Home গল্প ওপারের জারজিস -নাবিউল হাসান

ওপারের জারজিস -নাবিউল হাসান

হালকা সবুজের মাঝে আকাশের নীল রঙ মিশে স্বচ্ছ আয়নার মতো আরেকটা পৃথিবীর ছবি দেখা যাচ্ছে পুকুরটিতে। সাহেব আলী জমিদারের ৮ বিঘা জমি বিস্তৃত বিশাল এ পুকুর। পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি ডাবগাছ। মাঝে দূরত্ব বজায় রেখে পেয়ারা, বাতাবিলেবু, জামরুল, লটকান, জলপাই, আমড়া, কামরাঙ্গাসহ প্রায় সব প্রজাতির ফলগাছ দিয়ে চার পাশটা মনোরম দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে। পূর্ব থেকে পশ্চিমমুখী রাস্তাটা পুকুর পাড়ের দক্ষিণ দিকে ২০০ গজ দূর দিয়ে অতিক্রম করে উত্তর-পশ্চিম কোণ বরাবর বাইরের উঠোন হয়ে জমিদার বাড়িতে প্রবেশ করেছে। রাস্তা ও উঠোনের দুই দিকেই হরেক রকম ফুলগাছ দিয়ে নকশা আঁকানো। পুকুরের পূর্ব পাড়ে বসে আছে হারুন, তমাল, শিশির, সবুজ এবং কাজল। গ্রামের দুরন্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠা এদের বয়স ১৪-১৭ এর মধ্যে। প্রতিদিন জমিদার বাড়ির ফলগাছগুলোতে কয়েক দফা অভিযান চালালেও আজ কোনদিকে তাকিয়ে দেখাছে না তারা। মাথা নিচু করে বসে আছে নীরবে। একজন বন্ধুকে এভাবে চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলতে হবে কোনদিনও ভাবেনি কেউ। ফেসবুকের একটিমাত্র স্ট্যাটাস ওদের মনের বাগানে কালবৈশাখী ঝড় বয়ে বেড়াচ্ছে। যে ডাবগাছগুলোতে এতদিন নির্দ্বিধায় চড়া এবং নামা পছন্দ হতো সেগুলো আজ দাঁতালো রাক্ষুসীর মতো মনে হচ্ছে। কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে ওরা, তাই বলছে না কেউ। কাজল আনমনে হয়ে মোবাইলটা ধরে আছে। এখান থেকেই জারজিস ভাইয়ের মৃত্যুর সংবাদটা এসেছিল। পুকুরের পানি অশান্ত করে দেয়া আর গাছে গাছে দাপিয়ে বেড়ানো ছেলে-পুলেদের এমন ভদ্র হয়ে বসে থাকা লক্ষ করেন জমিদার সাহেব। এক পা দু’পা করে নিঃশব্দে তাদের পেছনে এসে দাঁড়ান। কিছুক্ষণ পর একে একে টের পেয়ে যায় সবাই তবু সস্থানে নীরব বসে থাকে তারা। “কিরে তোমরা আজ পালাচ্ছ না যে?” কিঞ্চিৎ হাসিমাখাকণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন সাহেব আলী জমিদার।
“আমরা তো কোন দোষ করিনি আঙ্কেল,” আলতোভাবে জবাব দেয় সবুজ। কিন্তু তার কান্নাজড়িত কণ্ঠস্বর ভাষার মোহনায় মিলিত হলো। বিস্মিত হলেন জমিদার। প্রকৃতির নির্মল ছন্দে হেসে-খেলে বেড়ানো কয়েকটা দুরন্ত বালকের অভয়ারণ্য জমিদারের এ পুকুর পাড়টি। প্রতিদিন তারা চুপি চুপি আসে, এগাছ থেকে ওগাছে ওঠে, বিভিন্ন রকম ফল পেড়ে খায়, গাছের ছায়ায় বসে খেলাধুলা করে, পুকুর জলে দাপাদাপি করে গোসল সেরে আবার চলে যায়। জমিদার কাউকে জোরগলায় কোন দিন ধমকও দেননি। তিনি জানতেন প্রকৃতির অন্যান্য শোভার মধ্যে এদের দুষ্টুমিও অন্যতম শোভার আয়োজন করে। কোনদিন খুব বেশি বাড়াবাড়ি হলে বাসা থেকে বাইরে আসাই তাঁর কাজ। তাতেই দৌড়ে পালায় সবাই। এদের এমন নিশ্চিত অবস্থা স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেন না তিনি। কী হয়েছে তাদের? মন খারাপ কেন? জানতে ইচ্ছে করে জমিদার সাহেব আলীর। কাছে চলে যান তাদের। কাজল আর হারুনের মাঝখানে বসে পড়েন তিনি। তাদের দু’জনের দুই কাঁধে হাত রেখে জড়িয়ে নেন দু’জনকেই। অবুঝ বালকের মতো বলতে থাকেন, “আমিও তোমাদের বন্ধু, ছোট থেকে এতবড় যে হয়েছ; বলতো কাউকে আমি কোন দিনও কি মেরেছি তোমাদের, জোর গলায় ধমক দিয়েছি? আমার সমস্ত পুকুর পাড় তোমাদের জন্যই তো উন্মুক্ত। তোমরা কান্না করছ কেন একটু বলা যাবে না?” জমিদার চাচার যে সাগরের মতো উদার হৃদয় এ কথা জানা ছিল না কারো। তাঁর অমায়িক সান্ত্বনার সুখানুভূতি আর জারজিস ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদ আনন্দ-বেদনার দু’টি অমলিন ধারা একসঙ্গে ঢেউয়ের মতো আসতে থাকে অশ্র“ফোঁটা হয়ে। অনেক কষ্ট করে বলে শিশির, “জারজিস ভাই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন ওপারের যাত্রী হয়ে” বলতে গিয়েও কয়েকটা ধাক্কা খায় সে। আবারও শুরু হয় কান্নার প্রতিযোগিতা। “রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জারজিস?” প্রশ্ন করেন জমিদার চাচা। “হ্যাঁ জবাব দেয় সবাই। “ছেলেটা আমাদের চোখের সামনে হেসে খেলে বেড়াত, ভদ্রতা আর মেধাবীর জন্য সবাই ভালোবাসতো তাকে।” বলেই কান্নায় শামিল হলেন জমিদার চাচাও। কামলা-কৃষাণরা মাঠের কাজ সেরে হাত-মুখ ধোয়ার জন্য পুকুর পাড়ে এসেছিল। ছোট ছেলেদের সঙ্গে জমিদার চাচার এমন গলাগলি বন্ধুত্ব দেখে তাজ্জব হয়ে যান সবাই। “গত আট দিন আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ হবিবুর রহমান হলের সামনে এক ডাবগাছে উঠতে গিয়ে পিছলে পড়ে যান জারজিস ভাই। সেখানে থেকে রাজশাহী মেডিক্যালে সাত দিন নিবির পরিচর্যা কেন্দ্রে লাইফ সাপোর্টে থাকার পর গতকাল পৃথিবী থেকে বিদায় নেন তিনি।” জারজিসের চাচাতো ভাই তমালের এমন বর্ণনায় শোকের ছায়া নেমে আসে সাহেব আলী জমিদারের পুকুর পাড়ে।

SHARE

Leave a Reply