Home সায়েন্স ফিকশন ইনসাইট -আবু হোসাইন

ইনসাইট -আবু হোসাইন

গত সংখ্যার পর
: এই যে, লাল বাটনটা দেখছিস। এটা হলো স্ট্যাবিলাইজার। যদি কখনও কোন সিরিয়াস অবস্থার সৃষ্টি হয়, তখন এটাতে ক্লিক করিস। টিএসটির অটো পাইলট তখন মেশিনটাকে নিয়ে ট্রলারের উপর ছইয়ের মতো…
: সিরিয়াস কন্ডিশন মানে কেমন?
: অনেক কিছু হতে পারে, আগুন লেগে যাওয়া, যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়া। কিংবা আবহাওয়ার কোনো পরিবর্তন ঘটা, কিংবা ধর কেউ দেখে ফেলল। তখন ঐ লাল বাটনটাতে ক্লিক করে রিমোট কন্ট্রোলারটাকে নদীতে ফেলে দিবি আস্তে করে, যাতে কেউ খুঁজে না পায়।
: আগুন লাগতে পারে!
: লাগতেই পারে, যদিও আশঙ্কা অনেক কম।
একটু ভয় পেয়ে গেল সে। হঠাৎ করে ভাইয়া তাকে এতবড় দায়িত্ব দিতে যাচ্ছে, যাতে আবার বিপদের ভয়ও আছে। ভালো লাগল না তার বিষয়টি। এ সময় হঠাৎ করেই তার মনে পড়ল আরেকটা জিনিস।
: আচ্ছা ভাইয়া, নদীর তলে ডুবে যাওয়া নৌকা তুমি তুলেছিলে কিভাবে?
: তার আগে জিজ্ঞাসা করলি না, ডুবে যাওয়া নৌকা কেন নদীর স্রোতে কিংবা জোয়ারে ভেসে যায়নি!
: ওটাতো এংকরের কারণে!
: না। এংকরের কারণে না, টিএসটির কারণে। কিন্তু থাক, এখন আর কোনো প্রশ্ন না। আমি যাচ্ছি টিএসটিতে উঠতে।
নৌকার দিকে হাঁটা শুরু করতে গেল হিশাম। কিন্তু যায়িদ আবার কথা বলে উঠল-
: আচ্ছা ভাইয়া, এতদিন ধরে তুমি ট্রলারের উপর মেশিনটাকে বসিয়ে রেখেছ, কিন্তু কেউ কোনো সন্দেহ করেনি কেন? এমনকি চাচাও কিছুই বুঝতে পারেননি কেন?
: গন্ধহীন এন্টিডিপ্রেসেন্ট। নৌকায় উঠলেই বুঝতে পারবি। যেইই নৌকায় উঠুক, আর যে প্রশ্নই মাথায় নিয়ে আসুক, নৌকায় ওঠার সাথে সাথেই তার মনটা খুশিতে ভরে যায়। ফলে, সব চিন্তা ভাবনা বাদ দিয়ে নৌকায় বসে নদীর দিকে তাকিয়ে গান গাওয়া শুরু করে দেয় সে। বুঝিস না, চাচা কেন এত ভাড়া পায়!
হাসতে লাগল হিশাম। তারপর হাসতে হাসতেই ট্রলারের দিকে পা বাড়াল সে। আর তার দিকে তাকিয়ে আছে যায়িদ। কিন্তু সে কখনো ভাবতেও পারেনি কিছুক্ষণ আগে ভাইয়াকে করা প্রশ্নটিই শেষ প্রশ্ন হতে পারে!
১০
যখন টিএসটিতে চড়তে যাচ্ছিল হিশাম, তখনও তার মনে সামান্যতম ধারণাও আসেনি যে, জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটি করতে যাচ্ছে সে। তার টিএসটি মানুষের চোখের আড়াল হতে পারে, কিন্তু সেটি যে ওয়াটারপ্রুফ নয় সে কথা বেমালুম ভুলে গেল সে। আগের দিনে চেক করা শেষে ‘ফ্লাইংয়ের জন্য রেডি’, এই চিন্তাটাই মাথায়  ছিল তার।
হিশাম গিয়ে টিএসটিতে উঠে দরজা বন্ধ করে দিল।  ফলে সেটি এখন পুরোটাই মানুষের চোখের আড়ালে চলে গেল। যায়িদের সামনে এখন মিকদাদ চাচার ছইহীন নৌকা ছাড়া আর কিছুই রইল না। রিমোট কন্ট্রোলারের দিকে তাকাল সে, ওটার স্ক্যানিংয়ে টিএসটিকে দেখা যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর গ্রিন সিগন্যাল আসল রিমোট কন্ট্রোলারে। অর্থাৎ তার ভাইয়া উড্ডয়নের জন্য রেডি।
কম্পিত হাতে টিএসটি স্টার্টের সিকুয়েন্স শুরু করল সে। প্রথমেই শুরু করল গামা রে উৎপাদন, ওটার সাহায্যেই উড়বে যন্ত্রটা। তারপর হরাইজোন্টাল স্ট্যাবিলাইজার, ওটা নির্দিষ্ট স্থানে ধরে রাখবে টিএসটিকে। নির্দিষ্ট কাজগুলো সে ঠিকমত করলেও মনের খুঁতখুঁতে ভাবটা থেকেই গেল।
শেষ রাত্রে কর্ণফুলীর হিমেল বাতাসে ঠান্ডা লেগে আসছে যায়িদের। নাক দিয়ে পানিও পড়ছে তার। নাকের ডগায় হাত দিয়ে হাতের আঙুল কিংবা নাক কোনটার অস্তিত্বই বুঝতে পারল না সে। তার ওপর ভাইয়া টিএসটিতে থাকার কারণে সে একা নদীর ধারে দাঁড়িয়ে, কিছুটা ভয় ভয়ও লাগছে। কিন্তু সবকিছুর ওপরে ছাপিয়ে রয়েছে টিএসটিকে আকাশে উড়ানোর আশা। ফ্লাইং কন্ট্রোলের দিকে হাত বাড়াতেই বুকের ভেতরে হাতুড়ি পেটানো শুরু হয়ে গেল তার।
ফ্লাইং বোতামে চাপ দিয়ে কয়েক সেকেন্ড শ্বাস নিতে ভুলে গেল সে। বোতামে চাপ সে ঠিকই দিয়েছে, কিন্তু আবার সন্দেহ হচ্ছে চাপ সে দিয়েছে কিনা। আরেকবার বোতাম চাপবে কিনা তা নিয়েও ভাবছিল। কিন্তু না কাজ শুরু করল টিএসটি। যায়িদের বুকের হাতুড়ি পেটা কয়েকগুণ বাড়িয়ে আকাশে উড়ল সেটি। তারপর ১০ ফিট উপরে উঠে স্থির দাঁড়িয়ে গেল। এতটুকু সাফল্যেই আনন্দে অধীর হয়ে গেল যায়িদ। কিন্তু উত্তেজনা তাতে এতটুকুও কমল না তার।
তারপর ভাইয়াকে গ্রিন সঙ্কেত দিল সে, এই সঙ্কেত পেয়েই কম্পিউটারে উড্ডয়ন পথের পরিকল্পনা এন্ট্রি করবে হিশাম। টিএসটির ফ্লাইংয়ের পুরোটাই প্রিপ্লান্ড, ইমার্জেন্সি কন্ট্রোলগুলোই শুধু টিএসটি থেকে করা হয়।
আবার গ্রিন সিগন্যাল পেল সে টিএসটি থেকে, অর্থাৎ তার ভাইয়া ফ্লাইং পাথের এন্ট্রি দিয়েছে কম্পিউটারে। ফ্লাইং পাথটা দেখলোও সে। কর্ণফুলী নদী ধরে সাগরের দিকে ১০০ মিটার যাবে সে। তারপর ঐ পথেই ফিরে আসবে। অর্থাৎ স্রোতের অনুকূলেই যাচ্ছে ভাইয়া প্রথমে।
মাথাটা ঝাঁকিয়ে স্মরণ করার চেষ্টা করল, এরপর কি করতে হবে তাকে। মনে পড়ল, ভাইয়াকে টিএসটির কন্ট্রোল দিতে হবে। অর্থাৎ এরপর তার আর কোন দায়িত্ব থাকছে না। কম্পিত হাতে শাসরুদ্ধকর অবস্থার মধ্যে টিএসটির ম্যানুয়াল কন্ট্রোল এক্টিভেট করার বোতামে চাপ দিল সে। গ্রিন সিগন্যাল জ্বলে উঠল রিমোট কন্ট্রোলারে, অর্থাৎ ম্যানুয়াল কনট্রোল এক্টিভেট হয়েছে টিএসটির। তারপর নদীর দিকে তাকাল সে, হয়ত বুঝতে চেষ্টা করছে কোথায় আছে টিএসটি এখন।
১১
টিএসটির দরজা বন্ধ করতেই ভেতরে মৃদু আলো থাকলেও প্রায় অন্ধকার হয়ে গেল। হিশাম জানে এই ছোট্ট আলোটিও কিছুক্ষণ পর বন্ধ হয়ে যাবে। অদৃশ্য থাকার জন্য টিএসটি তার একদিকের আলো কপি করে ঠিক বিপরীত দিকে নির্গত করে। ফলে কারও সামনে টিএসটি থাকলেও সে যা দেখছিল তাই-ই দেখবে। অর্থাৎ নদীর অপর তীর দেখছিল এমন কারও সামনে টিএসটি এসে দাঁড়ালেও তার অপর তীর দেখার ক্ষেত্রে কোন বিঘœ ঘটবে না।
আবার এটা যেমন টিএসটি বাইরের দেয়ালের জন্য সত্য, তেমনি ভেতরের দেয়ালের জন্যও সত্য। টিএসটির বাইরের দেয়াল যেমন তার বিপরীত দিকে আলো নির্গত করে, তেমনি সে একইসাথে  ভেতরের দেয়ালেও আলো নির্গত করে। অর্থাৎ বাইরের দেয়াল আলো কপি করে একবার কিন্তু সেই কপি করা আলো সে নির্গত করে দুইবার, একবার তার ভেতরের অবতল দেয়ালে, আরেকবার তার ঠিক বিপরীত পাশের  বাইরের উত্তল দেয়ালে।
অর্থাৎ বাইরের দেয়াল একই সাথে দু’টি কাজ করে, আলো কপি করা ও বিপরীত পাশের বাইরের দেয়ালের কপি করা আলো নির্গত করা। ফলে বাইরের মানুষের চোখে যেমন টিএসটি অদৃশ্য থাকে, তেমনি  ভেতরের মানুষের চোখেও অদৃশ্য থাকে টিএসটির দেয়াল। অর্থাৎ একজন মানুষ স্বাভাবিকভাবে তার চারপাশে যা দেখতে পারে, টিএসটির ভেতরে বসেও তা সে দেখতে পারে। বাইরের কেউ টিএসটির ভেতরের মানুষটিকে দেখতে না পেলেও, ভেতরে থেকে সে বাইরের লোকটিকে ঠিকই দেখতে পারবে। এটাই টিএসটির মূল আকর্ষণ। এগুলো টিএসটির ক্লাসিফাইড ইনফরমেশন। কিন্তু যায়িদকে তা জানানোর সুযোগ পায়নি হিশাম।
ঠিকঠাক মত বসে, যায়িদকে রেডি হওয়ার সঙ্কেত দিল। গামা রে উৎপাদন শুরু হল, আর তার সাথে সাথে নিভে এলো ভেতরের আলো। কিন্তু সক্রিয় হলো টিএসটির দেয়াল। বাইরের কপি করা আলো সে ভেতরে নির্গত করা শুরু করল। ফলে বাইরের সবকিছু আবার দেখতে শুরু পেল হিশাম। রিমোট কন্ট্রোলার হাতে কম্পনরত যায়িদকেও দেখল সে, গভীর মনোযোগসহকারে রিমোট কন্ট্রোলারের স্ক্রিনের দিকে দিকে তাকিয়ে আছে। বলা চলে শুধু ওটার মাধ্যমেই টিএসটিকে এখন দেখতে পাচ্ছে যায়িদ।
১০ ফিট উপরে উঠে থেমে গেল টিএসটি। পারস্পেকটিভ চেঞ্জ হয়ে গেল চারপাশের। তার সারা জীবন যেভাবে সে পৃথিবীকে যেভাবে দেখে এসেছে আজ তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখছে পারছে সে। একটু উঁচু অবস্থান থেকে চারপাশের সবকিছু দেখতে বেশ ভালোই লাগছে। বিশেষ করে ফাঁকা জায়গায় এই উচ্চতায় থেকে এইভাবে কখনও দেখার সুযোগ হয়নি। হওয়ার কথাও না। এমন যান আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি।
যায়িদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচে তাকাল হিশাম। সরাসরি মিকদাদ চাচার নৌকাটাকে দেখতে পেল সে। তার পায়ের তলে আর নৌকার মাঝে কিছুই নেই। মনে হচ্ছে যেন, কর্ণফুলী নদীতে শূন্যে বাতাসে চেয়ার পেতে বসে আছে সে।
এ এক ভিন্ন রকম অনুভূতি। তার এতদিনের চেষ্টা আজ সফল হয়েছে। টিএসটি আকাশে উঠেছে, যদিও তা মাত্র ১০ ফিট। আকাশে উঠেছে মানে উড়তেও পারবে। তার মানে তার ধারণা সঠিক হয়েছে, তার বৈজ্ঞানিক গবেষণা বিফলে যায়নি।
নদীর ভেতরে সে এমন একটি যানে চড়ে আছে, যার ভেতরে থেকে ৩৬০ ডিগ্রি কোণে সবকিছু দেখতে পারছে সে। একটা গেম খেলতে গিয়ে এই চিন্তাটা মাথায় আসে তার। গেমটিতে ট্যাংক নিয়ে আকাশে উড়া যায় চিটকোড বসিয়ে, আবার ট্যাংকের বডিও অদৃশ্য করে দেয়া যায়। তারপর ট্যাংকে বসেই নিচে সাগর, শহরের সবকিছু দেখা যায়। সে এক ভিন্নরকম আনন্দ ওপর থেকে এইভাবে পৃথিবীকে দেখতে, কিন্তু বিমানে উঠেও এভাবে দেখা যায় না। ঐ গেম খেলতে গিয়েই চিন্তাটা মাথায় আসে তার, এভাবে চট্টগ্রামকে দেখলে কেমন হয়! মূলত সেখান থেকেই টিএসটি বানানো ধারণাটা  তৈরি হয়েছে।
যায়িদের মত চঞ্চল নয় সে। আর সে জন্যই এতবড় সাফল্যেও সে খুব বেশি মাতামাতি করেনি। আর তাছাড়া বাহনটিকে এখনও পরীক্ষা করা এখনও শেষ হয়নি। পরীক্ষাটা পুরোপুরি সাফল্যের সাথে শেষ হলেই আনন্দ করবে সে, যদিও জানে সফল যতটুকু হওয়ার হয়েছে সে। এমন এক বাহন সে তৈরি করেছে, যা হয়ত মানবজাতির গতিকেই পরিবর্তন করে দেবে। কিন্তু বিপদের সম্ভাবনাও কম না। সে জন্যই মূলত এত সতর্কতা।
আরও কিছুক্ষণ এভাবে বসে থেকে সৌন্দর্য দেখার ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু মনোযোগ ছিন্ন হয়ে গেল। ফ্লাইট পাথের এন্ট্রি চাচ্ছে কম্পিউটার। এন্ট্রি দিল সে, অল্প একটু উড়েই আজকের মত পরীক্ষাটা শেষ করবে সে। তারপর বাকি কাজ আগামীকাল।
এন্ট্রি দিয়ে সে অপেক্ষা করতে লাগল যায়িদের জন্য। এরপর তাকে ম্যানুয়াল কন্ট্রোল দেবে যায়িদ।
কিন্তু এ সময়ই দুর্ঘটনাটা ঘটল। টিএসটি পানিতে ডোবার ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভুলে গেছিল সে। টিএসটির মূল মেশিনগুলো ওয়াটারপ্রুফ হলেও, তার বাহনের অংশটুকু যে ওয়াটারপ্রুফ নয় তা তার একবারের জন্যও মনে আসেনি হিশামের। নদীর পানিতে ভিজে শটসার্কিট হয়ে ছিল ম্যানুয়াল কন্ট্রোল। ফলে যায়িদ টিএসটির ম্যানুয়াল কন্ট্রোল এক্টিভেট করতেই নির্দিষ্ট অংশে বিদ্যুৎ প্রবাহিত না হয়ে, পুরো ম্যানুয়াল কন্ট্রোলসহ বাহনটিই বিদ্যুতায়িত হয়ে গেল। ম্যানুয়াল কন্ট্রোলে বিদ্যুতের মাত্রা কম হলেও শক খেল হিশাম। আর বিদ্যুতের স্ফুলিঙ্গ ফোটা শুরু হলো  ভেতরে।
বিপদ দেখেই অটোমেটিক কন্ট্রোল সক্রিয় হয়ে উঠল। শুরু হলো টিএসটির ইমার্জেন্সি প্রটোকল। ফলে বিদ্যুৎপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেল ম্যানুয়াল কন্ট্রোলে। হিশামের শক খাওয়া থামলেও, সে ভালোমতই বুঝতে পারল বিপদ শুধু এতটুকুই না।
মানুষের যাতায়াত যেখানে আছে, সেখানে গন্ধ ছড়াবেই। সুতরাং বাজে গন্ধ ছড়ানোর পূর্বেই ভালো গন্ধ ছড়িয়ে দিলে পরিবেশ সুস্থ থাকবে। অবশ্য সুগন্ধটা বাজে গন্ধের চেয়ে ভারী হওয়া লাগবে। এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই টিএসটিতে এন্টি ওডর সেল ইন্সটল করেছিল হিশাম। তাও আবার সিটের সাথেই। তার ধারণা নাকের কাছে সেন্ট থাকলে সারা দুনিয়াই সুগন্ধ থাকবে।
সেই দাহ্য পদার্থ এন্টি ওডরই আজ বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াল। স্ফুলিং থেকে আগুন ধরে গেল সিটে, আর সেখান থেকে এন্টি ওডর সেলে। আগুন পেয়ে বিস্ফোরিত হলো সেলটি। কাপড়-চোপড়ে আগুন ধরে গেল হিশামের। আর তার সাথে সাথে ভেতরের আলোও নিভে গেল।
টিএসটির ইমার্জেন্সি প্রটোকল অনেকটা কলা ছুলে ভেতরের মাংশ ফেলে দেয়ার মত। কলার শেষ মাথা থেকে খোসা ছড়িয়ে ঠিক উল্টো দিকে নিয়ে একত্রিত করলে যেমন উল্টোভাবে আরেকটি কলা  তৈরি হবে, যেখানে কলার বোটা কলার  ভেতরে পড়ে যাবে আর কলার খোসার বাইরের দিক ভেতরে চলে যাবে, টিএসটির ইমার্জন্সি প্রটোকলও ঠিক তেমন।
তবে টিএসটির নিচের অংশটা কলার বোঁটার মতো লম্বা না, ফ্লাইং সসারের মতো চ্যাপ্টা। ওটাই বাহনটির মুল অংশ। ওখানে গামা রে উৎপাদনের মেশিনসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রগুলো বসানো। এই যন্ত্রগুলো অনেক দামি, একবার নষ্ট হলে আর তৈরি করতে পারবে না সে। তাই কোন সমস্যা হলে এগুলো যেন ঠিক থাকে, সেজন্য এভাবেই প্রটোকল ঠিক করেছিল হিশাম। আগুনের সূত্রপাত হতেই টিএসটির উপরের দিকটা সমান আটভাগে ভাগ হয়ে পরস্পর থেকে দূরে সরে যেতে লাগল, একসময় ভূমির সমান্তরাল হলো, তারপর আবার টিএসটির নিচের দিকে এসে মিলিত হলো। অর্থাৎ প্রত্যক্ষভাবে না উল্টিয়েও উল্টে গেল টিএসটি।
দামি যন্ত্রগুলো আড়ালে চলে গেল, আর উন্মুক্ত হয়ে রইল হিশামকে নিয়ে বসার আসনটি। হিশামের মাথার ওপরে খোলা আকাশ। এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল হিশামের মুখে, বিপদ দেখে তার এত সাধের যন্ত্রটা তার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করল।
টিএসটি উঠে যেতেই স্রোতে কিছুটা সরে গিয়েছিল নৌকাটা। ইমার্জেন্সি প্রটোকলের সাথে টিএসটি আবার নৌকার দিকে সরে যেতে লাগল, ছইয়ের মতো গিয়ে নৌকার উপরে অসবে ওটা। যায়িদ হয়ত স্ট্যাবিলাইজার বোতামে চাপ দিয়েছে। কিন্তু বন্ধ হয়ে গেল হরাইজোন্টাল স্ট্যাবিলাইজার আর তার সাথে সাথে গামা রে উৎপাদন। ফলে ভারি এক খন্ড পাথর খন্ডের  মত নদীর পানিতে গিয়ে পড়ল টিএসটি।
কিন্তু গতিজড়তা হিশামের শরীরটাকে নিয়ে ফেলল নৌকার ওপর। নৌকার ইঞ্জিনে আগুন ধরে গেল। হিশাম তাকিয়ে দেখল, আগুন ইঞ্জিনের তেলের লাইনে ধরেছে, হয়ত আর কয়েক সেকেন্ড বাকি আছে বিস্ফোরণের। ‘আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ…’
১২
হিশামকে ম্যানুয়াল কন্ট্রোল দিয়েই রিমোট কন্ট্রোলারের স্ক্রিন থেকে মুখ তুলল যায়িদ। তাকাল নদীর দিকে। মিকদাদ চাচার নৌকা বাঁধা আছে যেখানে সেখানে। তার ওপর বরাবরই থাকার কথা টিএসটি। কিন্তু নৌকাটা একটু সরে গেছে দক্ষিণে, টিএসটি আকাশে উঠে যাওয়ার কারণে ফ্রি হয়ে গিয়েছে কি না।
কিন্তু হঠাৎ করে ভোজবাজির মত দৃশ্যমান হয়ে উঠল টিএসটি। পুরোপুরি ফ্লাইং সসারের রূপ নিলো, তারপর আবার টিএসটি হয়ে উঠল, কিন্তু এবার উল্টো দিকে। আর উপরের ফাঁকা জায়গায় ভাইয়াকে বসে থাকতে দেখল যায়িদ। কিন্তু ভাইয়ার গায়ে…
আগুন…
আগুন! কোথা থেকে এলো? কিভাবে ধরল? তার কারণেই কি? সে কি কোন ভুল করেছে নাকি? এখন কী করবে সে? ‘এখন কী করবে’ চিন্তাটা এই পর্যন্ত আসতেই মনে পড়ল ইমার্জেন্সি স্ট্যাবিলাইজারের কথা। চাপ দিল লাল বোতামটাতে। টিএসটিকে সরে আসতে দেখল সে নৌকার দিকে। কিন্তু তারপরেই নদীর  ভেতরে পড়ে ডুবে গেল, আর হিশাম গিয়ে পড়ল নৌকার উপরে।
আরও কয়েক সেকেন্ড কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। তারপর হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেয়ে নৌকার দিকে এগোতে গেল। কিন্তু এসময়ই ঘটল বিস্ফোরণটা।
‘ভাইয়া!’ বুক ফাটা চিৎকার বেরিয়ে এল তার কণ্ঠ থেকে।
কিন্তু সারাদিন রাতের এত টেনশন, এই দুর্ঘটনা এত প্রেশার সহ্য করার ক্ষমতা ছিল না যায়িদের। তার স্নায়ু অস্বীকার করল তা বহন করতে। হঠাৎ করে মনটা ফাঁকা হয়ে গেল যায়িদের, বিশাল এক শূন্যতা তৈরি হলো যেন। এত চিন্তা করার কী দরকার, সব ছেড়েছুড়ে একটু ঘুমিয়ে নিলেই তো চলে। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল যায়িদ। নিয়ন্ত্রণহীন তার শরীর আছড়ে পড়ল মাটিতে, আর তার থেকে রিমোট কন্ট্রোলার ছুটে গিয়ে পড়ল নদীর পানিতে।
১৩
জ্ঞান ফিরে যায়িদ দেখল নিজের বিছানায় শুয়ে আছে। তাকে নড়ে উঠতে দেখেই কয়েক জোড়া চোখ তার দিকে ছুটে এলো। সবাইকেই চিনতে পারল যায়িদ। তার আব্বু আম্মু আর আত্মীয় সবাই। তার মধ্যে ডা: মারুফও আছেন। উনি বিমানবাহিনী থেকে রিটায়ারার্ড করা, আব্বুর কলিগ ছিলেন।
সবার তোড়জোড় আগ্রহকে থামিয়ে দিলেন তিনি। প্রচুর বিশ্রাম দরকার যায়িদের। শুধু আম্মু এসে ওর কপালে হাত রাখল, আর আব্বু এসে পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর তার মনে পড়ল কর্ণফুলী তীরের কাহিনী। মনে পড়ল ভাইয়ার কথা।
: ভাইয়া কোথায়?
: তোমার ভাইয়া ভালো আছে। তুমি সুস্থ হয়েই তাকে দেখতে যাবে।
: কোথায় আছে ভাইয়া? আবার জিজ্ঞাসা করল সে।
: আগে সুস্থ হও, তারপর তাকে দেখতে যাবে। তার আগে তোমার বিছানা থেকে ওঠা নিষেধ। চেহারায় কঠোরতা আনার চেষ্টা করল আম্মু।
আম্মুর দিকে তাকাল যায়িদ। চোখ দুটি টকটকে লাল, মুখ শুকনো, চুল উষ্কখুষ্ক। হাজার লুকানোর চেষ্টা করলেও আম্মুর চোখের কোনার পানি নজর এড়াল না যায়িদের। আম্মু কি তাকে মিথ্যা কথা বলছেন। কিন্তু তা হতেই পারে না, এটা আম্মুর মর্যাদায় পরিপন্থী। আম্মু কখনও তার সাথে মিথ্যা কথা বলেননি। কিন্তু আম্মুর কথা বিশ্বাস করলেও মেনে নিতে পারল না সে।
১৪
দু’দিন পরই সব জানতে পারল যায়িদ। নৌকার আগুনটা প্রথমে মিকদাদ চাচাই দেখেন। নৌকার আগুন মনে করেই ছুটে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু নদীতীরে আসতেই যায়িদের শরীরটা চোখে পড়ল তার। গায়ে হাত দিয়ে বোঝার চেষ্টা করলেন বেঁচে আছে কিনা। তারপর নৌকার দিকে তাকাতেই তার চোখে পড়ল, নৌকার ছই উধাও, আর ওখানেও কেউ শুয়ে আছে। চমকে উঠলেন তিনি। এখানে এত রাতে যায়িদ এর অর্থ ওটা হিশামই হবে। কিন্তু দুই ভাইয়ে এই অবস্থায় দেখে কি করবেন বুঝতে না পেরে চিৎকার করা শুরু করলেন তিনি। তারপরই আশপাশের থেকে লোকজন ছুটে এসে তাদেরকে উদ্ধার করে। কিন্তু হিশামকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
দু’দিন অজ্ঞান হয়ে ছিল যায়িদ। এই দুদিনে হিশামের জন্য কান্নাকাটি করারও সুযোগ পায়নি কেউ, যায়িদের দুশ্চিন্তায়। যদিও প্রাথমিক চিকিৎসার পরই আঘাতটা মানসিক বলে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন ডা: মারুফ। তবুও যায়িদের দুশ্চিন্তায় দুদিন ঘুম হয়নি তার আব্বু আম্মুর। সারাদিন সারারাত তার মাথার কাছেই বসে ছিল তার আম্মু।
জ্ঞান ফিরেই যায়িদ ভেবেছিল তাকে অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। সবাই হয়ত তাকে জিজ্ঞাসা করবে হিশামের কথা। কিন্তু যায়িদ লক্ষ্য করল তার আব্বু-আম্মু একদম বদলে গেছেন। আম্মুর চোখে মুখে সেই শাসনের ছিটেফোঁটাও নেই, বরং সারাক্ষণ মমতাভরা চোখে তাকিয়ে থাকেন। বলা চলে এই কটা দিন একেবারে আম্মুর কোলের ভেতরেই কেটেছে তার। যেন, কোন অভিযোগ, অনুযোগ নয়, সারাক্ষণ শুধু তাকে জড়িয়েই ধরে রাখতে চান তার আম্মু।
আব্বুও আর সবার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে পত্রিকায় মুখ লুকিয়ে রাখেন না। তার সামনে আগের মতই সম্পূর্ণ স্বাভাবিক, হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করলেও, আব্বুর অতিরিক্ত আগ্রহের বিষয়টি চোখ এড়ায়নি তার। বলতে গেলে আব্বুর মুখের এই হাসিটিই যায়িদের কাছে একমাত্র জীবনের স্পন্দন। সবার নীরব, মলিন চাউনির মাঝে যখনই নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল, তখনই আব্বুর ঐ হাসিটুকুই যেন দুনিয়ার স্বাভাবিকতায় ফিরিয়ে আনত তাকে। ছোট মানুষ যায়িদ, তাই বুঝতে পারেনি সে যে, ঐ হাসিটুকু দিয়ে কত বড় ব্যথার পাহাড়কে আড়ালে রেখেছে তার আব্বু।
১৫
সেদিন দুপুরে নিজের বিছানায় শুয়ে ছিল যায়িদ। ঔষুধের প্রভাবে গত কয়েকদিন খুব বেশি চিন্তা মাথায় ঢুকেনি তার, ঘুমিয়েই কেটেছে দিন রাতের বেশিরভাগ সময়। আজই প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে তাকে ঔষুধ দেয়নি ডাক্তার। ফলে ঘুম আসছিল না।
দরজায় নক করে রুমে ঢুকলেন আম্মু। আম্মুর দিকে তাকাতেই চোখে পড়ল আম্মুর হাতে চাকতির মত জিনিসটা। ওটা ভ্যালেডিকশন, সবাই সংক্ষেপে ভ্যালেডি বলে থাকে। আজকাল সবাই মৃত্যুর আগে উইল করে যাওয়ার জন্য এটাকে ব্যবহার করে থাকে। এটা শুধু একটি মেসেজও হতে পারে আবার ইন্টার্যাক্টিভ ডায়ালগের মতও হতে পারে।
আম্মু এসে তার মাথার কাছে দাঁড়াল। তারপর মাথায় হাত বুলিয়ে তার হাতে তুলে দিল ওটা। যায়িদ ওটা হাত পেতে নিল, তারপর কোন কথা না বলে আম্মুর দিকে তাকিয়ে রইল।
: তোমার ভাইয়ার ঘরের জিনিসপত্র গোছাতে গিয়ে ওটা পেয়েছিল তোমার আব্বু। মনে হয় তোমার জন্যই বানিয়েছিল। শুধু তোমার কথাই আছে ওতে। দেখলে বুঝতে পারবে।
কিন্তু ভ্যালেডি কেন? এটাতো মানুষ মৃত্যুর পূর্বে উইল করার জন্য ব্যবহার করে। সাধারণত বৃদ্ধ হয়ে যারা মারা যায় তারাই উইল করতে পারে। তাহলে ভাইয়া কি জানত সে মারা যাবে? কিংবা মারা যাওয়ার আশঙ্কা আছে। কিন্তু তা হতেই পারে না। মারা যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে ভাইয়া কখনও ঐ পরীক্ষা করতেন না। আর ভাইয়া তাকে কিইবা উইল করতে পারে! কিন্তু আবার মাথার ভেতরে চিন্তা ঢুকল তার, ভাইয়া কিভাবে মারা গেছে এখনও জানে না সে। জানলে হয়ত কিছুটা ধারণা করা যেত। কিছুই বুঝল না সে, আর ভ্যালেডির ব্যাপারটাও মেনে নিতে পারল না।
বিছানা থেকে উঠল যায়িদ। তারপর টেবিলের ওপর ভ্যালেডি রেখে অন করল। ওটার মুখ ঘরের মাঝবরাবর ঘুরিয়ে দিল, যাতে প্রজেকশনটা ঘরের মাঝবরাবরই হয়। অন করতেই ঘরের ভ্যালেডি থেকে আলো বের হয়ে ঘরের মাঝ বরাবর একটা প্রজেকশন তৈরি হলো হিশামের। স্বাভাবিক হাসিখুশি চেহারা। একহাত পকেটে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ডান হাত সামনে বাড়ান, কথা বলার সময় ওটাকে নাড়ায় হিশাম। কথা বলে উঠল হিশাম,
: যায়িদ, আমি তোর বড় ভাই। আমি কেন তোকে এড়িয়ে চলব। আমি শুধু চাই যে, আমাকে অনুসরণ করতে গিয়ে তুই যেন কোন বিপদে না পড়িস। এ জন্যই নদীতে যাওয়ার সময় তোকে নিতে চাইতাম না।
চমকে উঠল যায়িদ এটাতো সেদিন রাত্রে ভাইয়া বলেছিল তাকে। কিন্তু ভ্যালেডিতে এ কথা কেন?
মনে পড়ল ভাইয়ার সাথে সেদিনের পুরো কথাবার্তা। ভাইয়াকে দুঃখীতই মনে হয়েছিল তার কাছে। তাহলে কি ভাইয়া এর মাধ্যমে তাকে ‘স্যরি’ বলতে চেয়েছিল। কিন্তু ঐদিন রাত্রেই তো ভাইয়ার সাথে অনেক কথা হয়েছিল, তাহলে আবার ভ্যালেডির মাধ্যমে কেন? নাকি এর পর আরও কোন কথাবার্তা আছে?
যায়িদ আরও অনেক কিছু বলল, কিন্তু হিশামের প্রজেকশন শুধু ডানে বায়ে নড়ল, একবার কাঁধের দিকে তাকাল, বাঁ হাত প্যান্টের ভেতরে নড়াচড়া করল। যায়িদ বুঝল এগুলো প্রজেকশনের রুটিন নড়াচড়া। কিন্তু প্রজেকশন মুখে আর কোন কথা বলল না। যায়িদ বুঝল, শুধু এতটুকু কথাই রেকর্ড করা আছে। তার মানে ভাইয়া তাকে ‘স্যরি’ বলার জন্যই এটা বানিয়েছিল!
মনে পড়ল সে রাতের পুরো ঘটনা। মনে পড়ল সবকিছুই। একরাশ আবেগ উঠে আসতে চাইল মুখ দিয়ে। কিন্তু আম্মুর সামনে সে কিছুই প্রকাশ করতে চাইল না। সামলে নিল নিজেকে। কিন্তু ঐ সামান্য প্রকাশও চোখ এড়াল না আম্মুর। ভর পেয়ে গেলেন, যায়িদ আবার অজ্ঞান হয়ে যায় কি না।
: যায়িদ, অসুস্থ বোধ করছ?
: না
: খারাপ লাগছে?
: না।
তবুও সন্দেহ দূর হলো না আম্মুর। ওদিকে যায়িদের অবস্থাও খারাপ। আম্মুর কারণে কাঁদতেও পারছে না সে।
এ সময় দরজায় এসে দাঁড়াল আব্বু।
: আফিয়া। আম্মুকে ডাক দিল আব্বু। আম্মু দরজার কাছাকাছি যেতেই বললেন,
: ওকে একা থাকতে দাও।
: কিন্তু…
: ওকে কিছুটা সময় দাও।
রাগ হলো কিছুটা আম্মুর। কিন্তু যায়িদের সামনে আব্বুকে কিছু না বলে আব্বুর সাথে ড্রইং রুমের দিকে চললেন।
আম্মু চলে যেতেই দরজা বন্ধ করল যায়িদ। তারপর হেলান দিয়ে দাঁড়াল। একা হতেই আবার সব চিন্তা ঘিরে ধরল তাকে। সে চেয়েছিল দরজা বন্ধ করে বিছানায় গিয়ে বসবে। কিন্তু পারল না, ঘরের দরজায় দাঁড়িয়েই কান্নায় ভেঙে পড়ল।
ঘরের মাঝবরাবর তখনও হাসিমুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে ভ্যালেডি থেকে বের হওয়া আলোকরশ্মি দিয়ে তৈরি হিশামের প্রজেকশন।
১৬
সে রাত্রে স্ত্রীর অনেক অভিযোগ আর অনুযোগ চুপ করে সহ্য করে আবারও হিশামের ঘরে এসে দাঁড়ালেন সোলাইমান সাহেব। শুধু দুঃখ পেলেই চলবে না। হিশামের মৃত্যুর কারণ তাকে খুঁজে বের করতে হবে। দুই ভাই কি করছিল সে রাত্রে তাও তাকে জানতে হবে।
ঘরে ভেতরে চারপাশের দেয়ালে তার জিনিসপত্রগুলো সুন্দর করে সাজানো, শুধু মানুষটাই নেই। আর মানুষটার এই না থাকাটাই তাকে স্মরণ করিয়ে দিতে লাগল জিনিসগুলো।
সেই ছোট্ট থেকে তিল তিল করে গড়ে তোলা প্রতিটি স্মৃতি এসে ঘিরে ধরতে লাগল তাকে। একগাদা আনন্দ, অজানা আশঙ্কা আর অনিশ্চয়তা নিয়ে এসেছিল সে, তারপর একরাশ বেদনা, আর শূন্যতা রেখে ফিরে গেল তার আগেই।
‘কিন্তু কেন…’
গত কয়েকদিন ধরে যে অশ্রুকে তিনি পাথর দিয়ে আটকে রেখেছিলে, আজ তা উন্মুক্ত হয়ে গেল। ঘরের মেঝেতে বসেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন তিনি।
কিছুটা সুস্থির হয়ে হিশামের জিনিসপত্রের দিকে এগোতে অনেকক্ষণ সময় লাগল তার। কিন্তু হিশামের প্রতিটি জিনিসপত্র নাড়াচাড়া করতে গিয়ে, একবারের জন্যও তার চোখের সেই অশ্রুকণা পিছু ছাড়ল না আর।    (সমাপ্ত)

SHARE

Leave a Reply