Home গল্প রম্যগল্প বুড়ো মানুষটির সাথে -ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ

বুড়ো মানুষটির সাথে -ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ

ছুটির ঘণ্টা বাজলেই পুচকুর মন খারাপ হতে থাকে, শুধু খরাপ নয়, ভীষণ খারাপ, বুকের ভেতরটা তিরিতিরি কাঁপে, চোখে জল টলটল করে।
তা কারণটা কী? ও কি স্কুলে যেতে চায় না? টিচার বকুনি দেয়? নাকি ও পড়াশুনা শিখে স্কুলে আসে না? ব্যাপারটা কী খুব জানতে ইচ্ছে করছে- তাই না।
এর কোনোটাই নয়? তবে কি ও ছিঁচকাঁদুনে? না না- এসবের কোনটাই নয়। আসল ব্যাপার হলো ছুটির পর বাড়িতে যাওয়া নিয়ে পুচকুর ভীষণ টেনশন হতে থাকে।
মা-বাবা দু’জনেই কাজে ভারী ব্যস্ত। স্কুল শুরু হবার সময় ওদের কেউ পুচকুকে রেখে যায় সত্যি, কিন্তু ছুটির পর ওদের যেন আসার সময়ই হয় না, মা-বাবা দু’জনেই অফিসের কাজে ব্যস্ত। স্কুলে থেকে নিতে আসে ঠিকই কিন্তু অনেক দেরি করে।
সাদা শার্ট, নীল রঙের টাই, নেভি ব্লু রঙের প্যান্ট পরা ছেলেমেয়েরা সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে গেটের দিকে ছুটছে। কেউ মামার হাত ধরে, কেউ বাবার হাত ধরে, কেউ মামণির হাত ধরে ছুটে।
পুচকু এককোণে পিঠে ব্যাগ, হাতে পানির বোতল নিয়ে একা দাঁড়িয়ে থাকে। ক্লাসের বন্ধুদের বাড়ি ফেরার তাড়া। অসহায়ের মতো পুচকু তবু পেছন থেকে ডাকে, এই তাতুম, এই অথৈ, এই তুনু আয় না ভাই আর একটু খেলি।
ওদের মায়েরা বলে, নানা এখন আর খেলা নয়। কেন শৌভিক (পুচকুর ডাক নাম) তোমার মা-বাবা কেউ নিতে আসেনি?
এর কোনো জবাব দেয় না পুচকু। এ প্রশ্নের কোনো জবাব নেই যে, রোজই এমন হয়। বাবা তো আসেই না, মা-ই রোজ নিতে আসে, কিন্তু বড্ড দেরি করে।
স্কুল-বাড়ি প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়, ফুলের বাগানে কোত্থেকে যেন ছুটে আসে অগুনতি ফড়িং আর প্রজাপতি। গোটা আকাশ ইস্পাতের মতো জ্বলে, রোদ চড়চড় করে বেড়ে ওঠে। এমন সময় বুকের ভেতর পুড়ে যেতে থাকে পুচকুর।
স্কুলে আসার বেলা মা বলেছে তোমাকে আনতে আজকে আমি যাবো। গেট থেকে বের হবে না কেমন?
বাবা শেভ করতে করতে বলেছে, পুচকু সোনা আমি তোমাকে আনতে যাবো আজ।
.. উফ-পুচকুর ছোট বুকে আনন্দ উপচে পড়ে। মা-বাবার মাঝখানে থেকে দু’জনের হাত ধরে লাফিয়ে লাফিয়ে সে বাড়ি ফিরবে। মধুর এ কল্পনায় ডুবে থাকে সে।
তখন অবশ্য বাড়ি ফেরার অন্য রকম ব্যবস্থা ছিল। মায়ের বাবা (মায়েদের আবার বাবা থাকে, একটা মানের হলে হি হি করে খুব হাসি পায় ওর) রোজ গাড়ি হাঁকিয়ে ঠিক এগারোটায় স্কুলের গেট-এর সামনে এসে দাঁড়াতেন। ড্রাইভার স্কুলের ব্যাগ আর পানির বোতল টুপ করে নিয়ে নিত। আহা সে বড় সুখের দিন ছিল ওর। দাদু একদিন বেশ রেগে গেলেন, মাকে বললেন দ্যাখ বিনু, এ সময়টাতে কত কাজ কর্ম থাকে। শেয়ার মার্কেটে যাই, ব্যাংকে যাই, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে দেখা করতে হয়। আমারও তো একটা সংসার আছে। নাকি বুড়ো হয়েছি বলে আমার পেটে খিদে থাকে না, ইচ্ছে অনিচ্ছে কিছু থাকে না। তোর মাকে চোখের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো তারও ফুরসত নেই। পিক আওয়ারটাই আমার নষ্ট হয়ে যায় স্কুলে গিয়ে। কী যে সিন্দবাদের মতো বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিস। ছেলেকে নিজেরা একটু দ্যাখ।
মা রেগে বলল, তোমার আর পুচকুকে আনতে হবে না বাবা আমরাই আনব।
সেদিনই ঘটল বিপত্তি। মা-ও গেল না, বাবাও না। রোদ মাথার ওপর চড়তে থাকে স্কুলে ফাঁকা হয়ে গেল। বসে রইলেন শুধু প্রিন্সিপাল, দফতরি আর দু’জন টিচার।
দিদার কাছে ফোন এলো।
ক্লাস ওয়ানের শৌভিক সেনকে নিতে এলেন না যে, আমরা ওর জন্য বসে আছি। তাড়াতাড়ি কেউ আসুন। খটখট করে সিঁড়ি ভেঙে দাদু নামেন, গাড়িতে চেপে ছুটেন নাতির স্কুলে।
দেখেন, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে পুচকু। এ কান্নার যেন শেষ নেই। দারুণ ভয় পেয়েছি। দাদু জড়িয়ে ধরলে কান্না থামে ওর।
দাদু বাড়িতে ফিরে মেয়ের অফিসে ফোন করেন- এই তোমাদের দায়িত্ব জ্ঞান নেই? ছি: ছেলেকে দুশ, তিনশ, চারশ টাকা টিউশন ফি দিয়ে পড়াও, টাইমলি স্কুল থেকে আনতে পারো না? ছেলে তো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে। তোমার বাড়িতে যে মহিলা রাঁধে, ওকে স্কুল থেকে আনা নেয়া শেখাও।
বিনু ফোনের ওপার থেকে বলে, ও ভীষণ বোকা বাবা।
যাহোক সেই একদিনের ঘটনা থেকে ভয় বাসা বেঁধেছে পুচকুর মনে।
দাদু যখন নিতে আসত কী চমৎকার ছিল সে দিনগুলো, স্কুলের গেটের বাইরে ফেরিওয়ালাদের ভিড়-বাট্টা, সাজানো দোকান, খপ করে পুচকু ও ছোট ছোট ছেলেরা দোকান থেকে তুলে নিত পটেটো চিপস, লেইজের প্যাকেট।
চশমার কাচের ভেতর দিয়ে বড় বড় চোখে তাকিয়ে দাদু বলতেন, ব্যাড, ভেরি ব্যাড পুচকু, এই ছাইপাশগুলো কেন খাও? এর চেয়ে ডিম ফল খাওয়া অনেক ভালো তা জানো?
এই মূহূর্তে লাফিয়ে লাফিয়ে ভ্যানে-রিকশায় হেঁটে ছেলেরা বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। সঙ্গে কেউ না কেউ তো রয়েছে।
ক্লাসের বন্ধুরা হাসে কেউ নিতে আসেনি? গাড়ি কোথায়? তোর ওল্ড ম্যান দাদুটা কোথায়? যা যা শৌভিক ভ্যানে চাপ গিয়ে। কী ফুটুনিÑনা ও গাড়ি চড়ে।
কোথায় ফুটুনি দেখালাম রে, মিছেমিছি খোঁচা দিয়ে কথা বলছিস কেন? মনে মনে প্রশ্ন পুচকুর। স্কুলের বিরাট মাঠ আর ফুল বাগানের পাশে একা একা দাঁড়িয়ে থাকে ও। নিজেকে একা ভেবে ভীষণ কান্না পায় ওর।
দাদু আজকাল গাড়ি নিয়ে পুচকুকে নিতে আসে না। মা- বাবার আসার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই, রোজই অনেক দেরি করে। সেই বন্ধুরা সব মুচকি হাসে আর বলে, এই শৌভিক ওঠ ওঠ ভ্যানে গিয়ে চেপে বোস। গাড়ির স্বপ্ন দেখিস না।
লজ্জায় অপমানে মাথা নুয়ে বসে থাকে ও। মা-বাবার ওপর রোজই ভীষণ রাগ হয়। মনে মনে বলে বড় হলে কে না একা একা বাড়ি ফিরে। আমি পুচকু তখন কি আর একা ঘরে ফিরতে পারব না? খুব পারব, সে যখন মেজোর মতো পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চি লম্বা হবে তখন?
ক্লাসের বন্ধু রাতুল বলে, দুর বোকা তুই এত লম্বা হবিই বা কেমনে। তাহলে তোকে টিভির ঝুলন্ত বাবু হতে হবে। ঝুলতে থাক সারাদিন। রন্তু বলে। দুর পিচ্চি, তুই তো খাটো হবি। রতনদার মতো শর্ট হবি।
ঠিক আছে মেস্কোর মতো, নাই বা হলাম, মামুর মতো পাঁচ ফুট সাত তো হবোই স্কুলের দফতরি রতনদার মতো শর্ট হবো কেন? আমি বড় হয়ে এখান থেকে ওখানে যাবো, বড়দের মতো বাজার থেকে চাল ডাল মাছ কিনে আনব তখন তো গোঁফওয়াশ ছেলেধরা আমাকে ধরতে আসবে না। মা-বাবার জন্য এমন করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না।
আগামী দিনের কথা ভাবতে ভাবতে ফুরফুরে খুশিতে বুকের ভেতরটা ভরে ওঠে। পর মুহূর্তেই করুণ নিঃশ্বাস ফেলে।
মামনি কি আজকের কাজ রেখে আমাকে ঠিক ছুটির সময়ে এসে নিয়ে যেতে পারে না? হাঁফাতে হাঁফাতে বাবু যদি এক্ষুনি এসে বলে। কই, আমার পুচকু ব্যাটা কই?
তাইলে ক্লাসের ছেলেদের কাছে মাথা উঁচু করে বলতে পারতাম। দেখেছিস, মা-বাবা আমাকে কতো ভালোবাসে। শুধু তোরা নয় আমিও মা-বাবুর হাত ধরে বাড়ি ফিরি। বাবুর হাত ধরে সবার সামনে ও রিকশায় চাপত, হাত নেড়ে বন্ধুদের বলত, বাই বাই।
এই এই বৃষ্টি আসছে রে। শ্রাবণ মাস, বৃষ্টি তো যখন তখন নামবেই। আয়া কাছে এসে বলল- কি শৌভিকবাবা মা-বাবা কেউ আসেনি নিতে?
প্রিন্সিপাল বলেন, স্কুল ছুটি হয়ে গেছে, ছেলেটা অপেক্ষা করছে, কেউ নিতে আসেনি, হোয়াট ননসেন্স!
একজন টিচার বললেন, স্ট্যান্ডার্ড ওয়ানের শৌভিককে নিতে রোজই দেরি করে আসে মা-বাবা।
শৌভিক চোখ বুজে কী ভাবছে কেউ জানে না, ও শুধু মনে মনে বলে আমাকে যে সত্যি ভালোবাসে সে আমাকে নিতে আসবেই আসবে, দুই সেকেন্ডের মধ্যে, দুই মিনিটের মধ্যে আমাকে এসে কেউ বাড়িতে নিয়ে যাও প্লিজ আমি একা একা দাঁড়িয়ে আছি, বড় একা আমি। কেউ নেই আমার পাশে।
সত্যিই তাই হলো।
অসুস্থ এক বন্ধুকে দেখে দাদু পুচকুদের বাড়িতে গেলেন। গিয়ে শুনেন, এখনও ফিরেনি সে।
তাজ্জব দাদু বলিস কিরে সাড়ে বারোটা যে বাজতে চলল, ফের গাড়িতে ওঠেন দাদু।
– ড্রাইভার!
– জি, স্যার।
– পুচকুর স্কুলে চলো।
– ছোট মিয়ার স্কুলে?
– হ্যাঁ হ্যাঁ বড্ড কথা বলো তুমি টুটুল। জোরসে চালাও।
টেনশনে দাদুর শরীরে ঘাম ঝরছে। হারিয়ে গেল না তো ছোট ছেলেটা?
দারোয়ান বলছে হঠাৎ সুড়ুৎকরে ইঁদুরের মতো বেরিয়ে পড়বে? এ বান্দা থাকতে তা হবে না, ছোট্টু মিয়া।
পুচকু কোনো কথাই শুনছে না। কথা কানে গেলে তো রাগ হবে। সার্কিট হাউজ রোড থেকে নিউ ইস্কাটন আর কতদূর সেও তো দুষ্টু মেঘের মতো, দুরন্ত পাখির মতো এক পলকে ছুটে যেতে পারত ওর বাসায়। ডানা মেলে উড়ে যেতে যেতে সে চেঁচিয়ে বলত- মা- বাবারা শোন, ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠিয়ে কাজে তোমরা ব্যস্ত হয়ে পড়ো না।
ছুটির ঢং ঢং ঘণ্টা বাজার আগেই তোমরা চলে এসো। ক্লাস থেকে লাইন করে বের হবার আগেই যেন আমরা তোমাদের দেখতে পাই।
দারোয়ান মোটা গলায় গর্জন করে ওঠে, আবার পা বাড়িয়েছ বাইরে। স্কুলের বাইরে যাবে? তা কক্ষনো হবে না বাপধন। পা ভেতরে রাখো পাজি ছেলে।
ব্রেক কষে গাড়ি থামতেই দেখেন স্কুলের বিশাল গেটে গল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পুচকু। ভেজা দু’টি চোখ, গালে কান্নার দাগ। ও তাকিয়ে আছে মেঘলা আকাশের দিকে। ভেজা ভেজা ফুল লতা পাতা আর দূর্বাঘাসের দিকে। মায়ের চোখে পরা কাজলের মত মেঘ, সাদা মেঘ পাখা ছড়িয়ে আকাশের এদিকে ওদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এক মনে তাই দেখেছে। ওফ বুকের ভেতরটা পুড়ে যেতে থাকে ওর। ওমা এ যে দাদুর গাড়ি গেটের সামনে পুচকুর পায়ের কাছে এসে দাঁড়ায়। স্টিল কালারের ঝকঝকে মারুতি সুজুকি।
গাড়ির দরজা খুলে দেয় টুটুল। বেড়ালের নরম তুলতুলে পশমের মতো পেছনের সিটে ঝাঁপিয়ে পড়ে, পুচকু। দাদু-মাই ডিয়ার দাদু।
– ওহ দাদু, হাউ সুইট ইয়ু আর।
– এই পাজি, জানিস না আম পাকলেই মিষ্টি হয়। আমি বুড়ো হয়েছি বলেই তো মিষ্টিরে।
গাড়ি দাদুর ইশারায় ছুটছে।
– ও দাদু বাড়ি যাবে না?
মুখ ভরে হেসে দাদু বলেন- নাহ আমরা দু’জন আজ লং ড্রাইভে যাবো। জানিস কান্ডজ্ঞানহীন মা-বাবাকে আর তোকে স্কুল থেকে আনতে হবে না। আমিই রোজ তোকে আনতে যাবো, পুচকু এই প্রমিস করলাম।
দাদুর আদরে গলে যেতে যেতে চোখ টলটল করে ওর। মা-বাবা নিতে আসেনি, কেউ মনে রাখেনি স্ট্যান্ডার্ড ওয়ানে পড়ুয়া ছেলেটির কথা। শুধু বুড়ো দাদুরই মনে রয়েছে।
রূপো দিয়ে বাঁধানো দাদুর লাঠি গুঁতো দেয় ওকে। উফ দাদু কি করো। হাসছে পুচকু। খুব মিষ্টি লাগছে আজ লাঠির গুঁতো।

SHARE

Leave a Reply