Home গল্প অনুবাদ গল্প বাড়ি ফেরা অ্যানা ক্লেয়ার ফ্লাড -অনুবাদ : হোসেন মাহমুদ

বাড়ি ফেরা অ্যানা ক্লেয়ার ফ্লাড -অনুবাদ : হোসেন মাহমুদ

১৮৩৪ সাল। এ বছরটির কথা যখনি মনে পড়ে তখনি মনে হয় যুদ্ধ সম্পর্কে আমার ধারণা কত না ভুল ছিল!
আমি তখন ছিলাম এক বালক মাত্র। বারোর কাছাকাছি বয়স। এ সময় এক ড্রামবাদক বালক হিসেবে আমি আমেরিকার গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ি। সত্যি বলতে কী, যুদ্ধে যোগদান ও লড়াই করার জন্য আমারও খুব আগ্রহ ছিল।
বাবা ও মা’র কাছে আমি ‘দেম ব্লুবেলিজ’দের কথা শুনেছিলাম। ‘দেম ব্লুবেলিজ’-এর অর্থ শিং ও লেজওয়ালা জন্তু। আসলে কনফেডারেট বিরোধীদের এ নামে আখ্যায়িত করা হতো। বাবা কোনো ক্রীতদাসের মালিক হতে বা তাদের দিয়ে কোনো কাজ করাতে পারবেন না বলে তারা নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। শোনা যাচ্ছিল, জেনারেল শেরম্যান যুদ্ধে আরেকটু ভালো অবস্থায় পৌঁছলেই এসব বিধি-নিষেধ কার্যকর করা হবে।
একদিন শুনতে পেলাম, ‘দেম ব্লুবেলিজ’রা উত্তর দিক থেকে আটলান্টার দিকে আসছে। এদিকে কনফেডারেটদের ড্রামবাদক বালক দরকার। যাকে বলে নেচে ওঠা- আমার অবস্থা হলো তাই।
বাবা-মাকে সাফ জানিয়ে দিলাম আমি যুদ্ধে যাচ্ছি। তারা আমাকে নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলেন যে যুদ্ধ খুবই খারাপ একটা ব্যাপার। এমনকি আমি মারাও যেতে পারি। কিন্তু তাদের ওসব উপদেশ বা সৎপরামর্শ শোনার মতো মানসিক অবস্থা আমার ছিল না। তাই তারা যা বললেন সেগুলো আমার এক কান দিয়ে ঢুকে আরেক কান দিয়ে বেরিয়ে গেল।
আমি ভেবে দেখলাম যে বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধই হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম পন্থা। যারা শক্তিশালী তারাই যুদ্ধে জিতবে। সুতরাং দক্ষিণাঞ্চল তাদের এলাকায় প্রচলিত দাসপ্রথা বহাল রাখতে চাইলে আলাদা একটি দেশেও পরিণত হতে পারে। ঠিক? ভুল। দেম ইয়াংকিরা নানা মত ও পথের মানুষ। ঠিক? ঠিক। তারা শুধু নানা মতের মানুষ- তবে শিং ও লেজবিশিষ্ট জন্তু নয়। যাহোক, তখনো আমি জানতাম না যে কখন যুদ্ধে যোগ দেবো।
টেনেসির ন্যাশভিলে কনফেডারেট সদর দফতরে পৌঁছলাম। আমাকে একটি ধূসর রঙের ড্রাম দেয়া হলো। তাতে লেখা ছিল- ‘কনফেডারেট ড্রামবাদক বালক।’ রোগা, দীর্ঘদেহী এক অফিসার আমার জুতা, শার্ট ও প্যান্টের সাইজ জানতে চাইলেন।
কাঁধ ঝাঁকালাম- জানি না।
তখন তিনি আমার বয়সের কথা জিজ্ঞেস করলেন।
বললাম-বারো।
ব্যস! তিনি সব জিনিসই ওই বারো সাইজের দিলেন।
বুটগুলো এত বড় হলো যে হাঁটতে গিয়ে বারবার হোঁচট খেয়ে পড়া ছাড়া উপায় থাকল না। শার্ট ও প্যান্ট হলো ভীষণ টাইট। ঝুলেও তা খুব ছোট হলো। আমি অফিসারকে পরিস্থিতি বোঝানোর জন্য বহু চেষ্টা করলাম। শেষ পর্যন্ত তিনি বলে দিলেন যে আমি যদি ঘ্যান ঘ্যান করা ও অভিযোগ করা বন্ধ না করি তাহলে তিনি উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবেন।
আত্মরক্ষার জন্য আমাকে একটি পিস্তল দেয়া হয়েছিল। সেটা বেল্টে গুঁজে রাখলাম। ইউনিফরমের নিচে একটি সাধারণ আন্ডার শার্ট ছিল। তার ওপর জ্যাকেট। ধূসর রঙের জ্যাকেটটির কলার ছিল চিবুক পর্যন্ত উঁচু। ইউনিফরমের কলার ও হাতায় ছিল নেভি-ব্লু রঙের পরিচিতি চিহ্ন। শরীরের সাথে ড্রাম আটকে রাখার জন্য বেল্ট জাতীয় একটি বন্ধনী দেয়া হয়েছিল। এটি ছিল খুবই বাজে যা আমাকে মা’র পার্সের কথা মনে করিয়ে দিত। কিন্তু তা পরতেই হতো, কারণ কনফেডারেট ড্রামবাদকের জন্য তা ছিল অত্যাবশ্যক। পরনে ছিল একটি ধূসর রঙের প্যান্ট। সাথে পরতাম নেভি বেল্ট। মাথায় থাকত ‘সি’ মনোগ্রাম শোভিত ধূসর ক্যাপ। ‘সি’ মানে কনফেডারেট। বুটেও ‘সি’ মনোগ্রাম থাকত। সব মিলিয়ে সামরিক পোশাকে আমাকে বেশ ভালোই দেখাত। আহা! বাবা যদি আমাকে এ অবস্থায় দেখতেন তাহলে না জানি কতই না গর্ব বোধ করতেন!
ঐ রোগা অফিসারটি আমাকে দক্ষিণ-পুবে টেনেসির ফ্রাংকলিনে গিয়ে সেখানে সেনাদলে যোগ দিতে বললেন। একজন ড্রামবাদক বালক হিসেবে আমার যাত্রা শুরু হলো। দীর্ঘ যাত্রা। পথ যেন শেষ হতে চায় না। পাঁচদিন লাগল ফ্রাংকলিনে পৌঁছতে। এর মধ্যে সাড়ে তিনদিন আমি পায়ে হেঁটেছিলাম। এ সময় এক সহৃদয় বৃদ্ধ ঘোড়া টানা ওয়াগন নিয়ে ঐ পথেই যাচ্ছিলেন। আমার সাথে দু’চার কথা হওয়ার পর বেশ আগ্রহ করেই আমাকে তিনি তার ওয়াগনে তুলে নিলেন। ফলে বাকি পথটুকু আরামেই পাড়ি দেয়া গেল। বৃদ্ধ ভদ্রলোকের নাম মি. স্মিথ। তিনি এত দয়ালু ছিলেন যে আমাকে শুধু তার ওয়াগনেই তুলে নেননি, ঘুমাবার কম্বল এবং পথের বাকি অংশে খাদ্য ও খাবার পানিও দেন। বেশ কয়েকবার ইয়াংকিরা তার ওয়াগন অতিক্রম করে। যতবারই তাদের সাথে দেখা হয়েছে ততবারই তিনি পেছন দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বুঝিয়েছেন যে জলদি কর বাছারা- ওরা এসে পড়ল বলে। এরপর তারা যখন দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যেত তখন তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলতেন- যাক, বাঁচা গেল। কোনো কোনো সময় আমি মাথা তুলে চারপাশ তাকিয়ে দেখতাম। এদিকে মি. স্মিথ গলা ছেড়ে তার প্রিয় একটি গান গাইতে শুরু করতেন।
ফ্রাংকলিনে পৌঁছে বিরাট এক ধাক্কা খেলাম। আমাকে বলা হলো, এ সেনাদলে যথেষ্ট সংখ্যক ড্রামবাদক বালক আছে। তাই আমাকে জর্জিয়ার কেনে’স মাউন্টেনে যেতে হবে। আমি মি. স্মিথকে বিদায় জানাতে গেলাম। কিন্তু তিনি আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, ওয়াগনে উঠে পড় বাছা, আমিও সেদিকেই যাচ্ছি। আমি পরিষ্কার বুঝতে পারলাম তিনি মিথ্যা কথা বলছেন। আসলে তিনি নিজে আমাকে পৌঁছে দিতে চান। এ মহান মানুষটির প্রতি কৃতজ্ঞতায় আমার হৃদয় ভরে ওঠে।
পাহাড়ি এলাকার ভেতর দিয়ে দুর্গম পথে মি. স্মিথের সাথে আবার আমার চলা শুরু হলো। এবার পথ বেশি দীর্ঘ নয়- মাত্র তিনদিনেই আমরা পৌঁছে যেতে পারব। তবে ইয়াংকিরা ভীষণ ঝামেলা করতে শুরু করল। বারবার ওয়াগনের কাছে এসে নানা কথা জিজ্ঞেস করে চলল। এমনকি ওয়াগনের পেছনে রাখা মালপত্রও খোঁজাখুঁজি শুরু করল তারা। এরপর থেকে ইয়াংকিদের আসতে দেখলেই আমি ওয়াগনের পেছনের স্তূপ থেকে বেরিয়ে কাছাকাছি কোনো ঝোপ বা গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়তাম। ফলে আমাকে দেখতে পেত না তারা।
একদিন এক জাঁদরেল গোছের ইয়াংকি মি. স্মিথের কপালে পিস্তল ধরল। অন্যরা গোটা ওয়াগন তল্লাশি শুরু করে। তারা হুমকি দিয়ে বলল যে ওয়াগনে যদি কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় তাহলে তাকে গুলি করে মারা হবে। কিন্তু কাউকে খুঁজে না পেয়ে তারা মি. স্মিথের দু’টি ঘোড়ার মধ্যে ভালোটি, কিছু গাজর, দু’টি কম্বল, লবণ দেয়া কিছু মাংস ও রান্নার সরঞ্জাম লুট করে নিয়ে গেল।
মি. স্মিথ আমাকে বললেন, যে লোকটি তার মাথায় পিস্তল ধরেছিলেন তিনি ছিলেন জেনারেল শেরম্যান। ইয়াংকিদের প্রধান জেনারেল শেরম্যানকে আমি এর আগে দেখেছিলাম। আমি যত খারাপ লোকের কথা শুনেছি তাদের মধ্যে জেনারেল শেরম্যান ছিলেন নিকৃষ্টতম। তারপর থেকে ইযাংকিদের সাথে মি. স্মিথের কথা হলেই আমি কান খাড়া করে শুনতাম। এর মধ্যে জেনারেল গ্রান্টও এলেন। তবে তিনি শেরম্যানের মতো অত নীচ মানসিকতার ছিলেন না। তিনি মাত্র এক বস্তা ময়দা লুট করলেন। এমনকি মি. স্মিথ সম্প্রতি উত্তরাঞ্চলের কাউকে দেখতে পেয়েছেন কি না সে কথাও জিজ্ঞেস করলেন না।
অবশেষে আমরা কেনে’স মাউন্টেনে পৌঁছলাম। আমি সেখানে জেনারেল লির সাথে সাক্ষাৎ করলাম। তিনি আমাকে পর্বত চূড়া পাহারার দায়িত্ব দিলেন। আর প্রস্তুত থাকতে বললেন- কারণ যে কোনো সময় যুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে। আমি পরম উপকারী মি. স্মিথকে বিদায় জানালাম। কথা দিলাম যে তাকে চিঠি লিখব।
জেনারেল লি ঠিকই বলেছিলেন। ঘন্টা তিনেক পরই দেখা গেল, জেনারেল শেরম্যান তার ব্লুবেলিজ বাহিনী নিয়ে এগিয়ে আসছেন। আমি ভেবেছিলাম, আমাদের সৈন্যরা প্রস্তুত হয়ে আছে। কিন্তু আসলে তারা ছিল অপ্রস্তুত। জেনারেল শেরম্যান তার সৈন্যদের কামানের গোলাবর্ষণ ও গুলি ছুড়তে নির্দেশ দিলেন। কনফেডারেট সৈন্যরা সেই প্রচন্ড গোলা ও গুলির মুখে হেমন্তের বৃক্ষের ঝরা পাতার মত মাটিতে লুটিয়ে পড়তে লাগল। জেনারেল শেরম্যান ও তার ব্লুবেলিজ বাহিনীর সৈন্যরা তারপর কি করল জানেন? তারা কনফেডারেট সৈন্যদের সকলকে হত্যা করে তাদের জিনিসপত্র লুট করল। তৎক্ষণাৎ আমি বুঝতে পারলাম যে যুদ্ধ কী খারাপ জিনিস। ব্লুবেলিজরা যা করল তা কোনো ভালো কাজ নয় যদিও তারা ততটা খারাপ ছিল না। আমি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালালাম আর চিৎকার করে নিজেকে বললাম- আমি বাড়ি যাচ্ছি- আমি বাড়ি যাচ্ছি।
আমি বাড়ি ফিরে এলাম।
পরের বছরগুলো খুব খারাপ অবস্থার মধ্যে কাটল। বাবা তার চাষের খামার হারিয়েছিলেন। ক্রীতদাসরাও ছিল না। নিরুপায় হয়ে তিনি চাকরি খুঁজতে লাগলেন। খাদ্য ও পানির ভীষণ সমস্যা দেখা দিল। আমি একটি চাকরি নিতে বাধ্য হলাম। অবশেষে পরিবারের সকলের আন্তরিক ভালোবাসা, সাহায্য ও সমর্থনে সমস্যা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হলাম আমরা।
আপনাদের কাছে এ গল্পটা বললাম কেন জানেন? এর উদ্দেশ্য হলো এটা বলা যে বড় সমস্যা আসতে পারে, কিন্তু তা যত কঠিনই হোক- পরিবারের সবার সাহায্য ও সমর্থন থাকলে শেষ পর্যন্ত তা কাটিয়ে ওঠা যায়।

SHARE

Leave a Reply