Home তোমাদের গল্প খুকীর ঈদ – মোনোয়ার হোসেন

খুকীর ঈদ – মোনোয়ার হোসেন

হাত তালি দিয়ে খুশিতে নাচতে লাগল খুকী।
খুকীকে খুশিতে নাচতে দেখে মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল সাদনান ফিরোজের। বেশ কিছুদিন ধরে একমাত্র প্রয়োজন ছাড়া কারো সাথে তেমন একটা কথা বলে না খুকী, মনমরা হয়ে একা একা চুপচাপ বসে থাকে। তাকে প্রশ্ন করা হলে উদাস গলায় বলে, কিছুই ভালো লাগছে না আমার।
প্রাণপ্রিয় খুকীকে এভাবে মনমরা থাকতে দেখে মন খারাপ হয়ে যায় সাদনান ফিরোজের। ছুটে যায় ডাক্তারের কাছে। সব শুনে ডাক্তার পরামর্শ দেন ওকে ঢাকা শহরের বাইরে কোথাও থেকে কিছুদিনের জন্য ঘুরিয়ে নিয়ে আসুন, সব ঠিক হয়ে যাবে।
ডাক্তারের পরামর্শ শুনে সাদনান ফিরোজ সিদ্ধান্ত নিলেন এবার গ্রামের বাড়ি সিলেটে ঈদ করবেন। রাতে খাবার শেষে তার সিদ্ধান্তের কথা বাড়ির সকলকে জানিয়ে দিলেন এবং হুকুম জারি করলেন সবাই যেন রাতেই তাদের প্রয়োজনীয় কাপড়-চোপড় গুছিয়ে নেয়, কারণ আগামীকাল সকাল ৭টায় তারা সিলেটের উদ্দেশে রওনা হবেন।
দাদুর সিদ্ধান্তের কথা শুনে হাততালি দিয়ে খুশিতে নাচতে লাগল খুকী। বহুদিন পর প্রাণপ্রিয় খুকীর মলিনমুখে হাসি দেখে মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল সাদনান ফিরোজের।
২.
সকালে একটা চনমনা ভালো মন নিয়ে ঘুম ভাঙল খুকীর। আড়মোড়া দিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল সে। শেষ রাতের দিকে বৃষ্টি হয়েছিল; এখন বৃষ্টি থেমে গেছে, তবে বৃষ্টির ঠান্ডা বাতাস এখনো ঝাপটা মারছে গাছের ডালে, তামার মতো মেঘ গুলপাকিয়ে পূর্ব আকাশ থেকে শাঁ শাঁ করে উড়ে যাচ্ছে পশ্চিম আকাশে।
বাতাস-মেঘের এমন দৌড়াদৌড়ি খেলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বেশ উপভোগ করছিল খুকী।
এমন সময় মায়ের ডাক পড়ল।
খুকী, এই খুকি, তাড়াতাড়ি তৈরি হও, সাড়ে ছ’টা বাজে বের হতে হবে তো!

দুপুরের পর গ্রামের বাড়ি সিলেট পৌঁছল খুকীরা। বাড়িতে পৌঁছেই তার ভালো লেগে গেল। ছোট ফুপু, বড় ফুপু সবাই এবার গ্রামের বাড়িতে ঈদ করতে এসেছেন এবার। ফুপাতো বোন দিয়া, অর্পি, জয়াও এসেছে। কী যে ভালো লাগছে খুকীর! খুশিতে হাততালি দিয়ে লাফাতে লাগল সে। দৌড়ে গিয়ে সকলকে জড়িয়ে ধরল।
পুরো বাড়িতে এখন হইচই চলছে।
বাড়ির পেছনের মেহেদি গাছটায় মেহেদি পাতা বেশ ঝাঁকড়া হয়ে আছে।
খুকী, দিয়া, অর্পি, জয়া সবাই গিয়ে মেহেদি গাছটায় হুমড়ি খেয়ে পড়ল। মেহেদিপাতা ছিঁড়ে বাটল। খুকী ব্যস্ত হয়ে পড়ল সবার হাতে মেহেদির নকশা আঁকতে। সরু কাঠি নিয়ে সবার হাতে সুন্দর করে মেহেদি নকশা আঁকে আর গল্প করে সে। খুকীর মন কাড়ানো মেহেদি নকশা দেখে সবার সে কী আনন্দ!
আনন্দ আর হৈ হুল্লোড় করতে করতে কখন যে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো টেরই পেল না ওরা। কাল ঈদ। ঈদুল আজহা।
ঈদ মোবারক ! ঈদ মোবারক!! ধ্বনিতে মুখরিত হতে লাগল চারপাশ।
লাফাতে লাফাতে রান্নাঘরে মায়ের কাছে এলো খুকী। মা, মা, ঈদ মোবারক। মা হাসলেন।
হাসতে হাসতে মাকে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল খুকী, আর ঠিক তখন খেয়াল করল কিচেনে শুধু মা আর কাকীমা, কাজের বুয়া ফাতেমা নেই। ফাতেমা খালা কই মা?
আজ আসেনি? কেন?
খুকীর মনে পড়ল ফাতেমা খালার একটা মেয়ে আছে, নাম রূপা, ঠিক তার মতোই। ছোট ফুপির বিয়েতে সে যখন এসেছিল তখন দেখেছ তাকে। বেশ মায়াবী মেয়েটা। যেমন নাম রূপা, ঠিক রূপার মতোই দেখতে সুন্দর। দুধে আলতা ধপধপে ফর্সা।
খুকীকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
খুকীকে খোঁজার জন্য বাড়ি থেকে বের হলো সবাই। দাদুও বের হলেন- গেলেন রূপাদের বাড়িতে।
খুকী খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠে চুপি চুপি রূপাদের বাড়ি গিয়ে তার সবচেয়ে সুন্দর জামাটা রূপাকে পরিয়ে দিয়ে তার মাথার এলোমেলো জোটাবাঁধা চুলগুলো সুন্দর করে চিরুনি দিয়ে আঁচড়ে বেণিগেঁথে কাঁধের দু’পাশে ঝুলিয়ে দিল।
আনন্দে রূপার চোখ চিকচিক করে উঠল।
সাদনান ফিরোজ রূপাদের বাড়িতে এসে দেখলেন খুকী এবার ঈদে কেনা তার সবচেয়ে সুন্দর জামাটা রূপাকে পরিয়ে দিয়ে তার সাথে বসে গল্প করছে।
দাদুকে দেখে দৌড়ে ছুটে এলো খুকী। উচ্ছ্বাসভরা গলায় বলল, দাদু ভাই, দেখো, আজ রূপাকে কী সুন্দর দেখাচ্ছে! যেন পরী।
এতটুকু মেয়ের বোধ-চেতনা দেখে মূক হয়ে গেলেন সাদনান ফিরোজ। চশমা খুলে চোখের পানি মুছলেন।
খুকীকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, দাদুভাই, এই হচ্ছে সত্যিকারের ঈদ, আজ যা তুমি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে শেখালে। সত্যি আজ আমি গর্বিত।

SHARE

Leave a Reply