Home নিয়মিত মুসলিম উম্মাহর প্রাণকেন্দ্র সৌদি আরব -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

মুসলিম উম্মাহর প্রাণকেন্দ্র সৌদি আরব -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

সৌদি আরব পশ্চিম এশিয়ার একটি আরব রাষ্ট্র। সরকারি নাম আরবিতে আল-মামলাকাহ আল-আরাবিয়া আল-সউদিয়াহ এবং ইংরেজিতে কিংডম অব সৌদি অ্যারাবিয়া (কেএসএ)। আরব উপদ্বীপের একটি বড় অংশ নিয়ে সৌদি আরব গঠিত। সৌদি আরবের আয়তন প্রায় ২১ লাখ ৫০ হাজার বর্গকিলোমিটার (৮ লাখ ৩০ হাজার বর্গমাইল)। মোট জনসংখ্যা ২ কোটি ৮৭ লাখ। এদের মধ্যে দুই কোটি সৌদি নাগরিক এবং ৮৭ লাখ বিদেশী। সৌদি আরব ভৌগোলিকভাবে এশিয়ার পঞ্চম বৃহত্তম রাষ্ট্র এবং আরব বিশ্বে আলজেরিয়ার পর দ্বিতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র। সৌদি আরবের সীমান্তে রয়েছে উত্তরে জর্দান ও ইরাক, উত্তর-পূর্বে কুয়েত, পূর্বে কাতার, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত, দক্ষিণ-পূর্বে ওমান এবং দক্ষিণে ইয়েমেন। সৌদি আরব আকাবা উপসাগরের মাধ্যমে ইসরাইল ও মিসর থেকে পৃথক হয়ে আছে। সৌদি আরব হচ্ছে একমাত্র দেশ যার লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগর উভয়ের সাথে উপকূল রয়েছে। এ দেশের ভূমির বেশির ভাগ ঊষর অবসবাসযোগ্য মরুভূমি অথবা অনুর্বর ভূমিকাঠামো নিয়ে গঠিত।
সৌদি আরবের সংবিধান আল কুরআন এবং ইসলামী শরিয়া এ দেশের আইনের উৎস। ইউরোপীয় সা¤্রাজ্যবাদ থেকে যে চারটি মুসলিম দেশ রক্ষা পায় সৌদি আরব সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। সৌদি আরবের হেজাজ অঞ্চল এবং এর মক্কা ও মদিনা নগরী ইসলামের সূতিকাগার, হজের গন্তব্যস্থল এবং ইসলামের দু’টি পবিত্রতম স্থান। ইসলাম সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় ধর্ম। সৌদি আরব একমাত্র দেশ যেখানে হাইয়া বা মুতাউইন নামে ধর্মীয় পুলিশ আছে যারা ভালো কাজের আদেশ দেয় এবং মন্দ কাজ নিষেধ করে।
আধুনিককালের সৌদি আরবের এলাকা অতীতে চারটি পৃথক অঞ্চলে বিভক্ত ছিল সেগুলো হলো হেজাজ, নাজদ, পূর্বাঞ্চলীয় আরবের একাংশ (আল-আহসা) এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় আরবের একাংশ (আ’সির)। ইবনে সউদ ১৯৩২ সালে সৌদি আরব রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ১৯০২ সালে শুরু করে রিয়াদ দখলের পাশাপাশি ধারাবাহিক বিজয়ের মাধ্যমে এই চারটি অঞ্চলকে একটি একক রাষ্ট্রে একীভূত করেন। উল্লেখ্য, রিয়াদ সউদ পরিবারের পৈতৃক আবাসভূমি। সেই থেকে সৌদি আরবে ইসলামী ধারার পাশাপাশি নিরঙ্কুশ রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। সৌদি আরবকে কখনও কখনও দুই পবিত্রতম মসজিদের (মক্কায় আল-মসজিদ আল-হারাম এবং মদিনায় আল-মসজিদ আন-নববী) দেশ বা হারামাইনের দেশ বলা হয়। উল্লেখ্য, এই মসজিদ দু’টি ইসলামের সবচেয়ে পবিত্রতম দু’টি স্থান।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ। বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধান বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ। যুবরাজ মুহাম্মদ বিন নায়েফ। এ দেশে কোনো রাজনৈতিক দল নেই এবং দলীয় ভিত্তিতে কোনো জাতীয় নির্বাচনও হয় না। সৌদি আরবের প্রশাসনিক এলাকা ১৩টি অঞ্চলে (মানাতিক ইদারিয়াহ) বিভক্ত। সেগুলো হলো- আল-জাউফ (রাজধানী সাকাকা), উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত অঞ্চল (আরার), তাবুক (তাবুক), হাইল (হাইল), আল-মদিনা (মদিনা), আল-কাসিম (বুরাইদা), মক্কাহ (মক্কা), আল-রিয়াদ (রিয়াদ), পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ (দাম্মাম), আল বাহাহ (আল বাহাহ), আসির (আবহা), জিজান (জিজান) ও নাজরান (নাজরান)।
সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে পেট্রোলিয়াম আবিষ্কৃত হয় এবং এরপর আরো কিছু খনিজদ্রব্য পাওয়া যায়। সেই থেকে সৌদি আরব বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী ও রফতানিকারক হিসেবে আছে। গ্যাস মজুদের দিক দিয়ে বিশ্বে সৌদি আরবের অবস্থান ষষ্ঠ বৃহত্তম। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী সৌদি আরবের উচ্চ আয়ের অর্থনীতি রয়েছে এবং এ দেশের মানব উন্নয়ন সূচকও বেশ উঁচু। সৌদি আরব হচ্ছে একমাত্র আরব দেশ যেটি প্রধান অর্থনৈতিক জোট জি-২০ এর সদস্য। সৌদি আরব জিসিসি ছাড়াও ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা ও ওপেকের সক্রিয় সদস্য। এ দেশের মুদ্রার নাম সৌদি রিয়াল।
আরব উপদ্বীপ বিশ্বের বৃহত্তম উপদ্বীপ। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানের সাথে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্ত চিহ্নিত না থাকায় দেশটির প্রকৃত আকার অসংজ্ঞায়িত রয়ে গেছে। এই উপদ্বীপের ৮০ শতাংশজুড়ে সৌদি আরব অবস্থিত। সৌদি আরব বিশ্বের ১৩তম বৃহত্তম রাষ্ট্র এবং অ্যারাবিয়ান প্লেইটে বৃহত্তম। সৌদি আরবের ভৌগোলিক অবস্থায় আরব মরুভূমি, সংযুক্ত আধা-মরুভূমি ও গুল্মাচ্ছাদিত ভূমির প্রাধান্য রয়েছে। সৌদি আরব কার্যত বেশ কয়েকটি সংযুক্ত মরুভূমির সমন্বয়ে গঠিত এবং এ দেশের দক্ষিণ অংশে রয়েছে ৬ লাখ ৪৭ হাজার ৫শ’ বর্গকিলোমিটার (২ লাখ ৫০ হাজার বর্গমাইল) আয়তনের ‘রাব আল খালি’ বিশ্বের বৃহত্তম সংলগ্ন বালির মরুভূমি। দেশটিতে কার্যত কোন নদী বা হ্রদ নেই, তবে অসংখ্য ওয়াদি (অর্থাৎ বৃষ্টির সময় পানির ¯্রােত থাকে এবং অন্য সময় শুষ্ক থাকে এমন জলাশয়) এবং মরূদ্যান আছে।
ওয়াদি, অববাহিকা ও মরূদ্যানে পলি জমা হওয়া পাললিক এলাকায় কিছু উর্বর ভূমি দেখা যায়। সৌদি আরবের প্রধান ভূ-সংস্থানিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মধ্যাঞ্চলীয় মালভূমি লোহিত সাগর থেকে অপ্রত্যাশিতভাবে ওপরের দিকে উঠে গেছে এবং ক্রমান্বয়ে নেজদের অভ্যন্তরে এবং পারস্য উপসাগরের দিকে নেমে গেছে। লোহিত সাগরের উপকূলে তিহামাহ নামে পরিচিত একটি সঙ্কীর্ণ উপকূলীয় সমভূমি আছে, আর এর সমান্তরালে আছে একটি ক্রমোন্নত মনোরম ঢাল। দক্ষিণ-পশ্চিম প্রদেশ আসির পর্বতময় এবং এখানে আছে ৩ হাজার ১৩৩ মিটার (১০,২৭৯ ফুট) উঁচু মাউন্ট সাউদা যা সৌদি আরবের সর্বোচ্চ স্থান।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় আসির প্রদেশ ব্যতীত সৌদি আরবে মরু আবহাওয়া বিরাজ করে। মরু আবহাওয়ায় দিনের বেলায় তাপমাত্রা খুবই বেশি থাকে এবং রাতে তাপমাত্রা দ্রুত নেমে যায়। গ্রীষ্মকালে গড় তাপমাত্রা থাকে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, তবে কখনও কখনও তা ৫৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠে। শীতকালে তাপমাত্রা কদাচিৎ শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামে। বসন্ত ও শরৎকালে তাপমাত্রা নাতিশীতোষ্ণ থাকে, এ সময় গড় তাপমাত্রা থাকে ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বার্ষিক বৃষ্টিপাত খুবই কম। তবে আসির প্রদেশ এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। এখানে ভারত মহাসাগরের মওসুমি বায়ুর প্রভাবে অক্টোবর ও মার্চের মধ্যবর্তী সময়ে বৃষ্টিপাত হয়। এ সময় এখানে গড়ে ১২ ইঞ্চি বৃষ্টিপাত হয় যা বার্ষিক বৃষ্টিপাতের প্রায় ৬০ শতাংশ।
সৌদি আরবে বন্য প্রাণীর মধ্যে রয়েছে আরবীয় নেকড়ে, ডোরাকাটা হায়না, বেজি, বেবুন, খরগোশ, বালি ইঁদুর ও জারবোয়া ইঁদুর। বড় প্রাণীর মধ্যে রয়েছে গজলা হরিণ, অরিক্স ও লেপার্ড। পাখির মধ্যে রয়েছে ফ্যালকন, ঈগল, বাজপাখি, শকুন, স্যান্ডগ্রুজ ও বুলবুল। এ ছাড়াও আছে কয়েক প্রজাতির সাপ এবং অসংখ্য ধরনের টিকটিকি। পারস্য উপসাগরে আছে বিচিত্র ধরনের সামুদ্রিক প্রাণী। গৃহপালিত প্রাণীর মধ্যে রয়েছে উট, মেষ, ছাগল, গাধা ও মুরগি। মরু অবস্থার কারণে সৌদি আরবের উদ্ভিদ জগতের মধ্যে খুব কম পানির প্রয়োজন হয় এমন ঝোপ-ঝাড় ও লতাগুল্ম রয়েছে। দক্ষিণ আসিরে অল্প এলাকায় ঘাস ও গাছ রয়েছে। তবে দেশটিতে খেজুর গাছ আছে ব্যাপক ও বিস্তৃতভাবে।

SHARE

Leave a Reply