Home দেশ পরিচিতি মেগা জীববৈচিত্র্যের দেশ মালয়েশিয়া -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

মেগা জীববৈচিত্র্যের দেশ মালয়েশিয়া -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

মালয়েশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি ফেডারেল সাংবিধানিক রাজতান্ত্রিক দেশ। ১৩টি রাজ্য এবং তিনটি ফেডারেল অঞ্চল নিয়ে দেশটি গঠিত। সেগুলো হলো- পারলিস, কেদাহ, পেনাং, কেলানতান, তেরেংগানু, পেরাক, সেলাংগর, নেগেরি সেমবিলান, মালাক্কা, জহর, পাহাং, সারাওয়াক, সাবাহ, লাবুয়ান, কুয়ালালামপুর ও পুত্রজায়া।
মালয়েশিয়ার মোট ৩ লাখ ৩০ হাজার ৮০৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ভূমি দক্ষিণ চীন সাগরের মাধ্যমে দু’টি একই রকম আকারের অঞ্চলে বিভক্ত। অঞ্চল দু’টি হলো পেনিনসুলার মালয়েশিয়া ও পূর্ব মালয়েশিয়া (মালয়েশিয়ান বোর্নিও)। পেনিনসুলার মালয়েশিয়ার থাইল্যান্ডের সাথে স্থল ও সামুদ্রিক সীমা রয়েছে এবং সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার সাথে শুধুমাত্র সমুদ্রসীমা রয়েছে। পূর্ব মালয়েশিয়ার ব্রুনাই ও ইন্দোনেশিয়ার সাথে স্থল ও সমুদ্র সীমা রয়েছে এবং ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের সাথে শুধুমাত্র সমুদ্রসীমা রয়েছে। মালয়েশিয়ার রাজধানী নগরী কুয়ালালামপুর এবং কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান পুত্রজায়ায়।
তিন কোটি ১১ লাখ ৩১ হাজার জনসংখ্যার মালয়েশিয়া বিশ্বের ৪৪তম সবচেয়ে জনবহুল দেশ। সরকারি ভাষা বাহাসা মালয়েশিয়া। মহাদেশীয় ইউরেশিয়ার সবচেয়ে দক্ষিণের পয়েন্ট তানজুং পিয়াই মালয়েশিয়ায় অবস্থিত। গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলে অবস্থিত মালয়েশিয়া পৃথিবীর ১৭টি অতিবৈচিত্র্যময় দেশের মধ্যে অন্যতম। এ দেশে বিপুলসংখ্যক স্থানীয় প্রজাতির প্রাণী রয়েছে।
অনুমান করা হয়ে থাকে, বিশ্বের প্রাণী প্রজাতিগুলোর ২০ শতাংশ রয়েছে মালয়েশিয়ায়। স্থানীয় প্রজাতিগুলোর আধিক্য বোর্নিওর পর্বতগুলোর বৈচিত্র্যময় জঙ্গলগুলোতেই বেশি। এ দেশে প্রায় ২১০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রজাতির প্রাণী রয়েছে। পেনিনসুলার মালয়েশিয়ায় ৬২০ প্রজাতির পাখির উপস্থিতি রেকর্ড করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে আবার অনেক সেখানকার পর্বতের স্থানীয় পাখি। মালয়েশিয়ান বোর্নিওতেও বহু স্থানীয় পাখি পাওয়া গেছে। এ দেশে ২৫০ প্রজাতির সরীসৃপ রেকর্ড করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ১৫০ প্রজাতির সাপ এবং ৮০ প্রজাতির টিকটিকি রয়েছে। এ ছাড়াও রয়েছে প্রায় ১৫০ প্রজাতির ব্যাঙ এবং হাজার হাজার প্রজাতির কীটপতঙ্গ। মালয়েশিয়ার জলভাগও জীববৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ। সিপাডান দ্বীপের চারদিকের পানিতে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জীববৈচিত্র্য। পূর্ব মালয়েশিয়ার সীমান্তে সুলু সাগরও জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল। এখানে প্রায় ৬০০ প্রবাল প্রজাতি এবং ১২০০ মাছ প্রজাতি রয়েছে। মালয়েশিয়ান কেভের অনন্য জীববৈচিত্র্য সর্বদা সারা বিশ্বের প্রতিবেশ পর্যটনের প্রেমিকদের আকৃষ্ট করে।
মালয়েশিয়ার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভূমি বন-জঙ্গলে ঢাকা। কয়েকটি বন আবার ১৩ কোটি বছরের পুরনো বলে বিশ্বাস করা হয়ে থাকে। এ দেশে বৃষ্টি বিধৌত বন, ম্যানগ্রোভ বন ও পিট বনসহ সব ধরনের বনই রয়েছে। এসব বনে ১৪ হাজার ৫০০ প্রজাতির মূল্যবান গাছপালা রয়েছে। এসব বনে রাফফ্লেসিয়া বর্গের নানা রকম ফুল ফোটে, যা আকারে বিশ্বের বৃহত্তম। এই ফুলের ব্যাস সর্বোচ্চ এক মিটার (৩ ফুট ৩ ইঞ্চি) হয়ে থাকে।
মালে রাজ্য থেকে মালয়েশিয়ার উৎপত্তি। এলাকাটি অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। প্রথম ব্রিটিশ অঞ্চলগুলো স্টেইটস সেটেলমেন্টস হিসেবে পরিচিত ছিল। এগুলো প্রতিষ্ঠার পর মালে রাজ্য গঠিত হয় এবং ব্রিটিশ আশ্রিত রাজ্যে পরিণত হয়। পেনিনসুলার মালয়েশিয়ার অঞ্চলগুলো ১৯৪৬ সালে প্রথম মালেয়ান ইউনিয়ন হিসেবে একীভূত হয়। মালে ১৯৪৮ সালে মালে ফেডারেশন হিসেবে পুনর্গঠিত হয় এবং ১৯৫৭ সালের ৩১ আগস্ট স্বাধীনতা লাভ করে। মালে ১৯৬৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর উত্তর বোর্নিও, সারাওয়াক ও সিঙ্গাপুরের সাথে একীভূত হয় এবং দেশটি মালয়েশিয়া নাম ধারণ করে। এর দু’বছরেরও কম সময় পর ১৯৬৫ সালে ফেডারেশন থেকে সিঙ্গাপুরকে বাদ দেয়া হয়।
মালয়েশিয়া বহু-জাতিগোষ্ঠী ও বহু-সংস্কৃতির দেশ। এ দু’টি বিষয় এ দেশের রাজনীতিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক জাতিগতভাবে মালে (৫০.১%)। অন্যরা হলো বড় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী মালয়েশীয় চীনা (২২.৬%), আদিবাসী জনগণ (১১.৮%), মালয়েশীয় ভারতীয় (৬.৭%) এবং অন্যান্য (৮.৮%)।
প্রধান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে রয়েছে মুসলিম ৬১.৩ শতাংশ, বৌদ্ধ ১৯.৮ শতাংশ, খ্রিষ্টান ৯.২ শতাংশ, হিন্দু ৬.৩ শতাংশ এবং অন্যান্য ৩.৪ শতাংশ। সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। তবে অমুসলিমদের পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা রয়েছে। সরকারব্যবস্থা ওয়েস্টমিনিস্টার পার্লামেন্টারি পদ্ধতির কাছাকাছি। রাষ্ট্রপ্রধান রাজা, যিনি ইয়াং ডি-পারতুয়ান অ্যাগং হিসেবে পরিচিত। তিনি প্রতি পাঁচ বছর অন্তর নয়টি মালে রাজ্যের উত্তরাধিকারী শাসকদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হন। মালয়েশিয়ার বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধান রাজা আবদুল হালিম। বর্তমান সরকারপ্রধান প্রধানমন্ত্রী নাজিব তুন রাজাক, তিনি ২০০৯ সাল থেকে ক্ষমতাসীন। এ দেশের পার্লামেন্ট দ্বিকক্ষবিশিষ্ট : উচ্চকক্ষ দেওয়ান নেগারা এবং নি¤œকক্ষ দেওয়ান রাকিয়াত।
স্বাধীনতার পর থেকে মালয়েশিয়া এশিয়ায় সেরা অর্থনৈতিক রেকর্ড করে চলেছে। গত প্রায় ৫০ বছর ধরে এ দেশের বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার গড়ে ৬.৫। ঐতিহ্যগতভাবে প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে এ দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে আছে, তবে বিজ্ঞান, পর্যটন, বাণিজ্য ও মেডিক্যাল পর্যটন খাতও সম্প্রসারিত হচ্ছে। বর্তমানে মালয়েশিয়া নব্য শিল্পায়িত বাজার অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এ দেশের অবস্থান তৃতীয় এবং বিশ্বে ২৯তম বৃহত্তম। মালয়েশিয়া আসিয়ান, ইস্ট এশিয়া সামিট ও ওআইসির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংস্থা, কমনওয়েলথ ও জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের সদস্য। মালয়েশিয়ার মুদ্রার নাম রিংগিত।
মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে মাহাথির মুহাম্মদ একটি উজ্জ্বল নাম। তিনি ১৯৮১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২২ বছর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। পেশাগতভাবে চিকিৎসক হিসেবে তিনি যেমন সফল হয়েছিলেন, ঠিক তেমনি রাজনীতিবিদ হিসেবেও সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মাহাথিরের শাসনামলে মালয়েশিয়ায় দ্রুত আধুনিকায়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটে। তা ছাড়া একজন সুবক্তা হিসেবে সারা বিশ্বে তার খ্যাতি ছিল। ৯১ বছর বয়সে এই মহান নেতা এখন অবসর জীবন যাপন করছেন।

SHARE

Leave a Reply