Home গল্প রহস্যময় ঢিবি -মোস্তফা কামাল

রহস্যময় ঢিবি -মোস্তফা কামাল

বাড়ির পাশেই মাঠ। বর্ষাকালে আউশ ধানে ভরে উঠেছে সমস্ত মাঠ। আউশ ধান দেখে কৃষকের মুখে হাসি যেন ফুরাতেই চায় না। অগ্রহায়ণ মাসে যখন ধান কেটে কৃষকেরা বাড়িতে নিয়ে আসে তখন বাড়ির সকলের আর আনন্দের সীমা থাকে না। বাড়ি বাড়ি নবান্নের উৎসব পড়ে যায়। নতুন চালের পিঠা পায়েস ছাড়াও চিঁড়া, খই, মোয়াসহ নানান রকমের খাবার। হাতের কাজ শেষ না হতেই কৃষকদের শুরু হয়ে যায় শীতকালীন শাকসবজি চাষ। সামান্য চাষ করে সরিষা বুনে দেয় অনেক কৃষক।
কিছু দিন যেতে না যেতেই হলদে ফুলে আর রবি শস্যে ভরে ওঠে সমস্ত মাঠ। আর যখন গ্রীষ্ম আসে তখন এই জনপদে সমস্ত মাঠ, খাল-বিল শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। গরু মহিষের খাবারের জন্য সামান্য ঘাসও জন্মায় না। জন্মাবেই বা কী করে! সীমান্তের ওপার থেকে যে নদীগুলো বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে তার অধিকাংশ নদীতে পাশের দেশ বাঁধ দেওয়ায় গ্রীষ্মকালে এই অঞ্চলের আবাদি জমিতে সেচ দেওয়ার মত পানি থাকে না। তাই গ্রীষ্মের মৌসুমে যত দূর চোখ যায় ধু-ধু মাঠ ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না। দুঃসহ গরম, একটু বাতাসও বইছে না। গাছের ডালগুলো পাহাড়ের মত আকাশের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। একটুও নড়ন চড়ন নেই। সীমান্তের কোল ঘেঁষে তেঁতুলিয়ার বাংলাবান্ধা অবস্থিত। বাংলাবান্ধার ছাতিমপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আদিব আর আসিফ অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে। আদিব আসিফের বাড়ি পাশাপাশি হওয়ায় মধ্যরাত অবধি তারা একত্রে লেখাপড়া করে আদিবদের বৈঠক খানায়। আজ একটু বেশি গরম, তাই লেখাপড়ায় মন বসছে না। আদিব বলল, চল ঘুমাতে যাই। আসিফ তার কথায় সায় দিয়ে বারান্দায় বিছানা পেতে দু’জনে ঘুমিয়ে পড়ে।
রাত গভীর, চারিদিকে ঝিঁ ঝিঁ পোকা ডাকছে। দূর থেকে শেয়াল আর পোষা কুকুরগুলো ক্ষণে ক্ষণে ডেকেই চলেছে। আদিবের ঘুম ভেঙে গেল। পাশ ফিরে যখন ঘুমাতে যাবে এমন সময় বাইরে তাকিয়ে দেখে মাঠের পাশে সাদা পোশাকে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। তার সাথে একটি ছোট বাচ্চা। আদিব রফিক স্যারের কাছে শুনেছে ভূত বলে কিছু নেই। তারপরও আসিফকে ডেকে উঠালো, আসিফ ঘুম থেকে উঠে কিছুক্ষণ পর যখন ঘুমের রেশ কেটে গেল তখন বললো, কী হয়েছে, ডাকছিস কেন? আদিব সাদা পোশাক পরা লোকটিকে দেখালো। তখন আসিফ কী করবে কিছুই বুঝতে পারছিল না। আদিব বললো, চল আমরা লোকটির পিছু নেই। লোকটি কী করে দেখি। আসিব হ্যাঁ বলে টর্চ লাইটটা নিয়ে দু’জনে লোকটির পিছু নিলো। আসিফ বললো, আমাদের কিছুটা দূরত্ব রেখে লোকটির পিছু নিতে হবে, যাতে লোকটি পেছনে তাকালে আমাদের দেখতে না পায়। আদিব হ্যাঁ সূচক উত্তর দিয়ে দু’জনে পাশাপাশি চলতে লাগলো। দুই পা যেতে না যেতেই লোকটি মাঠের দিকে চলতে শুরু করলো। সঙ্গে ছোট বাচ্চাটিও। হাঁটছে তো হাঁটছেই, থামার কোনো লক্ষণ নেই। গভীর রাত, চারিদিকে কোনো সাড়া শব্দ নেই। আকাশে তারাগুলো মিটি মিটি জ¦লছে। তারা গ্রাম থেকে বেশ দূরে মাঠের মধ্যস্থলে চলে এসেছে। লোকটি চলতে চলতে মাঠের মধ্যখানে একটি ঢিবি ছিল সেখানে গিয়ে থামলো। কিছুটা বিস্মিত হলো আদিব আর আসিফ। তারা আগেই শুনেছে, ঢিবিটা একটি ভয়ঙ্কর জায়গা। কে কখন এই ডিবিটা তৈরি করেছে তা কেউ বলতে পারে না। মাঠের মধ্যখানে হওয়ায় এখানে তেমন কেউ আসে না। গত দুই বছর আগে বদরুদ্দিন চাচার একটি গরু হারিয়ে গিয়েছিল। কোথাও পাওয়া যাচ্ছিল না। অবশেষে এখানে এসে পেয়েছিল। তার এক বছর আগে জহিরুদ্দিন চাচার গরুর রাখাল সোনা মিয়া এখান থেকে কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল তার কোনো হদিস কেউ বলতে পারে না। সকলে বলে ভূতে নাকি নিয়ে গেছে। এসব চিন্তা আদিব আর আসিফের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর যে লোকটির পিছু নিয়েছিল, দেখতে পেলো লোকটি আর তার সাথে থাকা বাচ্চাটি হাওয়ার সাথে মিশে গেছে। অবাক হয়ে দেখছে। কিন্তু কিছুতেই কিছু মিলাতে পারছে না। তাদের হাতে থাকা টর্চ লাইট দিয়ে চারদিকে ঘুরে ঘুরে দেখল কিন্তু তাদের কোনো হদিস পেলো না। অবশেষে তারা যখন গ্রামের দিকে পা বাড়াবে এমন সময় একটি ছোট বাচ্চার চিৎকার শুনতে পেল। পেছন ফিরে কোনো কিছু দেখতে পেল না। বিস্ময়ে দু’জন বাড়ি ফিরে এলো। বাড়ি ফিরে বাকি রাতটুকু তাদের আর ঘুম এলো না। ফজরের আজান হলো। দু’জনে অজু করে নামাজ পড়ে কুরআন তেলাওয়াত করে গত রাতের বিষয়টি নিয়ে রফিক স্যারের সাথে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিলো। যে কথা সেই কাজ। সকালে হাঁটতে হাঁটতে রফিক স্যারের বাড়িতে গিয়ে বিষয়টি বলল। রফিক স্যার সব কিছু শুনলেন, তারপর তিনজনে মিলে বিকেলে ঢিবিটির পাশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
আর আসিফ সকালের নাস্তা করে স্কুলে গেল। স্কুল শেষে বাড়ি এসে হাত মুখ ধুয়ে দুপুরের খাবার শেষে অঙ্কগুলো করে নিলো। বিকেল যখন ৪টা বাজে তারা দু’জনে রফিক স্যারের বাড়িতে গেল। রফিক স্যার বললেন, আমাদের এখন ঐ ঢিবিটার পাশে যেতে হবে যাতে কেউ বুঝতে না পারে। আধা ঘণ্টা হাঁটার পর তারা ঢিবিটার কাছে পৌঁছালো। তিনজনে ঢিবির চারপার্শ্বে খুঁটে খুঁটে দেখলো কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না। পাশে একটি বাবলা গাছে একটি শালিক পাখি আপন মনে ডাকছে। কিছুক্ষণ পর সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। দূর গ্রাম থেকে মাগরিবের নামাজের আজান ভেসে আসছে। তিনজনে অজু করে সবুজ ঘাসের ওপর নামাজ আদায় করে নিলেন। নামাজ শেষ করে আদিব বলল, ঐ দেখেন স্যার মাটির নিচ থেকে কিসের আলো বের হচ্ছে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তিনজন যেখান থেকে আলো বের হচ্ছে সেখানে গেলেন। তারা দেখতে পেলেন একটি ইঁদুরের গর্ত থেকে আলো বের হচ্ছে। আর ইঁদুরের গর্তের ঠিক বিপরীত পাশে চতুর্ভূজ আকৃতির একটি লোহার পাত দেখতে পেলেন, যা লতা-পাতা দিয়ে ঢাকা। তিনজনে সতর্কতার সাথে পাতটি কিছু অংশ ফাঁক করলেন এবং দেখলেন একটি সুড়ঙ্গপথ যা দিয়ে আলো বের হচ্ছে এবং তারা কিছু ছোট্ট বাচ্চার কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন। রফিক স্যার সঙ্গে সঙ্গে সুড়ঙ্গের মুখ বন্ধ করে দিলেন এবং আদিব ও আসিফকে বললেন, তোমরা দু’জন বাবলা গাছটির নিচে লুকিয়ে থাকো আর এখান থেকে যদি কেউ বের হয় তাদের কিছু না বলে বরং নিজেদের লুকিয়ে রাখবে। আমি গ্রামে যাবো আর আসবো। রফিক স্যার দৌড়াতে দৌড়াতে গ্রামের দিকে গেলেন। কিছুক্ষণ পর পাঁচজন করে পনের জন লোক তাদের দিকে আসতে দেখলো সাথে রফিক স্যারও। সবার হাতে লাঠি আর ছুরি। কিছুক্ষণ পর রফিক স্যারের নেতৃত্বে সুড়ঙ্গের ভেতর প্রবেশ করলেন। ভেতরে প্রবেশ করে দেখতে পেলেন বেশ বড়সড় একটা কুঠুরি। কুঠুরির মেঝেতে আটটি বাচ্চা পিঠমোড়া দিয়ে বাঁধা। সকলে কাঁদছে। আর দু’জন লোক চেয়ারে বসে আছে। সামনে টেবিল, টেবিলের ওপর পিস্তল আর বোতল ভর্তি মদ। রফিক স্যার দু’টি দলে বিভক্ত হয়ে লোক দুটির পেছন থেকে আস্তে আস্তে গিয়ে কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাদের ধরে ফেললেন। আদিব আর আসিফ দলের সাথেই ছিল। তারা তাড়াতাড়ি গিয়ে বাচ্চাগুলোর হাতের বাঁধন খুলে দিলো। আসিফ আর আদিব দেখল গত রাতে যে বাচ্চাটি সাদা পোশাক পরা লোকটির সাথে ছিল সে বাচ্চাটিও আছে। বাচ্চাগুলো কান্না থামিয়ে বলল, ঐ যে দেখেন একটা সুড়ঙ্গপথ, ঐ পথ দিয়ে চুল লম্বা কিছু লোক আসে। তাদের কথা আমরা বুঝতে পারি না। রফিক স্যার আর আসিফ সুড়ঙ্গপথে গিয়ে দেখলেন পথটি সীমান্তের ওপারে গিয়ে উঠেছে। সবাই মিলে লোক দু’টিকে পিঠমোড়া দিয়ে বেঁধে গ্রামে নিয়ে আসেন। কেউ কেউ লোক দু’টিকে বেদম প্রহার করতে লাগল। তারপর রফিক স্যারের কথায় মার বন্ধ করে গাছের সাথে বেঁধে রাখলো।
ঘটনা ক্রমশই রহস্যময় হয়ে ওঠে। সারা গ্রামজুড়ে রইরই আওয়াজ। কী আজব ঘটনা আট আটটি বাচ্চা। গ্রামের অর্ধেক মানুষ জড়ো হলো রফিক স্যারের উঠানে। সবার নজর লোক দু’টির ওপর। তবে আটটি বাচ্চার কেউ-ই আশপাশের গ্রামের নয়। লোকজনের কানাকানি বেড়েই চলল। হঠাৎ বন্দুকহাতে কয়েকজন লোক উঠানে এসে দাঁড়ালো। ভয়ে কেঁপে উঠলো আটক দু’জন। সকলের বিস্মিত চেহারা! কী হতে চলেছে…। নীরবতা ভেঙে গ্রামের স্কুলের প্রধান শিক্ষক ফইম মিয়াই প্রথমে মুখ খুললেন। আসিফের কাছে এসব শোনার পর আমি আগেই পুলিশকে ইনফর্ম করে রেখেছিলাম। তখন গ্রামবাসী এই নিষ্পাপ শিশুদের পাচারকারীদের কঠিন বিচার চাইলো। পুলিশ তার কথার ইন্দ্রজালে আসামিদের কাছ থেকে সঠিক তথ্য বের করলো। তারা স্বীকার করলো বাচ্চাগুলোকে তারা পাঁচ মাস ধরে ঐখানে আটকে রাখে। সুড়ঙ্গপথে আজ রাতে ভারতে পাচার করত। এসব কথা শোনার পর পুলিশ আরও ক্ষেপে গেল। সব আসামিকে ধরার জন্য সেখানে বিশেষ টিম পাঠালো। অতঃপর বাচ্চাগুলোকে তাদের পরিবারের কাছে পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে প্রধান শিক্ষক, রফিক স্যার ও আদিব আর আসিফকে ধন্যবাদ জানালো এবং তাদের এ কাজের পুরস্কার আছে জানিয়ে আসামি দু’জনকে গাড়িতে উঠিয়ে থানায় নিয়ে গেল। রাতের আকাশে ঢেকে থাকা চাঁদটা ধীরে ধীরে মেঘ কেটে ফকফকে আলোয় চারপাশ আলোকিত করে মুছে দিলো কালো অধ্যায়।

SHARE

Leave a Reply