Home আন্তর্জাতিক সবুজ মণি ও রত্নের দেশ মিয়ানমার -মুহাম্মদ আশরাফুল...

সবুজ মণি ও রত্নের দেশ মিয়ানমার -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

মিয়ানমার ইউনিয়ন প্রজাতন্ত্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম গরিব দেশ। ভারতের পর আমাদের দ্বিতীয় প্রতিবেশী রাষ্ট্র। ১৯৮৯ সালে সামরিক সরকার দেশটির পূর্বেকার বার্মা নাম পরিবর্তন করে নতুন নামকরণ করে মিয়ানমার। তবে দেশে-বিদেশে অনেকের কাছে দেশটি এখনো বার্মা নামেই পরিচিত। বর্তমান রাজধানী নেপিইডউ এবং সাবেক রাজধানী রেঙ্গুন মিয়ানমারের বৃহত্তম শহর। এ দেশের সীমান্তে রয়েছে বাংলাদেশ, ভারত, চীন, লাওস ও থাইল্যান্ড। মিয়ানমারের মোট সীমান্তের এক-চতুর্থাংশ অর্থাৎ ১ হাজার ৯৩০ কিলোমিটার একাধারে জুড়ে রয়েছে বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরের উপকূল।
মিয়ানমার সবুজ মণি, রত্ন, তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও অন্যান্য খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ একটি দেশ। মিয়ানমারে আয়বৈষম্য বিশ্বে সবচেয়ে বেশি। কেননা দেশটির অর্থনীতির একটা বিরাট অংশ সাবেক সামরিক সরকারের সমর্থকরা নিয়ন্ত্রণ করে। মানব-উন্নয়ন সূচক অনুযায়ী, মিয়ানমার মানব উন্নয়নের খুবই নি¤œ পর্যায়ে রয়েছে। বিশ্বের ১৮৭ দেশের মধ্যে মিয়ানমারের অবস্থান ১৫০।
৬ লাখ ৭৬ হাজার ৫৭৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দেশটির জনসংখ্যা ২০১৪ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ৫ কোটি ১৪ লাখ ৮৬ হাজার ২৫৩ জন, যা কাক্সিক্ষত জনসংখ্যার চেয়ে অনেক কম। সরকারি হিসাবে মিয়ানমারের জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ বৌদ্ধ, ৭ শতাংশ খ্রিষ্টান, ৬ শতাংশ স্থানীয় সর্বপ্রাণবাদী, ৪ শতাংশ মুসলিম, ২ শতাংশ হিন্দু এবং অন্যান্য ১ শতাংশ। জাতিগত গ্রুপের মধ্যে রয়েছে বামার ৬৮ শতাংশ, শান ৯ শতাংশ, কারেন ৭ শতাংশ, রাখাইন ৪ শতাংশ, চীনা ৩ শতাংশ, ভারতীয় ২ শতাংশ, মন ২ শতাংশ এবং অন্যান্য ৫ শতাংশ।
সরকারি হিসাবে এ দেশে মুসলিম জনসংখ্যা ৪ শতাংশ বলা হলেও স্বাধীন গবেষকদের হিসেবে এ দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার ৬ থেকে ১০ শতাংশ এবং মুসলিমদের দাবি ১২ শতাংশ। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ। এ দেশে মুসলিমরা ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষের শিকার। সরকারি ও সামরিক বাহিনীতে মুসলিমদের চাকরি দেয়া হয় না। মিয়ানমার সরকার কয়েক বছর আগে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও রাষ্ট্রসত্তা কেড়ে নিয়েছে। রোহিঙ্গা মুসলিমদের নির্মূল করার জন্য মিয়ানমার নির্মম ও নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়ে আসছে। এ ছাড়া সাগরপথে পালাতে গিয়েও অনেক রোহিঙ্গা অনাহারে ও পানিতে ডুবে মারা গেছে। উল্লেখ্য, মিয়ানমারে প্রায় ৬৭টি নির্যাতন শিবিরে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা কার্যত বন্দী রয়েছে। মালয়েশিয়ায় প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু রয়েছে। তবে বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডে কত রোহিঙ্গা রয়েছে তার সঠিক কোনো হিসাব নেই।
মিয়ানমারের প্রশাসনিক এলাকা সাতটি রাজ্য, সাতটি অঞ্চল (বিভাগ) এবং ৬৭টি জেলায় বিভক্ত। অঞ্চলগুলোতে বামার জাতিগত গ্রুপের প্রাধান্য রয়েছে, পক্ষান্তরে রাজ্যগুলোর প্রত্যেকটিতে পৃথক জাতিগত সংখ্যালঘু গ্রুপের লোকেরা বাস করে। ১৪টি রাজ্য ও অঞ্চলগুলো হলো কাচিন রাজ্য, কায়াহ রাজ্য, কায়ইন রাজ্য, চিন রাজ্য, সাগাইং অঞ্চল, তানিনথারাই অঞ্চল, বাগো অঞ্চল, ম্যাগওয়ে অঞ্চল, ম্যানডালে অঞ্চল, মন রাজ্য, রাখাইন রাজ্য, ইয়াঙ্গুন অঞ্চল, রাখাইন অঞ্চল, শান রাজ্য ও আইয়েইয়ারদি অঞ্চল। বর্তমান প্রেসিডেন্ট হলেন হতিন কিয়াও, রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা (প্রধানমন্ত্রীর সমকক্ষ পদ) অং সান সু কি, প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মিইন্ট সয়ে, দ্বিতীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট হেনরি ভ্যান থিও। মুদ্রার নাম বর্মি কিয়াট। পার্লামেন্ট দ্বিকক্ষবিশিষ্ট, ২২৪ সদস্যের জাতীয় পরিষদ এবং ৪৪০ সদস্যের প্রতিনিধি পরিষদ।
মিয়ানমারের উত্তরে হেংডুয়ান পর্বতমালা চীনের সাথে সীমান্ত তৈরি করে রেখেছে। কাচিন রাজ্যের হকাকাবো রাজি মিয়ানমারের সর্বোচ্চ স্থান (উচ্চতা ১৯,২৯৫ ফুট)। মিয়ানমারের পর্বত রেঞ্জগুলো হিমালয়ের উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে চলে গেছে। পর্বত শৃঙ্খলগুলো মিয়ানমারের তিনটি নদীব্যবস্থাকে বিভক্ত করে রেখেছে। সেগুলো হলো ইরাওয়ারদি, সালউইন ও সিতং নদী। ইরাওয়ারদি নদী মিয়ানমারের সবচেয়ে দীর্ঘ নদী, যার দৈর্ঘ্য ২,১৭০ কিলোমিটার। নদীটি মারটাবান উপসাগরে গিয়ে পড়েছে। পর্বত শৃঙ্খলগুলোর মধ্যকার উপত্যকাগুলোতে রয়েছে উর্বর সমভূমি। মিয়ানমারের জনসংখ্যার বেশির ভাগ ইরাওয়ারদি উপত্যকায় বাস করে।
আদি বাগান যুগে (৬৫২-৬৬০ খ্রিষ্টাব্দ) আরব বণিকরা থাটন, মারতাবান ইত্যাদি বন্দরে অবতরণ করেন। তখন আরব মুসলিম জাহাজগুলো মাদাগাসকান দ্বীপ থেকে চীনে যেতো এবং তারা এই পথে বার্মায় যাওয়া-আসা করতো। মুসলিমরা নবম শতাব্দীতে বার্মার তানিনথারি উপকূল ও রাখাইনে পৌঁছেন। ১০৫৫ খ্রিষ্টাব্দে বাগানের রাজা আনাউরাথা প্রথম বার্মিজ সা¤্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। সকল মুসলিম প্রথমে আরাকান উপকূলে পৌঁছেন এবং পরে মংডউয়ে চলে যান। এভাবে এখানে মুসলিমদের আগমন ঘটে, বসতিস্থাপন হয়, ইসলাম প্রচার হয় এবং এমনকি মুসলিমরা এখানে স্থানীয়দের সাথে বৈবাহিক সম্পর্কেও আবদ্ধ হন।
মিয়ানমারের আদি সভ্যতার মধ্যে রয়েছে উত্তর বার্মার তিবেতো-বার্মান-ভাষী পিউ নগর-রাষ্ট্র এবং দক্ষিণ বার্মার মন রাজ্য। নবম শতাব্দীতে বামার জনগণ উত্তর ইরাওয়ারদি উপত্যকায় প্রবেশ করে এবং ১০৫০ এর দশকে পাগান রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বর্মি ভাষা, সংস্কৃতি ও থেরাভাদা বৌদ্ধধর্ম দেশটিতে ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। মঙ্গল আগ্রাসনের কারণে পাগান রাজ্যের পতন ঘটে এবং বেশ কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটে। ষোড়শ শতাব্দীতে টংগু রাজবংশের মাধ্যমে পুনরায় একীভূত হয়ে দেশটি অল্প সময়ের জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাসে বৃহত্তম সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে কনবং রাজবংশ আধুনিক মিয়ানমার এলাকা শাসন করে এবং সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য মনিপুর ও আসাম নিয়ন্ত্রণ করে। ব্রিটিশরা ঊনবিংশ শতাব্দীতে তিনটি এ্যাংলো-বার্মিজ যুদ্ধের পর মিয়ানমার দখল করে এবং দেশটি ব্রিটিশ উপনিবেশে পরিণত হয়। মিয়ানমার ১৯৪৮ সালে স্বাধীন দেশে পরিণত হয়। মিয়ানমার প্রাথমিকভাবে গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে স্বাধীন হয় এবং পরবর্তীতে ১৯৬২ সালে অভ্যুত্থানের পর সামরিক স্বৈরশাসনের অধীনে চলে যায়।
২০১০ সালে সাধারণ নির্বাচনের পর ২০১১ সালে সামরিক সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে দেয়া হয় এবং নামমাত্র একটি বেসামরিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। সাবেক সামরিক নেতারা এখনো দেশে অপরিসীম ক্ষমতার অধিকারী হলেও বার্মার সামরিক বাহিনী সরকারের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়ার পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে মুসলিম রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের ব্যাপারে সরকারের ব্যবহার এবং ধর্মীয় সংঘাতের ব্যাপারে সরকারের নগণ্য সাড়া এখনো সমালোচনার বিষয় হয়ে আছে। ২০১৫ সালের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে অং সান সু কির দল পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে জয়লাভ করেছে এবং এর ফলে দেশটি সত্যিকার গণতন্ত্রের পথে অগ্রসর হচ্ছে।
এখানে স্মরণ করা যেতে পারে যে, সর্বশেষ মুঘল স¤্রাট বিশিষ্ট উর্দু কবি ও গজল লেখক মির্জা আবু জাফর সিরাজুদ্দিন মুহাম্মদ বাহাদুর শাহ জাফর রেঙ্গুনে নির্বাসিত থাকা অবস্থায় ১৮৬২ সালের ৭ নভেম্বর ৮৭ বছর বয়সে মারা যান এবং সেখানেই তাকে দাফন করা হয়। মুঘল সা¤্রাজ্য একপর্যায়ে শুধুমাত্র দিল্লি (শাহজাহানবাদ) নগরীতে সীমিত হয়ে পড়লে তিনি তখন নামমাত্র স¤্রাটে পরিণত হন। ১৮৫৭ সালে ভারতীয় বিদ্রোহে সমর্থন দেয়ার অভিযোগে ব্রিটিশরা তাকে তাদের নিয়ন্ত্রিত বার্মায় নির্বাসনে পাঠায়। স¤্রাট হিসেবে তিনি ২০ বছর ৪২ দিন ক্ষমতায় ছিলেন।

SHARE

Leave a Reply