Home গল্প লক্ষ টাকার বুদ্ধি -তমসুর হোসেন

লক্ষ টাকার বুদ্ধি -তমসুর হোসেন

এবার মনে হয় দশোহারার মেলা বেশ জমবে। অগ্রহায়ণের মাঝামাঝি মেলা হয়। পুষ্ট আমলকীতে যখন রঙের ছোঁয়া লাগে আর ডাঁসা খোকসায় পাখিরা ঠোকর বসায় তখন মেলার আয়োজন হয়। বন্যাপ্লাবিত অসমান মাঠকে মেলার উপযোগী করতে বেশ সময় লাগে। খানাখন্দ সমান করা চাট্টিখানি কথা নয়। কিন্তু মেলার আয়োজকরা লোক লাগিয়ে সব কাজ গুছিয়ে ফেলে। মেলায় যেতে জনগণ এতটা উন্মুখ থাকে যে হাটবাজারে মেলার কথা বললেই হলো। দিন-তারিখ লোকেশন খোলাসা করে বলতে হয় না। নিজেদের গরজেই জেনে নেয় তারা। ছেলেমেয়েরা বাপের পকেট হাতড়িয়ে পয়সা জমিয়ে রাখে। সোহেল কোনদিন মেলায় যায়নি। কারণ ওর মা মেলায় যাওয়া একদম পছন্দ করেন না। একদিন ওর ক্লাসের বন্ধু রতিকান্ত ওকে বললো,
‘মেলায় যাবে? মিষ্টি খাবো।’
‘মা যদি যেতে না দেন। তখন কী হবে?’
‘মাকে বলে রাখবে।’
সোহেলের বন্ধু রতিকান্ত। ও মেলায় না গেলে রতিকান্ত মাইন্ড করবে। ওরা দু’জনই ভালো ছাত্র। রতিকান্ত যদি এক বছর ক্লাসে প্রথম হয় তাহলে অন্য বছর সোহেল প্রথম হবেই। তুমুল লড়াই থাকার পরও ওরা একে অন্যকে ছাড়া চলতে পারে না। রতিকান্ত স্কুলে না এলে সোহেলের ক্লাসে মন বসে না। তেমন রতিকান্তরও। স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে কি যেন উপলক্ষে। ক’দিন পর অনুষ্ঠিত হবে ঈদুল আজহা। হঠাৎ রতিকান্ত সোহেলের বাড়িতে এসে হাজির। রতিকান্তকে দেখে সোহেল অবাক হয়ে যায়। ওকে নিয়ে সে অস্থির হয়ে ওঠে। কিন্তু রতিকান্তর কোন কিছুতে মন নেই। সে সোহেলকে বলে,
‘চলো কোথাও যাই।’
‘কোথায় যাবে? খেয়ে বিশ্রাম নাও।’
‘আমার কিছুই ভাল্লাগ্ছে না। তাই তোমাকে দেখতে এলাম।’
‘আমারও খারাপ লাগছে। এসে ভালোই করেছো। তুমি না এলে দিনটা খারাপ যেতো।’
‘আমার বাড়িতে চলো। একসাথে বেড়াবো।’
‘মাকে বলো। মা কোথাও যেতে দিতে চান না।’
‘থাক তাহলে। মেলার সময় অবশ্যই যাবে। থেকে আসবে ক’দিন।’
সোহেলের মা-ও রতিকান্তকে পেয়ে খুশি হন। ছেলের যে একজন ভালো বন্ধু আছে এ কথা মা জানেন না। মুরগির মাংস আর চিকোন চালের পোলাও খেয়ে তৃপ্ত হয় রতিকান্ত। ওকে দেখতে অনেক লোক আসে। খুবই জড়সড় হয়ে পড়ে সে। ওর এমন দশা দেখে সোহেলের মা বলেন,
‘অমন লজ্জা করে না বাবা। ওরা তোমাকে দেখতে এসেছে।’
‘খালাম্মা। সোহেলকে নিয়ে যাই। দু’দিন থেকে আসবে।’
‘ও পরে যাবে সোনা। দেখছো না ঈদ সামনে এসে গেছে।’
‘তাহলে মেলার দিন নিয়ে যাবো। তখন আটকাতে পারবেন না কিন্তু।’
রতিকান্তর কথা শুনে মেলার স্বপ্ন দেখে সোহেল । রতিকান্ত তাকে মিষ্টি খাওয়াবে। সে কি কিছুই খাওয়াবে না। কি খাওয়াবে ওকে? বগুড়ার দই। দই পাওয়া না গেলে রসমঞ্জুরী খাওয়াবে। কেমন আনন্দ হবে সেদিন! সারাটা মেলাবাড়ি ঘুরে বেড়াবে তারা। কতো জিনিস কিনবে দু’জনে মিলে! সোহেলের মন বাতাসে উড়ে বেড়ায়। সে যেন সুরের পাখি। সারাদিন গুনগুন গান গায়। মেলায় যদি অন্য বন্ধুদের সাথে দেখা হয়? ওদের দেখে তারা হয়ত ঈর্ষা করবে। করুক যার যতো ইচ্ছে। সবাই জেনে যাবে রতিকান্তর সাথে ওর কতোটা বন্ধুত্ব।
সোহেলের মাথায় একটাই ভাবনা। দশোহারা কখন আসে। কখন দেখা হবে রতিকান্তর সাথে। রতিকান্ত কি তাকে খোঁজ করবে! না তাকেই খুঁজে নিতে হবে ওকে। কখন কোনখানে তাদের দেখা হবে সে তো কিছুই বললো না। অতবড় মেলাবাড়িতে কোথায় খুঁজবে সে রতিকান্তকে। এ কদিনে সেতো একবারও যোগাযোগ করলো না। বেশ অস্থিরতা হতে লাগলো সোহেলের। মাকে সে বললো,
‘মা, রতির সাথে মেলায় যাবো?’
‘দরকার নেই। শুধু টাকা নষ্ট করা।’
‘ও যে বলে গেলো মেলায় যেতে।’
‘ওভাবে সবাই বলে। সে জন্য যেতে হবে?’
‘বাড়ি এসে বলে গেলো। না গেলে কী বলবে।’
‘যেতে চাও যাও। ওকি তোমাকে নিতে আসবে?’
সজলের সাথে মেলায় যায় সোহেল। সজল ওর চাচাতো ভাই। গ্রামের অনেকে যাচ্ছে মেলায়। রতিকান্তর সাথে দেখা না হলে সজলের সাথে ঘুরবে সোহেল। প্রশস্ত মাঠজুড়ে অনেক দোকানপাট। পুতুল নাচ, ঘোড়দৌড়, লাঠিখেলা এবং যাত্রাগানের শামিয়ানা আছে মেলায়। একদিকে বেদেরা বাঁশি বাজিয়ে সাপের খেলা দেখাচ্ছে। হঠাৎ রতিকান্তর সাথে দেখা হলো সোহেলের। একখানা মনিহারি দোকান দিয়ে বসেছে সে। ছেলেমেয়েরা তার দোকানের সামনে ভিড় করছে। তাদের সামাল দিতে সে দারুণ ব্যস্ত। চোখের ইশারায় সে সোহেলকে বসতে বললো। ওর দশা দেখে মন খারাপ হলো সোহেলের। মন খারাপ করে ঘুরে বেড়াতে লাগলো সে। ওর দুলাভাই মেলায় হোটেল দিয়েছে। ওকে দেখে বলতে লাগলো,
‘কখন এলে সোহেল?’
‘এইতো কিছুক্ষণ আগে।’
‘মেলায় কী দেখলে?’
‘অনেক কিছু দেখলাম।’
‘ইলিশ মাছ দিয়ে ভাত খাও।’
‘খেয়ে এসেছি। এখন খিদে নেই।’
‘আরে খাও না। মেলাবাড়ির রান্নাই আলাদা।’
পদ্মার ইলিশের মজাই আলাদা। খেয়ে সজলের সাথে পুতুল নাচ দেখলো সোহেল। প্রাণহীন পুতুল। অথচ মানুষের হাতের পরশে জীবন্ত হয়ে উঠলো। পুতুল নাচের পাশেই একখানা বিশাল সাইনবোর্ড দেখলো। তাতে লেখা ছিলো, ‘এখানে লক্ষ টাকার বুদ্ধি দেয়া হয়’। দু’টাকার টিকিটের বিনিময়ে লক্ষ টাকার বুদ্ধি! দু’জনে টিকেট নিয়ে সেখানে প্রবেশ করলো। মূল গেট পার হতেই প্রশস্ত করিডোর। সেখানে লেখা আছে ‘দয়া করে অন্যকে যেতে দিন।’ তার সামনে বড়সড় কক্ষে বসার জায়গা। সেখানে বড় করে লেখা, ‘পরামর্শক ব্যস্ত। অপেক্ষা করুন।’ এরকম অনেক জায়গা পার হয়ে একটা দামি পর্দাঘেরা কক্ষে যিনি আছেন তার নাম হলো,‘ বিন ইয়ামিন আল্ মুকাফ্ফা আস্ সাবিত আল্ কাওসার আল্ হিকমাহ্।’ সজলের আগে সেখানে প্রবেশ করে সোহেল। ঢুকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলো সে। একজন লোক মোটা চাদরে শরীর ঢেকে চুপচাপ বসে আছেন। লোকটি সুস্বাস্থের অধিকারী। হাতে বড়সড় তসবিহ এবং মুখে কাঁচাপাকা দাড়ি। মাথায় পাগড়ি বেঁধে উল্টো দিকে মুখ করে বসে আছেন তিনি। খানিকটা ইতস্তত করে সোহেল তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। ওকে দেখে গভীর গলায় লোকটা বললো,
‘লক্ষ টাকার বুদ্ধি শিখবে?’
‘জি হ্যাঁ।’
‘কী করবে এত বুদ্ধি দিয়ে?’
‘বুদ্ধি খরচ করে পড়াশুনা করবো।’
‘খুব খুশি হলাম। সাপের পা দেখেছো?’
‘সাপের তো পা থাকে না।’
‘কে বলেছে থাকে না?’
‘আমার স্যার বলেন।’
‘পা না থাকলে সাপ হাঁটে কী করে?’
কিছুক্ষণ লোকটা চুপ করে বসে থাকলো। কোন নড়াচড়া করলো না। ঠোঁট নেড়ে কি যেন জপলো। তারপর পাগলের মতো করে বলতে লাগলো,
‘এই বয়সে লক্ষ টাকার বুদ্ধি শিখবে?’
‘দয়া করে শিখিয়ে দিন।’
‘দাঁত পরিষ্কার করো?’
‘অবশ্যই করি।’
‘আর একটা কথা।’
‘কী কথা?’
‘কয়লা দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করবে না। আর শোন, এ কথাটা কাউকে বলবে না।’
শামিয়ানার বাইরে এসে থ মেরে দাঁড়িয়ে থাকলো সোহেল। পয়সা রোজগারের জন্য মানুষ এমন প্রতারণার আশ্রয় নিতে পারে তা তার জানা ছিলো না। রতিকান্তর সাথে দেখা করলো না সে। তাকে মেলায় ডেকে এসে রতিকান্ত মনিহারির দোকান দিয়ে বসেছে। মনের ভেতর চাপা বিষণœতা নিয়ে সজলের সাথে বাড়ি ফিরে এলো সোহেল। তখন বিকেল হয়ে গেছে। বাতাসে শীতের আমেজ। মা বিকেলে পিঠে বানাবেন। হালকার কুয়াশার স্বপ্নমাখা আঙিনায় বসে সজলের সাথে মায়ের বানানো পিঠে খাবে সে বাড়ি ফিরে।

SHARE

Leave a Reply