Home বিশেষ রচনা কাশের বনে লাগলো হাওয়া -জারিফ ইয়াসির চৌধুরী

কাশের বনে লাগলো হাওয়া -জারিফ ইয়াসির চৌধুরী

আমাদের দেশে ছয়টি ঋতু। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। এই ষড়ঋতুর বৈচিত্র্য প্রতিনিয়তই আমাদের মুগ্ধ করে তোলে। এখানে প্রত্যেক ঋতুতে প্রকৃতির রূপ হয় ভিন্ন ভিন্ন। তার মধ্যে থাকে আলাদা আমেজ, আলাদা সৌন্দর্য। ঋতুর প্রভাবে মানুষের জীবনযাত্রারও পরিবর্তন ঘটে স্বাভাবিকভাবে। স্নিগ্ধতার আমেজ নিয়ে আমাদের দেশে এখন চলছে শরৎকাল। শরৎকে বলা হয় ঋতুর রানী। কারণ শরৎকালই বর্ষার  সৌন্দর্যকে সাদরে গ্রহণ করে অপরূপ সাজে নিজেকে সাজিয়ে তোলে। বর্ষার হালকা মেঘ শরতের নির্মল আকাশে সাদা সাদা পাল তুলে মনের আনন্দে ভেসে বেড়ায়। দিনের বেলায় শরতের স্নিগ্ধ রোদে গ্রাম-বাংলার মাঠ-ঘাট, নদী-নালা, বড় বড় জলাশয় ঝলমল করে। শরতের এমন ভোলানো রূপ  সত্যিই অতুলনীয়।
উল্লেখ্য, প্রাচীনকালে শরৎঋতু শুরু হলে রাজারা যুদ্ধজয়ে বেরিয়ে পড়তেন। অশ্বারোহী  সৈন্য থাকতো রাজার সাথে। বুকে থাকতো বিজয়ের নেশা। শরতের সৌন্দর্য তৎকালীন শাসকদের হৃদয়কে প্রভাবিত করেছিল।  বাংলাদেশের ঋতু পরিক্রমায় শরৎকালের আছে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান। শরতের সৌন্দর্য আমাদের জাগিয়ে তোলে অনাবিল আনন্দ। ফুল, ফল, আর ফসলের দেশ বাংলাদেশের এই ঋতু সবার মনেই আনন্দের সঞ্চার করে। বাংলা ভাদ্র-আশ্বিন এই দুই মাস শরৎকাল। শরৎ অত্যন্ত মনোরম ঋতু, যার সৌন্দর্যের তুলনা হয় না। বর্ষার একটানা অস্বস্তির পর স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে আসে শরৎ। শরতের পবিত্রতার কাছে সবাই তাই হার মানে। শরতের প্রশংসা না করে কেউ থাকতে পারে না। শরতের আবেদন তাই প্রতিটি মানুষের কাছে আদরণীয়।
শরৎ অনেক গুণে গুণান্বিত বলেই একে নিয়ে কল্পনার কোনো শেষ নেই।  দেশের মাটি আর মানুষের সাথে গভীরভাবে মিশে আছে শরৎ। মিশে আছে প্রকৃতির সাথে একইভাবে। প্রকৃতি যে শরৎকে পেয়ে গর্বিত তার প্রমাণ মেলে আমরা যখন তাকাই প্রকৃতির দিকে। প্রকৃতির সাথে শরতের সুনিবিড় সম্পর্ক আর মনে হয় অন্য কোনো ঋতুতে এতটা দেখা যায় না।   শরতের গ্রাম-বাংলা যেন আমাদের জীবনের প্রতিচ্ছবি। স্বপ্নের মতো মায়াবী আর ছবির মতো ঝকঝকে। এত মায়া এত মমতা এত ভালোবাসার ঢেউ অন্য ঋতুতে পাওয়া কঠিন। শরৎ তাই সুন্দরের ডানা সাজিয়ে আমাদের গ্রাম-বাংলার প্রকৃতিকে উদার হাতে বিলায়। কাশবন সেই দৃশ্যের কোমল ছবি। কাশবনে উড়ে যায় নীল লাল প্রজাপতি। আরো আছে বেগুনি, হলুদ আর কালো ধূসর রাঙা প্রজাপতি।
শরৎ পাখির পাখায় কম্পন জাগায়। ফুলের মাঝে আনে স্পন্দন। এ সময় বাতাস থমকে দাঁড়িয়ে যায়। অবাক চোখে দেখে ফুল ও প্রজাপতির সুখ। কাশবনে ছুটে আসে মৌমাছি। দারুণ পিপাসা নিয়ে বুকে। তবুও গান করে। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে সে গান।  বাতাস ফেরি করে গানের বাণী। মৌমাছি কাশবনে অতিথি। অতিথি ভোমরা। তাদের মধু বিলিয়ে দিয়ে খুশি করে কাশফুল। কাশের বুকে জেগে ওঠে শরৎ সকাল। শরতের সাথে প্রকৃতির ভালোবাসা মানুষের অন্তরকে স্পর্শ করে। রূপে-গুণে সৌন্দর্যের তুলনা হয় না বলেই শরৎ রূপের রানী।
নদীর ধারে, কাশের বনে, বাতাসের দোলায়, শরতের আগমন যেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আরো সমৃদ্ধ ও প্রাণবন্ত করে তোলে।  সবুজ ঘাসের বুকে শিশিরের বিন্দু শরতের উপস্থিতির ছোঁয়া দিয়ে যায়। শরৎকে পেয়ে প্রকৃতি আরো সবুজ ও সজীব হয়ে ওঠে। শরতের এই সবুজের বুকে আরো সবুজের আস্তরণ ছড়ায় ধানের গাছগুলো।  মৃদু বাতাসে নেচে তারা মনের আনন্দ প্রকাশ করে এই শরৎকালে। কচি ধানগুলো আরো সবুজ হয়। আশ্বিনের শেষে চাষির মুখে  ফুটে উঠবে হাসি। কৃষকের দামাল শিশুরা ধানের গন্ধ গায়ে মেখে উঠোনে গড়াগড়ি যাবে। ধান পাকবে হেমন্তে। শরৎ সেই হৈমন্তিক বাণী শোনায় কৃষকের কানে। শরতের ভোরে কৃষক ধানের জমির আল ধরে হেঁটে যায়।  কৃষকের পায়ে শিশিরভেজা ঘাস আর শরীরে ধানগাছের পাতা পরশ বুলায়। এ পরশ তার মনে সুখের আমেজ আনে। শরতের ভোরে শিশিরে ধুয়ে যায় মাঠ-ঘাট-পথ-গাছ-পালা। মনে হয় প্রকৃতি যেন সারা রাত স্নান করেছে।  মুক্তোর মতো ঘাসের ডগায় সূর্যের আলতো কিরণে ঝলমল করে ওঠে শিশিরবিন্দু। শিউলি ফুলের পাপড়িতে কেঁপে ওঠে শরতের ভোর। আদর বুলানো হাওয়া। শিরশির দুলুনিতে মুগ্ধ। ভীষণ আরাম লাগে। ঘুম ঘুম আরামে চোখ বুজে আসে। কিন্তু মানুষ আবার ব্যস্ত হয় কাজে। কাজের সন্ধানে ছুটে চলে মানুষ। ছেলেমেয়েরা যায় পাঠশালায়। চাষি ছুটে খেত-খামারে। সারাদিন ব্যস্ততার পর আবার মানুষ ফিরে আসে আপন ঠিকানায়।
শরতের প্রকৃতি আসলেই মনোমুগ্ধকর। সারা আকাশজুড়ে মেঘেদের ওড়াউড়ি। মেঘগুলো যেন উড়তে উড়তে কাত হয়ে যায়। ঢুকে যায় একদল থেকে আরেক দলে। কখনো উধাও হয়ে যায়। হারিয়ে যায় শূন্য থেকে। কোন কোন মেঘদল নেমে আসে দিগন্ত ছেড়ে। নেমে আসে পাহাড়ের ঢালে।
শরতের আকাশ গাঢ় নীল।  সাদা মেঘের ওপাড়ে নীলের গ্রাম। তাই শরতের আকাশভরা নীলে জেগে ওঠে সমুদ্র। সমুদ্রের বুকে বিছানা পাতে নীল।  লোনা আরামে ঘুমিয়ে পড়ে। আবার জেগে ওঠে ঢেউয়ের উচ্ছ্বাসে।  শরৎ দাঁড়িয়ে থাকে বকুল তলায়। ঝরে পড়া বকুলেরা দেখে। কাছে আসে শরৎ।  বকুলের সৌরভ মেখে নেয়। মেখে নেয় হাতে মুখে গায়ে। শরৎ সুবাসিত হয়। এক সময়ে পুব আকাশে উজ্জ্বল করে সূর্য ওঠে। সকাল পেরিয়ে গড়িয়ে আসে শরৎ দুপুর। বকুল ছায়ায় ভিজিয়ে নেয় শরৎ দুপুর।  শরৎ দুপুরের আলোয় ঘাস, ধান, বাঁশঝাড়, খড়ের চালে জমে থাকা শিশির বিন্দুগুলো শুকিয়ে যায়।
শরতের দুপুর বড়ই নির্মল। নীলের গভীরতা বেড়ে যায় আকাশে। সাদা হালকা মেঘ আনমনে উড়ে যায়। ওড়ে দক্ষিণা দিগন্ত ছেড়ে। নীরব পাখা মেলে ওড়ে সাদা চিল। মেঘের কাছাকাছি ডানা মেলে শিকারি ঈগল। কোথায় লুকিয়ে আছে তার শিকার। শরতের দুপুর খানিকটা দক্ষিণে বেঁকে যায়। ধীরে ধীরে ছোট হয়। তারপর হেঁটে যায় বিকেলের দিকে। উল্লেখ্য, শরতের বিকেল আরো মায়াবী। রোদ নিজেকে অনেকটা শীতল করে নেয়। সবুজ গাছগাছালি রোদ খেয়ে খেয়ে বেশ তাজা হয়ে ওঠে। কলাপাতার গায়ে রোদের সাথে কাত হয়ে থাকে শরৎ। ফলে বনানীর মতো মাঠও সবুজ হয়ে ওঠে। একসময় মাঠভরা ধানের সবুজে গড়াগড়ি করে শরৎ বিকেল। শরৎসন্ধ্যা এসে দাঁড়ায় লালিমার নিচে। লাল কমলায় রাঙা হয় শরতের মুখ। শরৎসন্ধ্যায় জমে ওঠে কবিতার আসর। গানের জলসা। পাখিদের গানে গানে শরৎসন্ধ্যা প্রবেশ করে রাতের ঘরে। ঝিরঝির বাতাস হাত বুলিয়ে যায় প্রকৃতির গায়ে। সেই আরাম নিয়ে আসে শরতের রাত। পাখিরা চোখ বোজে, চোখ বোজে প্রকৃতির গাছেরা।  ধীরে ধীরে শরৎ হাঁটে রাতের দিকে। রাতের শরৎ মানে ভেজা ভেজা ঘুম। ঘুম ঘুম তারাজ্বলা রাত। রাতভর জেগে থাকে জোনাকি।
শরতের রাত বড় মজার রাত। না ঠান্ডা। না খুব দীর্ঘ, না খুব ছোট। শরৎ রাতে আকাশে দেখা দেয় ঘন তারকার বন। রাতভর, সারারাত। একটানা জ্বলে। জ্বলতে জ্বলতে কত তারা নিভে যায়। নিভতে নিভতে আবার জ্বলে। কোন কোনটি দূর থেকে কাছে আসে, কোনটি আবার কাছ থেকে দূরে সরে যায়। যেতে যেতে চোখের আড়াল হয়ে যায়। এভাবে কত তারা জ্বলে আর কত তারা নেভে, কে রাখে তার খবর! শরতের মধ্য-রাতে আকাশে জমে তারার মিছিল।
শরতের পূর্ণিমা রাতে জ্যোস্নায় মন ভরে ওঠে। এ সময় মেঘমুক্ত রাতের আকাশে চাঁদ তার প্রাচুর্য উজাড় করে ঢেলে দিয়ে আকাশে ভাসে। কী অপূর্ব সেই দৃশ্য! যা ভোলার নয়। শরতের জোছনা শ্রাবণের মতো স্বচ্ছ থাকে না। ধোঁয়ায় মিশিয়ে নামে জোছনারা।
শরৎ উৎপাদনের ঋতু। কৃষিনির্ভর বাংলা- দেশে বর্ষায় জনজীবন বিপর্যস্ত হলেও বর্ষার  কোনো বিকল্প নেই। বর্ষার অবিরাম বর্ষণ আর খাল-নদী-বিল ছাপিয়ে আসা পানি অবারিত সবুজের মাঠ প্লাবিত করলেও পানি নামার সময়  থেকে যায় স্তরে স্তরে পলি। যে পলিতে কৃষক বুনে তার আগামীর স্বপ্ন। তার স্বপ্নজুড়ে থাকে সবুজ ফসলে ভরা দিগন্তজোড়া ক্ষেত। তাই বর্ষার উর্বর মাটিতে সবুজ সোনা ফলাতে আসে শরৎ। শরৎ এলে বৃক্ষরাজির আড়ালে আবডালে থাকা পাখিরা নুতন  প্রাণের স্পন্দনে জেগে ওঠে।
শরতে আমাদের জাতীয় পাখি  দোয়েল, কোয়েল, বুলবুলিসহ সব পাখি গান করে। বিশেষত শরৎকালে দোয়েল পাখির শিস শুনতে কী যে ভালো লাগে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
শরতের স্নিগ্ধ শোভাকে আরো মোহনীয় করে এই মৌসুমের বিচিত্র ফুলেরা। নদী কিংবা জলার ধারে ফোটে কাশ-কুশ, ঘরের আঙিনায় ফোটে শিউলি- শেফালি, খাল-বিল-পুকুর ডোবায় থাকে অসংখ্য জলজ ফুল। আর শেষ রাতের মৃদু কুয়াশায় ঢেকে থাকা মায়াবী ফুলেরা যেন আরো রূপসী হয়ে ওঠে। শিশিরভেজা শিউলি বাতাসে মৃদু দোল খাওয়া কাশবনের মঞ্জরি, পদ্ম-শাপলা-শালুকে আচ্ছন্ন জলাভূমি শরতের চিরকালীন রূপ। সত্যিই বিচিত্র রূপ নিয়ে শরৎ আমাদের চেতনায় ধরা দেয়। আমাদের অন্যান্য ঋতুগুলো অনেক ফুলের জন্য বিখ্যাত হলেও মাত্র কয়েকটি ফুল নিয়ে শরৎ গরবিনী। তাই কাশ-শিউলির শোভা উপভোগ করতে হলে আমাদের রূপের রানী শরতের কাছে যেতে হবে।  ভাবুকদের কাছে শরৎ ঋতু নানা গুণে গুণী। নমনীয়তা, ভদ্রতা, স্নিগ্ধতা ও মিষ্টতার ঋতুও শরৎ। কারো মতে রূপসী রূপের পরী, কারো কাছে ঋতুপরী শরৎ। আসলেই তাই।
বসন্তের পর শরৎ ছাড়া এমন কোনো ঋতু নেই যা  ছোট বড় সকলের মনে দোলা দিতে পারে।  শরতের সুখ  মেখে এভাবেই কাটে এ  দেশের মানুষের জীবন। ছন্দময়, গতিময় এক অনাবিল শান্তির ঋতু শরৎ। এই শরতে আমাদের মন আন্দোলিত হয় বারবার। তাই শরৎ ঋতুর রানীÑ শরৎ সুন্দর, শরৎ প্রাণোচ্ছল, শরৎ সজীব। শরতের সাথে জড়িয়ে রয়েছে সৌন্দর্যের ছোঁয়া।

SHARE

Leave a Reply