছে। আলাউদ্দিন আহমেদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে সবচেয়ে ডানপিটে আর দুষ্টুর রাজা বলে খ্যাত বাটুল বাবলু জোয়ার্দ্দার সাইফকে আদর করে কাছে ডাকে। সহানুভূতির সুরে দরদমাখা কণ্ঠে বলে, ‘এই ভোলা বাবু! তুই খবরটা পাসনি! এখনও স্কুলে ঘুরছিস?’
সাইফ জিজ্ঞাসার দৃষ্টিতে বাবলুর দিকে তাকায়। ভাবে এই তল্লাটে জোয়ার্দ্দার বাবলুর দুষ্টুমির জুড়ি নেই। ‘কী খেয়েছিস’? জানতে চাইলে সে বমি করে দেখিয়ে দিয়েছিলো সেদিন। আর বলেছিলো, ‘কী কী খেয়েছি দেখে নাও, শোনার দরকার কী?’ ইচ্ছে করে কেউ ওর ছায়া পর্যন্ত মাড়ায় না। এলাকার যাযাবর কুকুরগুলোও বাবলুকে দেখে ঘেউ ঘেউ করে ডাকতে ডাকতে ছুটে পালায়। এরও কারণ আছে, বাবলু কুকুরের পেছনের ঠ্যাং ধরে মাথার ওপর কয়েক চক্কর দিয়ে ছুড়ে ফেলে দেয়। এ জন্য কুকুরগুলো সব সময় নিরাপদ দূরত্বে ডাকতে ডাকতে পালায়। স্কুল ফাঁকি দিয়ে বন-বাদাড়ে টইটই করে ঘুরে বেড়ানো কিংবা ঘুঘুর ডিম আর পাখির ছানা চুরি করায় বাবলুর জুড়ি নেই। পিতা তারিক জোয়ার্দ্দার এবং শিক্ষকবৃন্দ ওর জ¦ালায় অতিষ্ঠ। সালিস করতে হয় প্রায় প্রতিদিন।
বাবলু আবার বলে, ‘কিরে কথা বলছিস না কেন? তুই কোনো খবর টবর পাসনি, নাকি?’
– কী খবর, জানতে চায় সাইফ।
– কেন, তোর বাবা-মার ছেলে পানিতে ডুবে মারা গেছে, তুই এই সংবাদ এখনও শুনিস্নি?
কথাটি শুনেই সাইফের জানার আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। উত্তেজনায় ছটফট করতে থাকে ও।
– কখন, কোথায় ডুবেছে? শুনিনি তো!
– আরে ভুলু! কিছুক্ষণ আগে গড়াই নদীতে ডুবে গেছে। তোর বাবা-মা কত্ত কান্নাকাটি করছে আর তুই কিনা …
– তাই নাকি! তাহলে আমি গেলাম। বলেই সাইফ স্কুলের ব্যাগ না নিয়ে তিড়িং বিড়িং করে হরিণের মতো দৌড় দেয়। আর দুষ্টু বাবলু ওর দলবল নিয়ে হুল্লা দিয়ে অট্ট হাসিতে ফেটে পড়ে। আর বলে, ‘বোকারাম সাইফ তুই-ই তো তোর বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে হা হা হা হা …’
সাইফ এক দৌড়ে গড়াই নদীর তীরে এসে থামে। না এখানে কেউ নেই। দুই সেকেন্ড ভেবে আবার ছোটে বাড়ির দিকে। বাড়িতে পৌঁছে মাকে ডাক দেয়। শবনম খানম ছেলের হঠাৎ আগমনে বিস্মিত হন। কিছু বলার আগেই সাইফ জিজ্ঞেস করে, মা তুমি নাকি কাঁদছো?
– কেন কাঁদবো?
– তোমার ছেলে নাকি পানিতে ডুবে মারা গেছে?
– কে বললো এসব কথা?
– বাবলু।
এই বাবলু নামটি শুনে শবনম খানমের আর বুঝতে অসুবিধা হলো না তার ছেলের সাথে দুষ্টু বাবলু মজা করেছে। তিনি হাসি মুখে বললেন, আমার ছেলে কে বলো তো?
– কয়েক সেকেন্ড ভেবে সাইফ উত্তর দেয়- কেন আমি, আমিই তো তোমার একমাত্র ছেলে।
– মা বললেন, তাহলে তুমি কি মারা গেছো?
সাইফ বললো, না।
– তাহলে আমি কাঁদবো কেন?
এতক্ষণে সাইফের কাছে সব কিছু পরিষ্কার হয়। যেনো হুঁশ ফেরে ওর। সে যে পিতা-মাতার একমাত্র ছেলে সেটাই সে ভুলে গেছে। বাবলু তার সাথে গুল মেরেছে এটা এখন আর বুঝতে বাকি নেই সাইফের।
শবনম খানম পিচ্চি ছেলেকে কোলে নিয়ে বারান্দার চেয়ারে বসিয়ে বলেন, ওই হতচ্ছাড়া বাবলু তোমার সাথে মশকারা করেছে সেটাও বুঝতে পারোনি! তুমি এখানে বসো বাবা, আমি তোমার জন্য খাবার নিয়ে আসছি।
খাবারের কথা শুনে সাইফের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। মা রান্নাঘরে ঢুকতেই সাইফ এক লাফে উঠানে, তারপর এক নিঃশ্বাসে স্কুলের দিকে ছুটে পালায়। মা খাবার নিয়ে ফিরে এসে দেখেন সাইফ উধাও।
রাতে ছেলের আজকেরসহ গত দিনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা আর ভুলে যাওয়ার কথা সাইফের মা স্বামী শাজাহান আলীকে জানিয়ে বলেন, আমাদের একমাত্র ছেলের এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির একটা সমাধান করা জরুরি দরকার। চোখের সামনে আমার সোনার মানিকটা দিন দিন শেষ হতে চলেছে, ও কি পাগল হয়ে যাচ্ছে! আমি আর এটা সহ্য করতে পারছি না। তুমি এর একটা বিহিত কর। বলতে বলতে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন শবনম খানম।
শাজাহান আলী স্ত্রীকে সান্ত¡না দিতে দিতে বলেন, সাইফের মা কেঁদো না, ছেলের এই অস্বাভাবিকতা কি আমি লক্ষ্য করিনি ভাবছো! ব্যাপারটি নিয়ে আমিও চিন্তিত। গত শুক্রবার থেকে সাইফকে নিয়ে আমি বেশ হতাশায় ভুগছি। এই তিন দিন ওর কথা আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। আমি …।
শুক্রবারের কথা শুনে শবনম খানম স্বামীর কথা শেষ না হতেই জানতে চানÑ কেন? শুক্রবারে আবার কী হয়েছিলো? ওই দিন তো তুমি সাইফের নানা বাড়ি শিলাইদহে গিয়েছিলে ওকে সাথে করে। সেখানে কী …।
স্ত্রীর কথা শেষ না হতেই শাজাহান আলী বলেন, আরে সেটাই তো বলছি শোন।
শবনম খানম অবাক দৃষ্টিতে স্বামীর মুখের দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকেন। তার বুঝতে আর অসুবিধা হয় না, ছেলেটি নানা বাড়িতে নিশ্চয় কোনো একটা অঘটন ঘটিয়েছে।
‘কী করেছিলো সেখানে?’ জানতে চান মা।
শাজাহান আলী পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য হাসতে হাসতে বলেন, কী আর হবে! তোমার ছেলে নানাবাড়ি যেয়ে নানীকে জড়িয়ে ধরে সেই আগের মতো স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে। কিন্তু এবার নানীর বাহুডোর থেকে নিজেকে মুক্ত করে এক অবান্তর প্রশ্ন ছুড়ে বসলো।
স্বামীর কথায় সাইফের মায়ের উৎকণ্ঠা আর আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। উত্তেজনায় তিনি স্থির থাকতে পারেন না যেন। বলেন, তারপর! তারপর কী হলো?
শাজাহান আলী বললেন, কী আর হবে, নানীকে বিজ্ঞজনের মতো প্রশ্ন করে বসলো, আচ্ছা নানী, তুমি আমার কী হও?
তোমার ছেলের প্রশ্ন শুনে আম্মা তো হতবাক। ওর নানী বলেছিলেন, কেন? আমি তোমার কী হই তুমি সেটা জানো না?
সাইফ নাছোড়বান্দা। নানীর কাছে প্রশ্নের উত্তর তার চাই-ই চাই।
– নানী, নানী গো- বলো না, তুমি আমার কী হও?
– নানী জয়তুন নেছা খানম দাঁতপড়া মুখে ফোকলা হাসতে হাসতে নাতির মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, আমি তোমার নানী হই। সে জন্যই তো তুমি আমাকে নানী বলে ডাকো। নানী তো নানীই হয়, নানী আবার কী হবে!
এবার সাইফ অনেকটা খুশিমনে শান্ত ভঙ্গিতে মুখে আস্তে করে উচ্চারণ করে, ওহ তাই, আমি ভাবছি অন্য কিছু হতেও পারো।
সেই দিনের এই অপ্রত্যাশিত ঘটনাটি নিয়ে শাজাহান আলী বারবার ভেবেছেন। কিন্তু সঠিক উত্তর খুঁজে পাননি। অফিসের সবচেয়ে কাছের মানুষ সোহাগ খানকেও বিষয়টি জানিয়েছেন। খান সাহেব শেষ পর্যন্ত ‘এটা ছেলের দুষ্টামি’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু আজ স্ত্রীর মুখে গত দেড় মাসে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন লন্ডভন্ড মার্কা অঘটনের কথা শুনে তিনি আরো ঘাবড়ে গেলেন, চিন্তার পাহাড় মাথায় পড়লো যেন। এর একটি বিহিত করা লাগবেই এবং খুবই জরুরি। না আর নয়, কালই বড় ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। সাইফের ডিমোশন রোধ করতেই হবে তাদের।
পরদিন মা-বাবা ছেলেকে নিয়ে ডাক্তার শিহাব উদ্দিনের চেম্বারে হাজির হন। ডাক্তার শিহাব সব কিছু শুনে কয়েকটি পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে প্রেসক্রিপশন করে দেন। প্রেসক্রিপশনের ওপরে লিখে দেন সাইফের রোগের নাম ম্যারাসমাস, যার অর্থ দাঁড়ায় অনেকটা অপুষ্টিজনিত রোগ। কয়েক মাস চিকিৎসা চলার পর সাইফের স্বাস্থ্য ও উচ্চতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ভুলে যাওয়ার ঘটনাও আর হয় না। সব কিছুতেই স্বাভাবিকতা ফিরে আসে সাইফের জীবনে। এখন আর ওকে জোর করে কিংবা মুখে তুলে খাওয়ানো লাগে না, নিজে নিজেই খায় এবং খেতে চায়। বাবা-মা ভাবেন অনেক আগেই ছেলেকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত ছিলো। সন্তানের প্রতি অবহেলা করা মোটেও ঠিক হয়নি তাদের। সাইফ এখন খাওয়ার পাগল। সামনে যা পায় তা-ই গপাগপ মুখে পুরে নেয়। আর বলে, এতোদিন যা কম খেয়েছি সেগুলো এখন বেশি করে খাবো। খাওয়ার মজাইতো বড় মজা! খাবো আর পড়বো বুবুর মতো রেজাল্ট করবো।
একমাত্র ছেলের এই অভাবনীয় পরিবর্তনে শাজাহান আলী ও তার স্ত্রী শবনম খানমের আনন্দ বহুগুণে বেড়ে যায়। তারা শুকরিয়া জ্ঞাপন করেন স্রষ্টার দরবারে।
জেএসসি পরীক্ষায় কিশোর সাইফুদ্দিন আলী সাইফও বোনের মতো বোর্ডসেরা তৃতীয় স্থান অধিকার করে।

SHARE

Leave a Reply