Home নাটিকা টুই-টুই আর পিক-পিক -হুসনে মোবারক

টুই-টুই আর পিক-পিক -হুসনে মোবারক

এক বনে টুই-টুই নামে একটি পাখি একাকী বাস করত। একদিন অন্য একটি পাখিকে দেখে সে আনন্দে লাফিয়ে উঠল।
টুই-টুই     : (মনে মনে বলল) পাখিটা মনে হয় আমার মতোই একা। আমি যাই না কেন তার কাছে।
(সে পাখিটার কাছে গিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলল) ভাই পিক-পিক তোমার কি মন খারাপ, নাকি আমার মতো একা তুমি?
পিক-পিক     : (চিন্তিত মুখে পিক-পিক পাখিটি বলল) পথ হারিয়ে এই বনে এসে পড়েছি, এখানে কোনো পাখি দেখছি না, আমি খুবই একা। কিছুই ভালো লাগছে না আমার, বিরান ভূমির মতো লাগছে বনটা।
টুই-টুই     : (হাসিমুখে) আমিও তো তোমার মতই একা! তোমাকে পেয়ে আমার মন ভালো হয়ে গেছে। আমরা দু’জনে মিলে মিশে খুব থাকতে পারব এই বনে। কী বলো পিক-পিক?’
পিক-পিক     : মিলে মিশে থাকতে পারব মানে? তুমি এক জাতের পাখি আর আমি আরেক জাতের পাখি! দুই জাতের দু’টি পাখি কি এক সাথে মিলে মিশে থাকতে পারে? এটাও কি সম্ভব?’
টুই-টুই     : কেন সম্ভব নয়। হতে পারি আমরা দুইজন দুই জাতের পাখি, তাতে কী!
তা ছাড়া, এখানে আছে অনেক বিষাক্ত সাপ আর হিংস্র পশু। একা থাকা মানেই তো নিজেকে বিপদ আর কষ্টের মাঝে ঠেলে দেয়া। আর মিলে মিশে থাকা মানে আনন্দ আর নিরাপদে থাকা। আমরা তো চমৎকার বন্ধু হতে পারি, কী বলো পিক-পিক?’
পিক-পিক     : বন্ধু! তুমি দেখতে আমার চেয়ে অনেক সুন্দর। তোমার গায়ের রং, পাখা, ঠোঁট, পা ও পুচ্ছ যেমন রঙিন তেমন সুন্দর। দেখো, তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব হওয়ার মতো কোনো রং নেই আমার।
টুই-টুই    : মিলে মিশে থাকার জন্য বাইরের রং কোনো বাধা নয়। মনের রংটাই হলো আসল। আমরা পাখি, ব্যস এটাই বড় কথা। খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। তর্ক না করে চলো পেট ঠান্ডা করি আগে। তারপর অন্য কথা।
(পিক-পিক কোনো জবাব না দিয়ে টুই-টুই পাখির পিছু পিছু উড়ে চলে গেল খাবারের সন্ধানে। টুই-টুই পাখির সাথে পিক-পিক পাখির খাতির হয়ে গেল। তারা সারাদিন এক সাথে থাকে আর গল্প করে। আনন্দে ছুটোছুটি করে। গাছের মগডালে খুব সুন্দর বাসা বানিয়েছে তারা। কিছুদিন পর ডিম পেড়েছে পিক-পিক। ডিম ফুটে ফুটফুটে দু’টি বাচ্চা বেরিয়ে এলো। আনন্দের আর সীমা নেই।)
অন্য পাখি     : আচ্ছা পিক-পিক, তুমি বলতো, আমাদের চেয়ে সুন্দর পাখি বলে তার বড় অহঙ্কার। ক’দিন পরেই না তোমাকে ঘৃণাভরে তাড়িয়ে দিবে টুই-টুই। এটা কি আমাদের জন্য অপমানের বিষয় না?
পিক পিক    : এই গভীর বনে ভয়ঙ্কর বিপদে আমরা জাতপাত ভুলে নিজেদের শুধু পাখি ভেবেছি। আমাদের এখন কোনো কষ্ট নেই। দেখতেই পাচ্ছ, কত সুখে আছি আমরা।
(পিক-পিককে পটাতে না পেরে এবার এই পাখিটি টুই-টুইকে বুঝাতে লাগলো)
অন্য পাখি     : আচ্ছা টুই-টুই, জাতপাত বলতে কিচ্ছু মানো না তুমি? পিক-পিকের মতো অসুন্দর ও অন্যজাতের একটা পাখির সঙ্গে কি তোমার বন্ধুত্ব হতে পারে? আমাদের রূপের সঙ্গে তাদের কোনো তুলনা হয়, ছিঃ টুই টুই, ছিঃ।
টুই-টুই     : এত ছিঃ ছিঃ করছ কেন? আমরা পাখি। এটাই তো বড় পরিচয়। আর আমাদের মিলে মিশে থাকার পেছনে সেই পরিচয়টাই বেছে নিয়েছি আমরা। আমাদের মনে কোনো দুঃখ নেই। দেখতেই পাচ্ছ আমরা কত ভালো আছি।
বুড়ো পাখি     : শুনো, আমরাও ওই দুই জাতের দু’টি পাখির মতো সুখী হতে পারি, যদি আমরা জাত আর রং ভুলে নিজেদের শুধু পাখি ভাবতে পারি।
সবার আগে প্রয়োজন সদ্ভাব আর সদিচ্ছা। গায়ের রং তো আর আমরা নিয়ে আসিনি। আল্লাহ তাঁর ইচ্ছামত আমাদের বানিয়েছেন। সুতরাং চলো আমরা মিলে মিশে বসবাস করি। এতে আমাদের সবাই নিরাপদ থাকবে, সুখে থাকবে।
(বুড়ো পাখির কথায় সবাই খুশি হয়ে  গেল। পাখিরা আনন্দে হই হই করে টুই-টুই আর পিক-পিক পাখিকে বরণ করে নিলো এবং সবাই সুর করে গেয়ে উঠল)
কোরাস     :     জাত-পাত মানি না, আমরা সবাই এক
জাত ভুলে টুই-পিক সুখে আছে দেখ
হিংসা-বিবাদ ভুলে যদি মিলে মিশে থাকি
সারা জীবন সুখে থাকবো আমরা সকল পাখি।
(মূল গল্প: বি এম বরকতুল্লাহ)

SHARE

Leave a Reply