Home উপন্যাস উজানগড়ের রাজা -জিয়াউল আহ্সান

উজানগড়ের রাজা -জিয়াউল আহ্সান

উজানগড়ের রাজা দুই পুত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলেন। তার অবর্তমানে রাজ্যের নিয়মানুযায়ী বড় পুত্র রাজা হবে। বড় পুত্রের অযোগ্যতায় ছোট পুত্র রাজ্য শাসন করবে। কিন্তু রাজপুত্রদের পড়ালেখায় মন নেই। সারাদিন যত্রতত্র বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়ায়। দু’জনই খামখেয়ালি, বাউন্ডুলে। প্রজাদের অনিষ্ট করে বেড়ায়। কাজীর কাছে প্রজাদের কেউ কেউ এ জন্য বিচারও দিয়েছে। নির্ভীক কাজী রাজার কাছে সমন পাঠিয়ে রাজপুত্রদের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা। পড়ালেখা না করলে যোগ্য উত্তরসূরি হওয়া যায় না। কিন্তু রাজাপুত্রদের বোঝানোর সাহস এবং সাধ্য কারো নেই। একমাত্র রাজার কাছেই তারা মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকে। একের পর এক ওস্তাদ পরিবর্তন করেও কোনো লাভ হয়নি। ওস্তাদ বিদ্বান হোক কি কঠোর, কেউই এদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না; রাজপুত্রদের লেখাপড়াও হয় না। সময়মতো ঘরে ফেরে না, খাওয়া-দাওয়াও করে না। রাজপুত্রদের দুধে-আলতা গায়ের রঙ মলিন হতে বসেছে।
রাজপুত্রদের বয়স কৈশোর পেরিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু এখনো তারা মক্তবের পাঠ শেষ করতে পারল না। রাজার পুত্র হিসেবে তাদের মক্তবে হাজিরা কিংবা কোনো ধরনের পরীক্ষায় অংশ না নিলেও চলে। কিন্তু এসব রাজার অপছন্দ। রাজপুত্রদের লেখাপড়ার ক্ষেত্রে তিনি সবসময় স¤্রাট আওরঙ্গজেবের কথা মনে করেন। রাজ পারিষদবর্গও রাজার এই মনোভাবের কথা জানে। এসব কারণেও রাজার আক্ষেপ এত বেশি। জনগণের কল্যাণের কথা চিন্তা করেই রাজপুত্রদের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজার উদ্বিগ্নতা কেবল বেড়েই চলে।
এদিকে আশপাশের রাজ্যে চরম অস্থিরতা। ব্রিটিশদের কিনে নেয়া কালিকট, সুতানটি গ্রাম এখন বড় বন্দর; তারা নাম দিয়েছে কলিকাতা। বাংলার নবাবের হুকুম অগ্রাহ্য করে সেখানে তারা ঘাঁটি বসিয়েছে। উন্নত অস্ত্র তাদের। ছোট ছোট কামান দিয়ে দুর্গ সাজিয়েছে। এদেশের অভাবী লোকজনকে টাকা দিয়ে সৈনিক বানিয়েছে। তাদের বেজায় বাড়াবাড়ি। দু’একদিন পর পর গায়ে পড়ে বাংলার সুলতানের সাথে ঝগড়া বাধায়। আবার সুলতানের সৈন্যদের মার খেয়ে মাথা নুইয়ে জঙ্গল আর নদী ঘেরা নিজেদের ঘাঁটিতে ফিরে যায়। অত্যন্ত দূরদর্শী রাজা বুঝতে পারেন, সাতসমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইংরেজরা এত দূর যখন আসতে পেরেছে, ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়া যাদের অভ্যাস, আজ হোক কাল হোক স্বার্থপর আর বিশ্বাসঘাতক পরিবেষ্টিত তেইশ বছর বয়সী তরুণ নবাবের পক্ষে তাদের বুদ্ধির সাথে পেরে ওঠা মুশকিল হবে।
উজানগড় বাংলা মুলুকের ভাটি অঞ্চলের করদরাজ্য। বাংলার নবাবকে বার্ষিক নির্দিষ্ট হারে কর দিয়ে থাকে। সুলতানের পরিবারে অন্তর্কলহ, দরবারে রাজন্যদের ষড়যন্ত্র ইত্যাদি কারণে বাংলা মুলুকের সর্বত্র আইন-শৃঙ্খলা প্রায় ভেঙে পড়েছে, চুরি ডাকাতি রাহাজানি, লুটতরাজ, খুনাখুনি বেড়েছে। কিন্তু উজানগড়ে এখনও শান্তি বজায় আছে। তাই আশপাশ রাজ্য হতে অত্যাচারে অতিষ্ঠ কিছু মানুষ এখানে এসে আশ্রয় গেড়েছে। রাজা কঠোর হস্তে শৃঙ্খলা বজায় রেখেছেন। তিনি ভালো করেই জানেন, শান্তি-শৃঙ্খলা না থাকলে রাজ্যের উন্নতি হয় না।
রাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজার মাথায় হাজারো চিন্তা। এর সাথে দুই পুত্রের এ ধরনের মনোভাবে রাজা গভীর চিন্তায় পড়ে যান। অনেক ভেবে তিনি ঠিক করলেন আবারো রাজপুত্রদের জন্য একজন যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দেবেন। কিন্তু রাজ্যে এ ঘোষণায় অনেক অযোগ্য লোকই নিজের বিদ্যা-বুদ্ধি জাহির করতে চাইবে। অতীতের অভিজ্ঞতায় তিনি জানেন, এতে অযথা সময় এবং শ্রম নষ্ট। তাই তিনি এবার ঘোষণা করলেন, যিনি ব্যর্থ হবেন অর্থাৎ রাজপুত্রদের লেখাপড়ায় মনোযোগী করাতে পারবেন না তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হবে। আর সফল হলে অনেক ধন-দৌলত এবং বংশপরম্পরায় ভোগদখল করার জন্য একটি জমিদারি লিখে দেবেন।
অনেক মানুষই লোভের কাছে মাথা নত করে। তাই নিজেদের যোগ্যতার বিচার না করে অনেকেই ভাগ্য যাচাই করতে রাজদরবারে এলেন। রাজা এদের ভেতর থেকে বেছে বেছে কিছুদিন পর পর একজন করে নিয়োগ দিতে থাকলেন। একজন ব্যর্থ হলে রাজা ঘোষণা দিয়ে পুনরায় আর একজনকে নিয়োগ দেন। যেহেতু ব্যর্থ হলে মৃত্যুদন্ড, তাই দন্ডপ্রাপ্ত বন্দীর সংখ্যাও ক্রমে বাড়তে লাগল। প্রথামতো শাস্তি অবিলম্বে কার্যকর হওয়ার কথা; কিন্তু রাজা তা করলেন না। রাজা নিজেই ছিলেন একজন ধার্মিক ও মানবপ্রেমী। তিনি জানেন শাস্তি দিলেই সমস্যার সমাধান হয় না। দীর্ঘমেয়াদি শাসনকার্যে শিক্ষিত লোকদের প্রয়োজনীয়তা তিনি বোঝেন। লেখাপড়া জানা এসব লোককে উদ্বুদ্ধ করে তাদের মেধা, অভিজ্ঞতা সঠিকভাবে কাজে লাগালে এবং তাদের কাজের যোগ্য মূল্য দিলে রাজ্যের অনেক উপকার হবে। কিন্তু রাজা বলে কথা। তিনি যা বলেন তাই আইন, অবশ্য পালনীয়। এই কারণে রাজা মৃত্যুদন্ড না দেয়ার কথা গোপন রাখলেন। জনসাধারণ জানলো তাদের মৃত্যুদন্ডের কথা। বাকিটুকু লোকচক্ষুর আড়ালে রয়ে গেল।
দিন দিন রাজার দুশ্চিন্তা বাড়ে, যোগ্য লোক কি তিনি পাবেন না? পিতা হিসেবে রাজপুত্রদের মানুষ করার দায়িত্ব তার। আবার রাজা হিসেবে ব্যর্থতা প্রজাসাধারণ ভালো চোখে দেখবে না। এ ছাড়াও তার মনে হলো, তিনি কি এতটাই অযোগ্য রাজা, যে তার রাজ্যে কোনো যোগ্য শিক্ষিত ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া ভার? রাজার দায়িত্ব মস্তো বড়ো। তাকে হতাশ হলে চলবে কেন? রাজা আবারো যোগ্য লোকের সন্ধানে উদ্যোগী হলেন। কিন্তু ততদিনে এ ব্যাপারে রাজ্যের উৎসাহী যতো লোক সবাই রাজার দৃঢ়তা, কঠোরতা সম্বন্ধে জেনে গেছে। তাই এবার আর কাউকে পাওয়া গেল না। দিনের পর দিন রাজা অপেক্ষা করতে লাগলেন একজন যোগ্য শিক্ষক খুঁজে পাওয়ার জন্য। রাজকার্য যথানিয়মে চলে। রাজ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা আগের মতোই অক্ষুন্ন রয়েছে। কিন্তু রাজার মনে শান্তি নেই। এভাবে আরও কয়েক মাস কেটে গেল। প্রজারাও ভুলতে বসেছে, রাজা রাজপুত্রদের জন্য একজন যোগ্য শিক্ষকের সন্ধান করছেন।
একদিন প্রথামতো রাজা দরবারে বসেছেন, রাজা নিত্যদিনের মতো পারিষদবর্গের কথা শুনছেন। রাজ্যের বিভিন্ন সমস্যা আলোচনা হচ্ছে, উপস্থিত জ্ঞানী-গুণীরা সমাধানের কথা বলে যাচ্ছেন, রাজা মনোযোগ দিয়ে শুনছেন, প্রয়োজনে দু-একটা কথা বলছেন। এ সময় প্রহরীদের একজন এসে বলল, এক ব্যক্তি রাজার সাক্ষাৎপ্রার্থী। প্রজাদের যে কোনো বিষয়ে রাজা অত্যন্ত সহানুভূতিশীল। তিনি তৎক্ষণাৎ আদেশ দিলেন তাকে নিয়ে আসার জন্য।
এক সৌম্য দর্শন, বুদ্ধিদীপ্ত চেহারার আগন্তুক এসে অভিবাদন জানালো। রাজা অভিবাদন গ্রহণ করলেন। তারপর জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন, বললেন, বলো তোমার জন্য আমি কি করতে পারি।
সেই সময় কোনো রাজা এভাবে কথা বলতেন না। আগন্তুক তা জানতো। অন্যদিকে রাজাও সচেতন ছিলেন, প্রজাসাধারণের প্রতি তার কি দায়িত্ব কর্তব্য আছে। আগন্তুক বললো, মহামান্য রাজা আপনার জিজ্ঞাসার ভেতরেই প্রশ্নের জবাব রয়ে গেছে। নিজেকে অত্যন্ত সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছে; আমি ঠিক জায়গায় এসে পৌঁছেছি।
লোকটি একটু থেমে আবার বললো, হে মহামান্য সুশাসক, আমি অনেক দূরের অন্য রাজ্য থেকে এসেছি। আপনার শাসনের সুনাম আমাদের সে রাজ্য অবধি ছড়িয়ে পড়েছে। এ পর্যন্ত বলে লোকটি থামলো।
পারিষদবর্গের চোখ-মুখ দেখে বোঝা যায়, কেউ কেউ আরও জানতে আগ্রহী। যুবকের কথা-বার্তা, বলার ধরন সবার মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। কিন্তু রাজা কথা না বললে কিংবা অনুমতি না দিলে সভাকক্ষে কেউ কথা বলতে পারে না। এটা সাধারণ নিয়ম।
রাজা বুঝলেন আগন্তুক যা বলছে, তা সব গতানুগতিক কথাবার্তা। আসল কথা এখনও দূরে। রাজা সময় নষ্ট করতে চাইলেন না। তিনি বললেন, যুবক তুমি কেন এসেছ?
যুবক বুঝলো, রাজা সম্বন্ধে সে যা শুনে এসেছে, তা অতিরঞ্জিত নয়। সে বলল, মহামান্য রাজা আমাকে রাজপুত্রদের শিক্ষক নিযুক্ত করুন।
রাজা এ ধরনের বিনীত এবং সহজ উত্তরে খুব খুশি হলেন। কিন্তু অবাক হলেন না। তাই স্বাভাবিকভাবেই পরখ করে নিতে চাইলেন। রাজা বললেন, তুমি সবকিছু জেনেশুনে এসেছ?
জি, আমি সব জেনেশুনে এসেছি।
এ পর্যন্ত কেউ রাজপুত্রদের পড়ালেখায় মনোযোগী করতে পারেনি। তুমি ব্যর্থ হলে তোমাকেও মৃত্যুদন্ড পেতে হবে। তোমার বয়স কম, তুমি কেন এই ঝুঁকি নিতে চাইছ?
যুবক সহজে হারার পাত্র নয়। সে জানে রাজা জ্ঞানী এবং বুদ্ধিমান। তাই সে তার নিজস্ব পথ ধরলো। হে মহামান্য রাজা আমি জেনেশুনে এই ঝুঁকি নিতে চাই। কারণ আমি জানি, আমি ব্যর্থ হবো না।
রাজা চমৎকৃত হলেন। যুবককে সত্যিই তার বুদ্ধিমান মনে হয়েছে। রাজা ভেবে দেখলেন, অতীতে এই যুবকের মতো সাহসী সহজ-সরল চটপটে কিন্তু বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর দেয়, এমন কাউকে তিনি পাননি। তাই রাজা তাকে রাজপুত্রদের গৃহশিক্ষক নিযুক্ত করলেন।
রাজকার্য শেষে দুপুরে অন্দরমহলে গিয়ে রাজা জানতে পারলেন, রাজপুত্ররা ঘোড়াশালে। রাজার ইচ্ছা রাজপুত্রদের নিয়ে মধ্যাহ্নভোজন করবেন। প্রায়ই তা হয়ে ওঠে না। রাজপুত্রদের নিয়ে আসতে তিনি কাউকে পাঠাতে পারতেন; কিন্তু তা না করে নিজেই বেরিয়ে পড়লেন। সহিস দু’ঘোড়ায় টানা গাড়ি নিয়ে ছুটল।
ঘোড়াশাল রাজমহল থেকে খুব একটা দূরে নয়। প্রাসাদের চারদিকে কয়েক মাইলজুড়ে সুউচ্চ প্রাকার। এটাই রাজ্যের রাজধানী। এখান থেকেই রাজ্যের সবকিছু পরিচালিত হয়। প্রাচীরের বাইরে তিন দিকে প্রশস্ত নদী, একদিকে গভীর জঙ্গল। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পথ। প্রাকৃতিক নিয়মে গড়ে ওঠা এই বনের যেনো শেষ নেই। এটারই নাম জঙ্গলগড়। অথচ রাজধানীতে ঢুকতে হলে এ পথেই আসতে হবে। এটাই একমাত্র পথ, যে পথ দিয়ে পদব্রজে নগরে ঢোকা যায়। কিন্তু সে পথেও হাজারো পাহারা। সুতরাং নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিñিদ্র।
সুউচ্চ প্রাকারের বাইরে স্থানে স্থানে বিচ্ছিন্ন জনপদ। প্রত্যন্ত সাধারণ জনগণের বাস সেখানে। এ ধরনের আবাস গোটা রাজ্যজুড়েই ছড়িয়ে আছে। রাজার সম্মানার্থে উৎপাদিত শস্যের কিছুটা বার্ষিক খাজনা হিসাবে তারা স্থানীয় পরগনাধিপতির কাছে জমা দিয়ে থাকে। এটা চাপিয়ে দেয়া কোনো ব্যবস্থা নয়। সামর্থ্য অনুযায়ী খাজনা নির্ধারণপদ্ধতি। রাজ্যের গুণীব্যক্তিদের তৈরি করা নিয়ম। দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্ব বুঝে রাজা এটা মেনে নিয়েছেন।
রাজা ঘোড়াশালে গিয়ে থামলেন। দুই রাজপুত্রের ইচ্ছেপূরণের জন্য ঘোড়াশালের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তা ভরদ্বাজ ভরদুপুরে কয়েকজনকে ঘোড়দৌড় করাচ্ছেন। রাজার সুসজ্জিত গাড়ি থামামাত্র তিনি কুর্নিশ করে সরে দাঁড়ালেন। রাজপুত্রদ্বয় রাজাকে সম্মান জানিয়ে কাছে এসে দাঁড়ালো। অসময়ে ঘোড়দৌড় শেখা রাজার মনঃপূত নয়। তিনি নিয়ম মেনে চলা পছন্দ করেন। কিন্তু রাজপুত্রদের সামনে মনের ভাব প্রকাশ করলেন না। রাজা বললেন, তোমাদের মা অপেক্ষা করছেন। চলো আমরা প্রাসাদে ফিরে যাই।
খেতে বসে রাজা পুত্রদ্বয়কে জানালেন তাদের নতুন শিক্ষকের কথা। রাজার কথায় পুত্রদ্বয় নিজেদের ভেতর দৃষ্টি বিনিময় করলো। রাজা তাদের চোখের ভাষা বুঝলেন। কিন্তু কিছু বললেন না। নীরবে মধ্যাহ্নভোজ সম্পন্ন হলো।
রাজা মধ্যাহ্নভোজনের পর গড়াগড়ি যান। অপরাহ্নে কয়েকদন্ড দরবার বসে। তখন ব্যতিক্রমী কিছু কাজ সারেন। বিশেষ করে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন খবরাখবর নেন বিভিন্ন দায়িত্বে নিযুক্ত ব্যক্তিবর্গের কাছ থেকে। সংক্ষিপ্ত এই দরবার বসে প্রাসাদের এক খাস কামরায় এবং সবাইকে সেখানে ডাকাও হয় না। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া এই দরবারের সময়সীমাও বাড়ানো হয় না। এটা রাজ্যের কল্যাণে রাজার একান্ত নিজস্ব দায়িত্ব। একান্ত বিশ্বাসযোগ্য এবং শাসনকার্যে প্রয়োজনীয় কয়েকজন উচ্চপদস্থ ব্যক্তি দরকার পড়লে মাঝে মাঝে সেখানে থাকার অনুমতি পায়।
আজ অপরাহ্নে প্রাসাদের খাস কামরায় গুরুত্বপূর্ণ সভা বসেছে। রাজ্যের ভেতর এবং সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী রাজ্যে উচ্চ বেতনে নিযুক্ত সংবাদ সংগ্রহকারীরা বাহক মারফত গোপন বার্তা পাঠিয়েছে। বিশেষ কারণে রাজা এ সভায় আজ একাই শ্রোতা এবং প্রশ্নকারী।
রাজা বার্তাবাহকদের কথা শুনে যাচ্ছেন। কালিকট বন্দরে ইংরেজদের নতুন রণপোত ভিড়েছে। নতুন রণপোত মানে ইংরেজরা আরো নিত্য-নতুন যুদ্ধ সরঞ্জাম জড়ো করছে। সাথে বাণিজ্যের কাফেলা। ইচ্ছেমতো বাণিজ্যের সুবিধা পেলে ওদের মতো ভালো মানুষ আর হয় না। কিন্তু রাজা তার দূরদৃষ্টিতে জানেন, সুবিধা পাওয়ার শেষ নেই। তাই আজ হোক, কাল হোক স্বার্থের দ্বন্দ্ব বাধবেই।
এর আগের সুলতান ইংরেজদের বাণিজ্য করার সনদ দিয়েছিলেন। নতুন সুলতানের বয়স কম। আবেগ বেশি, ধৈর্য কম। অনিয়ম দেখলেই উত্তেজিত হয়ে পড়েন। ইংরেজরা যেমন বাণিজ্য সনদের অবৈধ ও যথেচ্ছ ব্যবহার করছে, তেমনি কর ফাঁকি দিয়েও রাষ্ট্রের ক্ষতি করছে। বারবার সাবধান করে দেয়া সত্ত্বেও তারা কর্ণপাত করছে না। ইংরেজদের বাড়াবাড়িতে তিনি সেই সনদ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
বণিক জাতি ইংরেজ বর্তমান সুলতানের বৈশিষ্ট্য ভালো করেই জানে। তাই তারা রণসম্ভার বাড়ানোর পাশাপাশি বিস্তর টাকা খরচ করে দিল্লির সম্রাটের কাছ থেকে শুল্কমুক্ত অবাধ বাণিজ্যের সনদ আনানোর চেষ্টা করছে।
সাধারণ জনগণ দেশপ্রেমিক হয়। ইংরেজ কুঠিতে কাজ করে এমন একজন এ খবর পেয়ে দরবারে এসে তরুণ সুলতানকে এই কথা জানিয়ে গেলো। লোকটির দেশপ্রেমে সুলতান মুগ্ধ হয়ে তাকে পুরস্কৃত করতে চাইলেন। কিন্তু ব্যক্তিটি পুনরায় কুর্নিশ করে পুরস্কার নিতে অস্বীকৃত হয়ে বললো, দেশ আমার মায়ের মতো। দেশের জন্য কাজ করে পুরস্কার নিলে মায়ের অসম্মান হয়।
তরুণ সুলতান এবার সিংহাসন থেকে নেমে এলেন। অশ্রুসজল চোখে লোকটির হাত ধরে বললেন, তোমার মতো মানুষের সংখ্যা বেশি হলে ইংরেজ বেনিয়া এদেশের মাটিতে ষড়যন্ত্র করার কথা কল্পনাও করতে পারত না।
এদিকে দরবারে কারো কারো চোখে বিস্ময়। কারো কারো কপালে ভ্রুকুুটি। কেউ কেউ এ ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছে। সুলতান বললেন, যাও বন্ধু তুমি নিজের কাজে ফিরে যাও। মনে রেখো আজ থেকে তুমি আমার সুহৃদ। আমি তোমার সাথে যোগাযোগ রাখবো।
এর ক’দিন পর সুলতান চর মারফত জানতে পারলেন, বাড়ি ফেরার পথে লোকটিকে কারা যেনো ছোরা মেরে রাস্তার পাশে জঙ্গলে ফেলে রেখে গেছে। সুলতান খুব কষ্ট পেলেন। তিনি জানতেন তার দরবারের কারো কারো সাথে ইংরেজদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে। কয়েকজনের নামও তিনি জানেন। কিন্তু তারা আগের সুলতানের সময় থেকে রাজদরবারে আসীন। উপরন্তু বয়োজ্যেষ্ঠ হওয়ায় তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করতেও মন সায় দেয় না। তা সত্ত্বেও মাঝে মাঝে তিনি আবেগের বশে রূঢ় ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছেন। এ জন্য তিনি অনুতপ্তও হয়েছেন। কিন্তু রাজন্যবর্গের ভেতর যারা দুষ্টপ্রকৃতির তারা সুলতানের আবেগকে দুর্বলতা ভেবে নিয়ে ষড়যন্ত্রেই মেতে থাকলো।
প্রিয় সুহৃদের মৃত্যুর কষ্ট সুলতান কাউকে বুঝতে দিলেন না। দাফনের সময় তিনি ফকিরের ছদ্মবেশে সেই বাড়িতে হাজির হলেন। সারা বাড়িতে কান্নার মাতম চলছে। ফকির বাবা চুপচাপ মৃতদেহের সামনে গিয়ে বসলেন।
প্রিয় সুহৃদের দাফন শেষ হলে কবরে শুইয়ে দেয়ার পর সুযোগ বুঝে একফাঁকে বন্ধুর স্ত্রীর কাছে গিয়ে কথা বলার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। আত্মীয়-স্বজনের কেউ কেউ বিরক্তবোধ করলেও ফকির বাবার ঋজু ভঙ্গির সামনে বিরোধিতা করার সাহস কারো হলো না। ঘরের একপাশে গিয়ে বন্ধুর বিধবা পতœীকে মৃদুকণ্ঠে বললেন, এই ঘরের দক্ষিণ কোনায় আমগাছের গোড়ায় সোনার মোহর ভর্তি একটি থলে পুঁতে রাখা আছে। এগুলো তার স্বামীর সম্পত্তি। এত দিন সে আর তার স্বামীই শুধু জানতো। এখন স্বামী মারা যাওয়ায় এই দায়িত্ব তিনি বিধবা পতœীর হাতে দিয়ে যাচ্ছেন।
এই কথায় বিস্ময়ে বিমূঢ় সদ্য বিধবা স্ত্রীলোকটি থ মেরে বসে রইলো। সম্বিত ফিরতে দেখে ফকির বাবা নেই। সে সারা বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজলো। কিন্তু ফকির বাবা কোথাও নেই। তাকে এভাবে খোঁজাখুঁজি করতে দেখে আত্মীয়-স্বজনদের কেউ কেউ এগিয়ে এলো। ফকির বাবা তাকে কি বলে গেছেন, জানতে চাইলো। মৃত ব্যক্তির স্ত্রীর কিছু বুদ্ধিশুদ্ধি ছিলো। সে নিরুত্তর, কোনো কথার জবাব না দিয়ে ঘরে ঢুকে কান্নায় ভেঙে পড়লো।
উজানগড়ের রাজা তার চরদের মারফত সব খবরই সময়মতো পেতে থাকলেন। বাংলার সুলতানের জন্য খুব দুঃখ হতো। কিন্তু তার কিছু করার ছিলো না। নিজের রাজ্যের প্রজাদের সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধি অর্জনই তার প্রধান কর্তব্য।
এদিকে শিক্ষাগুরু প্রথমদিন রাজপুত্রদের পড়াতে বসে লেখাপড়া নিয়ে কোনো আলোচনাই করলেন না। তিনি গল্পে মেতে উঠলেন। রাজপুত্রদ্বয় বুঝে উঠতে পারলো না এ কোন ধরনের পড়ালেখা। ওস্তাদ শুধু গল্পই করছেন। কতো ধরনের গল্প। নাম না জানা বিভিন্ন দেশের কাহিনী। সে সব দেশে কতো ধরনের মানুষ বাস করে। তারা দেখতে কেমন। তাদের বিচিত্র সব অভ্যাস। বিচিত্র তাদের খাদ্য। পড়ালেখা করতে হচ্ছে না, এই আনন্দে তারাও ওস্তাদের সাথে গল্পে মেতে উঠলো। অথচ ওস্তাদকে বিড়ম্বনায় ফেলার জন্য তারা দু’জন মিলে কত রকম পরিকল্পনাই না করে রেখেছিল।
গল্পে গল্পে অনেক রাত হয়ে গেলো। নৈশভোজে বসে রাজা পুত্রদের কথা জানতে চাইলেন। পরিচারিকা এসে জানিয়ে গেলো তারা ওস্তাদের কাছে পড়ছে। রাজা খুব অবাক হলেন। এমনটা তো এর আগে কখনো হয়নি।
কি ভেবে রাজা তাড়াতাড়ি ভোজ সেরে উঠে পড়লেন। পড়ার ঘরে এসে দেখলেন, তার পুত্ররা তন্ময় হয়ে ওস্তাদের কথা শুনছে। তিনি কাছে এসে বললেন, আজ কেমন পড়া হলো।
তরুণ শিক্ষক উত্তর দিলেন, আজ আমরা অনেক গল্প করেছি।
রাজপুত্রদের বিস্ময়বোধ তখনো কাটেনি। ছোট রাজপুত্র ওস্তাদকে উদ্দেশ করে বললো, এসব কি সত্যি?
শিক্ষক বললেন, হ্যাঁ, সব সত্যি।
রাজা ভাবলেন পড়ার সময় গল্প করার পেছনে নিশ্চয়ই শিক্ষকের কোনো পরিকল্পনা আছে। তিনি কিছু বললেন না। তিনি জানেন, এর আগে পুত্রদেরকে পড়ার টেবিলে কেউই বেশিক্ষণ বসিয়ে রাখতে পারেনি।
রাজা বললেন, খুব ভালো কথা। তোমরা নিশ্চয়ই অনেক কিছু জেনেছ। আজ থাক, তোমাদের ওস্তাদ এখন ক্লান্ত।
এবার তরুণ শিক্ষক রাজপুত্রদের বললেন, এখন তোমরা যাও। আমি পরে তোমাদের আরো নতুন নতুন গল্প বলবো। তোমরা আরো অনেক কিছু জানবে, যা তোমরা কখনো শোনোনি।
অল্প কয়েকদিনেই তরুণ শিক্ষক রাজপুত্রদের মন জয় করে ফেলেছে। রাজারও খুব ভালো লাগছে, রাজপুত্ররা অন্তত শিক্ষকের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছে। অন্দরমহলের খাস কামরায় এসে সে কথাই তিনি রানীকে জানালেন। রানী এতোটা আশাবাদী না। তিনি বললেন, আপনার সন্তানদের মতিগতি বোঝা ভার। কতোটা মনোযোগী তা কয়েকদিন পরই বোঝা যাবে। আমি তো শুনলাম ওস্তাদজি কেবল গল্পই করেছেন।
রাজা এর কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি অল্প কথার মানুষ। তর্ক একেবারেই পছন্দ করেন না। উপরন্তু তার অনেক দায়িত্ব। আগামীকাল গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাংলার আকাশে গভীর দুর্দিনের ঘনঘটা। বাংলা প্রদেশে কোনো সমস্যা হলে উজান অঞ্চলে তার এই ছোট রাজ্যও এ থেকে পরিত্রাণ পাবে না। ইংরেজদের ছোট ছোট বাণিজ্য কাফেলা বেশ কয়েক বছর ধরে তার রাজ্যের নদীপথ ও বন্দর ব্যবহার করে আসছে। অবশ্য এজন্য তারা রীতিমতো কর পরিশোধ করে। এবং অভিযোগ করার মতো কোনো ঘটনাও এ যাবৎ ঘটেনি। বরং আরো দক্ষিণে উপকূলীয় গভীর বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে যাওয়া নদীপথে ইংরেজদের বাণিজ্য তরী মাঝে মাঝে ডাকাত ও জলদস্যুদের কবলে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে বণিকদের তেমন কোনো অভিযোগও নেই। তারাও হয়তো বোঝে দূরবর্তী এ অঞ্চলে রাজার তেমন কোনো কর্তৃত্ব নেই। তাই তারা নিজেদের বন্দুকধারী সিপাই দিয়ে মোকাবেলা করেই এপথে চলাচল করে আসছে। রাজার দুশ্চিন্তার এটাও একটা কারণ। হাজার হাজার মাইল দূর থেকে আসা বণিকরা যা পারে, রাজা হয়েও তা তিনি পারেন না। বাইরের আগন্তুক হয়তো এভাবেই ধীরে ধীরে শক্তি অর্জন করে একসময় লোভে পড়ে শক্তিশালী শত্রুতে পরিণত হয়। ভেতরের-বাইরের শত্রুদের ষড়যন্ত্র থেকে রাজ্য রক্ষা করতে পারবেন কি-না, এ নিয়ে তিনি মহা চিন্তিত।
বাংলার নবাবের দরবারের গুরুত্বপূর্ণ অমাত্য রাজা রাজবল্লভকে রাষ্ট্রের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তলব করলে গঙ্গা¯œানের নাম করে তার পুত্র কৃষ্ণবল্লভ অবৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পত্তিসহ সমস্ত সম্পদ নিয়ে ইংরেজদের ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে চলে যায়। সম্পদসহ কৃষ্ণবল্লভকে ফেরত দিতে নবাব নির্দেশ দেন। কিন্তু জগৎশেঠ, রাজা রাজবল্লভ, সেনাপতি রায় দুর্লভ, মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র, মহারাজা স্বরূপচাঁদ, উমিচাঁদ, দেওয়ান রামচাঁদ, নন্দকুমার, মুন্সী নবকৃষ্ণের উৎসাহ ও পরামর্শে কলকাতার গভর্নর ড্রেক নবাবের নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করে। উজানগড়ের রাজা নবাবের দরবারে তাঁর দূত ও সংবাদ সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে প্রায় সমস্ত খবরই নিয়মিত পাচ্ছিলেন। তাঁর দুশ্চিন্তা বেড়ে গেল, এক বছর রাজ্য চালানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে তেইশ বছর বয়সী নবাব অনেক বেশি অভিজ্ঞ ও ক্ষমতাশালী এতোগুলো ষড়যন্ত্রকারীর মাঝে থেকে কিভাবে ইংরেজদের মোকাবেলা করবেন! করদ রাজ্যগুলোর দুশ্চিন্তার কারণ বাংলার শাসন ক্ষমতায় পরিবর্তন ঘটলে এর প্রভাব করদরাজ্যগুলোর ওপরও এসে পড়ে। ভালো শাসক যেমন কর বাড়ান না, তেমনি অপ্রয়োজনীয় ও উদ্ভট আইন-কানুন, নিয়ম-নীতিও চাপিয়ে দেন না। ভালো শাসক হিসেবে এক বছরেই সিরাজ-উদ-দৌলা করদাতা রাজ্যগুলোর রাজাদের প্রিয় হয়ে উঠেছেন।
আজ পড়াতে এসে ওস্তাদ দেখলেন দুই ভাই আগেই বসে আছে। ওস্তাদকে কক্ষে প্রবেশ করতে দেখে ছোট রাজপুত্র বললো, ওস্তাদজি আজ কোন গল্প বলবেন?
শিক্ষক মৃদু হেসে আসন নিলেন। তিনি দেখলেন, দুই রাজপুত্র উদগ্রীব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। বললেন, আজ তোমাদের এক রাজার গল্প বলবো। তবে তার আগে তোমাদের কয়েকটি প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। এই বলে কোর্তার পকেট থেকে বিভিন্ন গাছের কয়েকটি পাতা টেবিলে ছড়িয়ে দিয়ে বললেন, এগুলো কোন কোন গাছের পাতা বলতে পারবে?
ছোট রাজপুত্র ত্বরিত জবাব দিতে গেলে হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বললেন, একজনকে সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে না। এই বলে তিনি পাতাগুলোকে সামনে ছড়িয়ে দিয়ে ছোট রাজপুত্রকে বললেন, ছোটরা আগে সুযোগ পায়, তাই তুমি আগে বলো।
ছোট রাজপুত্র একটি পাতা দেখিয়ে বললো, এটা আমগাছের পাতা। এটা কাঁঠাল গাছের। এরপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো, ওস্তাদজি আর পারছি না।
শিক্ষক বললেন, চেষ্টা করো।
ছোট রাজপুত্রের উত্তরগুলো ঠিকই ছিলো। কিন্তু এরপর অনেক চেষ্টা করেও বাকি পাতাগুলোর নাম বলতে পারলো না।
বড়ো রাজপুত্র একটু গম্ভীর প্রকৃতির। সবকিছুই সে চিন্তা করে বলে। জানা থাকলেও তৎক্ষণাৎ কোনো প্রশ্নের জবাব দেয় না। বড়ো রাজপুত্রের পালা এলে নিজের ভাগেরগুলো দেখিয়ে বলতে লাগলো, নিম, বট। এ পর্যন্ত এসে ঠেকেছে। বড়ো রাজপুত্রও আর বলতে পারলো না।
শিক্ষক বাকি পাতাগুলো কোন কোন গাছের তা জানিয়ে দিয়ে বললেন, তোমাদেরকে পাতাগুলো সম্বন্ধে এ জন্য জিজ্ঞাসা করেছিলাম। এই গাছপালা আর মানুষ ও বিভিন্ন ধরনের প্রাণী নিয়েই আমাদের পৃথিবী। পৃথিবীকে জানতে হলে এসব সম্পর্কেও জ্ঞান রাখতে হবে। এই পাতাগুলো কোন না কোন গাছের। পাতার নামগুলো বলতে পারা অর্থ তোমরা সেই গাছগুলো চেনো। কোন গাছে ফল হয়, কোন গাছে হয় না। কোন ফল খাওয়া যায়, কোন ফল খাওয়া যায় না। কোন গাছে কোন মৌসুমে ফল ধরে। এগুলো জানলে তোমাদের জ্ঞান বাড়বে। এরপর যখন প্রাণীদের সম্পর্কে জানবে, তখন জ্ঞান আরো বাড়বে। বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন রকমের মানুষ বাস করে। তাদের চেহারা, গায়ের রঙ, উচ্চতাও আলাদা। আবার একেক অঞ্চলের তাপমাত্রাও একেক রকম। কোথাও অনেক গরম, আবার কোথাও অনেক ঠান্ডা। ঠান্ডা ও গরমের এই পার্থক্যের কারণে একেক অঞ্চলের মানুষ যেমন একেক রকম হয় তেমনি গাছপালাও ভিন্নরকম হয়। যেমন আমাদের অঞ্চলে গরম বা ঠান্ডা কোনটাই বেশি না। তাই আমাদের এই অঞ্চল অনেক বেশি আরামদায়ক।
হজে গিয়ে আমি একবার কাফেলার সাথে পারস্য হয়ে আরব দেশের নাজাফ পর্যন্ত গিয়েছিলাম। আমাকে মরুভূমিও পাড়ি দিতে হয়েছে। ওসব দেশে আমাদের মতো এতো গাছপালা নেই। মানুষগুলো গরিব, তারা পানির অভাবে খুব কষ্ট পায়। সেখানে আমি কোথাও আমাদের রাজ্যের আম, জাম, কাঁঠাল, নিমগাছ দেখিনি।
বড়ো রাজপুত্র গভীর আগ্রহ নিয়ে ওস্তাদের কথা শুনে যাচ্ছিল।
শিক্ষক একটু থামতেই ছোট রাজপুত্র বললো, ওস্তাদজি আজ গল্প বলবেন না?
শিক্ষক হাসি মুখে তাকালেন, এগুলো তোমার কাছে গল্প মনে হচ্ছে না?
এসব তো সত্যি।
গল্প সত্যি হতে পারে, আবার না-ও পারে। যা তুমি কখনো দেখোনি, তা-ই যখন সাজিয়ে-গুছিয়ে তোমাকে বলা হবে, সেটাই গল্প।
ছোট রাজপুত্র বললো, ওস্তাদজি আরো ভালো গল্প বলেন।
তরুণ শিক্ষক বললেন, কোন গল্প ভালো গল্প?
ছোট রাজপুত্র চোখে মুখে ভয় এনে বললো, ভূতের গল্প, রাক্ষসের গল্প, ডাইনি বুড়ির গল্প।
তুমি কখনো ভূত দেখেছো অথবা ডাইনি বুড়ি?
আমি দেখিনি কিন্তু আমার দিদিমা দেখেছে।
ভূত দেখতে কেমন?
ওস্তাদজি আপনি কখনো ভূত দেখেননি?
না।
দিদিমা বলেছে, ভূত অনেক লম্বা হয়। হাত-পাগুলো সরু সরু আর কয়লার মতো কালো। রাতের বেলায় কেউ একা একা কোথাও গেলে ভূত ঘাড় মটকে রক্ত খায়। মানুষের রক্ত খেয়ে ভূত বেঁচে থাকে। ভূত অনেক রকমের হয়। মেছোভূত ভয় দেখিয়ে মাছ চুরি করে খায়। গেছোভূত গাছে থাকে। জলভূত জলে আর মেঠোভূত মাঠে থাকে। দিনের বেলায় ভূত কুকুর বেড়ালের রূপ ধরে মানুষের কাছে আসে। ভূত মরে গেলে দাঁড়কাক হয়ে যায়।
বড় রাজপুত্র বললো, নদীর পাড়ে হিন্দুদের শ্মশান ঘাটের শেওড়া গাছে খুব খারাপ একটা ভূত আছে। ওখানে কেউ একা একা যায় না। যে যাবে শেওড়াভূত তার ঘাড় মটকে রক্ত শুষে খেয়ে মেরে ফেলবে।
রাজপুত্র একটা ঢোক গিলে বললো, আমাদের কবিরাজ মশাইয়ের কাছে ভূত আছে।
কবিরাজ মশাই ভয় পান না?
না না, ভয় পাবেন কেন? তিনি তো ভূত পালেন। ভূতরা তার কাছে থাকে, কথা শোনে, কাজ করে দেয়। তিনি রাতের বেলায় কোথাও যেতে চাইলে ভূত ঘাড়ে করে পৌঁছে দেয়।
তরুণ শিক্ষক রাজপুত্রদের আগ্রহের কথাগুলো চুপচাপ শুনে যান।
রাজপুত্র তখনো বলে যাচ্ছে, ঔষধ বানাতে কবিরাজ মশাইয়ের অনেক রকম গাছ-গাছড়া লাগে। ভূতগুলো অনেক দূর থেকে সেইসব গাছ-গাছড়া এনে দেয়। আর তিনি ঘরে বসে দুরমুজ দিয়ে গাছ-গাছড়া ছেঁচে ঔষধ বানান। তার বাড়ির একটা ঘরে বড়ো বড়ো বোতল আছে, ভূতগুলো সেখানে থাকে।
[বাকি অংশ আগামি সংখ্যায়]

SHARE

Leave a Reply