Home ধারাবাহিক: দুর্গম পথের যাত্রি দুর্গম পথের যাত্রী -আসাদ বিন হাফিজ

দুর্গম পথের যাত্রী -আসাদ বিন হাফিজ

গত সংখ্যার পর

ঘরের ভেতর কথা হচ্ছিল। ঘরের সবাই শুনছিল আগন্তুক ও বুড়োর কথোপকথন। বুড়োর ছেলের বউ কথা বললো এবার। মধ্যবয়সী এই মহিলা বলল, ‘আমার উটনী দেখো। মদিনায় এমন চমৎকার উটনী কারো নেই। যেমন নাদুসনুদুস তেমনি দ্রত সে ছুটতে পারে। তোমরা কি মনে করো আমি এই দায়িত্ব পালন করতে পারবো?’
বুড়োর এই বউটি চালাক চতুর এবং কর্মঠ। সে চাইলে এই দায়িত্ব পালন করতে পারবে। কিন্তু এমন একটি কঠিন কাজ তাকে দেয়া কি ঠিক হবে? বুড়ো মনে মনে এসব ভাবছিল আর তাকিয়ে দেখছিল ছেলের বউকে। আগন্তুক বললো, ‘তুমি ঠিক পারবে। পারতে যে তোমাকে হবেই। প্রভু হয়তো এই দিনটির জন্যই তোমাকে বাছাই করে রেখেছিল।’
সে তার পকেট থেকে একটি চিঠি বের করলো। বললো, ‘নাও, এই চিঠিটি তুমি তোমার চুলের ভেতর লুকিয়ে রাখবে। মক্কা গিয়ে সোজা আবু সুফিয়ানের বাড়িতে উঠবে। তারপর এই চিঠি তার হাতে দেবে। খবরদার, তাকে ছাড়া আর কারো হাতে যেন এ চিঠি না পড়ে।’
‘তুমি কোন চিন্তা করবে না। এ চিঠি আমি ঠিক তার হাতেই দেবো। আমার অনুপস্থিতি মদিনার কারো নজরেই পড়বে না। সবাই জানে আমি ও আমার ছেলে এই উট ও বকরিগুলো মদিনার বাইরে মাঠে চরাতে নিয়ে যাই। আমি উট নিয়ে বাইরে গেলে কেউ কিছু মনে করবে না। এরপর আমি উট নিয়ে মক্কার পথ ধরবো আর আমার ছেলে বকরিগুলো নিয়ে বাড়ি ফিরবে। আমি যে ফিরিনি এটা খেয়াল করার জন্য কেউ এখানে বসে নেই।’
‘হ্যাঁ, তাই যাও। ভাল কথা, তোমাকে বলে রাখি, তোমার কাজের অর্ধেক মূল্য এখানে আছে। বাকি অর্ধেক পাবে কাজ সমাধা করে ফিরে এলে।’
মহিলাটি চিঠি মাথার চুলে গুঁজতে গুঁজতে বললো, ‘দাও। তোমার পুরস্কারের থলিটি আমাকে দাও। আমি কাজ শেষে ফিরে এলেই বাকি অর্ধেক দিও। আর যদি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমি মারা যাই, আর কোনদিন আমি ফিরে আসতে না পারি তবে বাকি টাকা তুমি আমার অসুস্থ স্বামীর হাতে তুলে দেবে। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, তুমি যে দায়িত্ব আমাকে দিলে আমি তা সুচারুরূপেই পালন করবো। অচিরেই তুমি শুনতে পাবে, যে পরিমাণ মুসলমান মদিনা থেকে বের হয়েছে মক্কা পৌঁছার আগেই তার অর্ধেক নিঃশেষ হয়ে গেছে। তারা মদিনা ফিরে আসবে ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে। তাদের মুখ থাকবে মাটির দিকে আর মুখে থাকবে ব্যর্থতা, ক্লান্তি ও হতাশার ছাপ।’
আগন্তুক ইহুদি বললো, ‘যতটা সম্ভব দ্রুত পথ চলবে। যে কোন ইহুদি বসতি হবে তোমার নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র। তুমি ফিরে না আসা পর্যন্ত আমরা তোমার পথের দিকে তাকিয়ে থাকবো।’
বুড়ো, তার অসুস্থ স্বামী এবং আগন্তুকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মহিলা তার উটনী নিয়ে পথে নামলো।
এই মহিলার নাম কোনো ঐতিহাসিক উল্লেখ করেননি। তারা উট ও বকরি চরাতে মাঠে নিয়ে যাচ্ছিল। কেউ যদি তাদের লক্ষ্য করতো তবে দেখতে পেতো, উটগুলোর পিঠ খালি কিন্তু উটনীর পিঠে সওয়ারি বহন করার গদি বাঁধা ছিল। গলায় মশকভরা পানি এবং একটা বড়সড় খাবারের থলিও ছিল। মহিলাটি পশুর পাল নিয়ে মদিনার বাইরে চলে এলো।
মহিলা বাড়ি থেকে বেরিয়েছে অনেকক্ষণ হয়ে গেল। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। আগন্তুক বাড়ির ছোট বউকে বললো, ‘যাও, সে এতক্ষণে নিশ্চয়ই অনেক দূর চলে গেছে। তুমি গিয়ে ছেলের সাথে হাত মিলিয়ে উট ও বকরিগুলো নিয়ে এসো।’
ছোট বউ বলল, আমার কাজ আছে। তুমি জারিয়াকে বলো মাঠে যেতে। আগন্তুক জারিয়াকে বলতেই সে হাতে পশু চরানোর একটি লাঠি নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। বাড়িটা চোখের আড়াল হতেই সে নির্দিষ্ট মাঠের দিকে না গিয়ে শহরের এক গলিপথে ঢুকে গেল। হাঁটতে হাঁটতে সে এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল, যেন কাউকে খুঁজছে। একসময় সে শহরের শেষ মাথায় চলে এলো। সেখানে এক বিশাল মাঠ। মাঠে মুসলমানদের যুদ্ধ প্রশিক্ষণ চলছে। একদিকে নেজাবাজি ও তলোয়ারের ঝনন ঝনন চলছিল, অন্যদিকে চলছিল উটের দৌড়। লোকজন ভিড় করে খেলা দেখছিল।
যুবতী নির্দিষ্ট কাউকে খুঁজছিল। ভিড়ের মধ্যে খুঁজে ফিরছিল তার কাঙ্খিত জনকে। এতক্ষণ খোঁজার পরও তাকে না পাওয়ায় যুবতীর চেহারায় উৎকণ্ঠা দেখা দিল। সে তার হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল আর মাঠের চারদিকে চক্কর দিতে লাগলো। এক যুবক জটলার মধ্যে বসে বসে খেলা দেখছিল, হঠাৎ তার চোখ পড়লো মেয়েটির ওপর। যুবক উঠে দাঁড়াল এবং কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে বেরিয়ে এলো জটলা থেকে। সে মেয়েটির কাছে গেল এবং নিচুস্বরে ডাকলো, জারিয়া! যুবতী চমকে পেছনে তাকিয়ে যুবককে দেখতে পেল। সে হাঁটার গতি কমিয়ে দিল এবং ছেলেটিকে আরো কাছে আসতে দিল। ছেলেটিকে দেখেই মেয়েটির উৎকণ্ঠা দূর হয়ে গিয়েছিল। ছেলেটিকে সে বললো, চলো, কথা আছে। এখানে বলা যাবে না। যেখানে আমরা উট বকরি চরাই সেখানে চলে এসো।
মেয়েটি এ কথা বলেই একাকী হাঁটতে লাগলো। হাঁটতে হাঁটতে সে ওখানে চলে এলো যেখানে মেয়েটির উট চরে বেড়াচ্ছিল। মেয়েটি পেছন ফিরে দেখলো ছেলেটির ছায়া পর্যন্ত নেই। আবারো উৎকণ্ঠায় পেয়ে বসলো মেয়েটিকে। সে খানিক পায়চারি করলো। উৎকণ্ঠা তার বেড়েই চলছিল। শেষে এক সময় দেখলো ছেলেটি আসছে। ছেলেটিকে আসতে দেখেই সে একটা উঁচুমত জায়গায় বসে পড়লো। উৎকণ্ঠা দূর হয়ে সেখানে স্বস্তি ফিরে এলো।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছিল। ছেলেটি কাছে আসতেই সে বলল, ‘ও আবিদ, তুমি এত দেরি করলে কেন? আমি তো অস্থির হয়ে পড়েছিলাম।’
‘আমি কি তোমাকে অস্থিরতা দূর করার ওষুধ বলে দেইনি? তুমি আমার ধর্মে এসে যাও, দেখবে তোমার সব অস্থিরতা চলে গেছে। তোমাকে কতবার বলেছি, তুমি যদি ইসলাম কবুল না করো তবে তোমাকে বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’ ছেলেটি মেয়েটির পাশে বসতে বসতে বললো, ‘জারিয়া, আবারও বলছি, তুমি মন ঠিক করো। আচ্ছা জারিয়া, বলতো, এভাবে লুকিয়ে পালিয়ে আর কতকাল আমরা দেখা করবো?’
‘আচ্ছা, সে কথা পরে হবে।’ জারিয়া বললো, ‘ আমার মনের ওপর এখন শত মণ বোঝা চেপে আছে। সেই বোঝার ভারে আমি মুষড়ে পড়েছি।’
‘কী বোঝা!’ আবিদ উদ্বেগের সাথে বলল।
‘মুসলমানরা মক্কা আক্রমণ করতে যাচ্ছে। তোমার ধর্মের দোহাই! তুমি যেয়ো না আবিদ। তোমার যদি কিছু ঘটে যায়, কসম খোদার, আমি বাঁচবো না।’
জারিয়ার কথা শুনে হাসল আবিদ। বলল, ‘তুমি ভেবো না জারিয়া। মক্কার লোকদের এমন মনের জোর নেই যে, তারা আমাদের মোকাবেলা করে। শোননি, আবু সুফিয়ান আমাদের নিবৃত্ত করতে এসে ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেছে? তবে তোমাকে একটা কথা বলি, আমাদের নবী যদি আমাকে আগুনে ঝাঁপ দিতে বলেন তবে আমি বিন্দুমাত্র ইতস্তত না করে সেই আগুনে ঝাঁপ দেবো। আগুনে ঝাঁপ দিলে আমি বাঁচবো না মরবো সে চিন্তা আমি একবারও করবো না।’
‘তুমি আগুনে ঝাঁপ দাও তাতে আমি আপত্তি করছি না, কিন্তু আমার অনুরোধ, তুমি এ অভিযানে শরিক হবে না।’
‘তোমাকে তো বলেছি, আমাদের মোকাবেলা করার মত মনের  জোর মক্কার লোকদের নেই। তুমি আমাদের পরিকল্পনা জানো না, আমরা এমন অতর্কিতে তাদের ওপর আক্রমণ করবো যে, তাদের ঘাড়ের ওপর তলোয়ার স্পর্শ করার আগে তারা এই আক্রমণ সম্পর্কে কিছুই জানতে পারবে না। তুমি তোমার মনের বোঝা হালকা করো।’
‘না, আবিদ, না। এত সহজ হবে না।’ জারিয়া  বলল, ‘তুমি যেমনটি ভাবছো তেমনটি কখনোই হবে না। মক্কার লোকেরা সবাই তোমাদের জন্য প্রস্তুত হয়ে বসে থাকবে। এমনকি মক্কা পৌঁছার আগেই তোমরা আক্রান্ত হতে পারো।’
‘এ কথা কেন বলছো তুমি?’ আবিদ আশ্চর্য হয়ে বললো, ‘তোমার কেন ধারণা হলো মুসলমানরা পথেই আক্রান্ত হবে?’
‘কারণ আগামীকালের মধ্যেই আবু সুফিয়ান জেনে যাবে, তোমরা মক্কা আক্রমণ করতে যাচ্ছো। মদিনা থেকে মক্কা যাওয়ার যে পথ, সে পথের দু’পাশে কোরাইশদের যেসব বন্ধু সম্প্রদায় আছে তারাও জেনে যাবে এ খবর।’
আবিদের পঞ্চইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠলো। সে বললো, ‘বলছো কি তুমি জারিয়া! আবু সুফিয়ান কী করে জানবে আমরা তাদের আক্রমণ করতে যাচ্ছি? কে তাদের জানাবে এ সংবাদ?’
‘জানাবে, কেউ না কেউ তো জানাবেই। তুমি কি করে ভাবলে এতবড় অভিযানের খবর গোপন থাকবে?’
‘না জারিয়া। এটা হেঁয়ালির বিষয় নয়। আমার মন বলছে, তুমি আমার কাছে কিছু গোপন করছো। কে আবু সুফিয়ানকে সতর্ক করবে সেটা তুমি জানো। আমাকে সব খুলে বলো, নইলে বিপদে পড়ে যাবো আমরা।’
জারিয়া মাথা নিচু করে খানিক ভাবলো। এরপর বললো, ‘এ খবর আবু সুফিয়ানকে দেবে এক ইহুদি।’
‘এখানে তো তোমরা ছাড়া আর কোনো ইহুদি নেই। তাহলে কেমন করে অন্য ইহুদি এ খবর পাবে?’
‘আবিদ।’ ধরা গলায় বলল জারিয়া, ‘অন্য ইহুদি নয়, এ খবর আবু সুফিয়ানকে পৌঁছাবে আমার বড় ভাইয়ের বউ, আমার ভাবী।’
সন্ধ্যার সেই গোধূলিলগ্নে হঠাৎই যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত হলো। দু’জনই নির্বাক, নিথর হয়ে গেল। কেউ কোনো কথা বলছে না। আবিদ এতটাই অবাক হয়েছে যে, সে যেন বাকহারা হয়ে গেছে। আর জারিয়ার যা বলার তা তো সে বলেই ফেলেছে। বেশ কিছু সময় এই নীরবতার মধ্যে কেটে গেল। জারিয়া আবিদের বাহু ধরে বলল, ‘আবিদ, আমি তোমাকে এমন গোপন তথ্য দিয়েছি, যা তুমি কখনো কল্পনাও করোনি। এক ইহুদি কন্যা হিসেবে এ কথা কারো কাছে প্রকাশ করা ঘোরতর অন্যায় জেনেও আমি তা বলতে বাধ্য হয়েছি। কারণ আমার পিতামাতা, ভাই-ভাবী, আমার পরিবারের চেয়েও আমার ভালোবাসা আমার কাছে দামি। আমার সেই ভালোবাসার দোহাই, তুমি এ অভিযানে যাবে না। তুমি জানো না তাদের পরিকল্পনা। পথে প্রতি রাতে তোমাদের ওপর চোরাগুপ্তা হামলা চালানো হবে। মক্কা পৌঁছার আগেই তোমাদের বাহিনীর বহু লোক মারা পড়বে। অবশিষ্ট যারা থাকবে তাদের মোকাবেলা করতে হবে সম্পূর্ণ প্রস্তুত একটি বাহিনীর সাথে। ফলে খুব কম লোকই তোমাদের মদিনায় ফিরে আসতে পারবে। ভাগ্যগুণে যারা বেঁচে যাবে তারাও থাকবে আহত, ক্লান্ত। সব খুলে না বললে তোমাকে ফেরানো যাবে না বলেই এসব বলতে হলো আমাকে। আবিদ, তাই বলছি, আমার কথা শোন, মক্কা যাওয়ার সঙ্কল্প ত্যাগ করো তুমি।’ জারিয়ার কণ্ঠে মিনতি ও অনুনয়।
আবিদ গভীর আগ্রহ নিয়ে শুনছিল জারিয়ার কথা। বলল, ‘তোমার ভাবী কখন রওনা হয়েছে? কিসে যাচ্ছে?’
জারিয়ার কাছ থেকে সব শুনলো আবিদ। তারপর এক ইহুদি যুবতীর চুলের ঘ্রাণ পেছনে ফেলে ছুটলো শহরের দিকে। জারিয়া বলল, ‘কি করছো আবিদ? কোথায় যাচ্ছো?’
আবিদ যেন এসব শুনতেই পেলো না। সে আগের মতই ছুটতে লাগলো। জারিয়া কিছু দূর তার পিছু পিছু ছুটে গেল। বলল, ‘আবিদ, থামো। আমার কথা শোন আবিদ। তুমি কি করতে চাচ্ছো?’
কিন্তু কে শোনে কার কথা? এসব ডাক আবিদের গতিকে বিন্দুমাত্র শ্লথ করতে পারলো না। একটু পরই সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে হারিয়ে গেল আবিদ। জারিয়া দৌড় থামিয়ে ধপাস করে মাটির ওপর বসে পড়লো। জারিয়ার মনে হলো সন্ধ্যার অন্ধকার নয়, তাকে গ্রাস করছে কেয়ামতের সীমাহীন অন্ধকার।    (চলবে)

SHARE

Leave a Reply