Home বিজ্ঞান জগৎ বিস্ময়কর সৌরজগৎ -আহমদ বিন রফিক

বিস্ময়কর সৌরজগৎ -আহমদ বিন রফিক

এক সময় মানুষ মনে করত, পৃথিবীই মহাবিশ্বের কেন্দ্র। সূর্যসহ সব কিছু পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। পরে জানা গেল, সূর্য পৃথিবীকে নয় বরং পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। তবে তখনও অনেকেই মনে করত সূর্য নিজের জায়গায় স্থির বসে আছে। কিন্তু এখন আমরা জানি, সূর্য নিজেও আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। ভাবছো, তাহলে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি নিশ্চয়ই স্থির বসে আছে! না, তা নয়। মিল্কিওয়েসহ প্রায় ৫০টি গ্যালাক্সিকে একত্রে বলা হয় লোকাল গ্রুপ। এদের সবাই এদের সার্বিক কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করে চলছে। এটা আমরা এখন জানি। কিন্তু আল্লাহ আমাদেরকে আগেই কুরআনে জানিয়ে রেখেছিলেন, ‘সব কিছুই তার নিজ নিজ কক্ষপথে ঘুরছে।’ (সূরা ইয়াসিন : ৪০)
যাই হোক, আজকে তোমাদেরকে বলবো সৌরজগতের কিছু বিস্ময়কর কথা।
শনি গ্রহ ছাড়া অন্য কিছু গ্রহেরও
বলয় আছে
শনি নামটা শুনতে খারাপ লাগলেও গ্রহটি এর বলয়ের (Ring) কারণে সৌন্দর্যপিপাসুদের প্রিয়বস্তু। আর এ সৌন্দর্যের উৎস শনির (Saturn) বলয়। বলয়যুক্ত কোনো গ্রহ দেখলেই তোমরা চোখ বুজে বলে দিতে পারো, এটি নির্ঘাত শনি। কিন্তু সত্যি বলতে কি জানো, বলয় শনির একারই আছেÑ এমনটি কিন্তু নয়। অবশ্য এটা ঠিক যে শনির বলয়ই সবচেয়ে বড় এবং সহজে দৃশ্যমান। কিন্তু অন্তত আরো তিনটি গ্রহ- বৃহস্পতি (Jupiter), ইউরেনাস ও নেপচুনেরও বলয় আছে। তাও একটি দু’টি নয়, শনিসহ এদের সবার বলয়ের সংখ্যা একাধিক। শনির বলয়ের মূল উপাদান বরফের কণা হলেও বৃহস্পতির বলয়গুলোর মূল উপাদান ধূলিকণা। অবশ্য বৃহস্পতির বলয় বেশ অস্পষ্ট এবং একে দেখা সহজ কাজ নয়। এই বলয়ে বিভিন্ন উল্কা ও গ্রহাণুর টুকরোও থাকতে পারে। পাশাপাশি থাকতে পারে বৃহস্পতির উপগ্রহ আয়োর আগ্নেয়গিরি থেকে নিক্ষিপ্ত পদার্থ। কি অবাক লাগছে? পৃথিবীর বাইরেও আগ্নেয়গিরি আছে, আবার তাতে অগ্ন্যুৎপাতও হয় নাকি!
তবে ইউরেনাসের বলয়গুলো বৃহস্পতির চেয়ে বেশি স্পষ্ট। তবে শনির বলয়ের তুলনায় এরাও যথেষ্ট অনুজ্জ্বল। সম্ভবত ইউরেনাসের বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপগ্রহদের সংঘর্ষের ফলে এই বলয়দের সৃষ্টি হয়েছে। তবে নেপচুনের বলয়গুলো অনেকটা বৃহস্পতির বলয়দের মতোই অস্পষ্ট। বৃহস্পতি, ইউরেনাস ও নেপচুনের এ অনুজ্জ্বল বলয়দেরকে পৃথিবীকে থেকে সাধারণ ও ছোট্ট টেলিস্কোপ দিয়ে দেখা যায় না। ফলে শনিকেই বলয়ের রাজা বলা যেতে পারে।
সবচেয়ে উত্তপ্ত গ্রহ সূর্যের
সবচেয়ে নিকটে নয়
সূর্যের নিকটতম গ্রহ কোনটি? তুমি আমি সবাই জানি, এটি হচ্ছে বুধ গ্রহ। যদি বলি কোন গ্রহের তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি, এই প্রশ্নের উত্তরেও যদি বুধ বলো, তাহলে মস্ত বড় ভুল হয়ে যাবে। অবশ্য পৃথিবীর তুলনায় বুধ সূর্য থেকে প্রায় অর্ধেক দূরত্বে আছে বলে উত্তরে বুধ বলাটা খুব একটা অস্বাভাবিক মনে হয় না। কিন্তু আসলে তা নয়। সূর্য থেকে দ্বিতীয় গ্রহ শুক্র বুধ থেকেও প্রায় ৩ কোটি মাইল দূরে আছে। তাই এটি বুধের চেয়ে শীতল হবে মনে হলেও বাস্তবে শুক্রই সবচেয়ে উত্তপ্ত গ্রহ। এরকম কেন হলো জানো?
আচ্ছা বলছি। বুধের কোনো বায়ুমন্ডল নেই বললেই চলে। সূর্য থেকে আসা তাপ ধরে রাখার জন্য বায়ুমন্ডলে কিছু নির্দিষ্ট গ্যাসের উপস্থিতি আবশ্যক। নিশ্চয়ই জানো, পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইড বেড়ে যাচ্ছে আমাদের প্রিয় গ্রহটির তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। এর কারণ হলো, পৃথিবীতে আসা তাপ কার্বন ডাই অক্সাইডের কারণে পৃথিবীর ভেতরে আটকা পড়ে। একেই আমরা গ্রিন হাউজ প্রতিক্রিয়া বলি। আর শুক্র গ্রহের বায়ুমন্ডল পৃথিবীর তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ পুরু। উপরন্তু এর অধিকাংশই (৯২%) গঠিত কার্বন ডাই অক্সাইড দিয়ে। হয়ে গেল! সূর্য থেকে আসা তাপ খুব সহজে এই গ্যাস ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়লেও প্রতিফলিত হয়ে ফিরে যাবার সময় এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেশি থাকে বলে ফিরে যেতে ব্যর্থ হয়। ফলে বেড়ে যায় তাপমাত্রা।
সত্যি বলতে শুক্র গ্রহের গড় তাপমাত্রা ৪৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই তাপমাত্রায় টিন এবং সীসাও গলে যেতে বাধ্য। সে তুলনায় বুধ গ্রহের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা হলো ৪২৭ ডিগ্রি। তাও তা থাকে দিনের বেলায়। রাতে তাপমাত্রা নেমে আসে হিমাংকের ১৭৩ ডিগ্রির নিচে। এই ঘটনাটি হচ্ছে মরু অঞ্চলের মতো, যেখানে দিনের বেলায় তাপমাত্রা খুব বেশি থাকে, কিন্তু রাত নামলেই নেমে আসে ভয়াবহ ঠান্ডা। কিন্তু শুক্রের তাপমাত্রা খুব বেশি ওঠা-নামা করে না, সব সময় প্রায় একই থাকে।

পৃথিবীর মতো বায়ুমন্ডল আছে
শুধু টাইটানের
টাইটানিকের সাথে নামের মিল থাকলেও এই বস্তুটির বাস কিন্তু আকাশে। এটি শনি গ্রহের সবচেয়ে বড় উপগ্রহ। সাধারণত মনে করা হয়, সৌরজগতের আর কোথাও পৃথিবীর মতো বায়ুমন্ডল নেই। কিন্তু টাইটানের বায়ুমন্ডলের সাথে আমাদের বায়ুমন্ডলের উল্লেখযোগ্য মিল আছে। টাইটান আমাদের চাঁদের চেয়ে বড় এবং প্রায় বুধ গ্রহের সমান। এর বায়ুমন্ডল পৃথিবীর চেয়ে প্রায় ২০ গুণ ভারী। পৃথিবীর মতোই এর বায়ুমন্ডলের বেশির ভাগ জুড়ে রয়েছে নাইট্রোজেন। পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে নাইট্রোজেন আছে ৭৮%। টাইটানের বায়ুমন্ডলে অবশ্য নাইট্রোজেনের হার তুলনামূলক অনেক বেশি- প্রায় ৯৮%। আর আছে কিছু মিথেন ও হাইড্রোজেন।
একে পৃথিবীর মতো কেন বললাম তাহলে? একটু চিন্তা করো, বুধের তো বায়ুমন্ডল নেই বললেই চলে। আর মঙ্গল ও শুক্রের যাওবা আছে তা পৃথিবীর চেয়ে অনেক বেশি পুরু এবং বিষাক্ত কার্বন ডাই অক্সাইডে ভরপুর। শুক্র গ্রহের বায়ুমন্ডলে আবার আছে ভয়ানক গ্যাস সালফিউরিক এসিডও!
এ কারণে পৃথিবীর বাইরের প্রাণের অস্তিত্ব খোঁজার ক্ষেত্রে প্রথম দিকেই চলে আসে টাইটানের নাম। অবশ্য মিথেনের মতো জৈব অণু অজৈব উপায়েও তৈরি হতে পারে বলে এখানে প্রাণ- আছে এমন কথা নিশ্চিত করে বলার কোনো সুযোগ নেই।

আচ্ছা বলতো সূর্য আমাদেরকে আলো ও তাপ দিচ্ছে কিভাবে? এর উত্তরে অনেকেই বলবে সূর্যে আগুন জ্বলছে। রসায়নের ভাষায় কোনো কিছু জ্বালানো বা পোড়ানোকে বলা হয় দহন। আর দহন মানে হচ্ছে উত্তপ্ত অবস্থায় অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করা। মজার ব্যাপার হচ্ছে সূর্যের মধ্যে যদি এ ধরনের কাঠ ও কয়লা ইত্যাদির মতো দহন চলত, তবে কয়েক হাজার বছরেই সূর্যের জ্বালানি শেষ হয়ে যেত। অথচ সূর্য প্রায় চারশো কোটি বছর ধরে তাপ বিকিরণ করে যাচ্ছে এবং আরো প্রায় সমপরিমাণ সময় ধরে একই কাজ করে যাবে। তাহলে সূর্যে কী ঘটে নিশ্চয় জানতে ইচ্ছে করছে।
সূর্যেও এক ধরনের বিক্রিয়াই ঘটে। তবে সেটা রাসায়নিক বিক্রিয়া নয়। রাসায়নিক বিক্রিয়ায় বিভিন্ন পদার্থের মধ্যে বিনিময় হয় ইলেকট্রনের। এতে কোনো পদার্থ সৃষ্টি বা ধ্বংস হয় না। কিন্তু সূর্যে ঘটে নিউক্লিয়ার ফিউসান বিক্রিয়া। এতে অবিরাম হাইড্রোজেন থেকে হিলিয়াম প্রস্তুত হচ্ছে। এ ধরনের বিক্রিয়ার মাধ্যমেই বিপুল পরিমাণ তাপ উৎপন্ন হওয়া সম্ভব। আর এ কৌশল কাজে লাগিয়েই পৃথিবীতে তৈরি করা হয় বিধ্বংসী হাইড্রোজেন বোমা।

প্লুটোর সাইজ আমেরিকার চেয়ে ছোট
প্লুটো আগে সৌরজগতের নবম গ্রহ ছিল। কিন্তু এখন এটি আর গ্রহ নয়, বামন গ্রহ (Dwarf planet)। এর অন্যতম একটি কারণ গ্রহটির সাইজ অনেক ছোট। আবার গ্রহদের বাইরেও এর চেয়েও বেশি ভরের বস্তু রয়েছে। এটি হলো আরেকটি বামন গ্রহ এরিস। প্লুটোর ভর আমাদের চাঁদের চেয়েও ছোট।
আমেরিকার এক পাশ থেকে আরেক পাশে সর্বোচ্চ দূরত্ব প্রায় ২৯০০ মাইল। অথচ প্লুটোর ব্যাস মাত্র ১৪০০ মাইল, যা আমেরিকার অর্ধেকের চেয়েও কম। এমন বিভিন্ন কারণে প্লুটো গ্রহের মর্যাদা হারিয়ে ২০০৬ সালে বামন গ্রহে পরিণত হয়।

SHARE

Leave a Reply