Home তোমাদের গল্প স্বপ্নপূরণ -উম্মুল খাইর ফাতিমা

স্বপ্নপূরণ -উম্মুল খাইর ফাতিমা

রাহেলার মন আজ বেশ ফুরফুরে। তার একমাত্র ছেলে মাজিদ ডাক্তার হবে। মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় ভালো ফল করে সরকারি মেডিক্যালে চান্স পেয়েছে। তাই গর্বে তার বুক ফুলে যাচ্ছে।
রাহেলার এক ছেলে ও এক মেয়ে। একমাত্র ছেলে মাজিদ মেডিক্যালে চান্স পেয়েছে। আর মেয়ে মাঈশা ক্লাস সেভেনে পড়ে। অতীতের কথা চিন্তা করে রাহেলার চোখে পানি আসে। ছোটবেলায় রাহেলার স্বপ্ন ছিল উচ্চশিক্ষিত হয়ে নিজেকে দেশের সেবায় নিয়োজিত করবে। স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য সে গভীর মনোযোগ সহকারে রাতদিন কঠোর পরিশ্রম করতো। কিন্তু ক্লাস নাইনে পড়ার সময় তার দরিদ্র বাবা তাকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দেন। তাই বাধ্য হয়ে তার স্বপ্নকে মাটিচাপা দিতে হয়। বিয়ের দুই বছর পর রাহেলার কোলজুড়ে ফুটফুটে শিশু মাজিদ এলে রাহেলা নিজের অবাস্তবায়িত স্বপ্ন ছেলের মাধ্যমে বাস্তবায়নের আশা করেন। মাজিদের বয়স যখন ছয়, রাহেলা তাকে স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। শুরু হয় তার স্বপ্নপূরণের প্রথম ধাপ। মাজিদও খুব মেধাবী। সে তার মায়ের স্বপ্নপূরণে বদ্ধপরিকর। সে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায়।
রাহেলার দিনমজুর স্বামী প্রথমদিকে মাজিদের পড়ালেখার ব্যাপারে অনাগ্রহী হলেও ছেলের ভালো ফলাফল দেখে খুশি হয়ে সারাদিন খেটে দুই বেলা দুই মুঠো খেয়ে না-খেয়ে ছেলের পড়ালেখার খরচ চালাতেন। শত অভাবের মধ্যেও তিনি ছেলেকে কোনো কাজ করতে দিতেন না। কিন্তু হঠাৎ একদিন মাজিদের বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন। ডাক্তার জানান, তার বাবার ব্লাড ক্যান্সার হয়েছে। চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা দরকার। রাহেলার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। তিনি এত টাকা কোথায় পাবেন? কার কাছে যাবেন? কিভাবে তার স্বামীকে সুস্থ করে তুলবেন? পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী আজ অসুস্থ। এখন কে উপার্জন করবে? তবে কি তার স্বপ্নপূরণ হবে না? মাজিদের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যাবে? নাহ! রাহেলা তা কিছুতেই হতে দিতে পারেন না। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে করেই হোক তার ছোটবেলার অবাস্তবায়িত স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবেনই। তাই রাহেলা মেয়ে মাঈশাকে নিয়ে চরপাড়ায় মাছ শুকানোর কাজে নেমে পড়েন। সেখান থেকে যা ইনকাম হয় তা দিয়ে স্বামীর চিকিৎসা এবং সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। মাজিদও পড়ালেখার ফাঁকে সময় পেলে সাগরে মাছের পোনা ধরে তা বিক্রি করে পরিবারে কিছুটা অর্থ জোগানোর চেষ্টা করে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে মাজিদের বাবা একসময় পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরপারে পাড়ি জমান। রাহেলার পরিবারে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। রাহেলা প্রাণপ্রিয় স্বামীকে হারিয়ে দিশেহারা প্রায়।
এত কিছুর পরও রাহেলা তার অবাস্তবায়িত স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার জন্য বদ্ধপরিকর। মা-মেয়ে দু’জনই মাছ শুকানোর কাজ করে মাজিদের পড়ালেখার খরচ জোগান। মাজিদও অক্লান্ত পরিশ্রম করে SSC & HSC তে GPA ৫ পায়। এরপর মেডিক্যালে ভর্তি হওয়ার জন্য রাতদিন পড়ালেখা করে। অবশেষে ভর্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। তার এলাকার মেডিক্যাল পড়ুয়া বড়ভাই আবরার তাকে ভর্তি পরীক্ষায় প্রস্তুতির জন্য হেল্প করে। আজকে মেডিক্যালে চান্স পাওয়ার খবরটাও আবরার জানিয়েছে। আবরার মাজিদকে সবাইকে মিষ্টিমুখ করানোর কথা বলতেই মাজিদ বিব্রতবোধ করে। আবরার ভাইকে সে কিভাবে বলবে যে, তার পকেটে একটা কানাকড়িও নেই। সকাল থেকে সবাই না খেয়ে আছে। তার খুব ইচ্ছে হচ্ছে তার মাকে মিষ্টিমুখ করাতে। কিন্তু তার তো সাধ থাকলেও সাধ্য নেই। বুদ্ধিমান আবরার মাজিদের মনের অবস্থা বুঝতে পেরে মাজিদের হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে মিষ্টি কিনতে পাঠায়।
রাহেলা ছেলের সাফল্যে গর্বিত হয়ে আনন্দের আতিশয্যে অশ্রুসিক্ত হয়েছেন। তার ছোটবেলার অপূর্ণ স্বপ্ন ছেলের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হতে দেখে অভিভূত হচ্ছেন আর ভাবছেন, তার ছেলেটা অনেক বড় ডাক্তার হয়ে দেশ ও মানবতার সেবায় আত্মনিয়োগ করবে। তার স্বামীর মতো আর কাউকে চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুবরণ করতে হবে না। এসব ভাবতে ভাবতেই আনমনা হয়ে পড়েছিলেন।

SHARE

Leave a Reply