Home সায়েন্স ফিকশন তুহিনের LABS মোস্তফা ইউনুস জাভেদ

তুহিনের LABS মোস্তফা ইউনুস জাভেদ

ফারাহ তুহিন। ছোট থেকেই অস্বাভাবিক আকৃতির মাথা আর এক বছর বয়স থেকেই শিশুসুলভ আচরণের ছিটেফোঁটাও ওর মধ্যে খুঁজে না পাওয়ায় বাবা-মা প্রতিবন্ধী ভেবে একপ্রকার হতাশ হয়েই গিয়েছিলেন। সম্ভাবনা খুঁজে পেলেন উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্যোতির্বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. রাশিদুল ইসলাম। তুহিনের বাবার ছোটবেলার বন্ধু ড. রাশিদ। তুহিন জন্মের ৬ বছর পর একদিন তাদের বাসায় গিয়ে তুহিনের সাথে পরিচয় তাঁর। ৬ বছরের একটা ছেলেকে লেজার লাইট নিয়ে পানিতে আঁকিবুঁকি করতে দেখে ড. রাশিদ জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘কী করছো তুহিন?’
‘আংকেল, লেজার রশ্মি পানিতে বাঁকা দেখায়। কিন্তু সত্যি সত্যি পানিতে বেঁকে যায় না কেন? এমন কোনো মাধ্যম কি নেই যেখানে লেজার রশ্মিও বেঁকে যায়?’ অবাক হয়ে গেলেন অধ্যাপক। লেজার রশ্মি নিয়ে তুহিনের এমন চিন্তা দেখে তার সাথে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। তাঁর মতো ব্যক্তির জিম্মায় ছেলেকে তুলে দিতে কোনো আপত্তি করলেন না তুহিনের বাবা-মা।
সেই শুরু। এরপর আর পেছন ফিরতে হয়নি তাকে। সময়ের ব্যবধানে Laser angler, Laser Tube, Laser Sprayer, Laser bullet, Laser sprayer gun-35(LSG-35)-এর মতো বিশ্ববিখ্যাত আবিষ্কারগুলো তুহিনের হাত দিয়েই আলোর মুখ দেখে। বিশ্বজুড়ে লেজার তুহিন হিসেবে পরিচিত হয়ে যায় স্কুলে মাথামোটা হিসেবে পরিচিতি পাওয়া ছেলেটা। ফলশ্রুতিতে ২০৭২ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সেই যুক্তরাষ্ট্রের The Best inventor of the decade award উঠে আসে বাংলাদেশের তুহিনের হাতে।
কিন্তু সুখের সময় ফুরাতে বেশি দিন লাগে না। পৃথিবীর জন্য আসে অন্ধকার এক বার্তা। পৃথিবী থেকে ১৩০০ কোটি আলোকবর্ষ দূরের গ্রহ Kahnd-45N। এই গ্রহের প্রাণীদের পৃথিবীর ভাষায় বলা হয় কাহান। জাতি হিসেবে এদের মতো হিংস্র ও উন্নত আর কেউ নেই। মানুষ এদের চেয়ে উন্নত হলেও হিংস্র নয়। সেই ভয়ঙ্কর কাহানদের লোলুপদৃষ্টি পড়েছে সুজলা সুফলা নির্মল প্রকৃতির এই গ্রহের ওপর। Kahnd-45Nগ্রহের থেকে পৃথিবীতে আসার ঘোষণা দিয়েছে কাহানরা। এরকম আন্তঃগ্রহযুদ্ধে ফলাফল যাই হোক, অগণিত প্রাণহানি আর মানুষের ক্ষতির কথা ভেবে জাতিসংঘ বহুবার আলোচনা করতে চেয়েছে, কিন্তু কোনোভাবেই তারা রাজি হয়নি। চূড়ান্ত হামলার আশঙ্কায় বিজ্ঞানীরা সক্রিয় হয়ে ওঠেন। কি করে আকাশপথেই তাদের আটকে দিয়ে পৃথিবীকে রক্ষা করা যায় তা ভেবে ভেবে ক্লান্ত তারা।
২ ডিসেম্বর, ২০৭৪। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীরা একত্রিত হয়েছেন বাংলাদেশের ঢাকায়, নেক্সাস টাওয়ারে। কিভাবে বন্ধ করা যায় এই হামলা সেই নিয়ে আলোচনা পর্বের প্রথম ফেইজের পর বিরতি চলছে। একান্তে আলাপ করছেন বিশ্বের কয়েকজন খ্যাতনামা বিজ্ঞানী।
প্রথমে ড. গিলবার্টই মুখ খুললেন, ‘আচ্ছা, মহাশূন্যে নিউক ডিনামাইট সেট করলে কেমন হয়?’
ড. হাসান আজিজ বললেন, ‘তা সম্ভব নয়। কারণ প্রতিটি নিউক বিস্ফোরণে মহাশূন্যের গ্রহাণুগুলোর ঘূর্ণনের দিক ব্যাপক পরিবর্তন হবে। আপাতদৃষ্টিতে কাহানদের হাত থেকে বাঁচলেও পৃথিবীর সাথে অন্য গ্রহাণুর সংঘর্ষকেই পরোক্ষভাবে আমন্ত্রণ জানানো হবে।’
ড. স্টিভ তাকালেন ড. রাশিদুলের দিকে, বললেন, ‘আচ্ছা, লেজার নেট ব্যবহার করে ওদের রুখে দেয়া সম্ভব না?’
‘ভালো কথা বলেছেন।’ ড. রাশিদুল বললেন, ‘কিন্তু একটা অসুবিধা আছে। লেজার নেট যতো শক্তিশালী হবে ততো সহজে কাহানদের আক্রমণকে রুখে দেয়া যাবে। কিন্তু নভোমন্ডলে পুরো পৃথিবীকে ঘিরে রাখার মতো নেট তৈরি করা সম্ভব নয়। নভোমন্ডলের ক্ষুদ্র তারকাগুলো তাহলে এর সংস্পর্শে এসে ধ্বংস হয়ে যাবে। আর যখন পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ চাঁদকেও এর শিকার হতে হবে, তখন পৃথিবীর ক্ষতিটা আরো বেশি হবে।’
‘হবে না।’ এতক্ষণ পর এই প্রথম মুখ খুললো তুহিন। সব আলোচনা চুপচাপ শুনছিলো সে। শুনতে শুনতেই মনস্থির করে ফেলেছে তুহিন।
‘হবে না? কি বলছো তুমি? লেজার নেট ব্যবহার হলে তো অবশ্যই এই সমস্যা হওয়ার কথা।’ অবাক হয়ে বললেন ড. রাশিদ।
তুহিন একটু কাছাকাছি হলো বিজ্ঞানীদের। কণ্ঠস্বর নামিয়ে বেশ কিছু কথা বললো, যা কেবল ড. রাশিদই বুঝতে পারলেন।
দ্বিতীয় ফেইজ শুরু হলে ড. রাশিদ প্রথম কথা বললেন। একটু কেশে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে শুরু করলেন তার কথাÑ
‘শ্রদ্ধেয় ও প্রিয় সহযোগীবৃন্দ, আপনারা প্রথম ফেইজে গোটা ব্যাপার বিস্তারিত জেনেছেন। এই ফেইজে আমাদের সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে আলোচনার কথা ছিলো। আলহামদুলিল্লাহ, আমরা ইতোমধ্যে একটা সমাধানে আসতে পেরেছি। তার আগে আমি জানতে চাই অন্য কেউ কোনো সমাধান বের করতে পেরেছেন কি না?’
সবাইকে নীরব থাকতে দেখে আবারো কথা শুরু করলেন তিনি, ‘যেই সমস্যা আমরা সমাধানে ব্যর্থ হচ্ছিলাম প্রায়, সেই সমাধানের সন্ধান আছে আমাদের তরুণ বিজ্ঞানী তুহিনের কাছে। আমি তুহিনকেই ব্যাপারটা বিশদভাবে জানাতে অনুরোধ করছি।’
সবার চোখ ঘুরে গেলো তুহিনের দিকে। একটু নার্ভাস হলেও দাঁড়িয়ে কথা বলা শুরু করলো,
‘শ্রদ্ধেয় শিক্ষকবৃন্দ, আসসালামু আলাইকুম। আমি একটা যন্ত্রের ওপর বেশ কিছুদিন ধরে কাজ করছি। তার নাম আমি দিয়েছি Laser Air Bubble Sprayer। সংক্ষেপে LABS|। এটি লেজার রশ্মিকে পানির মতো একটি বিশেষ মাধ্যম দ্বারা কেটে নিজের মধ্যে বন্দি করে নিয়ে হাওয়ায় ভাসতে পারবে, প্রয়োজনবোধে গুলির মতো আবার ঢালের মতো একে ব্যবহার করা যাবে। তবে মানুষরূপী অমানুষদের হাতে যেন এই ভয়ানক অস্ত্র না যেতে পারে তাই এই কাজ আমি লুকিয়ে রেখেছিলাম। আজ পৃথিবী রক্ষার জন্য এই যন্ত্র ব্যবহৃত হতে পারলে আমার গবেষণা ধন্য হবে।’
কিছুক্ষণ থামলো সে। সভায় পিনপতন নীরবতা। বিজ্ঞানীরা যতোটা না বিস্ময়ে অভিভূত তার চেয়েও বেশি উদগ্রীব হয়ে আছেন কিভাবে এই LABS| ব্যবহার করে কোনো প্রকার ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই কাহানদের উচিত শিক্ষা দেয়া যাবে তা ভেবে। কোনো প্রশ্ন ওঠার আগেই তুহিন আবার শুরু করলো তার কথা,
‘LABS| এমন একটি অস্ত্র যা এক সেকেন্ডে ৬ কোটি ৭০০ লেজার বাবল যেকোনো মাধ্যমে স্প্রে করতে পারে। নভোমন্ডলে এ রকম কয়েক হাজার অস্ত্র পাঠাতে পারলে ওদের ধ্বংস করার পাশাপাশি ওদের অস্ত্রগুলোও বিকল করা যাবে। আর লেজার বাবলগুলো টু দি পয়েন্ট প্রয়োগ করতে চাইলে LABS|কে সেভাবে নির্দেশনা দিলেই হয়ে যাবে। বুলেটগুলো বাবলড হয়ে থাকায় নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের সাথে সাথে দীর্ঘস্থায়ী মেয়াদের জন্য মহাশূন্যে সেট করে রাখা যাবে অনায়াসে। LABS| এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর দ্বারা ১ ফেমটো মিটার থেকে এক আলোকবর্ষ পর্যন্ত বাবল বা বুলেট তৈরি করা যাবে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে। আমাদের কাজ হবে কাহানদের স্পেসশিপের ফায়ারিং রেঞ্জার গানগুলো, যা আলট্রা পেরিস্কোপের দ্বারা ডিটেক্ট করে শুধু ওদের গানগুলোকে বিকল করবে, ফলে যে কোন প্রকার বড় ধরনের বিস্ফোরণ থেকে নভোমন্ডলকে রক্ষা করা যাবে।’
এতোক্ষণ সবাই তন্ময় হয়ে তুহিনের কথা শুনছিলেন। তাই ওর কথা থামার বেশ কিছুক্ষণ পর সভা তুমুল করতালিতে ফেটে পড়লো। তালি থামলে তুহিন বললো, ‘তবে এখনো একটা কাজ বাকি রয়ে গেছে।’
‘কী কাজ?’ সাথে সাথেই কথাটা বললেন ড. রাশিদ। তার দীর্ঘ ৬৫ বছরের জীবনে লেজারকে বন্দি করে ব্যবহার করা কল্পনাতেও ছিলো না। আজ তার বন্ধুর ছেলে বাস্তবে তা করে দেখাচ্ছে। কিন্তু বাধাটা কিসের সেটাই তার প্রশ্ন।
তুহিন বললো, ‘LABS|-এর ফিনিশিংয়ে এখনো যেতে পারিনি আমি। ব্যারেল ও রেঞ্জের ব্যালান্স নিয়ে এখনো কিছু ইকুয়েশন মিলাতে হবে আমাকে, না হলে পারফেকশন পাবে না LABS|।
‘সেটার সমাধান কি আদৌ হবে?’ বললেন ইহুদি বিজ্ঞানী জ্যাকব জোনস। ভালো মনের মানুষ হলেও স্বভাবসুলভ মুসলিমবিদ্বেষী মনোভাব থেকেই গেছে তার। একটা খুঁত দেখেই তাই তার মন সন্দিগ্ধ হয়ে গেলো।
‘আপনারা আমার জন্য দোয়া করবেন। আল্লাহ সহায় হলে আর ২ দিনের মধ্যেই ইকুয়েশনটা মিলে যাবে মনে হচ্ছে।’
‘বেশ, আমরা সবাই প্রার্থনা করছি। তুমি খুব দ্রুত কাজে লেগে যাও। কাহানরা বলেছে, নতুন বছরটা ওরা এখানেই পালন করবে। সে হিসেবে আর মাত্র ২৭ দিন সময় হাতে।’ বললেন সভার প্রেসিডেন্ট ড. সাইফুল ইসলাম, ‘তাহলে সভা আপাতত এখানেই ইতি। সবাইকে অশেষ ধন্যবাদ। স্রষ্টা আমাদের সহায় হউন।’
এক এক করে সকলে তুহিনকে শুভ কামনা করে বিদায় নিতে লাগলেন। ড. গিলবার্ট এসে হ্যান্ডশেক করে বললেন, আসসালামু আলাইকুম হে পৃথিবী। হেসে উঠলেন ড. রাশিদ ও তুহিন।
আর একটা মাত্র ইকুয়েশন, আর একটা ইকুয়েশন মিলাতে হবে তুহিনকে। তাহলেই উন্মুক্ত হয়ে যাবে Laser Air bubble Sprayer (LABS)-এর সকল জটলা। লেজার সায়েন্সের জগতের নতুন বিস্ময় হবে খঅইঝ। তুহিন রক্ষা করতে পারবে পৃথিবীকে, ভয়াবহ এক যুদ্ধের হাত থেকে। গোটা একটা দিন চলে গেছে, ইকুয়েশন মেলাতেই পারছে না তুহিন। নিরুপায় হয়ে সকল বিজ্ঞানের আধার মহান আল্লাহর কাছে নুয়ে পড়লো তুহিন। ফরিয়াদ করলো, ‘হে মহাজ্ঞানী, আমার মেধা বাড়িয়ে দাও, আমার সমস্যা সমাধান করে দাও। তোমার সৃষ্টির কল্যাণ ছাড়া আমার যাবতীয় আবিষ্কারের কোনো উদ্দেশ্য নেই, এ কথা তো তুমি সবার চেয়ে ভালো করেই জানো হাকিম। আমার উদ্দেশ্য পূরণ করতে আমায় সাহায্য করো মা’বুদ। মানুষকে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচানোর একমাত্র মালিক যে তুমিই।
সেজদা থেকে উঠে নিজের গবেষণার মূল বিষয় কুরআন পড়া শুরু করলো তুহিন। এক একটি আয়াত যেন ওর মস্তিষ্কের এক একটা জট খুলতে থাকলো। পড়ে যেতে লাগলো তুহিন, ‘তোমরা দেখতে পাচ্ছ, দৃশ্যমান কোনো স্তম্ভ ছাড়াই তিনি মহাকাশ স্থাপন করেছেন ঊর্ধ্বলোকে। নিজেকে করেছেন সর্বময় কর্তৃত্বের আরশে আসীন….।’
আজ ১লা জানুয়ারি। আক্ষরিক অর্থেই পৃথিবীতে আজ নতুন সময়ের সূচনা। সকল ইকুয়েশন মিলিয়ে তৈরীকৃত LABS দ্বারা নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে কাহানদের ২৩০০ নিউক্লিয়ার অস্ত্র, কোনো প্রকার বিস্ফোরণ ছাড়াই। আটককৃত কাহানদের বন্দী রাখা হয়েছে বিশেষ সেলে।
টাইমস স্কয়ারে আজ লাখো মানুষের সামনে সংবর্ধনা দেয়া হচ্ছে ছোটবেলায় ক্লাসের দুষ্টুদের ডাকা সেই মাথামোটা ছেলে তুহিনকে। আনন্দে কাঁদছেন তার বাবা-মা। চারিদিকে খুশির আমেজ। আজ তুহিনের হাত ধরে পৃথিবীবাসী পেয়েছে দ্বন্দ্বহীন যুদ্ধহীন শান্তিময় জীবন যাপনের অনুপ্রেরণা।
বেশ কিছুদিন পর। নিজ ঘরে কুরআন তেলাওয়াত শুনছে তুহিন। এমন সময় তার কাছে এলেন বিজ্ঞানী ড. রাশিদুল ইসলাম। কুশলাদির পর জিজ্ঞাসা করলেন তিনি, ‘আচ্ছা তুহিন, তুমি কোন মাধ্যম দিয়ে লেজারকে বন্দী করলে বলতো? তার খোঁজই বা কোথায় পেলে?’
চিরচেনা রহস্যের হাসি দিয়ে কম্পিউটারের দিকে তাকালো তুহিন। প্লেয়ারে বেজে চলেছে মহাগ্রন্থ আল কুরআনের সূরা ইয়াসিনের আয়াতগুলো। সেই আয়াত যেন ড. রাশিদের প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়ে দিচ্ছে ইঙ্গিতে ‘ইয়া-সিন, বিজ্ঞানময় কুরআনের শপথ’।

SHARE

Leave a Reply