Home স্মরণ শিশুমনো বিকাশে মল্লিক সাহিত্য -আফসার নিজাম

শিশুমনো বিকাশে মল্লিক সাহিত্য -আফসার নিজাম

খুব সকালে উঠলো না যে
জাগলো না ঘুম থেকে,
কেউ দিও না তার কপালে
একটিও চুম এঁকে।
খুব সকালে উঠলে কী হয়? খুব জানতে ইচ্ছে করে। হ্যাঁ তোমার আমার মতো আর একজনের ঠিক এমনি মনে হতো। সকালে উঠলে সূর্যি মামার ঘুম ভাঙা দেখা যায়। পাখির দল বেঁধে বাসা থেকে উড়ে যাচ্ছে তা দেখা যায়। আর পাওয়া যায় সুনির্মল বাতাস। খুব সকালে উঠলে শোনা যায় মসজিদের মোয়াজ্জিনের সুমিষ্ট কণ্ঠের আজান। এমন একটি সুন্দর সময়ে যে দেখলো না তার জন্য তো কোনো আদরমাখা চুমু থাকে না। তাই সেই মানুষটি খুব সকালে উঠতেন। উঠেই অজু করতেন তারপর মহান আল্লাহর দরবারে হাজির হতেন। নামাজ পড়ে বেরিয়ে পড়তেন সকালে ভ্রমণে। কতো মানুষ। হাঁটছে, কেউ যাচ্ছে কাজ করতে, কেউ যাচ্ছে বিদ্যালয়ে। কেউ কেউ কুরআন পড়ছে বারান্দায় বসে। কেউ কেউ স্কুলের পড়ালেখা শেষ করে নিচ্ছে। আর হচ্ছে কথা বলতে বলতে হেঁটে যাওয়া। এ হাঁটার মধ্যে কত কথা। যেমন ধরো-
যে কোন কাজ করো না ভাই
যে কোন কাজ করো
তা যেনো হয় সবার চেয়ে
সবচেয়ে সুন্দরও।
তারা যখন হেঁটে যায় তখন তাদের কাজের ঝুলে খুলে বসে। কে কী কাজ করেছে। একজন তো বলে বসলো, ‘সকালে ঘুম থেকে ওঠাই হলো ভোরের সুন্দর কাজ। আর অজু করে ফজরের নামাজটি আদায় করা আরো সুন্দর কাজ।’ অন্য বন্ধু বললো, নামাজ শেষে একটু হাঁটা তারপর কুরআন পড়া এরপর স্কুলের পড়া যতটুকু বাদ আছে তা শেষ করাও সুন্দর কাজ। মানে প্রতিদিন স্কুলের পড়া পারাটাও সুন্দর কাজ।’ আরেক জন বললো, এই আমরা রাস্তায় হাঁটছি মানুষকে সালাম দিচ্ছি এটাও ভালো কাজ। রাস্তায় পড়ে থাকা পাথর সরিয়ে দিচ্ছি, কাঁটা সরিয়ে দিচ্ছি এটাও ভালো কাজ। এবার সেই মানুষটি বলে উঠলো তার চেয়েও সুন্দর, সবাই যেমন করে তারচেয়ে সুন্দর করতে পারাটাই আমাদের প্রতিদিনের নিয়ত থাকতে হবে। সেটা কিভাবে হয় তা বলছি,
যে কোন কাজ করতে গেলেই
লাগে নিয়মনীতি
সকল নীতির শ্রেষ্ঠ নীতি
ইসলামী সংস্কৃতি।
নিয়ম মতো কাজ করতে হয়। আমরা স্কুলে যাই একটি নিয়ম মেনে ক্লাস শুরু হয়। আমরা গোসল করি একটি নিয়ম মেনে করতে হয়। আমরা মাঠে বল খেলি তাও নিয়ম মেনে খেলতে হয়। না হয় ফাউল হয়, হলুদ কার্ড, লাল কার্ড খেতে হয়। যদি সেই কাজটি আমরা নান্দনিকভাবে করি, সাংস্কৃতিক সৌন্দর্য নিয়ে করি- তা হয় উপভোগ্য। আর সংস্কৃতির মৌলপাঠ তো আছেই ইসলামে। ইসলামী সংস্কৃতিই শ্রেষ্ঠ সংস্কৃতি। আমরা যখন গান পরিবেশন করবো, কথা বলবো, কাজ করবো, পড়ালেখা করবো। সবই হবে সেই সুন্দর সংস্কৃতির আদলে। তাহলেই আমরা একটি সুন্দর জীবন পাবো। আমি তোমাদের কয়েকটি সুন্দর উদাহরণ দেই,
‘লেনদেনে যার অস্বচ্ছতা
নেই হিসেবে পবিত্রতা
তারে নিয়ে সবখানে যে
দ্বন্দ্ব-দ্বিধা-ভয়।’
‘পড়ালেখা করে না যে
লাগুক না সে যতই কাজে
আজ বাদে কাল
তার কপালে জুটবে অপমান
সময় থাকতে সতর্ক হও
দেশের সুসন্তান
জাতির সুসন্তান।’

‘ছোট-বড় যে-কোনো পাপ
থেকে সত্যি বাঁচবে যে-জন-
অনেক দামি পুরস্কার তো
নিশ্চয়ই পাবে, পাবেই সে-জন।’
উপরের লেখাগুলোতে যে চিন্তা প্রকাশ পেলো তা আমাদের সবারই জানা। কিন্তু কবি আমাদের আরো সুন্দর করে, ছন্দবদ্ধভাবে পেশ করলেন। এটাই সংস্কৃতি। সুন্দরের প্রকাশ মাত্রই সংস্কৃতি। আর তা যদি হয় মহান আল্লাহর দেয়া বিধানের সাথে সামঞ্জস্য। তা হলে হয় সোনায় সোহাগা।
আমরা এতক্ষণ যার লেখা নিয়ে কথা বললাম তার কথাই বলতে ভুলে গেছি। না না তার কথা নয়, তার নাম বলতে ভুলে গেছি। আমি মনে করি আমি না বললেও তোমরা তার নাম ঠিকই বলে ফেলতে পারবে। তাঁর নাম কবি মতিউর রহমান মল্লিক। তাঁকে সবাই জাতীয় চেতনার কবি বলে ডাকে। আমাদের যে সৌন্দর্য চেতনা, আমাদের যে ঐশ্বরিক চেতনা, আমাদের যে প্রেমময় চেতনা সবই তাঁর লেখনীর মধ্যে আছে। তাই জাতি তাঁকে সম্মান করে ‘জাতীয় চেতনার কবি’ অভিধায় ভূষিত করেছে।
এবার আমরা কবির কিছু পরিচয় জেনে নিই। বারুইপাড়া গ্রামে ১৯৫৬ সালের ১ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন কবি মতিউর রহমান মল্লিক। তাঁর বাবার নাম মুন্সী কায়েমউদ্দীন মল্লিক এবং মাতার নাম আছিয়া খাতুন। মুন্সী কায়েমউদ্দীন মল্লিক ছিলেন এলাকার শিক্ষক ও কবিয়াল। বাংলা আরবি, ফারসি ও উর্দুভাষায় তাঁর ছিলো ব্যুৎপত্তি। আর হাতের লেখাও ছিলো মুক্তার মতো ঝকঝকে। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী শিক্ষিত এই মানুষটি ছিলেন স্বজ্জন, উদার, সরল ও দানশীল। যে সিলসিলা তার উত্তর-পুরুষ পর্যন্ত প্রবহমান আমরা দেখতে পাই। যাঁরা কবি মতিউর রহমান মল্লিককে দেখেছেন তারা জানেন কবি নিজের সকল কিছু উজাড় করে অন্যের জন্য বিলিয়ে দিতেন। শিশুরা তাঁর কাছে এলে ঋণ করে হলেও তাদের মজার মজার খাবার, বই, উপহার দিতেন।
কবি মতিউর রহমান মল্লিক যেমন সারাদেশে কবি হিসেবে পরিচিত তেমনি তাঁর আপন বড়ভাই এলাকায় কবি সাহেব হিসেবে পরিচিত এবং তাঁর চাচা এলাকায় সাংস্কৃতিক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ছিলেন একাধারে গীতিকবি এবং জারি গান রচয়িতা। কবির আম্মার ছিলো সুরেলা কণ্ঠ। তিনি মায়ের কোলে বসে সুরেলা কণ্ঠে কুরআন তেলাওয়াত শোনতেন। গান, গজল ও আঞ্চলিক মেয়েলি গান করতেন। মায়ের সেই সুরেলা কণ্ঠ কবি মতিউর রহমান মল্লিকের কণ্ঠে এসে আশ্রয় নেয়। তাই শিশুকাল থেকেই তাঁর কণ্ঠের জাদুতে বিমোহিত হয় পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের এই বেড়ে ওঠা কবি মতিউর রহমান মল্লিক মক্তব, মাদরাসায় সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল তৈরি করেন। এলাকায় ফুটবল টিম তৈরি করে ছেলেদের মাঝে সাংগঠনিক পরিচয় তুলে ধরেন। আর ফাইনাল খেলার দিন ফুটবল খেলার সাথে সাথে গান গজলেও মাতিয়ে দিতেন তিনি। এ সময় তিনি নজরুলের মতো ইসলামী গান লেখা, সুর করা ও গাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখতেন।  ইসলামিক আঞ্চলিক গানের সাথে সাথে আধুনিক ইসলামী গান লেখা, সুর করা ও গান পরিবেশন করে সাংস্কৃতিক ময়দানে নতুন জোয়ার আনেন।
হ্যাঁ, জানলে তো তার জীবনবৃত্তান্ত। এবার আমরা আরো একটু দেখে নিই শিশুমনো বিকাশে তার লেখনীর চিত্র।
‘মেজাজ শান্ত রাখলে তোমার ক্ষতি কি ভাই?
কমবে তাতে তোমার কাজের গতি কি ভাই?
খারাপ মেজাজ সোনার সে এক হাতি কি ভাই?
বাড়বে তাতে তোমার দেহের জ্যোতি কি ভাই?
মেজাজ শান্ত রাখলে তোমার ক্ষতি কি ভাই?’

‘নামবে আঁধার তাই বলে কি
আলোর আশা করবো না?
বিপদ-বাধায় পড়বো বলে
ন্যায়ের পথে লড়বো না?’

‘ভালো নয়-    কাটাকাটি,
ঝাঁটাঝাঁটা,     ফাটাফাটি,
লাঠালাঠি    লড়াটা!

ভালো নয়Ñ    গালাগালি,
কালাকালি,    চালাচালি,
ফালাফালি    পড়াটা!’

‘মারলে একটা পাখির ছানা
একটাই যায় মরে,
ছিঁড়লে একটা ফুলের কলি
একটাই যায় ঝরে।

কিন্তু একটা মারলে মানুষ
করলে একটা খুন-
খুন করা হয় সকল মানুষ
সকল তমদ্দুন।
তাই খুনিদের বিরুদ্ধে হও জড়ো-
লড়াই লড়াই তুমুল লড়াই করো।’

নৈতিকতাপূর্ণ এ লেখা পাঠে একজন শিশু-কিশোর হয়ে উঠবে সমাজের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। শিশু মনে যে ক্লেদ লুকিয়ে থাকে তাকে দূর করে সুনির্মল একটি মনোজগৎ সৃষ্টি করে। সেখানে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, প্রেম, দয়া, মায়া সৃষ্টি হয়। ভালো ভালো কাজ করতে শিশুকাল থেকেই সে তৈরি হয়। সে তো একদিন সমাজের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হবে। সেই মানুষ যেনো মানুষের কল্যাণ করে। এই নৈতিকতাবোধ যদি শিশুর মনে স্থান না করে নেয় তাহলে সমাজে সৃষ্টি হবে বিশৃঙ্খলা। সেই বিশৃঙ্খলায় ভেসে যাবে আমাদের ভূতভবিষ্যৎ। একটি কল্যাণময় জীবন থেকে আমরা দূরে সরে যাবো। কবি মতিউর রহমান মল্লিকের লেখা শিশু-কিশোররা যতো পাঠ করবে ততোই সমৃদ্ধ হবে। সমৃদ্ধ হবে রাষ্ট্র, সমাজ ও পৃথিবী।

SHARE

Leave a Reply