Home ধারাবাহিক: দুর্গম পথের যাত্রি দুর্গম পথের যাত্রী -আসাদ বিন হাফিজ

দুর্গম পথের যাত্রী -আসাদ বিন হাফিজ

গত সংখ্যার পর

ইতিহাসের কী নির্মম পরিহাস! যে মুহাম্মদকে একদিন মক্কার উপকণ্ঠ থেকে অপমানজনক শর্তারোপ করে ফিরিয়ে দিয়েছিল আবু সুফিয়ান, আজ তার কৃপার আশায় মদিনার পথ ধরতে হলো। কারণ আবু সুফিয়ান ভালো করেই জানতো, বনু বাকারের আক্রমণের খবর পেয়ে মুহাম্মদ খাজায়া গোত্রের সমর্থনে ছুটে আসবে। আবার একটি লড়াই অনিবার্য হয়ে উঠেছে। অথচ এটা কাম্য নয়। মুহাম্মদকে বুঝাতে হবে, বনু বাকারের অভিযানে কোরাইশদের কিছু যুবকের অংশগ্রহণ নেহাতই একটি দুর্ঘটনা। হুদায়বিয়ার সন্ধিভঙ্গের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এটা হয়নি।
আবু সুফিয়ান বিলম্ব না করে সেদিনই মদিনার উদ্দেশে যাত্রা করলেন। মদিনায় পৌঁছে প্রথম যে ঘরের কড়া নাড়লেন সেটা ছিল তার কন্যা উম্মে হাবিবার ঘর। দরজা খুলে সামনে পিতাকে দেখে আনন্দের পরিবর্তে তার চেহারা বিমর্ষতায় ছেয়ে গেল। পিতার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে বলল, ‘আপনি?’
আবু সুফিয়ান আশাভরা কণ্ঠে বলল, ‘পিতা কি কন্যার ঘরে সমাদর পাবে না?’
‘হ্যাঁ, অবশ্যই পাবেন, যদি পিতা সত্যধর্মের অনুসারী হয়, যে ধর্ম তার কন্যা গ্রহণ করেছে। শুধু সমাদর নয়, বরং পিতার আগমনের জন্য অধীর হয়ে কন্যা পথের দিকে তাকিয়ে থাকবে।’ উম্মে হাবিবা নিরুত্তাপ কণ্ঠে বললেন।
‘বেটি, আমি খুব পেরেশানির মধ্যে আছি। আমার কন্যা হয়ে তুমি আমার দিকে উপেক্ষার নয়নে তাকালে আমার কষ্ট আরো বেড়ে যাবে। অতটা নিষ্ঠুর তুমি হয়ো না। আমার কথা শোন, আমাকে সাহায্য করো।’
‘আপনার পেরেশানি দূর করার দাওয়াই তো আমার কাছে নেই। ওটা চাইলে আপনি রাসূলের কাছে যান। আমার রাসূলের শত্রুকে আমি সমাদরে আমার ঘরে বসতে দিতে পারি না।’
‘মা, আমি তোর বাপ! তোর জন্মদাতা! তুই আমাকে এভাবে ফিরিয়ে দিতে পারিস না।’
‘ধর্মের জন্য আমি সব পারি আব্বা। আমার কাছে আপন পিতা-মাতার চাইতেও রাসূল অধিক প্রিয় ও সম্মানিত। রাসূলের শত্রু বাপ হলেও আমার শত্রু। আমাকে মাফ করবেন, আমি আপনার কোনো উপকারে আসতে পারবো না। আপনি রাসূলের কাছে যান।’
আবু সুফিয়ান অপমানিত হয়ে কন্যার দরজা থেকে ফিরে এলো। চললো মহানবীর দরজার দিকে। পথে সে এমন অনেককেই দেখলো, যারা একসময় তাকেই নেতা বলে মানতো। আজ তাকে দেখেই তারা মুখ ফিরিয়ে নিলো। কেউ যেচে এসে এ কথাটাও জিজ্ঞেস করলো না, ‘আপনি এখানে! এখানে আপনি কি জন্য এসেছেন?’ বরং উপেক্ষার হুল দিয়ে তারা যেন তার বুকটাই এফোঁড় ওফোঁড় করে দিলো।
আবু সুফিয়ান কোন সাধারণ লোক নন। ধনসম্পদে তিনি যেমন শ্রেষ্ঠ, তেমনি বংশমহিমায়। মহিমান্বিত কাবাঘরের হেফাজতকারী হিসেবে আরবের সর্বত্র তিনি সমাদরের পাত্র। এখনো তিনি মক্কার সরদার। এতটা অবজ্ঞা ও উপেক্ষা গায়ে মাখার কোনো দরকার তার ছিল না। কিন্তু একজন বিচক্ষণ সরদার হিসেবে এ মুহূর্তে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়াটা কিছুতেই সঙ্গত হবে না মনে করেই তার এত দৌড়ঝাঁপ।
তিনি এসে রাসূলের দরজার কড়া নাড়লেন। রাসূল তার সাথে মোসাফেহা করলেন। বসতে দিলেন তাকে। আবু সুফিয়ান বলল, ‘আমি আপনাকে কিছু কথা বলতে চাই।’
রাসূল তাকে অনুমতি দিয়ে বললেন, ‘বলুন।’
আবু সুফিয়ান খাজায়া গোত্রের ওপর আক্রমণ, সেই আক্রমণে কিছু কোরাইশ যুবকের অংশগ্রহণের কথা বর্ণনা করে বললেন, ‘এটা হুদায়বিয়া চুক্তির লঙ্ঘন হলেও এতে আমার কোনো অনুমোদন ছিল না।’ আবু সুফিয়ান আরো বললেন, ‘এটা একটা দুর্ঘটনা। এ কারণে আপনি যেন কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত না নেন সে অনুরোধ করতেই আমি এসেছি।’
আবু সুফিয়ান কথা বলছিলেন, রাসূল (সা) মাটির দিকে মুখ করে মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন তার কথা। আবু সুফিয়ান কথা শেষ করে উত্তর শোনার অপেক্ষায় তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। রাসূল (সা) কোনো কথা বললেন না, এমনকি মাটির দিক থেকে মুখ তুলে আবু সুফিয়ানের দিকে তাকালেনও না। আবু সুফিয়ান পেরেশান হয়ে বললেন, ‘কিছু বলুন। আপনি চাইলে আমি নতুন করে সে চুক্তিতে আবার স্বাক্ষর করে দিতে পারি।’
ঐতিহাসিক ইবনে হিশাম ও মাগাজির বর্ণনা থেকে জানা যায়, রাসূল (সা) তার কথার কোনো জবাব দেননি, এমনকি মুখ তুলে তাকানওনি। বরং রাসূল ছিলেন নিরুত্তর। তিনি ভাবছিলেন গত কালের কথা। খাজায়া গোত্রের প্রধানকে তিনি কথা দিয়েছেন তাদের তিনি সাহায্য করবেন। তিনি মুজাহিদদেরকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতেও নির্দেশ দিয়েছেন। যে ঘটনা ঘটেছে এতে এটাই যুক্তিযুক্ত। এখন আবু সুফিয়ানকে তিনি কী বলবেন? বলবেন, আমি আমার বাহিনীকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। নাকি বলবেন, ঠিক আছে, আপনি ফিরে যান, আমি কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নেবো না? কী করবেন তিনি? কী বলবেন? না, তিনি কিছুই বললেন না, মুখও তোললেন না।
আবু সুফিয়ান কয়েকবারই তার কথার পুনরাবৃত্তি করে কোনো জবাব না পেয়ে একসময় উঠে দাঁড়ালেন এবং মাথা নিচু করে কামরা থেকে বেরিয়ে গেলেন। নিরাশা ও অপমানে তার ফর্সা চেহারা বিবর্ণতায় ছেয়ে গিয়েছিল। তিনি জীবনে কখনো এমন অপমান বোধ করেননি। রাসূলের ঘর থেকে বেরিয়ে তিনি আবার মদিনার পথে নামলেন। ভাবলেন, কী করা যায়? অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটতে হাঁটতে এক সময় তার মনে হলো, আবু বকর রাসূলের সবচে প্রিয় দোস্ত। তাকে ধরলে কি তিনি রাসূলের মুখ খোলাতে পারবেন? আশায় বুক বেঁধে তিনি চললেন আবু বকরের কুটিরের দিকে। আবু বকরের সাথে দেখা করে তাকেও সব কথা খুলে বললেন। বললেন, ‘আবু বকর, তুমি তো আমাদেরই লোক। মুহাম্মদকে বুঝাও। আমি এ মুহূর্তে কোনো যুদ্ধবিগ্রহ চাই না।’
‘আপনি নিজেই তাকে এ কথা বলেন না কেন?’ আবু বকর (রা) বললেন, ‘আপনি কি চান সেটা তাকেই খুলে বলুন।’
‘সে চেষ্টা কি করিনি! কিন্তু তিনি আমার কোনো কথাই  শোনেননি।’
আবু বকর তখন ভাবছিলেন অন্য কথা। ভাবছিলেন, কেমন করে তিনি তোমার কথা শোনবেন? তোমার কি মনে পড়ে না ওহুদ যুদ্ধের কথা। তোমার স্ত্রী তাঁর প্রিয় সাহাবীর কলজে চিড়ে খেয়েছিল। মুজাহিদদের নাক, কান কেটে তা দিয়ে মালা বানিয়ে সেই মালা পরে আনন্দে নৃত্য করেছিল। তুমি তার স্বামী এবং তাকে যুদ্ধে তুমিই টেনে এনেছিলে। এসব কথা মনে এলে কেউ কি কথা বলতে পারে? প্রকাশ্যে বললেন, ‘মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল। তিনি যদি তোমার কথা কানে না নেন তবে আমরা তোমার কোন কথারই জবাব দিতে পারবো না। তুমি কি শোননি, তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহ এক, তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। যদি শুনে থাকো তবে রাসূলের শত্রু কেন হলে?’
‘তুমি কি তবে আমাকে কোন সাহায্যই করবে না আবু বকর?’ আবু সুফিয়ানের কণ্ঠে অনুনয়।
‘না, আমি শুধু আমার রাসূলের অনুসারী। তার কথার বাইরে আমার কোনো কথা নেই।’ বললেন আবু বকর, ‘যা বলার তুমি রাসূলকেই বলো।’
আবু সুফিয়ান আবু বকরের ঘর থেকেও নিরাশ হয়ে বেরিয়ে এলো। কিন্তু এত সহজেই হাল ছেড়ে দেয়ার পাত্র তিনি নন। এবার তিনি গেলেন হজরত ওমরের কাছে। ওমর (রা) তাকে দেখেই বলে উঠলেন, ‘আরে! আবু সুফিয়ান যে!’
আবু সুফিয়ান ওমর (রা)-এর কথায় কিছুটা আন্তরিকতার ছোঁয়া অনুভব করলেন। বললেন, ‘হ্যাঁ, তোমার সাথে একটি বিষয়ে আলাপ করতে এসেছি।’
‘বলো, কী ব্যাপারে আলাপ করতে চাও?’ ওমর (রা) আন্তরিকতা নিয়েই তাকে বসতে দিলেন।
আবু সুফিয়ান তাকেও সবকিছু খুলে বললেন। জানালেন রাসূল (সা) তার কথা শুনে কোনো জবাবই দেননি। ওমর (রা) বললেন, ‘আবু সুফিয়ান, তুমি আমার শত্রু নও। তবে তুমি ইসলামের শত্রু, আল্লাহর রাসূলের শত্রু। আল্লাহ দ্বীনের শত্রু। তোমার কথা শুনে আমি তোমাকে এটুকুই বলতে পারি, এখন আমার একটাই কাজ, যা আমার রাসূল (সা) করেছেন। রাসূল (সা) যেহেতু এ ব্যাপারে মুখ খোলেননি, সে ক্ষেত্রে আমারও আর কিছু বলার নেই। এ বিষয়ে আমি আর কিছুই বলবো না। অন্য কোনো বিষয়ে আলাপ করতে চাইলে করতে পারো, নইলে আমাদের আলাপ এখানেই শেষ।’
ওমর (রা)কে আবু সুফিয়ান ভালো করেই চিনতেন। তাই আর কিছু বলা নিরর্থক মনে করে সেখান থেকে উঠে এলেন আবু সুফিয়ান। এরপর তিনি একই কথা নিয়ে দেখা করলেন হযরত আলী (রা) ও নবী তনয় ফাতেমা (রা)-এর সঙ্গে। কিন্তু কেউ তাকে বিন্দুমাত্র সহযোগিতা করতে রাজি হলো না।
আবু সুফিয়ান নিরাশ হয়ে মদিনা ছেড়ে মক্কার পথ ধরলেন। তার দেহমনে এক ধরনের অবশতা কাজ করছিল। নির্জীব হয়ে তিনি বসেছিলেন ঘোড়ার পিঠে। কোনরকম ব্যস্ততা নেই। ঘোড়াটি যেন মনিবের মনোভাব বুঝতে পারলো। সেও ঢিমেতালে পা চালাচ্ছিল মক্কার পথে। মালিক ঘোড়ার মর্জির ওপর ছেড়ে দিল চলার ভার। আবু সুফিয়ান তখন ছিল চরম বিপর্যস্ত ও উদাসীন। মনের চোখ দিয়ে সে দেখছিল মুহাম্মদের অতীত ও ভবিষ্যৎ। তার কল্পনার চোখ তাকে আশার আলো না দেখিয়ে তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল আরো গভীরতর অন্ধকারে।
মদিনা থেকে আবু সুফিয়ান বেরিয়ে যাওয়ার পর রাসূলে আকরাম তাঁর বিশিষ্ট সাহাবীদের ডাকলেন। বললেন, ‘আমরা খাজায়া গোত্রকে কথা দিয়েছি, তাদের সাহায্যে আমরা এগিয়ে যাবো। সন্ধিচুক্তির শর্তও ছিল তাই। আমি চাই, আমাদের সমস্ত শক্তি একত্রিত হোক। দ্রুত প্রস্তুতি নাও। প্রস্তুতির খবর যেন মক্কা না যায় সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখবে। আমরা তাদের কোনো সময় দিতে চাই না। তারা যেন তাদের মিত্রদের ডাকতে না পারে সেটাও খেয়াল রাখতে হবে। আমরা ঝড়ের বেগে ছুটে যাবো এবং খাজায়া গোত্রের মনে যে আঘাত লেগেছে সে দাগ আমরা মুছে দেবো ইনশাআল্লাহ।

মদিনায় শুরু হলো সাজ সাজ রব। চারদিকে যুদ্ধের তুমুল প্রস্তুতি চলছে। তীরকোষগুলো নতুন তীরে ভরে যাচ্ছে। শান দেয়া হচ্ছে তলোয়ারে। ঘোড়াগুলোকে দলাই মলাই করে সতেজ ও সজীব করে তোলা হচ্ছে। রাতদিন একাকার হয়ে গেছে মুসলমানদের। তাদের চোখে ঘুম নেই। নাওয়া খাওয়ার সময় নেই। কেবল কাজ আর কাজ। কেবল যুদ্ধের প্রস্তুতি। কেবল অস্ত্রের ঝনঝনানি। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন বর্শা। যুবকরা মহড়া দিচ্ছে। তাদের দেখাদেখি শিশুরাও নেমে পড়েছে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায়। নারীরাও ব্যস্ত। এটা সেটা এগিয়ে দিচ্ছে মুজাহিদদের। বাড়িতে এসে খেতে গেলে সময় নষ্ট হবে, সে জন্য রান্না করা খাবারগুলো পৌঁছে দিচ্ছে কারখানায়। সর্বত্র উৎসাহ ও প্রেরণা। সর্বত্র যুদ্ধের বিরামহীন প্রস্তুতি।
মদিনায় তখনো একঘর নিরীহ ইহুদি বসবাস করতো। সেখানে চলছিল ভিন্ন ব্যস্ততা। সেই বাড়িতে একজন অপরিচিত লোক অবস্থান করছিল। রাতের আঁধারে সে বাড়িতে ঢুকেছিল, আর বের হয়নি। বাড়িতে ছিল এক বৃদ্ধ ইহুদি, মধ্যবয়সী তার দুই ছেলে ও ছেলেদের বউ, একমাত্র কন্যাসন্তানটি এখন যুবতী হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া ছিল কয়েকটি শিশু, যারা বৃদ্ধের দুই সন্তানের ভাবী বংশধর।
আগন্তুক বললো, ‘আমি মুসলমানদের প্রস্তুতি দেখে এসেছি। এদের প্রস্তুতি দেখে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, অচিরেই তারা মক্কা আক্রমণ করবে। মুহাম্মদ যুদ্ধ কৌশলে বড়ই নিপুণ। সে মক্কাবাসীদের সম্পূর্ণ অজ্ঞাতে তাদের ওপর আক্রমণ চালাতে চায়। তার চাল বুঝে ওঠা সত্যিই কঠিন।’
‘আমরা এখন কী করতে পারি?’ বৃদ্ধ বললো।
‘সম্মানিত মুরব্বি, আমাদের এখন কিছুই করার নেই।’ বললো আগন্তুক।
‘কিন্তু কিছু তো করতেই হবে। আমরা তো এভাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারি না।’
‘তাহলে আপনিই বলুন আমরা এখন কী করতে পারি?’ বলল আগন্তুক।
‘আমরা মক্কাবাসীদের সতর্ক করতে পারি। তাদের জানাতে পারি মুহাম্মদের প্রস্তুতির কথা। তাদের বলতে পারি, তোমরা তোমাদের বন্ধু সম্প্রদায়গুলোকে একত্রিত করো। প্রস্তুত হও মুহাম্মদের হামলা মোকাবেলা করার।
তাদের আরো বলতে পারি, মক্কা থেকে মদিনার যে পথ, এই পথের দু’পাশে মক্কাবাসীদের যেসব বন্ধু আছে তাদেরকে সতর্ক করার। তারা যদি মুহাম্মদের পথের দু’পাশে ওঁৎ পেতে থাকে এবং প্রতি রাতে মুহাম্মদের তাঁবুতে আঘাত হানতে পারে তবে মক্কা পৌঁছার আগেই মুসলমানদের একটা বিরাট অংশকে নিঃশেষ করে দেয়া সম্ভব। যারা বেঁচে যাবে তারাও মনোবল হারা হয়ে যাবে।
আগন্তুক উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘সেই সত্তার কসম, আমরা যার পূজা করি, আপনি সত্যিই খুব বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী। আপনি একনিষ্ঠ সত্য পূজারি। প্রভু আপনাকে অনেক জ্ঞান ও বুদ্ধি দিয়েছেন যেন আপনি তার উত্তম সেবক হতে পারেন। আচ্ছা, আপনি বৃদ্ধ মানুষ, কিন্তু আপনার ছেলেরা তো বুড়ো নয়, তাদের কেউ মক্কা যেতে পারে না?’
‘না, মুসলমানরা প্রত্যেক অমুসলমানকেই অবিশ^াস করে ও সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে থাকে। তারা জানে যে আমরা ইহুদি। আমাদের কেউ এ সময় মদিনা না থাকলে তারা সন্দেহ করবে। আমি আগে যেমন কৌশল খাটিয়ে এসেছি এখনো তেমনি কৌশল খাটিয়ে যাবো। আমাকে সেই ইহুদি হত্যার প্রতিশোধ নিতে হবে যারা মুসলমানদের হাতে নিহত হয়েছে। আমার শিরায় শিরায় বনু কোরায়জার খুন প্রবাহিত হচ্ছে। আমার দায়িত্ব হচ্ছে, আমি যেন হত্যার বদলে হত্যা করি। মুসলমানের ওপর আঘাতের পর আঘাত হেনে যাই। আমি আমার দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে পারি না, বোকামি করে নিজের ও সন্তানদের বিপদ ডেকে আনতে পারি না।’ বৃদ্ধ বলল।
আগন্তুক বললো, ‘আপনার সঙ্কল্প সফল করার জন্যই তো কাউকে মক্কা যাওয়া দরকার। মুসলমানদের রক্ত পান করার এই সুযোগ আপনি কাজে লাগাবেন না?’
‘দেখো, আমি বৃদ্ধ। মক্কা অনেক দূর। ঘোড়া বা উটে চড়ে এত দূরের পথ আমি সফর করতে পারবো না। আমার ছেলের যাওয়ার বিপদ কি তা আমি তোমাকে বলেছি। তার ওপর সে অসুস্থ। কোন নারী বা শিশুর পক্ষেও এ দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। তাই এ দায়িত্ব আমরা নিতে পারছি না।’
আগন্তুক একটি থলে বের করে তা বৃদ্ধের সামনে রাখলো। বললো, ‘এটা দেখো। এর ভেতর আছে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা। এই কাজের বিনিময়ে তুমি এটা পাবে। আর পাবে আমাদের বন্ধুত্ব। তুমি যে স্বপ্ন দেখছো আমরা তা বাস্তবায়ন করবো। তোমার হয়ে মুসলমানদের রক্ত পান করবো। এ দায়িত্ব পালন না করলে প্রভু আমাদের ওপর অসন্তুষ্ট হবেন। আমরা সবাই কুষ্ঠরোগে মারা যাবো। এবার বলো, তুমি কী করবে?’
[চলবে]

ঘরের ভেতর কথা হচ্ছিল। ঘরের সবাই শুনছিল আগন্তুক ও বুড়োর কথোপকথন। বুড়োর ছেলের বউ কথা বললো এবার। মধ্যবয়সী এই মহিলা বলল, ‘আমার উটনী দেখো। মদিনায় এমন চমৎকার উটনী কারো নেই। যেমন নাদুসনুদুস তেমনি দ্রত সে ছুটতে পারে। তোমরা কি মনে করো আমি এই দায়িত্ব পালন করতে পারবো?’
বুড়োর এই বউটি চালাক চতুর এবং কর্মঠ। সে চাইলে এই দায়িত্ব পালন করতে পারবে। কিন্তু এমন একটি কঠিন কাজ তাকে দেয়া কি ঠিক হবে? বুড়ো মনে মনে এসব ভাবছিল আর তাকিয়ে দেখছিল ছেলের বউকে। আগন্তুক বললো, ‘তুমি ঠিক পারবে। পারতে যে তোমাকে হবেই। প্রভু হয়তো এই দিনটির জন্যই তোমাকে বাছাই করে রেখেছিল।’
সে তার পকেট থেকে একটি চিঠি বের করলো। বললো, ‘নাও, এই চিঠিটি তুমি তোমার চুলের ভেতর লুকিয়ে রাখবে। মক্কা গিয়ে সোজা আবু সুফিয়ানের বাড়িতে উঠবে। তারপর এই চিঠি তার হাতে দেবে। খবরদার, তাকে ছাড়া আর কারো হাতে যেন এ চিঠি না পড়ে।’
‘তুমি কোন চিন্তা করবে না। এ চিঠি আমি ঠিক তার হাতেই দেবো। আমার অনুপস্থিতি মদিনার কারো নজরেই পড়বে না। সবাই জানে আমি ও আমার ছেলে এই উট ও বকরিগুলো মদিনার বাইরে মাঠে চরাতে নিয়ে যাই। আমি উট নিয়ে বাইরে গেলে কেউ কিছু মনে করবে না। এরপর আমি উট নিয়ে মক্কার পথ ধরবো আর আমার ছেলে বকরিগুলো নিয়ে বাড়ি ফিরবে। আমি যে ফিরিনি এটা খেয়াল করার জন্য কেউ এখানে বসে নেই।’
‘হ্যাঁ, তাই যাও। ভাল কথা, তোমাকে বলে রাখি, তোমার কাজের অর্ধেক মূল্য এখানে আছে। বাকি অর্ধেক পাবে কাজ সমাধা করে ফিরে এলে।’
মহিলাটি চিঠি মাথার চুলে গুঁজতে গুঁজতে বললো, ‘দাও। তোমার পুরস্কারের থলিটি আমাকে দাও। আমি কাজ শেষে ফিরে এলেই বাকি অর্ধেক দিও। আর যদি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমি মারা যাই, আর কোনদিন আমি ফিরে আসতে না পারি তবে বাকি টাকা তুমি আমার অসুস্থ স্বামীর হাতে তুলে দেবে। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, তুমি যে দায়িত্ব আমাকে দিলে আমি তা সুচারুরূপেই পালন করবো। অচিরেই তুমি শুনতে পাবে, যে পরিমাণ মুসলমান মদিনা থেকে বের হয়েছে মক্কা পৌঁছার আগেই তার অর্ধেক নিঃশেষ হয়ে গেছে। তারা মদিনা ফিরে আসবে ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে। তাদের মুখ থাকবে মাটির দিকে আর মুখে থাকবে ব্যর্থতা, ক্লান্তি ও হতাশার ছাপ।’
আগন্তুক ইহুদি বললো, ‘যতটা সম্ভব দ্রুত পথ চলবে। যে কোন ইহুদি বসতি হবে তোমার নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র। তুমি ফিরে না আসা পর্যন্ত আমরা তোমার পথের দিকে তাকিয়ে থাকবো।’
বুড়ো, তার অসুস্থ স্বামী এবং আগন্তুকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মহিলা তার উটনী নিয়ে পথে নামলো।
এই মহিলার নাম কোনো ঐতিহাসিক উল্লেখ করেননি। তারা উট ও বকরি চরাতে মাঠে নিয়ে যাচ্ছিল। কেউ যদি তাদের লক্ষ্য করতো তবে দেখতে পেতো, উটগুলোর পিঠ খালি কিন্তু উটনীর পিঠে সওয়ারি বহন করার গদি বাঁধা ছিল। গলায় মশকভরা পানি এবং একটা বড়সড় খাবারের থলিও ছিল। মহিলাটি পশুর পাল নিয়ে মদিনার বাইরে চলে এলো।
মহিলা বাড়ি থেকে বেরিয়েছে অনেকক্ষণ হয়ে গেল। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। আগন্তুক বাড়ির ছোট বউকে বললো, ‘যাও, সে এতক্ষণে নিশ্চয়ই অনেক দূর চলে গেছে। তুমি গিয়ে ছেলের সাথে হাত মিলিয়ে উট ও বকরিগুলো নিয়ে এসো।’
ছোট বউ বলল, আমার কাজ আছে। তুমি জারিয়াকে বলো মাঠে যেতে। আগন্তুক জারিয়াকে বলতেই সে হাতে পশু চরানোর একটি লাঠি নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। বাড়িটা চোখের আড়াল হতেই সে নির্দিষ্ট মাঠের দিকে না গিয়ে শহরের এক গলিপথে ঢুকে গেল। হাঁটতে হাঁটতে সে এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল, যেন কাউকে খুঁজছে। একসময় সে শহরের শেষ মাথায় চলে এলো। সেখানে এক বিশাল মাঠ। মাঠে মুসলমানদের যুদ্ধ প্রশিক্ষণ চলছে। একদিকে নেজাবাজি ও তলোয়ারের ঝনন ঝনন চলছিল, অন্যদিকে চলছিল উটের দৌড়। লোকজন ভিড় করে খেলা দেখছিল।
যুবতী নির্দিষ্ট কাউকে খুঁজছিল। ভিড়ের মধ্যে খুঁজে ফিরছিল তার কাক্সিক্ষত জনকে। এতক্ষণ খোঁজার পরও তাকে না পাওয়ায় যুবতীর চেহারায় উৎকণ্ঠা দেখা দিল। সে তার হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল আর মাঠের চারদিকে চক্কর দিতে লাগলো। এক যুবক জটলার মধ্যে বসে বসে খেলা দেখছিল, হঠাৎ তার চোখ পড়লো মেয়েটির ওপর। যুবক উঠে দাঁড়াল এবং কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে বেরিয়ে এলো জটলা থেকে। সে মেয়েটির কাছে গেল এবং নিচুস্বরে ডাকলো, জারিয়া! যুবতী চমকে পেছনে তাকিয়ে যুবককে দেখতে পেল। সে হাঁটার গতি কমিয়ে দিল এবং ছেলেটিকে আরো কাছে আসতে দিল। ছেলেটিকে দেখেই মেয়েটির উৎকণ্ঠা দূর হয়ে গিয়েছিল। ছেলেটিকে সে বললো, চলো, কথা আছে। এখানে বলা যাবে না। যেখানে আমরা উট বকরি চরাই সেখানে চলে এসো।
মেয়েটি এ কথা বলেই একাকী হাঁটতে লাগলো। হাঁটতে হাঁটতে সে ওখানে চলে এলো যেখানে মেয়েটির উট চরে বেড়াচ্ছিল। মেয়েটি পেছন ফিরে দেখলো ছেলেটির ছায়া পর্যন্ত নেই। আবারো উৎকণ্ঠায় পেয়ে বসলো মেয়েটিকে। সে খানিক পায়চারি করলো। উৎকণ্ঠা তার বেড়েই চলছিল। শেষে এক সময় দেখলো ছেলেটি আসছে। ছেলেটিকে আসতে দেখেই সে একটা উঁচুমত জায়গায় বসে পড়লো। উৎকণ্ঠা দূর হয়ে সেখানে স্বস্তি ফিরে এলো।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছিল। ছেলেটি কাছে আসতেই সে বলল, ‘ও আবিদ, তুমি এত দেরি করলে কেন? আমি তো অস্থির হয়ে পড়েছিলাম।’
‘আমি কি তোমাকে অস্থিরতা দূর করার ওষুধ বলে দেইনি? তুমি আমার ধর্মে এসে যাও, দেখবে তোমার সব অস্থিরতা চলে গেছে। তোমাকে কতবার বলেছি, তুমি যদি ইসলাম কবুল না করো তবে তোমাকে বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’ ছেলেটি মেয়েটির পাশে বসতে বসতে বললো, ‘জারিয়া, আবারও বলছি, তুমি মন ঠিক করো। আচ্ছা জারিয়া, বলতো, এভাবে লুকিয়ে পালিয়ে আর কতকাল আমরা দেখা করবো?’
‘আচ্ছা, সে কথা পরে হবে।’ জারিয়া বললো, ‘আমার ভালোবাসা কোন ধর্মের বাধা মানে না। আমার দেবতা তুমি, ধর্ম তুমি। সারাদিন আমি তোমাকেই কল্পনা করি। সারারাত তোমাকে স্বপ্নে দেখি। কিন্তু সে আলোচনা এখন থাক। আমার মনের ওপর এখন শত মণ বোঝা চেপে আছে। সেই বোঝার ভারে আমি মুষড়ে পড়েছি।’
‘কী বোঝা!’ আবিদ উদ্বেগের সাথে বলল।
‘মুসলমানরা মক্কা আক্রমণ করতে যাচ্ছে। তোমার ধর্মের দোহাই! তুমি যেয়ো না আবিদ। তোমার যদি কিছু ঘটে যায়, কসম খোদার, আমি বাঁচবো না।’
জারিয়ার কথা শুনে হাসল আবিদ। বলল, ‘তুমি ভেবো না জারিয়া। মক্কার লোকদের এমন মনের জোর নেই যে, তারা আমাদের মোকাবেলা করে। শোননি, আবু সুফিয়ান আমাদের নিবৃত্ত করতে এসে ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেছে? তবে তোমাকে একটা কথা বলি, আমাদের নবী যদি আমাকে আগুনে ঝাঁপ দিতে বলেন তবে আমি বিন্দুমাত্র ইতস্তত না করে সেই আগুনে ঝাঁপ দেবো। আগুনে ঝাঁপ দিলে আমি বাঁচবো না মরবো সে চিন্তা আমি একবারও করবো না।’
‘তুমি আগুনে ঝাঁপ দাও তাতে আমি আপত্তি করছি না, কিন্তু আমার অনুরোধ, তুমি এ অভিযানে শরিক হবে না।’
‘তোমাকে তো বলেছি, আমাদের মোকাবেলা করার মত মনের  জোর মক্কার লোকদের নেই। তুমি আমাদের পরিকল্পনা জানো না, আমরা এমন অতর্কিতে তাদের ওপর আক্রমণ করবো যে, তাদের ঘাড়ের ওপর তলোয়ার স্পর্শ করার আগে তারা এই আক্রমণ সম্পর্কে কিছুই জানতে পারবে না। তুমি তোমার মনের বোঝা হালকা করো।’
‘না, আবিদ, না। এত সহজ হবে না।’ জারিয়া আবেগে আবিদের মাথা বুকে চেপে বলল, ‘তুমি যেমনটি ভাবছো তেমনটি কখনোই হবে না। মক্কার লোকেরা সবাই তোমাদের জন্য প্রস্তুত হয়ে বসে থাকবে। এমনকি মক্কা পৌঁছার আগেই তোমরা আক্রান্ত হতে পারো।’
‘এ কথা কেন বলছো তুমি?’ আবিদ আশ্চর্য হয়ে বললো, ‘তোমার কেন ধারণা হলো মুসলমানরা পথেই আক্রান্ত হবে?’
‘কারণ আগামীকালের মধ্যেই আবু সুফিয়ান জেনে যাবে, তোমরা মক্কা আক্রমণ করতে যাচ্ছো। মদিনা থেকে মক্কা যাওয়ার যে পথ, সে পথের দু’পাশে কোরাইশদের যেসব বন্ধু সম্প্রদায় আছে তারাও জেনে যাবে এ খবর।’
আবিদের পঞ্চইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠলো। সে জারিয়ার বুক থেকে মাথা তুলে বললো, ‘বলছো কি তুমি জারিয়া! আবু সুফিয়ান কী করে জানবে আমরা তাদের আক্রমণ করতে যাচ্ছি? কে তাদের জানাবে এ সংবাদ?’
‘জানাবে, কেউ না কেউ তো জানাবেই। তুমি কি করে ভাবলে এতবড় অভিযানের খবর গোপন থাকবে?’
‘না জারিয়া। এটা হেঁয়ালির বিষয় নয়। আমার মন বলছে, তুমি আমার কাছে কিছু গোপন করছো। কে আবু সুফিয়ানকে সতর্ক করবে সেটা তুমি জানো। আমাকে সব খুলে বলো, নইলে বিপদে পড়ে যাবো আমরা।’
জারিয়া মাথা নিচু করে খানিক ভাবলো। এরপর বললো, ‘এ খবর আবু সুফিয়ানকে দেবে এক ইহুদি।’
‘এখানে তো তোমরা ছাড়া আর কোনো ইহুদি নেই। তাহলে কেমন করে অন্য ইহুদি এ খবর পাবে?’
‘আবিদ।’ ধরা গলায় বলল জারিয়া, ‘অন্য ইহুদি নয়, এ খবর আবু সুফিয়ানকে পৌঁছাবে আমার বড় ভাইয়ের বউ, আমার ভাবী।’
সন্ধ্যার সেই গোধূলিলগ্নে হঠাৎই যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত হলো। দু’জনই নির্বাক, নিথর হয়ে গেল। কেউ কোনো কথা বলছে না। আবিদ এতটাই অবাক হয়েছে যে, সে যেন বাকহারা হয়ে গেছে। আর জারিয়ার যা বলার তা তো সে বলেই ফেলেছে। বেশ কিছু সময় এই নীরবতার মধ্যে কেটে গেল। জারিয়া আবিদের বাহু ধরে বলল, ‘আবিদ, আমি তোমাকে এমন গোপন তথ্য দিয়েছি, যা তুমি কখনো কল্পনাও করোনি। এক ইহুদি কন্যা হিসেবে এ কথা কারো কাছে প্রকাশ করা ঘোরতর অন্যায় জেনেও আমি তা বলতে বাধ্য হয়েছি। কারণ আমার পিতামাতা, ভাই-ভাবী, আমার পরিবারের চেয়েও আমার ভালোবাসা আমার কাছে দামি। আমার সেই ভালোবাসার দোহাই, তুমি এ অভিযানে যাবে না। তুমি জানো না তাদের পরিকল্পনা। পথে প্রতি রাতে তোমাদের ওপর চোরাগুপ্তা হামলা চালানো হবে। মক্কা পৌঁছার আগেই তোমাদের বাহিনীর বহু লোক মারা পড়বে। অবশিষ্ট যারা থাকবে তাদের মোকাবেলা করতে হবে সম্পূর্ণ প্রস্তুত একটি বাহিনীর সাথে। ফলে খুব কম লোকই তোমাদের মদিনায় ফিরে আসতে পারবে। ভাগ্যগুণে যারা বেঁচে যাবে তারাও থাকবে আহত, ক্লান্ত। সব খুলে না বললে তোমাকে ফেরানো যাবে না বলেই এসব বলতে হলো আমাকে। আবিদ, তাই বলছি, আমার কথা শোন, মক্কা যাওয়ার সঙ্কল্প ত্যাগ করো তুমি।’ জারিয়ার কণ্ঠে মিনতি ও অনুনয়।
আবিদ গভীর আগ্রহ নিয়ে শুনছিল জারিয়ার কথা। বলল, ‘তোমার ভাবী কখন রওনা হয়েছে? কিসে যাচ্ছে?’
জারিয়ার কাছ থেকে সব শুনলো আবিদ। তারপর এক ইহুদি যুবতীর চুলের ঘ্রাণ পেছনে ফেলে ছুটলো শহরের দিকে। জারিয়া বলল, ‘কি করছো আবিদ? কোথায় যাচ্ছো?’
আবিদ যেন এসব শুনতেই পেলো না। সে আগের মতই ছুটতে লাগলো। জারিয়া কিছু দূর তার পিছু পিছু ছুটে গেল। বলল, ‘আবিদ, থামো। আমার কথা শোন আবিদ। তুমি কি করতে চাচ্ছো?’
কিন্তু কে শোনে কার কথা? এসব ডাক আবিদের গতিকে বিন্দুমাত্র শ্লথ করতে পারলো না। একটু পরই সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে হারিয়ে গেল আবিদ। জারিয়া দৌড় থামিয়ে ধপাস করে মাটির ওপর বসে পড়লো। জারিয়ার মনে হলো সন্ধ্যার অন্ধকার নয়, তাকে গ্রাস করছে কেয়ামতের সীমাহীন অন্ধকার।

SHARE

Leave a Reply