Home সাহসী মানুষের গল্প বিশ্ববিখ্যাত কুস্তিবীর গামার ভাষণ -আবদুল হালীম খাঁ

বিশ্ববিখ্যাত কুস্তিবীর গামার ভাষণ -আবদুল হালীম খাঁ

ইকবাল এবং গামা। ইকবাল কবি এবং দার্শনিক। আর গামা কুস্তিবীর। দু’জনই বিশ্ববিখ্যাত। দু’জনই পাশাপাশি বাস করেন। উভয়ের মধ্যে খুব বন্ধুত্ব। গভীর আন্তরিকতা। গামা পালোয়ান শরীর চর্চা করেন। ইকবাল কবি। তিনি কাব্য চর্চা করেন। উভয়ের চিন্তা ও কর্ম পৃথক হলেও মনের মিল খুব। দু’জনের মধ্যে তুইতোকারি ভাব। প্রায়ই দু’জনে একত্রে আড্ডা মারেন।
ইকবালের সাথে দেখা হলেই গামা তাঁর শারীরিক শক্তির মহড়া দেন। ইকবালের শরীরে এখানে ঘা মারেন। ওখানে খোঁচা মারেন। নানা রকম হাসি ঠাট্টা করেন। বন্ধুর হাসিঠাট্টা তো মন্দ না। ভালোই লাগে। ইকবালও জবাবে হাসিঠাট্টা করেন। কিন্তু খোঁচা মারাটা তাঁর এক রকম অসহ্য। তবু চুপ করে সহ্য করেন। হাজার হলেও বন্ধু তো। তাকে নারাজ করা যায় না।
তবে প্রতিশোধ নেয়ার ইচ্ছে করে রাখলেন ইকবাল। সময় হলে দেখা যাবে। একদিন হলো কি। এক পড়ন্ত বিকেলে গামা গিয়ে হাজির হলেন বন্ধু ইকবালের বাসায়। তাঁর ইচ্ছে বিকেলটা দু’জনে গল্প করে কাটাবেন। গামাকে দেখেই ইকবাল বললেন, ভালোই হলো দোস্ত। আমি তোমার কথাটা ভাবছিলাম মনে মনে।
গামা বললেন, দোস্ত, আমি একটা সভায় চলছি। চলো আমার সঙ্গে।
ওখানে আমার ভাষণ আছে।
গামা বললেন, তোমার ভাষণ অনেক শুনেছি। ওতে আমার কোনো লাভ নেই। তোমার ভাষণে পালোয়ান হবার কোনো কথা নেই। ইকবাল বললেন, আগে চলো না।
দু’জনে চললেন সভায়। সভামঞ্চে দু’জনকে পাশাপাশি বসতে দেয়া হলো। গামা পালোয়ানের বিশাল শরীর। শ্রোতাদের দৃষ্টি অই গামার দিকে। সভায় সকল বক্তার ভাষণ শেষে প্রধান অতিথির ভাষণ দেয়ার জন্য ইকবালকে আহবান করা হলো। ইকবাল ওঠে মাইকের কাছে গিয়ে সংক্ষেপে ভাষণ শেষ করে বললেন, ভাইসব, আপনারা আমার ভাষণ ইতঃপূর্বে শুনেছেন আজো শুনলেন। আমি আপনাদের কাছে এসে ধন্য হয়েছি। আজকে আমি একজন নতুন বক্তা সঙ্গে নিয়ে এসেছি। আপনারা যদি তাঁর ভাষণ শোনেন তবে আমি আরো ধন্য হবো। কী বলুন! আপনারা তাঁর ভাষণ শুনবেন?
শ্রোতারা সমস্বরে চিৎকার দিয়ে উঠলোÑহ্যাঁ হ্যাঁ, আমরা তাঁর ভাষণ শুনবো।
ইকবাল ঘোষণা করলেন মাইকেÑ এবার আমার দোস্ত গামা সাহেব ভাষণ দেবেন।
ঘোষণা শুনে তো গামার আক্কেল গুড়–ম। তিনি যেনো আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি ভেতরে ভেতরে ঘেমে উঠলেন। কী ভাষণ দেবেন তিনি? ভাষণ দেয়া তো দূরের কথা জীবনে তিনি কোনো দিন মঞ্চে গিয়েই বসেননি। কিভাবে বক্তৃতা দিতে হয় কিছুই তাঁর জানা নেই। গামা বলতে লাগলেন, না না, আমি ভাষণ দেবো না। না, না…
কে শোনে তাঁর কথা। শ্রোতারা সবাই বলতে লাগলো, আমরা গামা সাহেবের ভাষণ শুনবো।
গামার আপত্তি শ্রোতাদের কলকণ্ঠে তলিয়ে গেল।
ইকবাল মাইকে ঘোষণা করলেন আবার। দোস্ত গামা সাহেব, আপনি দয়া করে মাইকের সামনে আসুন। জনতা আপনার মূল্যবান ভাষণ শুনতে চাচ্ছে।
গামা মাইকের সামনে যেতে লজ্জা ও সঙ্কোচ বোধ করতে লাগলেন। কী বলবেন? কেমনে বলবেন? ওদিক থেকে আবার ইকবালের তাগাদা। দোস্ত গামা সাহেব, আসুন আসুন। সবাই আপনার কথা শুনতে চাচ্ছে।
কী আর করা! বারবার মাইকে ঘোষণা হচ্ছে। জনতার সামনে না যাওয়াটা তো অভদ্রতা। তাই বিশাল দেহের অধিকারী বীর পুরুষ গামা ভীরু পায়ে দুরু দুরু বুকে মাইকের সামনে গেলেন কোনো রকমে। ইকবাল বলতে লাগলেন, হ্যাঁ দোস্ত, তোমার ভাষণ চালিয়ে যাও।
ইতোমধ্যে মস্ত বড় কুস্তিবীর গামা ঘেমে নেয়ে একদম সারা। প্রায় বাকহারা অবস্থা। তাঁর কণ্ঠ শুকিয়ে গেল। বাক্য বের হতে চায় না। এক গ্লাস পানি খেতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু পানিটুকু চাওয়ার শক্তি যে তাঁর নেই। এবার গামা সাহেব রাজ্যের সব শক্তি কণ্ঠে এনে কোনো রকমে মিউ মিউ করে বলতে লাগলেনÑ
ভাই সকল, আপনারা শরীরের শক্তি বাড়ানোর জন্য হামেশা কুস্তি করবেন। আমি প্রতিদিন ভোরে ওঠে হাজার তিনেক বৈঠক দেয়ার পর গোছল করে সামান্য একটু নাস্তা করি। এই ধরুন : চারটা মুরগির বাচ্চা, গোটা ত্রিশেক মুরগির আণ্ডা, এতপোয়া বাদাম, আধপোয়া আখরোট, ঐ পরিমাণ কিশমিশ, গোটা দুই-তিন পরটা, আর অর্ধসের গরম ঘি এক চুমুকে পান করি।
দুপুর বিকেলের খানা ঐরূপ।……
এরপর গামার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেল। তিনি আরো কিছু বলার চেষ্টা করলেন বোঝা গেল। কথা বের হলো না। শেষে মাইকের সামনে থেকে সরে আসার সময় বললেন, ভাইসকল, আপনারা রুটি রুটি। যাদা করকে খাও……বলেই গামা কোনো রকমে ইকবালের পাশে বসে পড়লেন। রুমাল দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে বললেন, রোজ সকালে আমি এক হাজার বৈঠক দিই এক জররা পছিনা দেখা দেয় না। আর এই শ্বশুরের পুত কবি আমাকে কী মুশকিলে ফেলেছিল যে, পছিনায় আমার সমস্ত শরীর ভেসে গেছে।’
ইকবাল গামার কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন, আমাকে তো খুব খোঁচাতে পারো। এবার বোঝ ঠেলা। পেয়ারে দোস্ত, শরীরের শক্তি সব জায়গায় খাটে না। ও দিয়ে কুস্তি লড়া যায়। ভাষণ দেয়া যায় না।
ইকবালের কথা শুনে গামা হো হো করে মঞ্চ কাঁপিয়ে হেসে উঠলেন।

SHARE

Leave a Reply